ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ৯০

 ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ৯০


সম্পাদকীয়,
বর্ষাকাল মানেই খোকা বায়না ধরে বৃষ্টিতে ভিজবে। এই বায়না নিয়েই ছড়া লিখেছে রূপা আন্টি। আর ঋপণ আঙ্কেল ছবি পাঠিয়ে বলেছে, খোকাদের বায়না কেমন করে পুরণ হচ্ছে দেখ। আমি তো প্রচ্ছদের ছবি দেখে হা। বৃষ্টিতে ভিজে এবার যদি বাচ্চাদুটোর ঠান্ডা লাগে তখন? তখন তো মায়েরই যত জ্বালা। তবে এটা ঠিক, বাচ্চাদুটোর মোরগ লড়াই খেলা দেখে আমারও ভারি আনন্দ হয়েছে। খেলার কথায় মনে পড়ে গেল। মতি নন্দীর নাম। পীযূষ আঙ্কেল তাঁকে নিয়েই এবারে লিখেছেন আর মিহিকা তাঁর প্রতিকৃতি এঁকে পাঠিয়েছে। মতি নন্দী সারাজীবন খেলা নিয়ে লিখে গেছেন। তোমাদের বন্ধু রিয়া আবার কাদা নিয়ে ছোটোবেলায় খেলতে খুব ভালবাসতো। বর্ষাকালে অনেকে আবার মাছ ধরতে যায় পুকুরে, সেই ছবি এঁকে পাঠিয়েছে অনুশ্রুতি। নোবিতা আবার ডোরেমনের সঙ্গে খেলতে ভালবাসে। সেটা ছবি এঁকে পাঠিয়েছে শুভঙ্কর। খেলার গল্প অনেক হল এবার কাজের কথায় আসি।  দেখতে দেখতে ছোটোবেলা ১০০ তম সংখ্যার দিকে এগিয়ে চলেছে। জানিনা এর কোনো নাম আছে কিনা। মুক্তি জেঠু জানলেও জানতে পারেন। এবারে জেঠু তোমাদের জন্য এই নিয়ে একটা দারুণ অজানা নিবন্ধ লিখেছেন। তবে এটা জেনে রাখ, ১০০ তম সংখ্যা এলেই তার সঙ্গে সঙ্গে এসে যাবে শারদীয়া সংখ্যা। ওদিকে জয়াবতীর জয়যাত্রাতেও তৃষ্ণা আন্টি মহালয়ার গল্প বলেছেন। আর ধারাবাহিক ভ্রমণে জয়তী আন্টি ব্যাংককের দুর্গাপুজো নিয়ে লিখে পাঠিয়েছেন। সুতরাং তোমরা সকলে অতি সত্বর পাঠিয়ে দাও গল্প আর ছড়া শারদীয়া ছোটোবেলার জন্য। আঁকা পাঠাতেও ভুলোনা যেন। রথের দিনই তো প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে খুঁটি পুজো হয়, ঠাকুরের বায়না দেওয়া হয়। আর আমরাও শারদীয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। এসো আঁকায় লেখায় উৎসবে মেতে উঠি। -- মৌসুমী ঘোষ।


ধারাবাহিক উপন্যাস
জয়াবতীর  জয়যাত্রা
দ্বাবিংশ পর্ব
তৃষ্ণা বসাক


সাগরজল   
২৬
ডাকাত তুলে নিয়ে গেছিল! আহা গো! ভয়ে আদমরা হয়ে আছে, তবু তার মধ্যেই তেজ ঝলসে উঠেছে।পিতৃপক্ষের আজ শেষ, দেবীপক্ষের শুরু। মহালয়ার দিন যেন স্বয়ং উমা এসে দাঁড়িয়েছেন সবার মাঝে। ঘটিতে দুধ ছিল, সেই খাওয়াতে আস্তে আস্তে চোখ মেলল সে।
‘কী নাম গা তোমার?’
‘উমাশশী’
ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল মেয়ে। জয়াবতীর মনে হল এ নাম আর বদলাতে হবে না।
‘ডাকাত তোমায় কেমন করে ধরলে গা?
পুণ্যি রেগে গিয়ে বলল ‘তোকে কি এখুনি সব শুনতে হবে? দেখছিস তো মেয়েটা কেমন বাঁশপাতার মতো কাঁপছে, ওকে দুদণ্ড জিরুতে দে, আমরা তর্পণ সেরে বাড়িই তো ফিরব, তখন  যত ইচ্ছে কথা বলিস’
পুণ্যির কথার যুক্তি আছে, যদিও জয়াবতীর মনে হল পুণ্যি আসলে ভয় পাচ্ছে এসব গোলমালে তর্পণের লগ্ন না পেরিয়ে যায়। তবে ওর কথার মধ্যে একটা ইশারা ছিল যেটা খুব ভালো লাগল তার। পুণ্যি ধরেই নিয়েছে এই মেয়েটাকে সেনমশাই নিয়েই ফিরবেন, ঘরে ঠাঁই দেবেন, যেমন পেরজাপতিকে দিয়েছেন।  উহহ কি আনন্দই না হবে। কত খেলুড়ে বাড়ির মধ্যেই। পাঁচ পাঁচ জন। সে, পুণ্যি, পেরজাপতি, প্যাঁকাটি আর এই উমাশশী। একে সে উমা বলেই ডাকবে। দেখে মনে হচ্ছে তার থেকে ছোটই হবে। শুধু তার থেকে নয়, সব্বার থেকেই ছোট হবে বয়সে।

কিন্তু তার মাথায় একটা নতুন ভাবনার উদয় হল। এমন কথা আগে কখনো তার মাথায় আসেনি।সেনমশাইয়ের নিজের পরিবার হয়তো পাঁচজন। কিন্তু দাস দাসী অতিথি অভ্যাগত নিয়ে নিত্য দশ পনেরোজনের পাত পড়ে। তারপর তারা দুজন হাজির হয়েছে, সে শুনেছে পিতাঠাকুরের হাজার অনুরোধেও সেনমশাই ওদের খাইখরচ কিছুতেই নিতে রাজি হননি। শুধু কি খাইখরচ?  পরনের কাপড় থেকে ওষুধ পালা কিছুই নেন না। ওঁর কথা হল- তাঁর নিজের মেয়েই তো ওঁরা। তারপর জুটল পেরজাপতি।এবার আবার উমাশশী ! এতজনের ভার কি টানতে পারবেন সেনমশাই?এমন কথা আগে কখনো মাথায় আসেনি তার। এ কথাও মনে হল যে তাকে শিগগির উপার্জন করতে হবে। সেনমশাইয়ের ঘাড়ে এতগুলো মানুষ বসে খাবে-সে হয় নাকি? ওদিকে পিতাঠাকুরেরও তো বয়স হচ্ছে। নিজেরই কেমন অবাক লাগল এসব ভাবনা তার মাথায় আসছে দেখে। সে কি বড় হয়ে যাচ্ছে তবে?
বড় হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা কেমন? ভেবে দেখলে এর মধ্যে খুব বাখানা করার মতো আছেটাই বা কী? এই তো আদুরী বেড়ালের কুচি কুচি বাচ্চা হল, যেন শিমুল তুলোর বল উড়ছে, ফুঁয়ো ফুঁয়ো লোম সারা গায়ে। ছোট থাকলে মনে হয় সারাক্ষণ চটকাই। মার চোখে পড়লে আর রক্ষে নেই। বলবে মেয়েমানুষকে নাকি বেড়াল ঘাঁটতে নেই, বেড়ালের লোম পেটে গেলে আর কোনদিন মা হতে পারবে না। পারবে না তো পারবে না। মা হওয়া ছাড়া কি মেয়েমানুষের কাজ নেই সংসারে? মা হলেই তো একেবারে নাক অব্দি সংসারে ডুবে যায় মেয়েমানুষ। ছেলে ওই পড়ল, ছেলে ওই কাঁদল, দুটো ভাত মুখে দেবার জো নেই, অমনি প্যাঁ প্যাঁ করে কাঁদবে খোকন। দূর, দূর, এই যদি মায়ের জীবন, তবে মা হয়ে কাজ নেই কো। তার মাকে তো কোনদিন গাছে চড়ে পেয়ারা পাড়তে দেখেনি জয়াবতী, গালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে দেখেনি দুপুর বেলা, উটোনে বড় আমগাছটায় কী সুন্দর দোলনা বেঁধেছে জয়াবতী, জীবনে মা চড়েছে সে দোলনায়? সবসময় খালি দেকো হয় রাঁধছে, কি বড়ি দিচ্ছে, কি আমসি শুকুত দিচ্ছে, নয় কাঁথা সেলাই করছে, কিংবা তাদের খাওয়াচ্ছে বা ঘুম পাড়াচ্ছে বা পিতাঠাকুরের বেলের পানা তয়ের করছে। সব কাজই তাদের, পিতাঠাকুরের, এই সংসারের জন্যে। একেবারে নিজের জন্যে , একেবারে এমনি এমনি, নিজের আনন্দের জন্যে বুঝি মায়েদের কিছুই করতে সাধ যায় না? যায় না কি আর? খুব যায়। কিন্তু সে কতা কেউ কোনদিন জানতে পারবে না, এমনকি নিজের পেটের মেয়েও না। কতায় কতায় বলবে মেয়েমানুষ হবে এমন যার বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না! মুখ ফোটে না বলেই তো ধরে ধরে জ্বলন্ত চিতায় ফেলে দিচ্ছে। এমন বোবা মেয়েমানুষ যে গায়ে আগুন লাগলেও চেঁচায় না, ভাবে  দয়ালু ভগমান গায়ে হাত বুলোচ্ছেন। মুখ্যু মেয়েমানুষ এইজন্যেই বলে। ভেবেও দেখে না, এই যে ভগমান, যিনি নাকি  এই পিথিমি তৈরি করেছেন, এতগুলো প্রাণ এনেছেন পিথিমিতে,  মায়ের স্নেহ মমতা তাঁর আছে বলেই তো পেরেছেন। তিনি কি তাঁর একটা সন্তানকেও আগুনে পুড়িয়ে মারতে পারেন? তবু দেকো মেয়েমানুষের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। ঘরের মধ্যে মেয়েমানুষে মেয়েমানুষে ঝগড়া করে মরবে, কিন্তু যেখানে দুটো উচিত কতা কইলে সুসার হয়, সেখানে বেবাক চুপ। হেই ভগমান, এবার থেকে তুমি মেয়েমানুষকে জিভ কেটেই পাটিও, জিভ যখন কাজেই লাগাতে পারল না, ও আপদ আগে থাকতে বিদেয় হওয়াই ভালো। সেই যে কে একজন ছিলেন, খনা, এমন জ্যোতিষ জানতেন যে তাঁর শ্বশুরের কাছে আর কেউ যেত না ভাগ্য জানতে। শুধু কি তাই? মেঘ, বৃষ্টি, মাটির গুণ, কোন সময় কী চাষ করলে কেমন ফসল পাওয়া যায়, তা ছিল তাঁর নখদর্পণে।

যদি বর্ষে মাঘের শেষ
ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ
কিংবা
আউশ ধানের চাষ
লাগে তিন মাস
 
এসব চাষিদের মুখে মুখে ফিরত। রাজ্য জুড়ে যেখানেই কান পাতো, শুধুই খনার নাম। রাজার কানে গেল সে কথা। শ্বশুর, স্বামীর মাথা হেঁট। বাড়িতে পুরুষ ছেলে থাকতে, বাড়ির পরিচয় হবে কিনা একজন মেয়েমানুষের নামে? তাও আবার বংশের কেউ না, বাইরে অন্য বাড়ি থেকে আসা একজন বৌ মানুষ, সে কি সহ্য হয় কারো? তাই যা হবার হল, খনা যাতে আর বচন দিতে না পারে, তার জন্য তার জিভটাই কেটে ফেলা হল। জয়াবতীর কথার জ্বালায় বিরক্ত হয়ে ছোট থেকে মা ওকে খনার গল্প শুনে ভয় দেখাবার চেষ্টা করেছে। এত কথা বললে তোর একদিন জিভ কেটে নেবে সবাই। মা যাই বলুক, জয়াবতী কোনদিন ভয় পায়নি সে কথা শুনে। উল্টে সে পিতাঠাকুরের কাছে গিয়ে যাচাই করতে চেয়েছে এ গল্পের সত্যতা, সত্যিই খনা বলে কেউ ছিল কিনা, সত্যিই তার জিভ কাটা হয়েছিল কিনা। পিতাঠাকুর অবাক হয়েছেন মেয়ে এত খুঁটিয়ে এসব কথা জানতে চাইছে দেখে। এমনিতে জয়াবতীর সঙ্গে পুথির কোন সম্পর্ক ছিল না। সে শুধু  খুব যত্ন করে পুথি লেখার কালি তয়ের করে দিত, ব্যস। শুখনো পুথি পড়া পণ্ডিত হবার বাসনা তার কোনদিন ছিল না। তবু সে খনার গল্প শুনেছিল মন দিয়ে, আর শুনতে শুনতে তার মনে একটা কথা স্পষ্ট হয়েছিল। মেয়েমানুষের জিভকে এই সমাজ সংসার খুব ভয় পায়। তারা যত পোষা পাখির মতো শেখানো মিস্টি মিস্টি বুলি আওড়াবে, তত সবার আমোদ। ইস, সব্বাইকে অত আমোদ দিতে ভারি বয়ে গেছে তার। এই মুহূর্তে ভীষণ জরুরি একটা কাজ তার মাথায় নড়ে উঠল। সে পুণ্যিকে বলল ‘এক দণ্ড দাঁড়ালে তোর তর্পণের কিছু যায় আসবে না। এমন তো না যে তেনারা না খেয়ে আছে। তোদের  তর্পণের থেকেও ভারি দরকারি একটা কাজ আছে। দাঁড়া দিকি’
পুণ্যি ভেবলে গিয়ে বলল ‘কী কাজ শুনি?’
ততক্ষণে জয়াবতী একটা কাঁসার রেকাবিতে নাড়ু আর বাতাসা সাজিয়ে ফেলেছে, তাতে দুটো ফুলও রেখেছে, একটা নতুন গামছাও বের করে ফেলেছে পুঁটলি থেকে। ঘাটে নেমে ছোট চুমকি ঘটি করে গঙ্গাজলও নিয়ে এল হুড়মুড়িয়ে। সেনমশাই খুড়িমা ঠাকমা অবাক হয়ে দেখছে কী করছে মেয়েটা। পুরুত ঠাকুর বিরক্ত গলায় বলল ‘ও কবরেজ মশাই, বলি তর্পণের লগ্ন বইয়ে কি কাজ করবেন নাকি?’
সে কথাও হজম করার পাত্রী নয় জয়াবতী। সে খরখরে গলায় বলল ‘ লগ্ন অমনি বয়ে গেলেই হল। এখনো মেলা সময় আছে। আপনি বকবক করে মাতা খাবেন না। আমার কাজটা দেকুন দিকি চুপ করে’
পুরুত তো অবাক। এমন মুখরা মেয়েমানুষ জন্মে দেখেননি তিনি। সেনমশাই ইশারায় চুপ করতে বলেন তাঁকে। সবাই দেখে নতুন গামছার ধারের সুতো ছিঁড়ে ডাকাতের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া মেয়েটার হাতে বেঁধে দেয় জয়াবতী। গায়ে একটু জল ছিটিয়ে দেয়। মুখে একটা নাড়ু গুঁজে বলে ‘আজ থেকে তোতে আমাতে সই পাতালাম। সাগরজল সই’
‘সাগরজল!’ কেমন এক বিস্ময় খেলে  যায় সবার মুখে চোখে। পুণ্যির বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সে বলে ‘সাগরজল তুই কোনদিন চোখে দেকিচিস নাকি?’
‘গঙ্গাও কোনদিন দেকিনি, আজই পেত্থম। তবু তুই আমার গঙ্গাজল। তেমনই এই সাগরজল পাতিয়ে আমি একদিন ঠিক সাগর দেকতে পাব। শুধু আমি না, আমি মা, খুড়িমা, ঠাকমা, আর তোদের সব্বাইকে সাগর দেখিয়ে আনব, ছিখেত্তর ঘোরাব।এই মা গঙ্গা সাক্ষী রইল। হেই মা গঙ্গা, যদি কোনদিন এই পিতিজ্ঞের কথা ভুলে যাই, তুমি মনে করিও মা’   সবাই অবাক হয়ে তাকায় জয়াবতীর দিকে, পুণ্যি বলে ‘হায় হায়, মা গঙ্গা আবার কী করে মনে করাবে?’
‘কেন স্বপ্নে দেখা দিতে পারে না বুঝি? ওই দেখ কত শুশুক মাথা তুলচে আবার ডুবে যাচ্ছে, তেমনই মাতার মধ্যে সব স্মৃতি শুশুকের মতো ভেসে উটবে’
‘আহা আহা
গঙ্গার শুশুক সম
উদিবে স্মৃতি মম
সার্থক এ জনম-’
সবাই চমকে যায় শুনে। কে, কে বলল এই পদ?এ যে কবিতা!
উমাশশী! এই নতুন মেয়েটা কবিতা রচনা করতে পারে!  জয়াবতী ওকে জড়িয়ে ধরে বুকে। একটু আগে ও ভাবছিল নতুন কোন সাথী আসবে তার জীবনে! সে যে এত গুনী হবে, তা কে ভাবতে পেরেছিল? পুণ্যি ভালো, পুথি পড়া পণ্ডিত সে, কিন্তু পুথির বাইরে অন্যরকম করে সে ভাবতেই পারে না।আর পেরজাপতি তো সবসময় ভয়ে লুকিয়ে থাকে, আর পানু সারাক্ষণ তিড়িংবিড়িং করে লাফায়, ওর মনের খবর পায়নি জয়াবতী। কিন্তু এই নতুন মেয়েটা, যেন ধুলোর নিচে পড়ে থাকা অমূল্য মানিক, তার তেজ কেউ ঢাকতে পারছে না।
সে উমাশশীর হাত ধরে বলে ‘তুই ছড়া কাটতে পারিস? ভারি সুন্দর তো রে!’
ওকে ধরে উঠে দাঁড়ায় উমাশশী। বলে ‘আমিও যাব তো ছিখেত্তর, ও সাগরজল? তার আগে ডাকাতদের ডেরায় যেতে হবে। ওখানে আরো মেয়েদের আটকে রেকেছে ওরা’। ( ক্রমশ)



