গলদা চিংড়ি /হিরন্ময় ধাড়া


গলদা চিংড়ির কথা


হি র ন্ম য়  ধা ড়া


গলদা ও তার জাতভাইয়েরা প্যালিমনিডি গোত্রের ম্যাক্রোব্রাকিয়াম প্রজাতির  অন্তর্ভুক্ত। ম্যাক্রোব্রাকিয়াম রোজেনবারগি হলো স্বয়ং গলদার বৈজ্ঞানিক নাম। ম্যাক্রোব্রাকিয়াম ম্যালকমসনি, ম্যাক্রোব্রাকিয়াম রুডি, ম্যাক্রোব্রাকিয়াম ল্যামরি , ম্যাক্রোব্রাকিয়াম ইডেই , ম্যাক্রোব্রাকিয়াম মিরাবাইল প্রভৃতি গলদার জাতভাই।

সুন্দরবন ও মেদিনীপুরের উপকূলের নোনাজলের বাস্তুতন্ত্র এদের প্রজনন ক্ষেত্র। তবে নিম্ন গাঙেয় অববাহিকার পুকুর বিল খালেও পাওয়া যায়। তবে ম্যাক্রোব্রাকিয়াম প্রজাতির চিংড়ি গঙ্গা,  গোদাবরীতেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

গলদা চিংড়ির বৈজ্ঞানিক নাম: ম্যাক্রোব্রাকিয়াম রোজেনবারগি। খাদ্যরসিক বাঙালির কাছে যথেষ্ট সমাদৃত এই চিংড়ি আকারে অনান্য প্রজাতির চিংড়ির থেকে বড়ো হয়। সাধারণত ২০০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের হলেও  ৩২০ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে দেখা যায়। এদের বক্ষ উপাঙ্গ পাঁচটি খণ্ড নিয়ে গঠিত, যার শেষ খণ্ডটি সাঁড়াশি মতো। একে গলদার দাঁড়া বলে।

মূলতঃ নদনদীর মোহনা অঞ্চলে কিংবা নিম্ন অববাহিকার মিষ্টি বা ঈষৎ নোনা জলে থাকলেও প্রজননের জন্য নোনাজলের বাস্তুতন্ত্রে পরিযান করে। মেদিনীপুরের রূপনারায়ণ,  হলদি, রসুলপুর কাঁসাই সহ বিভিন্ন নদনদী ও পুকুর বিলে দেখা যায়। সাধারণত বর্ষার প্রাক্কালে প্রজনন করে। এরপর বর্ষার শেষ ও শীতের শুরুতে বিভিন্ন নদনদীতে গলদার পোষ্টলার্ভা প্রচুর সংখ্যায় পাওয়া যায়। স্থানীয় মহিলারা গামছা জালের সাহায্য গলদার চারা সংগ্রহ করে , একে মীন ধরা বলে। খাদ্যাভ্যাসে গলদা সর্বভুক হলেও পচনশীল জৈববস্তুকে এরা পরমতৃপ্তিতে খায়।
 
বর্তমানে পুকুরেও গলদা চাষ হচ্ছে। কৃত্রিম প্রজননও সফল হয়েছে। তাই বাঙালে ইলিশের জন্য প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল হতে হলেও চিংড়ি  প্রিয় ঘটিদের পাতে গলদার যোগান মোটামুটি নিশ্চিত । 
মালাইকারি, ডাবচিংড়ির মতো সাবেকি পদের পাশাপাশি ফ্রাই,কাবাব,দোপেঁয়াজা ইত্যাদি আধুনিক ঘরণার পদেও গলদা সমাদৃত হচ্ছে। মার্কিন মুলুক কিংবা মধ্য প্রাচ্যের দেশ সব আন্তর্জাতিক বাজারেই ভারতীয় গলদার চাহিদা তুঙ্গে। MPEDA(মেরিন প্রোডাক্ট এক্সপোর্ট ডেভলপমেন্ট অথিরিটি) রপ্তানির আগে সঠিক গুণমান যাচাই করছে।

নদী কিংবা খালের জলে যেসব ধান জমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয় সেখানে প্রাকৃতিক ভাবে এই চিংড়ির চারা জোয়ারের জলে চলে আসে। ধানের সঙ্গে সঙ্গে চিংড়িও বাড়তে থাকে। এ এক সমন্বিত কৃষির উদাহরণ। এই ধরণাকে কাজে লাগিয়ে বৈজ্ঞানিক ভাবে  ধান ও চিংড়ির নিবিড় মিশ্র চাষ পদ্ধতি গড়ে ওঠে। কৃষকের আয়ের পথ প্রশস্ত করে এই পদ্ধতি। তবে বর্তমানে পরিবেশ দূষণ ও কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে এই পদ্ধতি মার খাচ্ছে। বদলে গড়ে উঠছে গলদা ভেড়ি। ভেড়িগুলোতে কৃত্রিমভাবে চাষ করা হয় তাই ভেড়ির গলদা স্বাদের দিক থেকে কিছুটা আলাদা। 

এত কিছুর পরও বলতে হয়, পরিবেশদূষণ আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর হাত থেকে গলদাও মুক্ত নয়। নদী মোহনায় গলদার প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রের বাস্তুতান্ত্রিক কাঠামো দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে গলদা চাষ ও উৎপাদনের উপর।

Comments

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো