কুমারেশ তেওয়ারী


কু মা রে শ  তে ও য়া রী


পাথর

ভাস্কর্য নির্মাণে যুবক ভাস্কর, সামনে মডেল, নারী
সমস্ত শরীর ঘিরে যার উদাসীন কোলাজের ঢেউ
ভাস্কর জানেন উদাসীনতার থেকে কীভাবে নিখুঁত 
পেড়ে নিতে হয় আগুনের শিখা, বরফীয়া নদীটির গান
পেড়ে নিতে হয় ঘন উপত্যকাটির বুকে 
একই সঙ্গে ফুটে থাকা ক্রিশেন্থিমাম এবং 
অর্কিডের বুকে ফোটা ছান্দিক কবিতা 

ছেনি ভাবছে, হাতুড়ির ঘা যেন ঠিকঠাক পড়ে 
নতুবা বাঁকের ভেতরে জমে উঠবে খুব উলটপুরাণ
বাঁকনির্মাণটি এমন হবে, যেন নাবিক কাছে গেলে 
মনে পড়ে যায় তার নৌকাটির কথা  

ভাস্কর চেয়ে আছেন আকাশের দিকে, ছেনি ও হাতুড়িও
একটা পাখি উড়ে গেলে তার ডাক শোনা গেল, রভস রভস!

পাথর ও নারী মুখোমুখি বসে কিছুটা কৌণিক  
পাথর ভাবছে শুধু কে বেশি পাথর


ছুঁচসুতো

সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি
যেখানে যা ছেঁড়াফাটা দেখি 
আনাড়ি আঙুলে রাখি শিক্ষানবিসি
আলোর পর্দার যে ফাটা অংশ দিয়ে 
ঢুকে আসে অন্ধকার কাল স্রোত হয়ে
সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি হাতে

ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি, 
ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন আর বিনোদিনি রাই
গোপন হাঁড়িতে রাঁধে ভাতের সুঘ্রাণ

বিত্রস্ত আলোকে বিভঙ্গের সামান্য বদল 
টেরিকাটা শ্যাম দেয় ফুঁ, 
এখনও অপাপবিদ্ধ বাঁশিটি, থেকে থেকে 
                                        মর্মধ্বনি তোলে 

সুতোতে নিদান রেখে সযত্নে ছিদ্রে পরাই
রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!

সারসত্য

তুমুল বৈরাগ্য মাখি আড়বাঁশি তুলে নিই হাতে
নীরবে ভাসাই সব কুলক্ষয় গেরস্ত রাতের
কিউরিয়ো সপে যাই সন্ন্যাসীর প্রাচীন জটাটি
পূর্ণব্রহ্ম রূপ দিতে পরে নিই অতি পরিপাটি

পুরোনো বটের ঝুরি দেখে ভাবি নির্জনসন্ধ্যায়,
সপ্তর্ষিমণ্ডল থেকে ঋষি এক এখানে ঝাঁপায়?
হরিণ-হরিণী দে‘খে সংগমের ক্রিয়াধর্মী রূপ
ঋষি কি কামের গন্ধে পরাজিত তুরন্ত নিশ্চুপ?

সন্যাসী পোশাক পরে অতঃপর লোকালয়ে যাই
মাধুকরি নেব বলে হাত পাতি গ্রহিতামুদ্রায়

পোশাক শরীর থেকে মোহগন্ধ যায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে
নকল জটায় থাকা বায়োপিক চোখ বোজে ভয়ে

হাতের তালুতে দেখি জমে ওঠে ঋণের পাহাড়
তরবারি বলে, হাঁটো, খোলা আছে মহাতীক্ষ্ণ ধার


মেছুনী 

মেছুনির নিজেরই শরীর যেন বঁটি হয়ে থাকে
ইস্পাত কঠিন তার ভীষণ ধারালো 
ফালাফালা কেটে যায় খদ্দেরের চোখ 
পিছল শরীর তবু চরম নাব্যতা ধরে
কার্ভেচার আর ক্লিভেজের ঘরে থরে থরে সাজানো বন্দিস
ফুল্ল কুসমিত

মেছুনির ক্লেদজকুসুমে রেণু হয়ে লেগে থাকে খদ্দেরের ভ্রম
ভ্রমের ভেতরে পরকীয়, সাঁতারের অনন্ত পিপাসা
মরা মাছের আঁশটে গন্ধ তাদের ভেতরে নেমে 
ঘেটে দিয়ে আসে অবৈধ সেই  পিপাসার রং

বঁটির উপরে এসে ফালা হয় 
আসঙ্গ লিপ্সার থেকে লাফ দিয়ে
নেমে আসতে চাওয়া বাঘের বিভ্রম

উদাসীন মেছুনি এসবই জানে
মাছের আঁশের নিচে ঘন হয়ে জমে থাকে 
পদ্মগোখরোর থুতু, ছিটকে গেলে
অন্ধ হবে কামুক বায়স
মরা মাছ খণ্ড খণ্ড কেটে দিতে দিতে
ভ্রূক্ষেপবিহীন সেই আগুনে মেছুনী 
শরীরী বঁটিতে আরো কৌশল ঢুকিয়ে 
নেড়ে দেয় বীর্য থলি

মরা মাছ নিয়ে থলি হাতে বাড়ি যায় সম্মোহন
চোর

আকাঁড়া চালের কাছে ছন্দ ভিক্ষা করি
কথ্যভাষা রূপে খুঁজি আলোকের পরি

পলাশের কাছে এসে—এসেছো পলাশ
লাঙল প্রাচীন, জানে ফসলের চাষ

ঘুঘু পাখিটিকে বলি, দেখো পাতা ফাঁদ
মাটির হাঁড়িতে রাখি পিপাসিত চাঁদ

তবু কেন মনে হয় ঘূর্ণাবর্ত ঘাঁটি 
ছিঁড়ে নিই পাপড়িশুদ্ধ ফুলেল দোপাটি

এজমালি জমি ঘিরে বেড়া তুলে রাখি
ভুলস্পর্শ দিয়ে রাখি পালকের পাখি

দিনান্তে বাগানে যাই মদালসা চোখ
প্রাচীন গাছেরা এতো কীভাবে অশোক!

গোপন সাপের দেখি চলে যাওয়া পথে
প্রজাপতি উড়ে যায় বায়ুপূর্ণ রথে

হৃদয়ে হৃদয় জাগে কাটে মায়াঘোর
কীভাবে নিজেকে বলি মাননীয় চোর

-------

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