জ্বলদর্চি

সজিনা/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১১৪
সজিনা

ভাস্করব্রত পতি

'ঘাস আমি দেখিয়াছি, দেখেছি সজনে ফুল চুপে চুপে পড়িতেছে ঝ’রে। 
মৃদু ঘাসে, শান্তি পায়, দেখেছি হলুদ পাখি বহুক্ষন থাকে চুপ করে।'
 -- রূপসী বাংলা, জীবনানন্দ দাশ
বসন্তের আগমনে যেকটি ফুলের দেখা মেলে তার মধ্যে সজিনা বা সজনে ফুল অন্যতম। গ্রামবাংলায় আখছার জন্মাতে দেখা যায়। অত্যন্ত পলকা এই গাছটি কিন্তু খাদ্যরসিকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় বৈকি। এর ফুল, পাতা এবং ডাঁটা রসুইঘরের স্বাদবৃদ্ধির অন্যতম উপকরণ। প্রবাদেও সজিনা গাছের সজাগ উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। আমরা কথা প্রসঙ্গে সারবত্তাহীন এবং অচল বোঝাতে বলে থাকি, 'লোকটা যেন সজনে কাঠ'। কারণ সজিনা গাছ যতই বিশাল, মোটা এবং প্রাচীন হোক না কেন, গাছে এতটুকুও সার হয় না। অর্থাৎ ফোঁপরা। 

সজিনা গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম Moringa oleifera। এটি Moringaceae পরিবারের অন্তর্গত। সজিনার আরও কয়েকটি প্রজাতি হল --
Guilandina moringa 
Hyperanthera moringa
Moringa pterygosperma 
একে সংস্কৃতে শোভাঞ্জন, শিগ্রু, হিন্দিতে সজনা, শোয়ানজন, তামিলে মরুঙ্গা, তেলুগুতে মুঙ্গ, কন্নড়ে মুনগা, ওড়িয়াতে মুনিখ বলে। এছাড়াও এর পরিচিতি হরিত শাক, শতপত্র, মধুশিগ্রুক, কালশিগ্রু, নীলশিগ্রু, কৃষ্ণশিগ্রু, শ্বেতশিগ্রু, রক্তশিগ্রু, রক্ত বহুলচ্ছদ, সুগন্ধকেসর, সুখামোদ, সিতাহ্ব, সুমুল, শ্বেত মরিচ, রোচন নামেও। 
গাছে ঝুলছে কচি সজিনা ডাঁটা

সজিনাকে প্রাচীন বৈদ্যকাররা 'আক্ষীব' নামকরণ করেছে। যার অর্থ শিগ্রু বা সজিনা গাছ। এই আক্ষীবের আরেকটি অর্থ হল মাতাল। বেদে আলোচিত এই অর্থটির মূলে প্রাক্ আর্যগোষ্ঠীর উত্তরাধিকারিদের ব্যবহৃত একটি সামগ্রীর প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য। আমরা জানি, বৈদিক সংস্কৃতির সৃষ্টির বহু আগে থেকেই এখানে আর্যরা বসবাস করত। তাঁরা তাঁদের জীবনধারণের জন্য সখিনার ছালের রস দিয়ে মদ তৈরি করে। যে পদ্ধতি আজও দেখা যায়। সাধারণত লোধা, কোল, ভীল, মুণ্ডা, সাঁওতালদের মধ্যে এভাবে মদ তৈরির পদ্ধতি অনুসৃত হয়। তাই হয়তো 'আক্ষীব' অর্থে মাতাল বোঝায়! আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য সজিনা গাছ থেকে আদিবাসীদের এই মদ তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে লিখেছেন, "এই মদ তৈরি করতে সজিনার ছাল, অনন্তমূল (Hemidesmus indicus), শতমূল (Asparagus racemosus), শিমূলমূল (Salmalia malabaricum) ও মুথা (Cyperus rotundus) - এ পাঁচটির মাত্রা প্রথমটি তিনসের, বাকিগুলি আধসের ক'রে নেয়; মাত্র ২০ দিন পচায়। তারপর শুকনো মহুয়া এবং গুড় মিশিয়ে প্রয়োজনমাফিক জল দেয় এবং দেশীয় পদ্ধতিতে চুঁইয়ে নিয়ে যে মদ প্রস্তুত করে, তাকে বলে 'হাঁড়িয়া খেরী'। এই মদ ওদের কাছে পবিত্র এবং মূল্যবান।"
সজিনার ফুল

সজিনা হ'ল মাঝারি ধরনের গাছ। প্রায় ২০-২৪ ফুট লম্বা হয়। বাংলা প্রবাদে আমরা বলে থাকি, "আম, আমড়া, সজনে, শিমূল / ফাগুনের জলে সব নির্মূল"। সজিনার ফুল সাদা রঙের থোকা থোকা। যা সর্বত্র পাওয়া যায়। এর ডাঁটা কিন্তু সবুজ। খুবই জনপ্রিয় সবজি। এছাড়াও আরও তিন ধরনের সজিনা গাছের খোঁজ পাওয়া যায়। Moringa concanensis প্রজাতির এক ধরনের সজিনার দেখা মেলে সমগ্র দাক্ষিণাত্য, রাজপুতানা সহ বালুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশে। এর ফুল এবং ডাঁটা লালাভ। আরেক ধরনের লাল রঙের সজনে গাছ জন্মায় মালদহতে। নাজনে অবশ্য মেলে সারা বছর ধরেই। এ প্রসঙ্গে একটি প্রবাদ শোনা যায়, "ন'টে খেটে আড়াইয়ে / সজনে বারো মাস"। অর্থাৎ ন'টে শাক আড়াই মাস মাত্র থাকলেও সজিনা পাওয়া যায় সারা বছর। তবে নীল রঙের সজিনার দেখা মেলা ভার এখন। কখনো কখনো সজিনা গাছের কাণ্ডে প্রচুর পরিমাণে শুঁয়োপোকা জন্মায়। তখন গাছে চড়া ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। গ্রামাঞ্চলে এই দৃশ্য বেশ পরিচিত। 
সজিনা পাতা

সজিনা পাতার মধ্যে রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি, নিকোটিনিক অ্যাসিড, প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট সহ আরও অনেক উপাদান। সজিনাতে প্রায় ৪৬ রকমের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে এবং এর মধ্যে ৩৬ টি অ্যান্টি ইনফ্ল্যামমেটরি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। বসন্তের প্রারম্ভে সজিনা পাতার তরকারি অনেকেই খায়। পেটের রোগের পক্ষে উপযোগী। এই সময় শাকের মত রান্না ক'রে খাওয়া হয় সজিনার ফুল। ভোরবেলা গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে থাকা সজিনার ফুল কুড়িয়ে নিয়ে আসার মজাই আলাদা। সজিনার ফুল হল বসন্ত রোগের অন্যতম প্রতিষেধক। সজিনার ডাঁটাগুলি Amino Acid সমৃদ্ধ উৎকৃষ্ট সবজি। শরীরের উপযোগী ৯ টি Amino Acid ই এতে মেলে। রান্নাঘরে নানা ব্যাঞ্জন বানাতে এর জুড়ি মেলা ভার। শুক্তো, আলু দিয়ে ঝোল, কুমড়োর তরকারি, দক্ষিণ ভারতের খাদ্য সম্বর ইত্যাদি তৈরিতে সজিনা ডাঁটা ছোট ছোট করে কেটে দেওয়া হয়। দারুন স্বাদ। তেমনি দারুণ উপকারী। 
সজিনা ডাঁটা

খুবই উপকারী সজিনার কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে ফোঁড়া, জ্বর, হিক্কা, টিউমার, দাদ, উচ্চ রক্তচাপ, কুষ্ঠ, দাঁতের মাড়ি ফোলার নিরাময়ে। শরীরে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ তথা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন, অকাল বার্ধক্য রোধ, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানো, রক্তাল্পতা, অন্ধত্ব রোগের নিয়ন্ত্রনে বৈদ্যকাররা সজিনা গাছের নাম সুপারিশ করে থাকেন। আফ্রিকা থেকে সজিনা বীজের তেল 'বেন অয়েল' আমদানি করা হয় এদেশে। যা বাতের ব্যাথায় মালিশ করলে উপশম হয় এবং ঘড়ি মেরামতির কাজেও লাগে। শীত কাটার সাথে সাথেই সজিনা গাছ ভরে ওঠে অতি প্রিয় সজিনা ডাঁটায়।

Post a Comment

0 Comments