জ্বলদর্চি

ধূমপান মুক্ত দিবসে আজ অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিন/পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

ধূমপান মুক্ত দিবসে আজ অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিন

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী


ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর—এই ধ্রুব সত্যটি মনে করিয়ে দিতে এবং মানুষকে তামাক বর্জনে উৎসাহিত করতে প্রতি বছর মার্চের দ্বিতীয় বুধবার 'ধূমপান মুক্ত দিবস' (No Smoking Day) পালন করা হয়। আজ সেই ধূমপান মুক্ত দিবস। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিন।
ধূমপান মুক্ত দিবস'-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালে আয়ারল্যান্ডে। আয়ারল্যান্ডের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং জনহিতৈষী সংস্থাগুলো একজোট হয়ে ঠিক করেছিল বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনকে 'ধূমপান মুক্ত' হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না,  এই সিদ্ধান্ত আসলে ছিল জনস্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে শুরু হওয়া একটি সংগঠিত জন আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্ব। উদ্যোক্তারা চেয়েছিলেন  ধূমপায়ীরা অন্তত ২৪ ঘণ্টার জন্য তামাক বর্জন করতে উৎসাহিত হোক, যেটি তাদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে যে ধূমপান ত্যাগ করা অসম্ভব কিছু নয়। 
আয়ারল্যান্ডের এই উদ্যোগটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং যুক্তরাজ্যে  ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। 'অ্যাশ' (Action on Smoking and Health - ASH) নামক একটি সংস্থা এই দিনটির প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি ও বেসরকারিভাবে এই দিনটিকে উদযাপন করা হয়। 🍂

প্রথম দিকে এই দিনটি পালিত হতো প্রতি বছর 'অ্যাশ ওয়েডনেসডে' (Ash Wednesday)-তে, যে দিনটি ছিল খ্রিস্টধর্মের একটি বিশেষ ধর্মীয় দিন। কিন্তু পরবর্তীকালে  দিনটিকে কোনো ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের সাথে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বজনীন করার লক্ষ্যে মার্চের দ্বিতীয় বুধবার নির্দিষ্ট করা হয়। ১৯৮৪ সালের পর থেকে প্রতি বছর মার্চের দ্বিতীয় বুধবারেই এই দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ধূমপান মুক্ত দিবস শুধুমাত্র তামাক বর্জনের কথা বলে না, বরং একটি শৃঙ্খলিত, স্বাস্থ্যবান এবং সচেতন জীবনবোধ গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা দেয়। এই দিনটি পালনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অবশ্য  একটি দিন পালনের মধ্যে বা কিছু স্বাস্থ্যগত বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর গভীরে লুকিয়ে আছে মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক এক  পরিবর্তনের আহ্বান। একজন ধূমপায়ীর কাছে সবচেয়ে বড় বাধা হলো তার নিজের আসক্তি। এই দিনটি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, সে চাইলে অন্তত ২৪ ঘণ্টা তামাক ছাড়া থাকতে পারে। এই একদিনের সাফল্য তাকে দীর্ঘমেয়াদী আসক্তি মুক্তির আত্মবিশ্বাস দেয়। ধূমপান ছাড়ার লড়াইটা অনেক সময় একাকীত্বেরও হয়। কিন্তু এই বিশেষ দিনে যখন হাজার হাজার মানুষ একসাথে প্রতিজ্ঞা করে, তখন একজন ব্যক্তি অনুভব করেন যে তিনি একা নন। সমাজ ও পরিবার যখন তাকে তিরস্কার না করে বরং উৎসাহ দেয়, তখন সামাজিক বন্ধনও সুদৃঢ় হয় ও সমাজকে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারার দিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

তামাকমুক্ত সমাজ মানেই একটি সবুজ ও দূষণমুক্ত পৃথিবী। মানুষের ফুসফুস পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি পৃথিবীর বাতাসকে বিষমুক্ত রাখাই এই দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।
একটি বিড়ি বা সিগারেটের ধোঁয়ায় কেবল তামাক পোড়ে না, পুড়তে থাকে মানুষের আয়ু, স্বপ্ন এবং প্রিয়জনদের ভবিষ্যৎ।ধূমপান মুক্ত দিবস আসলে আত্মশুদ্ধি এবং নতুন করে বাঁচার এক অঙ্গীকার। সুস্থ ফুসফুস আর বিষমুক্ত নিশ্বাসের চেয়ে দামী আর কিছুই হতে পারে না। এই দিনটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তখনই সফল হবে, যখন মানুষ একদিনের প্রতীকী বর্জন থেকে বেরিয়ে এসে চিরস্থায়ীভাবে তামাককে 'না' বলতে পারবে। নিজের প্রতি ভালোবাসা আর পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আজই ধূমপানমুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার শপথ নিন।

Post a Comment

0 Comments