চিরনিদ্রায় কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়


কা না ই লা ল  জা না


কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায় স্মরণে

জন্ম - ১১ মার্চ ১৯৩৭
প্রয়াণ - ২৬ জুলাই ২০২০ 

ক্রমশ গড়িয়াহাট মোড়ের 'মেঘমল্লার'  আবাসন খালি করে স্বর্গলোকে পাড়ি দিচ্ছেন কবি সাহিত্যিকরা। সদ্য গেলেন বিজয়া মুখোপাধ্যায়। গতকালই ভাবছিলাম ১৯৩১ সালে জন্ম শরৎদার, নব্বই ছুঁতে চলল বয়স, একবার দেখা করে আসি শরৎদা বিজয়াদি-র সঙ্গে। শুনে স্ত্রী বলল  কিভাবে যাবে? তাঁরা কি তোমাকে ঘরের ভেতর নেবেন? সত্যি দিনকাল যা! ভারী মিষ্টি কন্ঠস্বর বিজয়া-দির। একবার যোধপুর পার্ক যাচ্ছি শীর্ষেন্দুদার বাড়ি। রাস্তার মধ্যে দূর থেকে ভেসে এল এক চেনা কন্ঠস্বর। হ্যাঁ তাইতো বিজয়াদি রিক্সা থেকে নেমে কথা বলছেন কারুর সঙ্গে। আর একবার জীবনানন্দ সভাঘরে ঢোকার মুখে কোনো কবির সঙ্গে গল্প করছেন। কাছে গিয়ে বলি -- রেডিও -র কণিকা মজুমদার  তৃপ্তি মিত্রদের মতো মধুর আপনার কন্ঠস্বর। সঙ্গে সঙ্গে বললেন -- 'এবার ডাকলে যাবো।' প্রথমটায় অবাক হলেও মনে পড়ে গেল একবার আলিপুর  জেল কোয়ার্টার্সে বার্ষিক সাহিত্যসভা ও আড্ডায় ডেকেছিলাম দুজনকেই। কী কারণে যাননি। বললাম বিজয়াদি আমি তো বাড়ি করে গড়িয়ার ব্রহ্মপুরে চলে গেছি। তাঁর ঝটিতি উত্তর হোক্ না সেখানেই যাবো। সত্যি বিজয়াদি শরৎদা এসেছিলেন অনুষ্ঠান শুরু হওয়ায়  অনেক আগেই। অনেক গল্প আড্ডা কবিতা পাঠ হল। কারুর কারুর গানে স্বরক্ষেপণ ইত্যাদির ভুল ধরিয়ে দিলেন। আসলে বিজয়া মুখোপাধ্যায় নবনীতা দেবসেন কবিতা সিংহ-রা তো শুধু কবি ছিলেন না। বিভিন্ন বিষয়ে ছিল গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। ফেরার সময় বলে গেলেন "আবার ডাকলে আবার আসবো।" সেবার তাঁদের সঙ্গ দিয়েছিলেন অদ্বিতীয় কবিবন্ধু নাসের হোসেন। 
 
কানাঘুষো শুনেছি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়  বিজয়া মুখোপাধ্যায় কবি দম্পতির মধ্যে লেখা নিয়ে বাক্ বিতণ্ডা হয় কিন্তু য'বারই গেছি তাঁদের 'মেঘমল্লার' এর বাসায়, যত্নআত্তি গল্প আড্ডা খাওয়ানো দাওয়ানোর এতটুকু খামতি ছিল না। মনোমালিন্যের ছিটেফোঁটাও আভাস পাইনি কখনো। তবে দুজনেই ছিলেন স্পষ্টবাদী। 

শক্তিমান কবিদের মধ্যেই পড়েন বিজয়া মুখোপাধ্যায়। নাহলে তো বিজয়াদি নয় আরতি সরকার-কে পাঠক মনে রাখতো। সমরেশ বসু তখনো চুটিয়ে লিখছেন, আরতি সরকার নাম্না এক মহিলা কবি মুহুর্মুহু 'দেশ' সাপ্তাহিকে লিখছেন, বইমেলায় সাহিত্যিকদের চাঁদের হাটেের মাঝে বসে আড্ডা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে আলোকিত হচ্ছেন। সেই কবি এখন কোথায়? 
বহু গুণের অধিকারী বিজয়াদির কোনোদিন তাড়া ছিল না কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে। ৮৩ বছরের জীবনে ডজন খানিকের বেশি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। সম্পাদনা করেছেন 'বিভাষা' পত্রিকা।  কাব্যগ্রন্থগুলো যথাক্রমে-- (১) আমার প্রভুর  জন্য (২) যদি শর্তহীন (৩) ভেঙে যায় অনন্ত বাদাম (৪) উড়ন্ত নামাবলী (৫) দাঁড়াও তর্জনী  (৬)  ঝড়ের সঙ্গে যখন দেখা (৭) ভাষায় যে টুকু বলা যায়  (৮) মাস্তুলের পাখি (৯) আজন্ম হস্টেলে আছি।  (১০) শ্রেষ্ঠ কবিতা। যখন তিনি বিজয়া দাশগুপ্ত,  প্রকাশ করেছেন কাব্যগ্রন্থ 'সামনে  অপর্ণা' এবং সাম্প্রতিককালে 'অশ্লেষা তিথির জন্য'। কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি সাড়া ফেলেছি-- 'ভেঙে যায় অনন্ত বাদাম'।
এই গ্রন্থের 'আমি মরে গেলে' কবিতায় যথার্থই উচ্চারিত হয়েছে --

 'আমি মরে গেলে চলে যাবে  ভালোবাসা । পৃথিবী স্বাধীন হবে যেমন স্বাধীন বিধবা পতিতা কিংবা নারীচ্যুত গোঁয়ার পুরুষ।'

Comments

  1. কবিকে শ্রদ্ধা
    তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি l

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

অংশুমান কর

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানী নারায়ণচন্দ্র রানা : শূন্য থেকে 'শূন্যে' উড়ানের রূপকথা―(প্রথম অধ্যায়)পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা