আবৃত্তির পাঠশালা-২৬/শুভদীপ বসু

আবৃত্তির পাঠশালা-২৬
শুভদীপ বসু

বিষয়-বাংলার বিশিষ্ট আবৃত্তিকার(তৃতীয় পর্ব)

শুভ দাশগুপ্ত

কবিতা,গান,নাটক,আবৃত্তি-সব ভুবনেই শুভ দাশগুপ্তের সফল পদচারণা।তার কবিতা গ্রামে শহরে সর্বত্রই আবৃত্তিকারদের সেরা পছন্দ।প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের তার রচিত গান অনন্য আকর্ষণ। এ পর্যন্ত প্রায় দু'হাজার গান রেকর্ড হয়েছে নামিদামি সব ভারত বিখ্যাত শিল্পীদের কন্ঠে।ওনার আবৃত্তির অ্যালবাম শতাধিক। খ্যাতনামা প্রায় সব শিল্পীরাই ওনার কবিতা পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়ার শুভ দাশগুপ্ত তার কাজের সাফল্যের স্বীকৃতিতে আজ ছড়িয়ে রয়েছেন দেশে ও বিদেশে।অসংখ্য তার কবিতার ও গদ্যের বই।'আমি সেই মেয়ে' 'ব্রিলিয়ান্ট','জন্মদিন'-এরকম বহু কবিতা এক এক জন আবৃত্তি শিল্পী কে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। তিনি প্রতিবাদেরকবি,রুখে দাঁড়ানোর কবি।জীবন রসিক এই কবির কবিতা ও না কবিতায় প্রেম ভালোবাসা তার প্রকাশও বহু মানুষের অন্তরের সম্পদ হয়ে উঠেছে।
রাম চন্দ্র পাল

তিনি মূলত আবৃত্তিশিল্পী পাশাপাশি কবিতাও লেখেন। ধারাবাহিকভাবে উৎপল কুন্ডুর কাছে আবৃত্তি শিক্ষা করেছেন। তার লেখা কবিতার মতোই তার কণ্ঠের আবৃত্তি এবং আবৃত্তির রূপায়ণও বিশিষ্টতার গুণে জনপ্রিয়।ছোটদের জন্য ছড়া ও কবিতা আবৃত্তিতে তার দক্ষতা অসামান্য।দলগত আবৃত্তির জন্য তার বিষয় ভিত্তিক সংকলন আবৃত্তি সংগঠন গুলির কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত।রবিন ভট্টাচার্যের সঙ্গে যৌথভাবে মজার ছড়া আবৃত্তি'রাম রবিনের ছড়া' বঙ্গসংস্কৃতিতে এক অভিনব সংযোজন।সম্প্রতি তার 'আমার বাউল' কাব্যগ্রন্থটির কবিতাগুলি নিয়ে কল্যাণ সেন বরাট এর সুরে ও পরিচালনায় গান ও আবৃত্তি একটি অনবদ্য সিডি প্রকাশিত হয়েছে।সেখানে কণ্ঠ দিয়েছেন শ্রীকান্ত আচার্য,রূপঙ্কর,লোপামুদ্রা মিত্র,জয়তী চক্রবর্তী ও ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়।১৯৯২সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন'উচ্চারণ'সংস্থা। স্বর্গের সিঁড়ি,নীল পাখিটা,সৃষ্টি সুখের উল্লাসে,ভুতুম ভগবান,দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়, রূপকথার দেশে,মাকে মনে পড়ে, ছন্দের উৎসব ইত্যাদি তার বিখ্যাত সব আবৃত্তির সি.ডি।এই মানুষ এই পৃথিবী,মেঘ পাথর ও জল তরঙ্গ, অন্য ছবি অন্যরকম,জন্মান্ধ ভায়োলিন,বৃষ্টি ও শ্রাবণের রূপকথা,জন্মদিনের ছড়া,স্বপ্নের ফুটবল,পাগলা খেলে যা,আয় বৃষ্টি বাঘের দেশে ইত্যাদি তার বিখ্যাত সব কাব্যগ্রন্থ।আবৃত্তি জগতের বহুমুখী কাজের সঙ্গে তিনি নানাভাবে যুক্ত।বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার নেওয়া আবৃত্তি কর্মশালাগুলো কবিতার শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনবদ্য অধ্যায়।এখনো তিনি আবৃত্তি নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছেন।

দেবব্রত দত্ত

'ছড়া ছড়ানোর জিনিস'-অন্নদাশঙ্কর রায়ের এরকম উচ্চারণ কে যিনি আত্মমগ্ন করেছিলেন তিনি আধুনিক ছড়াসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ছড়াকার দেবব্রত দত্ত।প্রফুল্ল দত্ত ও অনিমা দত্তর দ্বিতীয় সন্তান দেবব্রত জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি।তবে শুধু ছড়াকার নয় তিনি একজন বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী।দূরদর্শন, বেতার ও মঞ্চে নিয়মিত অনুষ্ঠান করেন।তার প্রতিষ্ঠিত'ছন্দায়ন'দীর্ঘ তিন দশকের ওপর ধরে  পূর্ব মেদিনীপুরে আবৃত্তিচর্চার পীঠস্থান।তার-ছড়ার মজা মজার ছড়া,বই নিয়ে ষোলকথা,গুপ্ত ভুতের ফুল পঞ্জিকা,অদল বাবু বদলবাবু,আনন্দে গান গাই,একশো হাসির আনন্দ, আজকের বীরপুরুষ-বিখ্যাত সব ছড়ার বই।তার জমজ ভাই,সেন বংশ,ফার্স্টবয়,হারানো মার্কশিট, কর্মখালি,স্বর্গীয় মন্ত্রিসভা,তিনি রবীন্দ্রনাথ-কবিতাগুলি বহু বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পীর কন্ঠে বারবার শোনা যায়।১৬টি ছড়ার ও ৬টি কবিতার বই লেখা এই শিল্পী দুটি তথ্যচিত্রে অভিনয়ও করেছেন।একটি সিনেমায় ডাবিং আর্টিস্ট ছিলেন তিনি।'মজার খেলা'নামের রিয়েলিটি শো এর বিচারক ছিলেন তিনি।সত্যজিৎ রায়ের সাথে তার যোগাযোগ ছিল।সত্যজিতের লেখা এক ডজন চিঠি আজ তার কাছে এক বিরাট সম্পদ।কাজী সব্যসাচী স্মৃতি পুরস্কার,রূপসী বাংলা শুভেচ্ছা সম্মান,শিশু সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার ইত্যাদি বহু সম্মানে সংবর্ধিত হয়েছেন তিনি। কবি জানেন সময় সব সময় একই রকম যায় না।'Time is between past and future.Time is now'কবি জানেন সময় চিরকাল একইভাবে বিনম্র থাকেনা।তাইতো মহাশূন্যের আবর্তনের বিবর্তন এর মধ্যে যেতে যেতে তিনি বলেন-'যেন আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে একটা সুদীর্ঘ পথ।আজ কেন গত জন্মের কথা মনে আসছে।'ছড়া শিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী ,দক্ষ সংগঠক দেবব্রত দত্ত বাংলা সংস্কৃতিজগতের  এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।
নিবেদিতা নাগ তহবিলদার

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্রী নিবেদিতা নাগ তহবিলদার আবৃত্তির ইতিহাসেও এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।মা গৌরী নাগ ও বাবা অচিন্ত্য কুমার নাগ। কথা বলা আর আবৃত্তি দুটোই প্রায় শুরু হয়েছিল একই সময়ে।ছোট থেকেই বাবার হাত ধরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন তিনি।তবে শুধু নিজের কবিতা বলেই চলে আসা নয়,ওনার কথায় অন্যদের কবিতা শুনতে শুনতে সেই সময় থেকেই কান তৈরি হয়ে গিয়েছিল।আকাশবাণী কলকাতায় যাত্রা শুরু করলেন ২০১০ সাল থেকে।'প্রিয় আমার''সূর্যস্নান''কবিতার স্কেচ' 'এক বিকেলের কথা'এরকম প্রায় ৬টি অ্যালবাম দেশে ও বিদেশে মানুষের মনে এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।ওনার আবৃত্তির গুরু শ্রী জগন্নাথ বসুর সাথে'সূর্যস্নান' অ্যালবামের'প্রশ্নোত্তর'কবিতাটি ছাড়াও 'বোঝাপড়া''পুরুষের গান' 'আজ অন্তত ঘড়ির দিকে'ইত্যাদি আবৃত্তি গুলো ভাইরাল হয়েছে মুহূর্তে।নিবেদিতা প্রতিষ্ঠা করেছেন আত্মজা আবৃত্তি সংস্থা।এই সংস্থাটি বর্তমানে দেশে ও বিদেশে সমানভাবে জনপ্রিয়।বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবৃত্তি ও সঞ্চালনা প্রিয় মানুষ জন ক্লাস করছে ওনার কাছে।পেশাগত ও নেশা গতভাবে এই আবৃত্তিশিল্পী মনে করেন যদি এই শিল্পের পেছনে সময় দেওয়া যায় তবে এই শিল্পও ফিরিয়ে দেবে অনেকটাই। দূরদর্শন ও আকাশবাণীর বর্তমানের এই সফল সঞ্চালক ও আবৃত্তিশিল্পী এখনো সবথেকে বেশি আনন্দ পান বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে কর্মশালা নেওয়ার সময়। সম্প্রতি ইনি'আবুল কাশেম রহিমুদ্দিন' সম্মাননা পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে।

দেবাশিস চক্রবর্তী

পূর্ব মেদিনীপুরে কোলাঘাটের বাসিন্দা দেবাশিস চক্রবর্তী পেশাগত ও নেশাগত একজন আবৃত্তিশিল্পী।আবৃত্তির স্বাদ পেয়েছিলেন উনি মা লীলা চক্রবর্তীর কাছে।এরপর শিব সুন্দর বসু,স্বরাজ বসু ও পরে জগন্নাথ বসুর কাছে বেশ কিছুদিন তিনি আবৃত্তির শিক্ষা নেন। মফস্বলের ছেলে তাই লড়াই অন্যদের থেকে অনেকটাই বেশি। আকাশবাণীর নাটক বিভাগের অস্থায়ী কর্মী হিসেবে তিনি পাঁচ বছর কাজ করেছিলেন।এরপর আবৃত্তি শেখা আর পরবর্তীকালে শেখানো এই নিয়ে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর।ওনার কথায়"এখন যদিও অনেকেই আঞ্চলিক কবিতা আবৃত্তি করেন,১৯৮০-৮৫তে এর তত চলছিল না।২০১০সালে আমার একক আবৃত্তির অ্যালবাম প্রকাশিত হয়-জীবনের জলছবি।"১৯৯০ সালে কোলাঘাটে তিনি গড়ে তোলেন'আবৃত্তি তীর্থ'নামে কবিতার স্কুল।২০১৩ সালে'কবিতা যখন আবৃত্তি'নামে কবিতার সংকলন প্রকাশ করেন মৌসম মজুমদার এর সাথে।'আবৃত্তি সংবাদ'নামে আবৃত্তি বিষয়ক পত্রিকা ২০০৬সাল থেকে তিনি প্রকাশ করে আসছেন পূর্ব মেদিনীপুর থেকে যা এই জেলায় প্রথম।খুব সম্প্রতি 'ডাউন মেমোরি লানে'নামে একটি স্মৃতিকথার বই তিনি প্রকাশ করেছেন যা সারা ফেলেছে সংস্কৃতি জগতে।আবৃত্তি সঞ্চালনা ও শ্রুতি নাটকের সিদ্ধ কন্ঠ দেবাশিস বলেন-'বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষের সান্নিধ্য আমাকে প্রাণিত করেছে।কতটা যোগ্য জানিনা তবে ওয়ার্কশপে ক্লাস নিতে খুব ভালো লাগে।আবৃত্তি আমার জীবিকা।খুব স্বাচ্ছন্দে না থাকলেও আবৃত্তি করেই ডালভাত জোগাড় করি।এটা খুব আনন্দের।'পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাওয়া কবিতা পাগল এই ষাটোর্ধ্ব মানুষটি তার কাজে ও ভাবনায় আজও সমানভাবে সচল।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি