রবি মননে রবি রশ্মি /সৌমী গুপ্ত

রবি মননে রবি রশ্মি 

সৌমী গুপ্ত 

"আজি এ প্রভাতে রবির কর 
কেমনে পশিল প্রাণের পর..."
আসলে রবির কিরণ জীবনের প্রথম প্রভাতের শৈশববেলায় নরম রোদ্দুরের আলতো ছোঁয়ায় লেপ্টে আছে আমাদের মননে ,চিন্তনে এবং অবশ্যই জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আমাদের মজ্জায় । 
  সেই ছেলেবেলা থেকেই যদি শুরু করি তাঁর নিজের আত্মস্মৃতিমূলক রচনা 'ছেলেবেলা ' শৈশবের জীবন্ত দলিল দেখতে পাই আমরা । সব যেন জলছবির মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁরই লেখনীর গুণে।  একটি জানালার পাশে বসে থাকা ছোট্ট রবি লিখছেন তাঁর ছেলেবেলার আত্মকথন। কি অনুভূতিময় সেসব লেখা। চোখ বন্ধ করলে যেন অনায়াসে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই অশ্বত্থ গাছ,পুকুরে স্নানরত, আচমনরত লোকজনের ভিড় । কবির উদাসী মায়াময় কল্পনা। কিংবা ছন্দময় লেখা "জল পড়ে পাতা নড়ে" চারটি অক্ষর । সত্যতার নিরীক্ষণ ও ছন্দের তালে নিশ্চিত মনকাড়া লাইন । তখন সবে ছোট্ট রবির কবিতায় হাতে খড়ি। চমৎকারিত্ব ও মুন্সীয়ানায় তখনই তাঁর জুড়ি মেলা দুষ্কর। 
  আসলে দেখার চোখ আর অনুভবের মন এই দুইইয়ের ব্যতিক্রমী মেলবন্ধন ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায়। কি অসম্ভব প্রাণশক্তি না থাকলে অগুনতি চিরন্তন সাহিত্য সৃষ্টি কখনোই সম্ভবপর হয়ে উঠত না। 
নিজের জন্মভূমিকা সম্বন্ধে ছেলেবেলার স্মৃতিতে তিনি লিখেছেন কত সুন্দর করে," আমি জন্ম নিয়েছিলাম সেকেলের কলকাতায়। শহরে শ্যাকরাগাড়ি ছুটছে তখন ছড়ছর করে ধুলো উড়িয়ে, দড়ির চাবুক পড়ছে হাঁড়-বের করা ঘোড়ার পিঠে। না ছিল ট্রাম , না ছিল বাস , না ছিল মোটরগাড়ি । তখন কাজের এত বেশি হাঁসফাঁসানি ছিল না , রয়ে বসে দিন চলত। বাবুরা আপিসে যেতেন কষে তামাক টেনে নিয়ে পান চিবতে চিবতে , কেউ বা পালকি চড়ে কেউ বা ভাগের গাড়িতে।'
  এই ছিলেন রবি ঠাকুর। তৎকালীন শহরের একটুকরো ছবিতে ধাঁ করে নিয়ে গিয়ে ফেলবেন তিনি কলমের দক্ষতায় । ২৫ শে,১২৬৮ বৈশাখ ধনাঢ্য পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা ব্রাক্ষ  ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পারিবারিক ভৃত্যের তদারকিতে তাঁর বেড়ে ওঠা। পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়িয়ে এ জগতের রূপ রস গন্ধ নিজের সমস্ত অস্থি মজ্জা দিয়ে গ্রহণ করে তাকে নিপুণ কলমের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরেছেন । তাঁর সৃষ্টি অমর , চিরন্তন।
  একবার কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন রবিঠাকুর হলেন তাঁদের কবি । সত্যই তাই সাধারণ মানুষের জন্য যেমন লিখেছেন তেমনই তাঁর রচনা গভীরতা ,অর্থের ওজনে  যথেষ্ট ভারী‌। একাধারে ঔপন্যাসিক,লেখক, প্রাবন্ধিক,গল্পকার,কবি, নাট্যকার, গীতিকার। সাহিত্যের কোন প্রাঙ্গনে তাঁর পদচিহ্ন নেই? তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সার্বভৌম কবি। বৈশাখ যেমন আপামর বাঙালির কাছে রবীন্দ্রময় ঠিক তেমন বাংলা সাহিত্য তথা বাঙালীর অপর পরিচয় রবিঠাকুর।

  গল্পগুচ্ছ এর প্রত্যেকটা গল্প যেন সকল মানুষের হৃদয় নিঙড়ানো অনুভূতি। একটা গাছকে নিয়ে কি অনাবিল অনুভব,ভালবাসার আর্তি বলাই না পড়লে বোঝা দায়। পোষ্টমাস্টার ছাড়ি কি করে! রতনের মত মুখচোরা অথচ মনকাড়া কিশোরী এ গ্রামবাংলার আনাচে কানাচে ধুলিধূসরিত প্রান্তে অভিমানে প্রিয় মানুষটির জন্য চোখের জল ফেলে বৈকি! কাবুলিওয়ালার মিনি! আমাদের সকলের ঘরে ঘরে একজন করে মিনি নেই। সেই আধো আধো স্বর,আদরে আবদারের মিনি যখন বড়ো হয়ে যায় বহুদিন পর ছেলেবেলার কাবুলিওয়ালার নিকট একদম অচেনার মত অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকে আর জেল ফেরত কাবুলিওয়ালার বুকের ভিতর ছোট্ট একটা ছবি ভেসে ওঠে নিজের সন্তানের! কেন কাঁদবে না পাঠক! দরদ দিয়ে সমস্ত অপত্য দিয়ে একটার পর একটা সন্তানের মত জন্ম দিয়েছেন এক একটা লেখা। আছে চারুলতা। একলা নারীর একাকি যন্ত্রণা,ভালবাসার আগুনে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ,কিংবা শাস্তির মত তৎকালীন সমাজের নিদারুন প্রেক্ষাপটের দলিল। 
  ভৌতিক গল্পগুলি তিনি লিখেছেন চমকপ্রদ।কঙ্কাল  তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য। 
  সঞ্চয়িতা তাঁর চিরকালের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। ভানুসিংহের পদাবলীর মত কি অপূর্ব পদের ন্যায় কবিতা উপহার পাই আমরা। এতটাই নিটোল এবং কালজয়ী তাঁর ছদ্মনাম হল ভানুসিংহ। সোনার তরী, পুরবী, চিত্রা, কথা ও কাহিনী,খেয়া অভূতপূর্ব কাব্যগ্রন্থ। 
  মহাভারতের কর্ণ ও কুন্তীকে নিয়ে তিনি লিখলেন কর্তকুন্তীসংবাদ। মাতৃহৃদয়ের আকুলতা ও যন্ত্রনা নিঙড়ে কবিতার অক্ষরে লেখা যেন। তিনি যেমন সেযুগের কবি তেমনই তিনি এযুগেরও কবি। সমসাময়িক আধুনিক কবিদের সঙ্গে দাপটের সাথেই লিখেছেন হঠাৎ দেখার সেই লাইন ,"আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে ? কিছুই কি নেই বাকি? 
রাতের সব তারা আছে দিনের আলোর গভীরে !'
কিংবা সাধারণ মেয়ের সেই শব্দবন্ধন ,"আমরা বিকিয়ে যাই মরীচিকার দামে!" 
  কতটা গভীরতা থাকলে এমন করে লেখা যায় । আর হবে নাই বা কেন! তিনি যে কবিদেরও কবি! তিনি তো নিজেই লিখেছেন ,"ওরে নবীন ওরে কাঁচা,আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা!" নিজের নবীন কাঁচা মনের স্বাক্ষর রেখে গেছেন প্রত্যেকটা ছত্রে ! কবিতার জগতে তিনি ঈশ্বর একথা অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই। সামাজিক ছবির কবিতা দুই বিঘা জমি যেন সপাটে চাবুক মারে সমাজের পিঠে। 

  জীবন থেকে মৃত্যু সলিলসাগরের ফেনায় মিশে আছে কবি রবির কবিতা । কি অনায়াসে লিখেছেন ,"আছে মৃত্যু আছে দুঃখ বিরহবেদন লাগে ,তবুও শান্তি ,তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে!" আমরা অনুভব করতে পারি তাঁরই লেখার মাধ্যমে মৃত্যুর চেয়ে কঠিন সত্যি ও নিশ্চিত ভবিষ্যত আর হয় না। জীবন নিয়েও কী অকপট ব্যক্ত করেছেন তিনি ,"অধিক করি না আশা, কিসের বিষাদ 
  জনমেছি দুদিনের তরে ...নাই তোর নাই রে ভাবনা 
এ জগতে কিছুই মরে না " ...সত্যই যা আমরা দিয়ে যাই তাই থেকে যায় এ বিশ্বে। মুঠো ভরে নিয়ে যাওয়ার কিছু তো থাকে না। জীবন ও মৃত্যু নিবন্ধন করে এত সাবলীল উচ্চারণ আর কেউ এমনভাবে লিখেছেন কিনা সন্দেহ । 
  মৃত্যুশোক যতবার পেয়েছেন ,প্রিয়জনকে যতবার হারিয়েছেন চিরতরে ততবার অন্তরবেদনার অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে রচনা করেছেন দূর্লভ সমস্ত সৃষ্টি। পুত্র সোমেন্দ্রনাথকে হারিয়ে সেই রাতেই লিখলেন ,"আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে!" স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকেও হারালেন। আর হারালেন প্রানের প্রিয় কাদম্বরী দেবীকে । লিখলেন ,"আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে...সে চলে গেল বলে গেল না!" তিনি লিখে নিদারুন সত্যি জানালেন যে যায় সে বলে যায় না ,কোথায় যায় সেখান থেকে ফিরেও আসে না কখনো কোনোদিন। অমর তাঁর লেখা ।
উপন্যাসের কথা বলতে গিয়েই মনে পড়ে চোখের বালি। সমাজের রক্তচক্ষুর বেড়ী পরা , নিষিদ্ধ ভালবাসায় জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া নারী চরিত্র বিনোদিনী। কি অসম্ভব প্রাণশক্তি! তাঁর উপন্যাসের প্রতিটি নারী চরিত্র যেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। ঘরে বাইরের বিমলা ,যোগাযোগের কুমুদিনী এবং অবশ্যই শেষের কবিতার লাবণ্য। রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে গোরা দেশপ্রেম, নারীমুক্তি, সামাজিক অধিকারকে যেন জ্বলন্ত উদাহরণকে তুলে ধরেছেন। 
এছাড়াও গীতিনাট্য ,নাটকে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি সর্বত্র। রক্তকরবী, অচলায়তন নাটকের সাহিত্যে স্বনামধন্য।
  আসলে ছোট থেকেই আমরা রবি মননের রবি রশ্মির ওমে সেঁকে নিই নিজেদের চিত্ত।  আনন্দে , দুঃখে , জীবনে ,প্রেমে ,প্রকৃতিতে ,আদর্শে ,পূজায় তিনি ঈশ্বর। দেশ বিদেশের বর্ননাও পাই তাঁর লেখা রাশিয়ার চিঠিতে। স্বদেশপ্রেম ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। তার প্রমাণ পাই তাঁর পাওয়া নাইট উপাধি নির্দ্বিধায় ত্যাগ করে জালিওয়ানা হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যমে । তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। শুধুমাত্র বাঙালি নয় সমগ্র বিশ্ববাসীর কবি তথা সাহিত্যিক ও জাতীয় সঙ্গীতকার তিনি ... তিনি আর কেউ নন তিনি আমাদের প্রাণের কবি ,চিরকালের সাহিত্যিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি