গুচ্ছ কবিতা /শুভশ্রী রায়

গুচ্ছ কবিতা 
শুভশ্রী রায়

প্রশ্ন করি

তুমি কী সবটা আমার, অস্তিত্বের আয়না?
দাঁড়াব সামনে গিয়ে, গা জ্বালানো গয়না!
তুমি কী প্রভু আমার, মুক্তির চেয়েও উঁচু?
হাজার হুকুম তাই নিয়েই আসো পিছুপিছু
তুমি কী শাসক আমার, না গো না মোটেই
খুঁজলে মন এই ধরায় ঈশ্বর উদার জোটেই
কে কাকে শাসন করে, কে ওঠে কার ওপর?
পাল্টে যাবেই যাবে সাবেকি চাপানউতোর।
তুমি বড় জোর বন্ধু ভালো, সঙ্গী দীর্ঘ পথের
চেও না রাজা হ'তে ধুয়ো তুলে বাঁধা গতের। 



বালি বাড়ি

বালির ওপরে নাম লিখি
মুছে দেয় চঞ্চল নীল ঢেউ
ফিরে আসতে চাই কোথাও
ঠিকানা ভাসিয়ে দেয় কেউ।

জীবনের নোনা সমুদ্র গভীর
সমস্ত সুখ আর স্বস্তিই ফেনা
গভীর জলজ এই সাম্রাজ্য
তার কাছে জীবনের দেনা।

বালির ওপরে প্রাসাদ বানাই
সমুদ্র স্বয়ং ধ্বংস করে দেয়
ক্রমশ জীবনের সমস্ত স্বপ্নকে
নিজের ভেতরে টেনে নেয়।

তারপরেও হাতে নিই বালি
ফের গড়তে শুরু করি বাড়ি
জানা কথা, নতুন ভবনটিও
অনন্তের স্রোতে দেবে পাড়ি।



ভন্ড থাকুন মৌন

যৌনতা মন্দ কথা! কোথা থেকে আপনি এলেন?
যৌন মিলন বিনাই নিজের এই শরীর পেলেন?
এ দেহেরই তো অঙ্গ মাথা সব কিছু বোঝে জানে
বুঝেও কী করে সে নিজের উৎসকেই মন্দ মানে?
দেহে হৃদকমল থাকে সম্পদ যার আবেগ ভাঁড়ার
অগুনতি বার ধড়কায়, নেই তার উপায় থামার
থেমে গেলে মরণ আসে, কে জানে তার পরে কী?
যতটুকু সময় আছি, সাধ করে সব দেখি শুনি।
দেহে পাঁচ ইন্দ্রিয় অপূর্ব এই দুনিয়াকে বোঝার তরে
জগৎ-ব্যাপার কিছু কিছু নিয়ে আসে চেতনঘরে।
ধরে রাখে চেতনাকে দেহ-বাড়ি, রহস্যময় কারখানা!
যৌন মিলন বিনা এমন পুণ্য-শরীর ধারণ হয়ই না
দেহ থেকে শুরু তবু দেহ অতিক্রমী সংবেদন যৌন
খোলাখুলি উত্তম না বলতে পারেন, থাকুন মৌন।


রক্তমাংসের কবিতা        

আমি মর্তের নারী, ভালোবাসা না পেয়ে ফুঁসে উঠি
নিজস্ব পুরুষ ভেবে নীল দেবতার পিছু পিছু ছুটি
দু' দু' খানি নয়ন জ্যোৎস্না দিয়ে যতটা পারি ভরি
চাঁদের আলো চেটেপুটে খাই, জ্যোৎস্না পান করি
তার পরেও অবশ্য যেমন শ্যামলা তেমন থেকে যাই
নীল দেবতার পিছু পিছু দ্বাপর থেকে কলিযুগে ধাই
আমি রাধা নই গৌরবর্ণা, নেই কোনো কুটিলা ননদ
সঙ্গে বাস করে না কোনো পুরুষ বা অপুরুষ মরদ
শুদ্ধ কলঙ্ক অর্জন করেছি নীল দেবতার পিছু হেঁটে
পেয়ে যাবে এ নারীকে কাহিনীর স্রোতস্বিনী ঘেঁটে
চির প্রেমিকা রমণী আমি, ভালোবাসায় তুখোড়
যে প্রেম বিরহ উপহার দেয় তার ভাবেতে বিভোর
আমি ভালোবাসার খোঁজে পেরিয়ে যাই রীতিনীতি
প্রেমের পিছু নিতে নেই গো আমার সহজাত ভীতি
আমি বারবার প্রেমে পড়ি, কামনায় অসহ্য জ্বলি
এমন কী দেবতার সাথেও দেহ-মিলনের কথা বলি
আমি মানবী, এই পৃথিবীর রক্ত ও মাংসের নারী
কখনো যেন দেবী হওয়ার লোভে কামকে না মারি
ভালোবাসায় আমি হয়ে যাই একদম উথালপাতাল
মদ লাগে না আমার, ভালোবাসার ঘোরেই মাতাল।



হৃদয়ধর্ম

জ্বলে হৃদয় আগুন বিনাই ধর্মই তার প্রেমে পোড়া
ভালোবাসা ভাঙলে তাকে কী করে যাবে জোড়া!
এই জগতে ক' জন মানুষ চিনে নেবে তোমার হৃদয়
ক' জন মানুষ গাইতে জানে ভালোবাসার বিজয়?
সারা জীবন ঘোরা শুধু ভালোবাসার গোলকধাঁধায়
কাঁটায় ভরা রাস্তা, নিছক কষ্টই তোমার সাথে যায়
যাকে হৃদয় সবটুকু চায় তাকে পাবে কেমন করে?
সে তো ধরে-বেঁধে রাখার নয় যে বলব , 'রেখ ধরে'
কী মায়া! যাকে পাইনি তার জন্য পুড়ে মন হল ছাই
হায়, তার পরেও পোড়া মনের কসম, তাকেই চাই।
চাওয়া পাওয়া, পেয়ে হারানো, জীবন জুড়ে ঘটে
মনের মনই জানে, এ সব কিছু কলঙ্ক নয় মোটে!
আজব-বসত মাঝে কারা পায় ভালোবাসার দাম?
মন রে, বড় মহার্ঘ এ কলঙ্ক, যার ভালোবাসা নাম!


 অঘটন

হৃদয় ফের করেছে ভুল
নিজেই নিজের চক্ষুশূল
বিষাদ থেকে ফুটেছে ফুল।

চোখ ভর্তি এ কার জল?
নিজেকে সিক্ত রাখার ছল
ভালোবাসার স্বল্প বল!

মাটির অন্ধকার নরম
বিরহ ঋতু টানা গরম
কামনা জাগে বেশরম।

কোথায় যাস ভুল হাওয়া
কারো দিকে কেন যাওয়া,
ফুরিয়েও চাওয়া-পাওয়া?

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি