কান্না : কষ্ট নয় কষ্টমুক্তির প্রয়াস

অলংকরণ- ঋত্বিক ত্রিপাঠী   


কান্না : কষ্ট নয়  কষ্টমুক্তির প্রয়াস


সূ র্য কা ন্ত  মা হা তো 

দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন প্রচন্ড লড়াই করে,  যেদিন মাতৃ যন্ত্রণা থেকে জননীকে মুক্তি দিয়ে মাতৃজঠর থেকে খসে পড়লাম পৃথিবীর বুকে, সেদিন নিজের অস্তিত্ব প্রথম জানান দিয়েছিলাম একটুখানি কেঁদে ফেলে। সেই কান্না নিয়েই জীবনভর  পথ চলা। আর কি অদ্ভুত! আমাদের মৃত্যুর সময়ও আমাদের চারপাশে ধ্বনিত হয় কান্নার রোল। যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়। কান্না দিয়ে জীবনের সূচনা, আর কান্নাতেই জীবনের  পরিসমাপ্তি। 

কান্নার সঙ্গে কষ্টকে পিঠোপিঠি জুড়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়টির  কারণেই নাকি প্রথমটা সংঘটিত হয়। অর্থাৎ দুঃখ কষ্ট ব্যথার কারনেই আমরা কাঁদি। আসলেই কি তাই? একটু গভীরে গিয়ে ভাবুন তো, কষ্টের কারণে কাঁদি, নাকি ঐ তীব্র কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য কাঁদি? আসলে আমাদের দুঃখ কষ্ট ব্যথা বেদনার সহনশীল ক্ষমতা একটা সীমারেখা পর্যন্ত থাকে। তারও পরে সেটা অসহনীয় হয়ে পড়লে তা থেকে তাৎক্ষণিক বা সাময়িক মুক্তিলাভ বা স্বস্তি লাভের কারণে আমরা কেঁদে উঠি। অনেকটা বাড়ির প্রেসার কুকারের সেফটি ভালভ্ এর সিটি মেরে অতিরিক্ত চাপ নিষ্কাশনের মতো। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা যখন আমাদের বুকের ওপর চেপে বসে তখন তার থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে কান্না নির্যাস হয়ে বেরিয়ে আসে।

এই কান্না আসলে কী? কখন একজন মানুষকে আমরা বলতে পারি যে উনি কাঁদছেন?
              কান্না হল একটি আবেগের বহিঃপ্রকাশের রূপ। এর আভিধানিক অর্থ হল--- ক্রন্দন, রোদন, দুঃখ কষ্ট বা ব্যথায় চোখের জল ফেলা। আসলে কান্না একটা প্রক্রিয়া, প্রথমে আপনার মধ্যে একটা কান্নার সিচুয়েশন বা আবেগের পরিস্থিতি (দুঃখ, কষ্ট,ব্যথা,আনন্দ) তৈরি হয়, এবং তারপর সেটা সহনশীলতার মাত্রা অতিক্রম করে, অবশেষে দু চোখে অশ্রুধারা রূপে নির্গত হয়ে পরিসমাপ্তি লাভ করে। সুতরাং একজনকে কাঁদতে হলে, তাকে দুইচোখ দিয়ে জল ফেলতেই হবে। চোখের জল নির্গত না হলে, তিনি কাঁদছেন কিনা সেটা কোনও মতে প্রমান করা যায় না। তাই কান্নার প্রধান ও একমাত্র শর্তই হল, 'চোখ দিয়ে জল পড়া।'

বিরুদ্ধবাদীরা হয়তো বলবেন, এ আবার কি কথা! চোখে পোকা পড়লে, মোটর বাইকে যাত্রা করলে, কিংবা একপ্রস্থ হাসির কারণেও তো চোখ দিয়ে অনেকের জলের ধারা বয়। তখন কি সে কাঁদে? তার বেলা?

হ্যাঁ, ঠিক কথায় বলেছেন। চোখ দিয়ে জল পড়লেই তো আর সেটা কান্না হয়ে উঠে না। সঙ্গে একটা জোরালো আবেগ থাকা চাই। সর্বোপরি সেই আবেগের একটা সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রান্ত হওয়া চাই।

পূর্বেই বলেছি যে, কান্না কোনও দুঃখ কষ্ট বা ব্যথা নয়। বরং সেগুলো থেকে ঐ সময়ের জন্য মুক্তিলাভের একটা প্রয়াস মাত্র। প্রচন্ড শারীরিক যন্ত্রণা যেমন মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা বা যেকোন আঘাত জনিত ব্যথায় যখন কাতর হয়ে পড়ি,তখন একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত তা সইতে পারি। আর তা যখনই  সেই মাত্রা অতিক্রম করে,তখনই আমরা তা থেকে তাৎক্ষণিক উপশমের উপায় খুঁজি, আর কান্নার মধ্য দিয়েই সেটা সম্পন্ন হয়। আবারও বলছি, এটা দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি নয়, কেবলই তাৎক্ষণিক বা মুহূর্ত কালীন ব্যাপার মাত্র। শারীরিক কষ্ট জনিত কান্নায় একটা তীব্র গোঙানির চিৎকার আর চোখের অবিরল অশ্রু বর্ষণ থাকে।

তবে মানসিক আবেগ জনিত কান্নায় আবার বৈচিত্রই বেশি। 
            কারও দ্বারা প্রচন্ড অপমানিত হলে, ধিক্কৃত হলে, চরম উপেক্ষিত হলে, আবার কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে কিংবা বেইমানি করলে,অথবা কারো দ্বারা মানসিক আঘাত পেলে ক্ষোভে দুঃখে কষ্টে ব্যথায় আমাদের কান্না বেরিয়ে আসে। এটাও ঐ তীব্র মানসিক কষ্ট থেকে সাময়িক মুক্তির একটা প্রচেষ্টা। তাৎক্ষণিক ঐ পরিস্থিতি থেকে নির্গমনের একটা উপায়। মানসিক এই কান্না অনেকটাই নীরব যাকে বলে ফুঁপিয়ে কান্না আর কি। নাকের পাটাগুলো দ্রুত ওঠানামা করে আর বারেবারেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। চোখের জলের কেবলই স্রোতধারা বয়ে যায়। তাইতো 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তকে একজায়গায় বলছে যে,শ্রীকান্তর জন্য সে যতখানি চোখের জল ফেলেছে তা জমা করলে একটা পুকুর না হোক ডোবা হলেও ভরে যেত।

প্রচন্ড রেগে গেলে কিংবা উত্তেজিত হয়ে পড়লেও আমরা অনেক সময় কেঁদে ফেলি। আবেগের চূড়ান্ত মাত্রাতিরিক্ততায় এর প্রধান কারণ। অবশেষে কান্নার মধ্য দিয়ে এই ক্রোধ সাময়িক ভাবে অনেকটাই প্রশমিত হয়। 

কোনও কিছুর কারণে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলেও আমরা কেঁদে ফেলি। বিশেষ করে শিশু ও মহিলারা এমন কান্নার সাথে অভ্যস্ত। সুতরাং কান্নার মধ্য দিয়েই ঐ আতঙ্কের আচ্ছন্ন ভাবটা থেকে মুক্তির প্রয়াস করা হয়।

কুম্ভীরাশ্রু বা মায়াকান্না--- অনেকের কাছে একটু বাড়তি সুবিধা বা গুরুত্ব লাভের জন্য, কিংবা কোনও দাবি পূরণের জন্য এমন কপট কান্না অনেকেই কেঁদে থাকেন। বউরা স্বামীদের কাছে, এবং ছেলেমেয়েরা বাবা মায়ের কাছে  আবদার  পূরণের জন্য এমন মায়া কান্না কেঁদে থাকেন। যেহেতু এই কান্না অনেকটাই ইচ্ছাকৃত তাই এটি বিভিন্ন স্টাইলে সংঘটিত হয়। অন্যের কাছে সেটা আবার সময়ে সময়ে হাস্যকরও হয়ে পড়ে।

তবে মৃত্যু জনিত কান্না বা বিয়োগ ব্যথার কান্না সব কান্নাকে ছাপিয়ে গেছে তার ধারে ও ভারে। অকস্মাৎ বা অপ্রত্যাশিত এক শোকের প্রাবল্য এতটাই আমাদের গ্রাস করে ফেলে যে, আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। দিশাহারা হয়ে সেই অপ্রত্যাশিত শোকের টুঁটি চেপে ধরা অবস্থা কাটাতেই আমাদের মধ্যে কান্না উচ্চস্বরে বেরিয়ে আসে। তাই একে রোদন করে কান্না বলা হয়। গ্রামের দিকে এক বিশেষ সুরে "ও বাবা গো! মা গো! আমার কি হবে গো!" বলে চিল চিৎকার করে কাঁদা হয়। কান্নার এই রোদন বা সুরটাই সকলকে বলে দেয়  যে, কেউ মারা গেছে।

হালের করোনা রোগের মতো কান্নাও অনেকটা সংক্রামক। অন্যকে কাঁদতে দেখলে অনেক সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। সমবেদনায় অজান্তেই কেঁদে ফেলি। এটা কোনও উদ্দেশ্য জনিত নয়। বরং অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত।

ছেলে মেয়ে,পরিবার পরিজন,এমনকি স্বয়ং নিজে কোনও বড় পরীক্ষায় অসামান্য সাফল্য লাভ করলে, কিংবা কোনও মহৎ কিছু কাজ করলে প্রচন্ড আনন্দে আমাদের চোখে জল এসে যায়। যদিও এটা কতটা কান্নার শর্ত পূরণ করে তা নিয়ে সংশয় আছে। তবে এটা অনেকটা হাসি কান্নার সংমিশ্রিত রূপ।

অনেক সময় কেউ হয়তো কাঁদো কাঁদো অবস্থার মধ্যে আছে কিন্তু কাঁদতে পারছে না। তখন তাকে একটু বাড়তি সহানুভূতি বা আবেগের সুড়সুড়ি দিলেই হল, ব্যস অমনি সে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করে দেবে। অনেকটা আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার মতো।

অকারণে সহজেই কেঁদে ফেলা যায় না। যেমনটা হাসা যায়। কারণ কান্নায় একটা আবেগের বিস্ফোরণ লাগেই লাগে। তাই কান্না হল, সেই কঠিন মুহূর্তটিকে অতিক্রম করার প্রয়াস। সুতরাং একেবারে না কাঁদলেও সমস্যা, তাই বলে আবার কথায় কথায় ছিঁচকাঁদুনের মতো কাঁদাও ঠিক নয়। যেমন--- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "গুরু" নাটকে সুভদ্রের কান্নাটা তার কাছে ভয়মুক্তির হলেও পঞ্চক সহ অনেকের কাছেই সেটা ছিঁচকাঁদুনি বলেই মনে হয়েছে। আসলে এটা আপেক্ষিক দর্শন। দেখার দৃষ্টিকোণের উপর যা নির্ভরশীল। আবার শরৎ চন্দ্রের নারী চরিত্রগুলিও অতিরিক্ত চোখের জল ফেলার পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। তুলনায় রাধার বিরহ জনিত কান্না, কিংবা ফুল্লরার বারমাস্যার কান্না অনেক উচ্চ পর্যায়ের বলে মনে করা হয়। দেশি বিদেশি ট্র্যাজেডি নাটকে যে কান্নার সুর থাকে সেটাও এক উচ্চ মানের মাত্রা বহন করে।

সুতরাং কান্না মানেই কেবল কষ্ট নয়, বরং অনেক বেশি সাময়িক কষ্ট মুক্তির এক সফল প্রয়াস। তাই একটু না হয় কাঁদলামই,একটু না হয় ব্যক্তিত্বের তারল্য প্রকাশ পেল, তাতেই বা কি এসে গেল?

Comments

Post a Comment

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো