"হারানো হিয়ার"/বুবুসীমা চট্টোপাধ্যায়

"হারানো হিয়ার"

বুবুসীমা চট্টোপাধ্যায় 

তখন মাঝেমাঝেই তোমার সাথে দেখা হতো,
গ্রীষ্ম,বর্ষা,হেমন্ত,বসন্ত নয় যখন-তখন,
যেখানে-সেখানে দেখা হতোই হতো!
তুমুল বর্ষায় পুকুরপাড় ঘেঁষা তেরছা ঘরটাতে
পড়া হোক বা গান অথবা কবিতার ছলেই যেভাবে তোমার সাথে সারা সন্ধ্যা পুরো পরিবার একসাথে কাটতো তা আজ দুর্মূল্য সন্ধ্যা। 
যেমন গ্রীষ্মের তীব্র গরমে কত রাত ঘুম নেই চোখে,
খোলা ছাতে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে আছি ঝকঝকে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
ঘুমন্ত ঠাম্মির হাতে ননস্টপ তালপাতার পাখা,  একপাশে আমি অন্যপাশে সঞ্চিতা।
একসময় মধ্যরাতের চাঁদ নেমে আসতো আমার
মাথার কাছটিতে, আমায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করলো "কেমন আছো?" ঠিক সেইসময় 
ঠাম্মির ঘুম ভেঙে গেলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চাঁদের কাছ থেকে তোমায় ডেকে নিতো চুপটি করে, সে এক অপূর্ব ডেকে নেওয়ার আদব জানতো আমার ঠাম্মি,
আমি বলতাম-
"ঠাম্মি তুমি মন্ত্র জানো"
বাবা বলতো "তাই তো তুমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনো!"
আমি ভীষণরকম ভাবে ঐ ডাক যতবার রপ্ত করতে গিয়েছি ততবারই ঠোক্কর খেয়েছি,
হয় সুরে ভুল নয় আবেগে- 
আসলে কিছুই রপ্ত করা যায় না যদি শিকড়ে জারিয়ে না যায় রস।
  নিভু নিভু হ্যারিকেনের সলতে যেন নিজে নিজেই
উস্কে যেতো সেইসময়,
আর সারা ছাদ আলোয় আলোকিত। 
ঝাঁকড়া ঘন চুলের তুমি, স্মিত হাসি আর স্ফীত চোখের আলোয় তুমি তখন বুকের মাঝখানটিতে এসে আলো হয়ে বসতে প্রায়ই নির্ঘুম রজনীতে!
সময়টা আশির দশক, তখনও তোমার সুরের মূর্ছনা আমাদের বৈঠকখানায় খুঁজে পাওয়া যেতো গল্পে-গল্পে। ঠাম্মি মধ্যরাতের একখিলি পান মুখে পুরে সেই যে তোমাকে বসিয়ে রাখতো তারপর একটার পর একটা যেন চলমান চিত্র আঁকা শুরু হতো। ঠাম্মি দেখিয়ে দিচ্ছে আর আমি পৌঁছে যাচ্ছি তোমাকে নানা রূপে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে!
  সিয়ারসোলের ছাত্রাবাসের জানালার কি রঙ
ঠাম্মি নিপুণ ভাবে আঁকছে কথায় কথায়,
কখনো দেখিয়ে দিচ্ছে তোমায় পল্টনের বেশে,
তো কখনও বাঁশী হাতে, আবার তখনই যাত্রাদলের লোকদের দেখবে বলে বাবুবাড়ির উঁচু পাঁচিলে রাতভর বসে আছো সেই তুমিটাকেও!
অনটনের তুমিটাকে কেন যে আমার বাবা কাকাদের মতো লাগতো জানি না।বড্ড চেনা। 
যেদিন তোমার কবিতার সাথে পরিচয় হল সেদিন তোমাকে অন্যরকম করে দেখালো ঠাম্মি, নীলকণ্ঠের মতো চোখের উপর অভিমান আর বুকের ভিতর শিকড় ছিঁড়ে আলাদা করে নিজেকে দেশের দশের জন্য প্রতিদিন একটু একটু করে যে স্বপ্ন বুনছিলে তখনকার তুমিটাকেও দেখালো।
অথচ তোমাকে সমস্তটা দেখানো শেষ না করেই 
একদিন দুম করে ঠাম্মি নিজেই ভ্যানিশ হয়ে গেল।
আসলে চোখ না ফুটলে সবটা দেখানো যায় কি? 
তখন যে সবে অগ্নিবীণা বানান'টা ঠিক করে লিখতে শিখছি। 
  অসম্পূর্ণ থেকে গেল শৈলজা কবিতা লিখতে লিখতে কখন দিস্তা দিস্তা চিঠি পাঠাতো নজরুলকে ! তারপর আর ঐভাবে কখনও দেখা না হলেও তোমাকে দেখলাম একদিন মা'য়ের ঠাকুরঘরে, আমি স্নান করে ঠাকুরঘরের পাশ দিয়ে
পেরিয়ে যেতেই মা' মিষ্টি সুরে কিছু গাইছে,
উঁকি দিতেই মা'য়ের চোখে চোখ,
 ঠাকুর স্নান করাতে করাতে মা গাইছে-
         "অরুনকান্তি কে গো যোগী ভিখারী
         নীরবে এসে দাঁড়াইলে হেসে.."
মা বললে-
"পরের সপ্তাহে গানের দাদুর কাছে গানটা তুলিস তো, নজরুলগীতি।"
আমার ঘোর লেগে গেল সুরটাতে। কখনও মায়ের মতো করে গাইতে পারিনি কিন্তু তোমাকে পেলাম অন্যভাবে। এমনি করেই একটু একটু করে যেন কাছে আসছি তোমার। 
এরকম ভাবেই একদিন এক তরুনতুর্কি তাঁর দীপ্ত- কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিল পাশেই দেবদাস মঞ্চ কাঁপিয়ে--
"মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেইদিন হবো শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল
আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ
ভীম রণভুমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শান্ত।"

মনে আছে সেদিন ছিল ১১ই জ্যৈষ্ঠ,
তোমার জন্মদিন পালন হচ্ছে,
এক দৌঁড়ে ছাদে গেলাম,
আরও আরও স্পষ্ট হল সেই মর্মভেদী কবিতা!
সেদিন কবি,কবিতা ও কবিতাকারকে মনে হল
একাকার হয়ে গেছে,
অবোধ আমিটা বুকে হাত রেখে বলেছিল 
"এই তো আমি পেয়েছি আমি পেরেছি তোমার কাছে আসতে, তোমাকে চিনতে!"
কিন্তু না, 
এই মধ্য চল্লিশে এসে দেখি কেউ ছেড়ে যায়নি কিন্তু কী ভীষণ অধরা,
আমি যখন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় বসে আপনমনে গেয়ে যাই-
"অন্তরে তুমি আছো চিরদিন ওগো অন্তর্যামী.. !"
অজান্তেই একটা অন্য-আমি বলে ওঠে,
"আমি না পেরেছি একশ বছরের সেই কালজয়ী  কবিতাটিকে চিনতে,না পেরেছি কবিকে জানতে,
না পেরেছি যাঁরা আমার "ওপেনার ওফ নলেজ" সারাজীবনের তাঁদেরকে বুঝতে।"
শূন্যপাত্রের মতো গড়াগড়ি খেয়ে ভাঙা হারমোনিয়মের রিডে আমার আঙ্গুলে বেজে ওঠে
            "হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে
            কুড়াই ঝরা ফুল একেলা পথে..! "
আজও দেখা হয় তোমার সাথে তবে অন্যভাবে অন্যপথে! মেঘ খুঁচিয়ে বৃষ্টি না নামুক,
বুক ভাসিয়ে কান্না আসে যখন-
অক্ষরে অক্ষরে খুলে বসি সেই দিনগুলির আলো!
আলোকিত হয়ে স্পষ্ট দেখি 
বোকা আমিটার বয়স বাড়ছে যত,
তোমাকে খুঁজে বেড়ানোর আকুতিও বাড়ছে তত।
কোথা থেকে ভেসে আসছে-
"দুলিতেছে তরী,
ফুলিতেছে জল, 
ভুলিতেছে মাঝি পথ
ছিঁড়িয়াছে পাল 
কে ধরিবে হাল
কার আছে হিম্মত?"
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে কি দেখছো তুমি অমন করে  আজও কবি?

১০ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮  
25শে মে 2021

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

  1. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  2. এই খুঁজে বেড়ানোর আকূতি সফল হোক। পূর্বজদের উত্তরাধিকারে অর্জিত ভাষা দিয়েই প্রিয় কবিকে ছোঁয়া যাক।

    কবির দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী। কলমও এভাবেই প্রকাশমান থাকুক।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি