ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -৩১

সম্পাদকীয়,
ছোটো বন্ধুরা, পৃথিবীর ভারী অসুখ। সে কথা তোমরাতো এতদিনে সবাই জেনেই গেছো। এমনকি পশু পাখিরাও বুঝতে পারছে বোধহয়। এই তো দেখো না, প্রচ্ছদের সুখ পাখিটা কেমন পৃথিবী মায়ের কোলে চুপটি করে বসে আছে। প্রচ্ছদের এই ছবিটি যিনি তুলেছেন সেই অমিয় বিশ্বাস কি বললেন জানো? তিনি যখন ছবি তোলার জন্য পাখিটার একদম কাছে গেলেন তখনও সে উড়ে পালায়নি। কে বলল, সুখ পাখিরা কেবল সুখের সময় আসে? আর সুখের কথায় মনে পড়ে গেল সুখের দিদি শান্তির কথা। শান্তির দূত কে বলতো? হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। পায়রা। সুখ পাখির কথা বলব আর শান্তির দূত কে বাদ দিয়ে! তা তো হয় না। তাই এবারের সংখ্যায় প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক দীপান্বিতা রায়ের কলমে পায়রার গল্প।  তোমরা কি জানো, এই পায়রারা আগে চিঠি পত্র আদান প্রদান করত? আমাদের সময় অবশ্য চিঠি পত্র আদান প্রদান হতো ডাকঘরের মাধ্যমে। আর ছোটোবেলার সেই ডাকঘরের স্মৃতি নিয়ে গল্প লিখেছেন শিশু সাহিত্যিক দিলীপ কুমার মিস্ত্রী মহাশয়। প্রচ্ছদের সুখ পাখিটার মন খারাপের ছবিটা আমাদের উপহার দেবার জন্য অমিয় বিশ্বাসকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আর এ সময়ের দুই শিশু সাহিত্যিক দীপান্বিতা রায় মহাশয়া ও দিলীপ কুমার মিস্ত্রী মহাশয়কে শ্রদ্ধা জানাই। পাখির কথা তো হলো। এবার আসি পশুদের কথায়। পাড়ায় পাড়ায় কুকুরগুলো নাকি সন্ধের পর চেঁচামিচি আর মার পিঠ করছে। তোমরা কিন্তু বিরক্ত হয়ে ওদের ঢিল ছুঁড়ে মের না। আসলে ওরা পেট ভরে খেতে পাচ্ছে না। এসো আমরা প্রত্যেকে  ওদের অল্প অল্প খাবার খেতে দিই। তাহলে ওরা এই অতিমারীর পরিস্থিতিতেও আমাদের বন্ধু হবে বইকি। কুকুরের বন্ধুত্বের কথায় মনে পড়ে গেল তোমাদের এক ছোটো বন্ধু সন্দীপ কুকুরদের নিয়ে খুব সুন্দর একটা গল্প লিখেছে। আরে না না এবারের সংখ্যায় শুধু গল্প থাকবে কেন? কবি উপাসনা সরকার ও অধ্যাপিকা সুস্মিতা সাহা তোমাদের জন্য ছড়া লিখেছেন। তাঁদের দুজনকেই ধন্যবাদ। আর ছোটবন্ধু শতভিষাও ছড়া লিখেছে।  পৃথিবীর ভীষণ মনখারাপ তাই সাঁঝবাতি পৃথিবীর একটা ছবি এঁকে পাঠিয়েছে।  এবার চটপট খাতা পেন নিয়ে বসে পড়ো। কেন? আরে কেমন লাগলো লিখে পাঠাতে হবে না?  -  মৌসুমী ঘোষ


ফুলকুসুমপুর খুব কাছে  ||  পর্ব- ৪

রতনতনু ঘাটী
সেদিনের মতো মিটিং শেষ হলে কী হবে, প্রায় তক্ষুনি অনিচ্ছেঠাকুরমা দাদুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি এসো না গো! আমার রাধাগোবিন্দকে একতলা থেকে এনে খাঁচায় পুরে দাও না!’ বলে ঠাকুরমা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তাঁর মনের কথা শোনা গেল, ‘আমি যাই, একটা ছোট তালাচাবি নিয়ে আসি!’
   ছোটরা আর এখন নীচে নামল না। তারা রাধাগোবিন্দর নতুন কাঁচা-বাড়িটা দেখে তারপর না হয় খেলতে যাবে! দাদু মুখটা ব্যাজার করে নীচে চললেন হীরামন পাখিটাকে আনতে। ছোটরা সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকল যতক্ষণ না দাদু হীরামনটাকে উপরে নিয়ে আসছেন। এমন সময় দাদু শিকলসুদ্ধু রাধাগোবিন্দকে নিয়ে উপরে এলেন। ছোটরা গোল হয়ে দাঁড়াল একটা খাঁচার সামনে। দাদু রাধাগোবিন্দকে খাঁচার দরজা খুলে ভিতরে ছেড়ে দিয়ে হাতটা বের করে খাঁচার ছোট দরজাটা বন্ধ করে হাত দিয়ে ধরে রাখলেন। এখনও ঠাকুরমা দোতলায় আসেননি। হীরামনটা খাঁচার ভিতরে চারপাশে ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগল, তার খাঁচা-বাড়িটা কেমন! দাদু তিন্নিকে বললেন, ‘তোর ঠাকুরমাকে একবার ডাক দে তো!’
   তিন্নি সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ডাক দিল, ‘ঠাকুরমা, শিগগির উপরে এসো!’
   ঠাকুরমা সাড়া দিলেন, ‘দাঁড়া, যাচ্ছি। তালাচাবিটা খুঁজে পাচ্ছি না।’
   আরও কয়েক মিনিট পরে সিঁড়ি দিয়ে ঠাকুরমা উঠে এলেন। দাদুর হাতে তালাচাবিটা দিয়ে বললেন, ‘ঠিক করে আমার রাধাগোবিন্দর খাঁচার দরজাটা বন্ধ করে দাও! তোমার যা কাজের ছিরি! ফাঁক পেলে কখন রাধাগোবিন্দ ফুড়ুত করবে তার ঠিক কী?’
   ইচ্ছেদাদু তালা বন্ধ করে চাবিটা ঠাকুরমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই নাও! তোমার রাধাগোবিন্দকে নিয়ে কাটাও। আমার নানা কাজ পড়ে আছে।’
   দাদু নীচে নেমে গেলেন। মিটিংয়ের সকলে একতলায় চলে গেছেন। বুম্বা বলল, ‘ঠাকুরমা, রাধাগোবিন্দ জল খাবে কিসে? ওর তো গ্লাস নেই?’
   তিন্নি বলল, ‘ওর খাবার খাওয়ার প্লেট বা বাটিও তো চাই ঠাকুরমা?’
   বিন্নির বুদ্ধি ওদের চেয়ে একটু বেশি। বলল, ‘ঠাকুরমা, একটা আইডিয়া বলি। তুমি রাধাগোবিন্দর জন্যে একটা ছোটো দোলনা বানিয়ে খাঁচার ভিতর ঝুলিয়ে দাও! ও তো একাই থাকবে। কখনও মন হলে দোলনায় বসে দুলতেও পারবে।’
   ‘ঠিক বলেছিস রে বিন্নি! এই জন্যে তোকে আমার এত ভালো লাগে। দাঁড়া, কথাটা তোর দাদুকে একবার বলে দেখি। তার আগে তিন্নি তোদের রান্নাবাটি খেলনার বাক্স থেকে আমাকে প্লাস্টিকের দুটো বাটি আর একটা গ্লাস এনে দে তো!’
   বুম্বা জিজ্ঞেস করল, ‘ওসব কী হবে ঠাকুরমা?’
   ‘আমাদের রাধাগোবিন্দবাবুকে খাবার খেতে দিতে হবে তো! সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলল, বেচারার বড্ড খিদে পেয়েছে!’ এবার ঠাকুরমা মুখে হাসি ফুটিয়ে খাঁচার কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘একবার বলো তো বাবা রাধাগোবিন্দ---‘অ-এ অজগর, আ-এ আম।’ 
 রাধাগোবিন্দ ট্যাঁ-ট্যাঁ করে কী বলল, তা ঠাকুরমা ছাড়া কেউ বুঝতে পারল না ওরা। বুম্বা দুষ্টুমি করে ঠাকুরমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার রাধাগোবিন্দ এখনও অ-আ শিখতেই পারেনি? ও তা হলে আমার চেয়ে অনেক নিচু ক্লাসে পড়ে? আমার তো এখন ক্লাস টু!’
   ঠাকুরমা বুম্বাকে আদর করে বললেন, ‘তুই যখন সময় পাবি, খাঁচার কাছে এসে আমার সোনামনকে লেখাপড়া শিখিয়ে দিস তো! আগে অন্তত স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণটা তো শিখে ফেলুক!’
   বুম্বা হেসে উঠল, ‘ঠাকুরমা, ও সোনামন কেন হবে, ও তো হীরামন পাখি!’
   ঠাকুরমা হেসে বললেন, ‘ও-ই হল রে! হীরামন! তবে তোদের ইচ্ছেদাদু আমার রাধাগোবিন্দকে হীরামন পাখি বলে মানতেই চায় না। বলেন, ওটা নাকি বনটিয়া! তা কেন হবে রে? আমি গত বছর আমার বাপের বাড়ি মদনপুরে গিয়ে এক পাখিওলার কাছ থেকে রাধাগোবিন্দকে কিনেছি। তিন্নি আর বিন্নির দিকে তাকিয়ে ঠাকুরমা বললেন, ‘দ্যাখ, দ্যাখ! আমার রাধাগোবিন্দকে কী সুন্দর দেখতে! তোরাই বল, এ কি হীরামন পাখি না হয়ে যায়?’
   বিন্নি বলল, ‘একদিন বাবার মোবাইলে ইন্টারনেট খুলে গুগল সার্চ করে দেখব হীরামন পাখি কী রকম দেখতে। তোমাকেও দেখাব।’
   ঠাকুরমা বললেন, ‘তা না হয় দেখাস’খন। তবে আমার রাধাগোবিন্দর সঙ্গে যদি সে পাখিটা না মেলে, তা হলে তোর দাদুকে অমন কথা বলতে যাস না যেন। এক্ষুনি দাদু গোটা বাড়ি মাথায় করে বলে বেড়াবে, ‘রাধাগোবিন্দ হল আসলে বনটিয়া!’
   তিন্নি কিছু একটা বলতে গিয়ে মুখ খুলতে ঠাকুরমা বললেন, ‘শোন বিন্নি, কী সার্চ বললি যেন? ও কি আর সব কিছু ঠিকঠাক দেখাতে পারে রে? কত মহা মহা পণ্ডিত মানুষের কত ভুল হয়, আর ও তো সামান্য ইন্টারনেট! এর কি ভুল হতে নেই? তাই বলে আমার রাধাগোবিন্দ ভাল জাতের হীরামন পাখি, এ নিয়ে কোনও ভুলই নেই।’
   বিন্নি বলল, ‘ঠাকুরমা, তোমার রাধাগোবিন্দ হীরামন বা বনটিয়া, যে জাতের পাখি হোক না কেন, কথা বলতে শিখলেই তো হল? তখন তুমি সকলের মন থেকে দ্বিধা দূর করে দিতে পারবে নিশ্চয়ই। কেননা, তখন তোমার রাধাগোবিন্দ গড়গড় করে বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ’, রবি ঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’ আর যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হাসিখুশি বইটার রাইমসগুলো মুখস্থ বলে সকলকে তাক লাগিয়ে দিতে পারবে!’
   ঠাকুরমা হাসতে-হাসতে বললেন, ‘বিন্নি, তোর মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক!’
   বিন্নি মজা করে বলল, ‘ঠাকুরমা, ফুল-চন্দন তো মেয়েরা বিয়ে হলে মুখে পরে!’
   ঠাকুরমা ছুটে ধরতে গেলেন বিন্নিকে, ‘খুব পাজি হয়েছিস? দাঁড়া তো, তোকে মজা দেখাচ্ছি।’
   বিন্নি ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে একতলায় চলে গেল।
   তিন্নির বাবা কী দরকারে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাচ্ছিলেন। দেখলেন, রাধাগোবিন্দ খাঁচার ভিতর থেকে মহাসুখে পিটপিট করে বাইরের জগৎ দেখছে। ঠাকুরমাকে বললেন, ‘তোমার রাধাগোবিন্দ কেমন সুন্দর করে খাঁচায় বসে আছে দ্যাখো মা! ওকে খেতে দাও!’
   ‘দাঁড়া, তিন্নিকে খেলনাবাটির বাক্স থেকে গ্লাস-বাটি আনতে পাঠিয়েছি। ও আনলেই রাধাগোবিন্দকে খেতে দিয়ে দেব।’ বলে ঠাকুরমা গলা তুলে একতলায় তিন্নির উদ্দেশে ডাক দিলেন, ‘তিন্নি, আয় রে! রাধাগোবিন্দর খুব খিদে পেয়েছে।’
   সত্যি খিদে পেয়েছে কিনা কে জানে। রাধাগোবিন্দ ‘ট্যাঁ-ট্যাঁ’ করে ডেকে উঠল। ঠাকুরমা বিন্নি আর বুম্বার দিতে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখলি, কেমন করে খেতে চাইছে আমার কাছে?’ তারপর রাধাগেবিন্দরকে বললেন, ‘দাঁড়া বাবা, দাঁড়া! অত খাইখাই করলে হয়? পৃথিবীতে কত মানুষ ঠিকমতো খেতে পায় না? একটু সবুর কর বাবা!’
   ইচ্ছেদাদু নীচ থেকে দোতলায় এসে নিজের ঘরে যাচ্ছিলেন। ঠাকুরমার কথা শুনে থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘ও কি আর তোমার ওসব কথা বুঝবে? ও তো বুনো টিয়া, গাছের ফলপাকুড় ফেলে-ছড়িয়ে লোপাট করতে থাকে। যদি হত ভাল জাতের হীরামন, তা হলে কথা ছিল।’ ঠাকুরমার দিকে তাকিয়ে দাদু বললেন, ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি—বলে প্রবাদ আছে না? এসব প্রবাদ কি এমনি এমনি চালু হয়েছে? বলেই দাদু নিজের ঘরে চলে গেলেন। 
   তিন্নির বাবা ঠাকুরমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মা, তুমি বাবার ওসব কথায় রাগ কোরো না! তোমার রাধাগোবিন্দ---বনটিয়া হোক, কি কি ভাল জাতের টিয়া পাখি হোক, আমরা ওকে হীরামন পাখি বলেই মানব! দেখবে, ও একদিন কথা বলতে শিখে সকলকে তাক লাগিয়ে দেবে। পাড়ার লোক বারান্দায় রাধাগোবিন্দর মুখের কথা শোনার জন্যে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করবে, দেখে নিও!’
   ইচ্ছেঠাকুরমা দু’ হাত নেড়ে বললেই, ‘বল, তোরাই বল বাবাকে বুঝিয়ে!’
   এমন সময় দুটো প্লাস্টিকের বাটি আর একটা প্লাস্টিকের খেলনা গ্লাস নাচাতে-নাচাতে হাজির হল তিন্নি। 
(এর পরে আগামী রোববার)
পায়রার ছানা

দীপান্বিতা রায়

জানলার তাকে রাখা আছে একটা ছোট্ট টব। আধখানা মাটি ভর্তি। জানলাটা বন্ধ। বেশ অনেকদিন ধরেই। বাড়ির লোকেরা কোথাও গেছে নিশ্চয়ই। রেলিং-এর ভিতর দিয়ে গলা বাড়িয়ে ভিতরটা ভাল করে দেখতে দেখতে ভাবল সাদা পায়রাটা। ডিম পাড়ার সময় হয়ে এসেছে। এখন একটা ভাল জায়গা দরকার। চারতলার ওপরে এই জানলাটা এমনিতে সব দিক দিয়েই বেশ ভাল। 

পাড়ার হুলোগুলো মহা পাজি। সারাদিন শুধু চারিদিকে ছোঁকছোঁক।  তবে এত ওপরে ওঠার সাধ্যি  নেই ওদের। দুষ্টু কাক অবশ্য আছে। কিন্তু যতই যাই হোক গ্রিলের পাশ দিয়ে হুস করে ঢুকে পড়তে সবাই একটু ডরায়। না: জায়গাটা খারাপ নয়। ঝড়-ঝাপ্টা বৃষ্টির জল কিছুই গায়ে লাগবে না। দিব্যি আরামে-গরমে থাকবে ছানারা। খুশি হয়ে আপন মনে গলা ফুলিয়ে বুকুম বুকুম করে একটু ডেকে নিয়ে খাবার খুঁজতে উড়ে গেল সাদা পায়রা। 

তবে ডিম দেবার সময় তো হয়েই এসেছে। কয়েকদিন পরেই তাই ফিতে এল আবার। বৈশাখ মাসের বেশ গরমের এক বিকেল গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে টবের নরম মাটিতে বসল আরাম করে। তারপর ভোর না হতেই দুটি ডিম পাড়ল সেখানে। ছোট ছোট দুধ সাদা ডিমদুটি দেখে পায়রার তো আর আনন্দ ধরে না। গর্বে বুক ফুলে উঠল। আপনমনে গলা ফুলিয়ে ডাকাডাকিও করল খানিক। তারপর সুস্থির হয়ে বসল তা দিতে। শুধু ডিম পাড়লেই তো চলবে না, তার থেকে ছানা ফোটাতে হবে যে।

সারাদিন ধরে ডিমের ওপর বসে তা দেয় পায়রা মা। মাঝে মধ্যে উড়ে গিয়ে কোনো রকমে একটু খেয়ে আসে। কিন্তু মন পড়ে থাকে ডিমের দিকেই। 

এদিকে জানলা দেওয়া বাড়ির বাসিন্দারা কিছুদিনের জন্য গেছিল অন্য জায়গায় থাকতে। একদিন রাতে তারা ফিরল মোটঘাট নিয়ে। কাচের জানলা বন্ধ। ভিতরে ভারী পর্দা টানা। পায়রা তাই রাতে কিছুই টের পায়নি। পরদিন সকালে জানলা খুলেই গিন্নি দেখেন, ওমা, টবের ভিতর ছোট্ট দুখানা পায়রার ডিম। মা পায়রা ততক্ষণে ভয় পেয়ে ডিম ছেড়ে উড়ে গিয়ে বসেছে সামনের তারে। 

বাড়িতে আছে ঝুঁটি বাঁধা ছোট্ট একটা মেয়ে। মায়ের ডাক শুনে সেও দৌড়ে এল ডিম দেখতে। মা বললে, কাছে যেও না। দেখছো তো পায়রা মা ভয় পাচ্ছে। আমরা সরে না গেলে ও ডিমে তা দিতে বসবে না। তাড়াতাড়ি সরে য়েল সবাই। কাচের জানলা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল মা। কাজের মাসিকে বলে দিল, ওই জানলায় যেন কাপড়-চোপড় মেলা না হয়।

ছোট মেয়ের কিন্রু মন মানে না। রোজ সকালবেলা স্কুল যাওয়ার সময় একবার সাবধানে জানলা ফাঁক করে দেখে ডিমদুটো ঠিকঠাক আছে কীনা। আবার স্কুল থেকে ফিরেও, জুতো ছেড়েই আগে খোঁজ নেয় পায়রা মায়ের। 

বইয়ে পড়া আছে পাখিরা নানা রকম শস্যের দানা খেতে ভালোবাসে। মায়ের ভাঁড়ার থেকে চুরি করে তাই জানলার তাকে চাল-ডালের দানাও ছড়িয়ে রেখেছিল। কিন্তু মা পায়রা খায়নি কিছুই।

তাহলে কি ও আমার দেওয়া খাবার খাবে না? ও কী এখনও আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে? মেয়ের দু:খ দেখে হেসে ফেললেন মা। পরেরদিন কাগজের টুকরোয় দিলেন ভাত। মাটির বাটিতে জল। টুকটুক করে খেল পায়রা। সেদিন সন্ধ্যায় বাবা বাড়ি ফিরতেই হেসে-নেচে তার গলা জড়িয়ে ধরে খবরটি দিল ছোট্ট মেয়ে।

গরম আরও বেড়েছে। স্কুলের ছুটিও পড়ে গেছে। সেদিন দুপুরবেলা হঠাৎ ছোট্ট মেয়ের মনে হল জানলার কাছ থেকে কেমন যেন একটা চিঁচিঁ শব্দ আসছে। তবে কী...  তাহলে কী...

তক্ষুণি সাবধানে জানলা খুলতেই দেখা গেল, ডিম ফুটেছে। হলদে রঙের রোঁয়ায় ঢাকা অতি ক্ষুদে দুই পায়রা ছানা বিশাল হাঁ করে চিঁচিঁ করে চেঁচাচ্ছে।

অফিসের ফোনে মেয়ের সাংঘাতিক উত্তেজিত গলা শুনে মা তো প্রথমে বুঝতেই পারছিলেন না কী হয়েছে। তারপর অবশ্য বোঝা গেল সবটা। বাবারও খবর পেতে দেরি হল না। সেদিন রাতে পায়রার ছানা হওয়ার আনন্দে বাড়িতে একটা ছোটোখাটো ভোজের আয়োজন হল। বাবা অবশ্য বলে দিলেন, স্কুল এখন ছুটি। তাই পায়রা ছানাদের দেখ-ভালের দায়িত্ব নিতে হবে মেয়েকেই। কাক-চিল যাতে ধারে-কাছে আসতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। আবার বেশি নজর রাখতে গিয়ে পায়রা মা যাতে ভয় পেয়ে না যায় সেটাও খেয়াল রাখা দরকার। 

পায়রা ছানারা বড় হচ্ছে বেশ তাড়াতাড়ি। তাদের একজনের গা ঢেকে যাচ্ছে সাদা পালকে, অন্যজনের রঙ ধোঁয়াটে। টব থেকে নেমে তারা এখন দিব্যি জানলার তাকেও ঘোরাঘুরি করে। আর ছোট্ট মেয়েটাকে তাদের মায়ের মতো ভয়ও পায় না তেমন।

গ্রামের ছুটি শেষ। স্কুল থেকে ফিরে জানলা খুলেই ছোট্ট মেয়ের তো চোখে জল। জানলার তাক খালি। ছানাপোনা সমেত উড়ে গেছে পায়রা মা। 
- আমাকে তো বলেও গেল না।
- চিন্তা করিস না। আবার আসবে ওরা। 
মেয়ের কান্না দেখে সান্ত্বনা দিলেন মা। মেয়ের কিন্তু বিশ্বাস হল না। মন খারাপ নিয়ে ঘুমোতে গেল রাতে। এলোমেলো স্বপ্ন দেখে হাত-পা ছুঁড়ল। তারপর সকালে উঠে স্কুলে যাবে বলে যেই না দুধ-বিস্কুট নিয়ে বসেছে, অমনি শোনে বুকুম বুকুম শব্দ। কার্নিসের ওপর দুই ছানা নিয়ে এসে বসেছে পায়রা মা। গলা ফুলিয়ে ডাকছে মনের আনন্দে।

ইচ্ছে

উপাসনা সরকার

ইচ্ছে করে অনেক দূরে
মায়ের সাথে যাই
ইচ্ছে করে আদরসকাল
বাবার থেকে পাই

ইচ্ছে করে গাছ গাছালি
সবুজ পাহাড় বাড়ি
ইচ্ছে করে আঁকি আবার
"সুপুরিবনের  সারি"

ইচ্ছে করে নৌকো ভাসাই
বৃষ্টি আসুক ঝেঁপে
ইচ্ছে করে চৌখুপি পা
ফেলব মেপে মেপে

ইচ্ছে আমার ছেলেবেলা
ইচ্ছের নেই শেষ
ইচ্ছে দামি মন কেমনের
ইচ্ছে খেলা বেশ

ইচ্ছে হলেই ছোট্ট হব
আজব সে এক খেলা
ইচ্ছে নিয়েই ঘুমিয়ে থাকুক
সবার ছেলেবেলা!



শৈশবের বন্ধু - ডাকঘর      
                                          
দিলীপকুমার মিস্ত্রী

ডাকঘরের সঙ্গে আমার ভাব সেই ছোট্টবেলা থেকে। তখনও রবি ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ পড়ার বয়স হয়নি। ১৯৬৫ সাল। থাকা হয় পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মুগবেড়িয়া গ্রামে। খুব সুন্দর,  ছবির মতো একটি গ্রাম। গঙ্গাধর নন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস টুয়ে  তখন আমি পড়ছি।  মাটির দেয়াল, খড়ের চালা, আর লম্বা বারান্দার ইসকুল। সামনে খেলার মাঠ, ডানপাশে ফুল-ফলের বাগান, বাঁ-পাশে মেয়েদের জুনিয়র হাইস্কুল, পিছনে ছায়ায় ঘেরা ডোবা-পুকুর আর ডুমুর নারকেল সুপুরি আমের ছোঁয়াছুঁয়ি। সত্যিই, সে এক ইস্কুল ছিল বটে আমাদের।
        আমরা থাকতাম ইস্কুল-মাঠ লাগোয়া হাসপাতাল কোয়ার্টারে।  সেও ছিল কাঁচা-ঘর। আমাদের ঘর থেকে ডাকঘর ছিল বেশ খানিকটা দূরে। গ্রামের জমিদার নন্দদের বাড়ি লাগোয়া দালানে। আমরা  দুগ্গা পুজোর সময় মায়ের সঙ্গে গরুর গাড়ি চেপে ঠাকুর দেখতে যেতাম নন্দদের বাড়িতে।  তাই পথটা চেনা ছিল। তবে সবটাই কাঁচা-পথ। মুগবেড়িয়া গ্রামে তখনও কোন পাকা রাস্তা হয়নি। 
               বিজয়া দশমীর পর, বাবা মা দিদি চিঠি পাঠাচ্ছে মাঝে-মধ‍্যে। চিঠি আসছেও। তবে সবই পোস্টকার্ড। আমার খুব ইচ্ছে, আমিও চিঠি লিখি। কিন্তু আমার কথা কে শুনবে। বড়দাকে বলতেই সে খুব বকল।  কিন্তু আমি দমে যাবার পাত্র নই। দিদির কাছে বায়না ধরলাম। দিদি জিজ্ঞেস করল, 'তুই কাকে চিঠি লিখবি ?' আমি বললাম, 'কেন, ডাকঘরকে।' আমার কথা শুনে দিদি খুব হাসল। আমি বোকার মতো তার মুখে কতক্ষণ চেয়ে থাকলাম। শেষে দিদি হাসি থামিয়ে বলল, 'ঠিক আছে। তুই একটা কাগজে যা যা লেখার লিখে ডাকঘরের ওই ডাক-বাক্সের মধ্যে ফেলে দিবি। ব‍্যাস, তোর চিঠি ঠিক পৌঁছে যাবে তার কাছে।'
        আমি ছোট দিস্তা খাতার একটা পাতা ছিঁড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠিটা লিখলাম পেনসিল দিয়ে। বানান, বাক‍্য গঠন যে ঠিক  ছিলনা - তা বলাই বাহুল্য।  ভুলটা অবশ্য হুবহু  আজ মনে নেই। কিন্তু কি লিখেছিলাম তা প্রায় মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে আজও। সেটাই আজকে তুলে ধরলাম।
       “ডাকঘর, তুমি কেমন আছ ? আমি ভাল আছি। আমাদের বাড়িতে তুমি একদিন আসবে।“
         পরদিন আমি ইস্কুল যাবার একটু আগে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম সোজা ডাকঘরে। তার দরজা তখনও খোলেনি। একজন ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি হাতের কাগজটা ডাক-বাক্সে ফেলবার চেষ্টা করছি। কিন্তু বাক্সটা বেশ উপরে। নাগাল পাচ্ছি না। আমি লোকটিকে বললাম, 'কাকু, আমার চিঠিটা ডাকবাক্সে ঢুকিয়ে দাওনা।' লোকটি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কাগজটা হাতে নিল। সেটা পড়ে মুচকি  হাসল। তারপর আমার নাম, বাবার নাম জিজ্ঞেস করল। শুনে আবার হাসল। তারপর কাগজটা ডাকবাক্সে ফেলে দিল। তখন আমার আনন্দ দেখে কে। আমি দে ছুট - পিছন ফিরে।
              ডাকঘরের ওই লোকটি বাবাকে চিনতেন। বিকেলে তিনি আমাদের ঘরে এলেন। বাড়ির সকলকে সামনে রেখে, সকালের ঘটনাটি বললেন। পকেট থেকে আমার সেই কাগজটি বের করে বাবার হাতে দিলেন। আর আমাকে কাছে টেনে খুব আদর করলেন। হাতে দিলেন দুটো অরেঞ্জ কালারের লেবু লজেন্স। সেটা ছিল বোধহয় আমার চিঠি লেখার পুরস্কার।
         সেই ছিল আমার জীবনের প্রথম চিঠি লেখা। পোস্টকার্ড , ইনল‍্যান্ড, খাম, ডাক টিকিট -  কিছুই চিনতাম না, জানতাম না, বুঝতামওনা তখন। কিন্তু সেই সাদা কাগজে, পেনসিলে লেখা চিঠির কথা আমি আজও ভুলতে পারিনি। তার টানেই বোধহয় আমি আজও ডাকঘরে  নিয়মিত যাতায়াত করছি। যদিও সাতের দশকের মাঝামাঝি বা তার পর পর, ডাকঘর শব্দটি আমাদের সকলের কাছে কীভাবে যেন পাল্টে পোস্ট-অফিস হয়ে গেছে। কিন্তু আমি ডাকঘরকে কিছুতেই ভুলতে পারিনি আজও। ডাকঘর যে আমার শৈশবের বন্ধু।


নবীন বরণ

সুস্মিতা সাহা 

কলার বসন সোনালি বরণ
জবারা রঙে লাল-
শুভ্র বেলি জুঁইয়ের গন্ধে 
মন মাতোয়ারা সকাল। 
পলাশ আসে গাছ ভরিয়ে 
তাই তো আসে বসন্ত। 
খোকা খুকুদের আলোর পোশাক
আনুক নবীন দিগন্ত।
সবাই বাঁচো বাঁচার মতো
ভুলে যাও ভেদাভেদ, 
আমরা সবাই মানুষ রে ভাই
ভালবাসায় নাইকো ছেদ।।


কালবৈশাখী

শতভিষা মিশ্র
অষ্টম শ্রেণী, জ্ঞানদীপ বিদ্যাপীঠ 
এগরা, পূর্ব মেদিনীপুর


কালো রঙের এলো চুলে
এলে হাওয়ার ঢেউটি তুলে
আকাশ ঢাকে কালো মেঘে
বাতাস বয় উথাল বেগে।।

উঠোনেতে দাঁড়াই এসে
ধুলিকনা বাতাসে মেশে
আকাশে মেঘেরা ভাসে
এই বুঝি বৃষ্টি আসে।।

মেঘেরা গরজে ওঠে
বিজলি চমকে ওঠে
ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ঝরে
মন আমার কেমন করে।।

গ্রীষ্মের এই তপ্ত দাহে
গাছেদের ঐ ক্লান্ত চোখে
কালবৈশাখীর হিমেল পরশ
জাগায় মনে স্নিগ্ধ আবেশ।।

অপেক্ষা 

সন্দীপ বিশ্বাস
অষ্টম শ্রেণী, বেথুয়া ডহরি জে.সি.ম উচ্চ বিদ্যালয়,
নদীয়া

অনেক দিন পর রাস্তায় বেরিয়েছি ।  লকডাউন-এর জন্য বহুদিন সে ভাবে রাস্তায় বেরোনো আর  হয় না। রাস্তার মোড় পার হতেই দেখলাম একটি  কুকুর মৃত অবস্থায় রাস্তার ধারে পড়ে আছে। সদ্য কোন গাড়ি চাপা দিয়ে গেছে। মনটা ব্যথায় ভরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল ছোটবেলার এক দুঃখের স্মৃতির কথা। আমার প্রিয় সাথি টমির  কথা। 

  একদিন আমি মায়ের সাথে পাশের পাড়াতে গিয়েছিলাম। বেশ রাত্রি হয়ে গেছিল।  চারিদিকে অন্ধকার, ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে।  প্রতিবেশী বলতে শুধু জয়ন্তী পিসি। তার বাপের বাড়ির নিকটে বলে রাত্রে সমস্ত কাজের শেষে সে মা-বাবাকে দেখতে যায় ।বাড়ির কাছটা রাত দশটা পর্যন্ত ফাঁকাই থাকে ,যদি কিনা মা আর আমি ঘরে না থাকি। পাশের পাড়াতে আমার পিসির বাড়ি সেখানেই আমরা গিয়েছি । রাত্রি তখন আটটা বাজে মা আর আমি পা চালিয়ে বাড়ি ফিরছি। দশ মিনিটের মতো লাগল। এসে দেখি একটি কুকুর আমাদের দরজার সামনে শুয়ে আছে তার চেহারাটি খুবই সুন্দর। দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতই সুন্দর। মা কুকুরে ভীত ছিল। কারণ ছোটবেলায় অন্ধকারে দুটো কুকুর তাড়া করেছিল মাকে । তাই মা কুকুরটাকে তাড়িয়ে দিতে চাইলেও আমার বায়নায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই ওটাকে বাড়িতে রেখে দিল। 

  আদর করে জয়ন্তী পিসি কুকুরটার নাম দিল টমি। ছোটকা দাদা, আমি আর বাবু দাদা নতুন সদস্য কে পেয়ে খুব খুশি। টমি কখনও আমাদের খাবারে মুখ পর্যন্ত দিত না। তাকে যা দেওয়া হতো তাই খেত।খুব নম্র স্বভাবের ছিল টমি। এভাবেই তিন মাস কেটে গেল। তিন মাস কেটে যাবার পর একদিন তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। আমি খুবই চিন্তায় পরে গেছিলাম। প্রথম প্রথম প্রচন্ড খারাপ লাগলেও বন্ধুদের সাথে খেলতে খেলতে একসময় সেটা চাপা পড়ে গেল।

  কয়েকদিন বাদে জানা গেল টমি, হালদার পাড়া তে আছে। আরো জানা গেল সে নাকি এভাবেই তিন মাস করে করে একেকটা বাড়িতে থাকে। তার এই সময় নির্ধারণ-এর বুদ্ধি দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়। এরকম করে বছর কেটে গেল। কিন্তু তারপর থেকে সে কোনদিন আর ফিরল না। আমি আর মা প্রচন্ড আশায় থাকতাম, যদি সে আবার আসে। হঠাৎ একদিন জয়ন্তী পিসি এসে জানাল যে, টমি আর নেই। সে বড় রাস্তায় এক ট্রাকের ধাক্কায় মারা গেছে। সেটা শুনে  আমার  কান্না পেয়ে গেছিল। প্রথম প্রথম কষ্ট হলেও আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেই হল। তারপর সাত বছর কেটে গেছে। কিন্তু আমার হৃদয়ের এক অংশ এখনও ফাঁকা হয়েই আছে। 
বহুবছর পরে আবার মনের কোণায় চাপা পড়ে যাওয়া ব্যথাটা উঠে এল। মাকে বললাম, ' মা, টমি কি এইভাবেই মরে গেছিল?' মা ব্যাগ থেকে বোতল বার করে মরা কুকুরটার মুখে একটু জল ঢেলে দিল। জলটা কুকুরটার মুখ থেকে গড়িয়ে রাস্তায় পড়ল।


পাঠ প্রতিক্রিয়া ১
(জ্বলদর্চির ৩০ তম সংখ্যা পড়ে পারমিতা মন্ডল যা লিখল)

ছোট্ট বন্ধুরা, আগে কেমন আছ বলতো?একটু মন খারাপ তাই তো? বাড়ি থেকে বেরোনো একদম বারণ। কি আর করা যাবে বল। দুষ্টু করোনা ভাইরাস যতদিন না যাবে ততদিন উপায় তো নেই বল। তোমাদের প্রিয় পত্রিকা জ্বলদর্চি ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ৩০ এর প্রচ্ছদে বিশিষ্ট চিত্রগ্ৰাহক শ্রী সুদীপ পাত্র মহাশয়ের ক্যামেরায় একটি মিষ্টি বাচ্চা মন খারাপ করে তোমাদের মতোই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে, কখন সে বাইরে যাবে বলে। চিন্তা কোরো না তোমরা। দেখ , খুব তাড়াতাড়ি আমরা এই করোনা ভাইরাস কে ছক্কা মেরে হারিয়ে দেব।
প্রথমেই পড়লাম শ্রী রতনতনু ঘাটী মহাশয়ের ধারাবাহিক উপন্যাস "ফুলকুসুমপুর খুব কাছে"। রাধাগোবিন্দ, মিঁউ, কুমি ও বিংগোর জন্য চারটে খাঁচা রাখা নিয়ে ইচ্ছে দাদুর সঙ্গে মিটিং এ কি মজাই না হচ্ছে তাই না! আমার তো খুব ভালো লেগেছে পর্ব ৩।আমিও তোমাদের মতো বসে রইলাম পরের পর্বের জন্য। কবে যে রবিবার আসবে! উপন্যাসে খাঁচার ছবিগুলো কি সুন্দর এঁকেছে সায়নী কুন্ডু! এই ছবিগুলো দেখেই তো আরো বেশি করে চিনলাম রাধাগোবিন্দ, মিঁউ, কুমি ও বিংগো কে। এবার পড়লাম শ্রী সুকুমার রুজ মহাশয়ের গল্প "হীরামন"। তাতাই আর হীরামন পাখির বন্ধুত্বের গল্প। গল্পটা পড়তে পড়তে আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম আমার ছোটবেলায় জানো। আমাদের বাড়িতেও একটা সাদা পায়রা আসতো। আমি ওকে খেতে দিতাম। ওর সাথে কথা বলতাম।বকম বকম করে সারা উঠোন জুড়ে ঘুরে বেড়াতো। গল্পে হীরামন কি সুন্দর একটা উপহার দিল বলতো তাতাইকে! জন্মদিনে পায়েস খেলো। আনন্দে শিস দিল।আর তাতাই যে মিথ্যুক নয় তা প্রমাণ করে দিল। আমিও সত্যি করে বলছি তোমাদের , পাখিরা খুব ভালো বন্ধু হয়। এরপর পড়লাম শ্রী জগদীশ শর্মার দুটো কবিতা , "নোনাজল" ও "জলছুরি"। কি সুন্দর কথামালা। পড়তে ভীষণ মজা! ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরাও পড়েছ নিশ্চয়ই। কিন্তু এবার যেন মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কি কারণ? বলছি। শ্রী মুক্তি দাশ মহাশয়ের লেখা "রাস্তা" গল্পটি পড়ে মন খারাপ আর এক তাতাই এর জন্য। ওর মা আকাশের তারা হয়ে গেছে। ও ওর মায়ের কাছে যেতে পারে না। তাই রাস্তা তৈরি করে দিতে বলছে মিস্ত্রি কাকু কে। কিন্তু বলতো এটা তো সম্ভব নয় তাই না!যদি সত্যিই ও ওর মায়ের কাছে যাবার জন্য রাস্তা পেত তাহলে...ওর জন্য অনেক আদর রেখে গেলাম।
না, বেশিক্ষণ আর জ্বলদর্চি মন খারাপ করে থাকতে দেয়নি। শ্রী অসীম হালদার মহাশয়ের ছোটবেলায় স্কুলের বিভিন্ন স্মৃতি নিয়ে লেখা "আমার স্কুল জীবন ও মাস্টার মশাইরা" পড়ে কখনো হাসতে হাসতে পেট ফেটে গেল। আবার কখনো মনে হলো অনেক কিছু শেখার আছে কিন্তু । আসলে আমরা বড়রাও তো তোমাদের মতো একদিন ছোট ছিলাম। তখন কি এতোসব বুঝতাম? বুঝতাম না। এখন বুঝি। সত্যিই বড় হলে দেখবে তোমরাও খুব খুব খুব মিস করবে স্কুল লাইফকে। স্কুলের আন্টি স্যার দের। ওনারা তোমাদের একটু বকাঝকা করেন ঠিকই। মাঝে মাঝে রাগ হয় হয়তো। কিন্তু পরে বুঝবে,ওনারা যা করেন তোমাদের ভালোর জন্যই। ছোট্ট মেয়ে রেনেসাঁ গঙ্গোপাধ্যায় এর "গরমের ছড়া" পড়লাম। রেনেসাঁ, সত্যি গো,এক ফুঁয়ে যদি সব cool হয়ে যেত! তোমার ছড়া খুব সুন্দর হয়েছে। সত্যি হবে না তো কি হয়েছে! তোমার ছড়া পড়ে কল্পনায় ফুঁ দিয়ে সব আজ cool cool ! পুচকে  মিষ্টি মেয়ে সাত্ত্বিকী নস্করের লেখা "বেরঙা সময়" পড়ে আমার মনটাও রঙহীন হয়ে পড়েছে। সত্যিই তো, অনলাইন ক্লাস কার ভালো লাগে! কবে আবার স্কুলে যাওয়া হবে? আমি বলি কি সাত্ত্বিকী , একদম মন খারাপ কোরো না। এখন ধৈর্য্য ধরতেই হবে। করোনাকে জিততে দিলে হবে না কোনমতে। দেখো, দুষ্টু বিশ্রী করোনা তোমাদের মতো ছোট্ট ছোট্ট ফুলের গন্ধে খুব শিগগিরই পালাতে পথ পাবে না। আমার  মনটা রঙহীন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমার ছোট্ট সুন্দর বন্ধুরা কি আমার মনকে বেশিক্ষণ রংহীন থাকতে দেবে?কক্ষনোই না।তাই আবার আমার মন রঙীন হয়ে উঠলো তোমাদের সুন্দর সুন্দর ছবির রঙে।অস্মিতা ঘোষের ফুলের বাগান আর হাওয়া কল দেখে একটাই শব্দ মুখ থেকে বের হলো ,আহা!শতরূপ বসুর ময়ূর, নদী,পাহাড়, সূর্য কি অপরূপ।এই দেখো ,হয়ে গেল তো ছড়া!"শোন বন্ধু শতরূপ/তোমার ছবি অপরূপ!" আর এক বন্ধু রিষিকা মজুমদারের ছবি দেখে কি বলি বলতো!ধানের জমি, খেঁজুর গাছ সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত!আর এই যে,সোনা গুলু গুলু রিষিত মজুমদার,তোমার ছবিটাতে একশোটা চুমু।খুউউউউব মিত্তি! নজর কাড়ল আত্রেয়ী বিশ্বাসের মান্ডালা আর্ট। তোমার আঁকার হাত খুব ভালো। এগিয়ে চল।
খুব ভালো লাগলো এটা দেখে যে ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরাও কি সুন্দর পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখে।এটা থেকে এটাই বোঝা যায় যে ওরা জ্বলদর্চি খুব মন দিয়ে পড়ে।সুখময় বিশ্বাস ও সাঁঝবাতি কুন্ডুর পাঠ প্রতিক্রিয়া তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সুদীপ্তা আদিত্য ও খুব ভালো পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছেন। ওনাকেও শুভেচ্ছা। আসলে এই পাঠ প্রতিক্রিয়াগুলোই তো ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের লিখতে উৎসাহিত করবে।আর শুধু ছোটদের কথা বলছি কেন যারাই পত্রিকার সাথে যুক্ত সবাই নিশ্চয়ই  পাঠ প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশায় বসে থাকেন।এটাই তো প্রাপ্তি। পত্রিকার আর একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনোজিৎ বেরার "জানো কি"।কত কিছু জানা যায় এখান থেকে।কি বন্ধুরা,তাই তো?
জানি জানি,সবাই একসাথে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলছ।
সত্যিই এতো সুন্দর সাজানো গোছানো একটি ছোটদের পত্রিকা জ্বলদর্চি বিশেষ ছোটোবেলা সংখ্যা ৩০ আমার মন কেড়ে নিয়েছে। এইরকম একটি পত্রিকা ছোটদের মনের বিকাশের একটা প্ল্যাটফর্ম নয় শুধু আমাদের বড়দেরকেও ছোটবেলা ফিরিয়ে দেওয়া।আর তাই এই পত্রিকার সম্পাদক মৌসুমী ঘোষ দিকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না। বরং এসো বন্ধুরা আমরা সবাই মিলে বলি আন্টি (আমার দিদি) তোমাকে অনেক ভালোবাসা। 
এইভাবেই এগিয়ে চলুক জ্বলদর্চি ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা সবার মন জয় করে। অনেক শুভকামনা রইল।

পাঠ প্রতিক্রিয়া - ২
(জ্বলদর্চি ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ৩০ পড়ে চতুর্থ শ্রেণীর সুহেনা মন্ডল যা লিখল)


আমি এই সংখ্যাটি পড়ে আমার মনের কথা বলছি। প্রচ্ছদের ছবিতে বাচ্চাটিকে দেখে মনে হচ্ছে যে আমাদের মতোই ও মনে করছে যেন ও বাইরে গিয়ে খেলতে পারে। সত্যি, কবে যাব বাইরে?" কুসুমপুর খুব কাছে " উপন্যাসটা পড়ে ভালো লাগলো।সব থেকে ভালো লেগেছে যেটা সেটা হলো গল্পটার চারটে পশুপাখি- রাধাগোবিন্দ, মিঁউ, কুমি ও বিংগো কে। পড়তে খুব মজা লেগেছে। উপন্যাসে সায়নী কুন্ডুর আঁকা খাঁচার ছবিগুলো খুব ভালো হয়েছে কিন্তু আমার মনটা খারাপ হয়েছে ছবিগুলো দেখে কারণ খাঁচায় পশুপাখি গুলো পরাধীন ও বন্দী।অস্মিতা ঘোষের ছবিটা খুব রঙীন ও ছবির পরিবেশটাও খুব সুন্দর। "হীরামন " গল্পটা পাখি- মানুষের বন্ধুত্বের গল্প। ভালো গল্প। গল্পটায় তাতাইয়ের অপেক্ষা বিফলে যাইনি। ওর বন্ধু হীরামন এসেছিল। আসল বন্ধুরা মিথ্যে কথা বলে না। আত্রেয়ী বিশ্বাসের সুন্দর ঘাগড়া পরা মেয়ের ছবিটা আমার এতো ভালো লেগেছে যে কোনোদিন দিদিটার সাথে দেখা হলে বলব আমাকে একটু এইরকম আঁকা শিখিয়ে দেবে ? নোনাজল ও জলছুরি ছড়া দুটো পড়তে ভালো লেগেছে কিন্তু আমি কিছু বুঝতে পারিনি। "রাস্তা " গল্পটি খুব দুঃখের। ছোট্ট তাতাইয়ের মায়ের কাছে যাওয়ার রাস্তা হয়তো কেউই বানাতে পারবে না।তাই আমার কষ্ট হচ্ছে। শতরূপ বসুর ছবি খুব রঙীন। ময়ূরটি কি সুন্দর! সে নদীর তীরে সকাল বেলা একটি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। "আমার স্কুল জীবন ও মাস্টার মশাইরা" পড়ে কত মজার মজার ঘটনার কথা জানলাম অসীম কাকুর। অনেক কিছু শিখলাম ও। রিষিকা মজুমদারের জলরং ছবি খুব ভালো। আমিও এখন একটু একটু জলরং করি। রেনেসাঁ গঙ্গোপাধ্যায়ের "গরমের ছড়া " খুব মজাদার।এক ফুঁয়ে সত্যিই যদি সব কুল হয়ে যেত। তাহলে ভীষণ গরম লাগতো না। "বেরঙা সময়" পড়লাম। আমারও করোনার ওপর ভীষণ রাগ হয়। আমার কাছে যদি এমন কোন যন্ত্র থাকতো যেটা দিয়ে করোনা কে ধাক্কা মেরে পৃথিবী থেকে বাইরে বের করে দিতে পারতাম তবে আমাদের কি আনন্দটাই না হতো! কিন্তু সেরকম কোন উপায় নেই। তাই আমরা সবাই একটা বেরঙা সময় দিয়ে যাচ্ছি।তাই জন্য আমারো খুব দুঃখ। কিন্তু মা বলেছে আমরা আবার খুব তাড়াতাড়ি স্কুলে যেতে পারবো। এই বয়সে এতো সুন্দর একটা ছবি এঁকেছে রিষিত মজুমদার। তাই রিষিতকে অনেক আদর।জানো কি থেকে অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ । অনেক ভালো ভালো গল্প,ছড়া, কবিতা,ছবি,উপন্যাস একসাথে এই পত্রিকায় দেওয়া হয়েছে।পত্রিকাটি আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই জ্বলদর্চি ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যার সম্পাদক মৌসুমী আন্টিকে অনেক থ্যাঙ্কস। আরো পড়ব জ্বলদর্চি।
জানো কি !

আজকের বিষয়: বিভিন্ন বিষয়ের জনক ।

১.ইন্টারনেটের জনক কাকে বলা হয়?
২.বর্তমান সময়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হোল কম্পিউটার। এই কম্পিউটার বিজ্ঞানের জনক কে?
৩. মোবাইল ফোনের জনক কে?
৪. ল্যাপটপের জনক কাকে বলা হয়?
৫. কম্পিউটারের জনক কে?
৬. ই-মেলের জনক কে?
৭. আধুনিক কম্পিউটারের জনক কাকে বলা হয়?
৮. চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিসাবে কাকে মানা হয়?
৯. মন বিজ্ঞানের জনক হিসাবে কাকে মানা হয়?
১০. আয়ুর্বেদের জনক কাকে বলা হয়?

গত সপ্তাহের উত্তর:
১.১৯৮৪ ২.১৯৭৩ ৩.১৯৮৪ ৪.১৯৮৭ ৫.ম্যানগ্রোভের জন্য ৬.বাঘ ৭. দক্ষিণ ২৪ পরগনা ৮.কুমির ৯.১৯৮৯ ১০.২০১৯

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 





Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া