জুবিলী

মুক্তি দাশ

কোনো বিশেষ উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় ঘটনার বিভিন্ন সংখ্যক বর্ষপূর্তিকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন নামে চিহ্নিত করে থাকি। যেমন কোনো স্মরণযোগ্য ঘটনার পঁচিশতম বর্ষপূর্তিকে আমরা বলি, সিলভার জুবিলী বা রজত-জয়ন্তী। পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তিকে বলি গোল্ডেন জুবিলী বা সুবর্ণ-জয়ন্তী। তেমনি ষাটতম বর্ষপূর্তি হলো ডায়মন্ড জুবিলী বা হীরক-জয়ন্তী। আর সেইভাবে পঁচাত্তরতম বর্ষপূর্তিকে প্লাটিনাম জুবিলী নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই ধরণের নামগুলি বহুল প্রচারিত ও ব্যবহত বলেই আমাদের সকলের জানা।

কিন্তু অনেকেরই বোধহয় জানা নেই যে, যে-কোনো স্মর্তব্য ঘটনার বিভিন্ন বর্ষপূরণের আলাদা আলাদা নাম রয়েছে – যা প্রায়শই ব্যবহৃত হয়না। সেকথায় পরে আসছি। তার আগে ইংরেজিতে   ‘জুবিলী’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত দিকটা একবার দেখে নেওয়া যাক।

মূলত, ‘জুবিলী’ (Jubilee) শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘জুবিলিয়াস’ (Jubilaeus) থেকে। হিব্রুভাষায় ‘ইয়োবেল’ (Yebel) বা ‘ইয়োভেল’(Yobhel) নামে একটি শব্দ আছে। ইয়োভেল শব্দটির অর্থ ভেড়া বা মেষ। ভেড়ার শিং দিয়ে নির্মিত হতো একপ্রকার মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট যার নাম ‘শোফার’ (Shofar)। পবিত্র উৎসবের দিনটি ঘোষণা করা হতো এই শোফার বাজিয়ে। দেশবাসীর উদ্দেশে শোফার বাজিয়ে ঘোষণা করা হতো এইজন্যে যে, সবাই যেন প্রার্থনাসভায় যথাদিনে ও যথাসময়ে উপস্থিত থাকে। এর থেকেই ‘জুবিলিয়াস’ (Jubilaeus)। একটি স্মরণীয় ঘটনা বা উৎসবের দিনটি সম্পর্কে সচেতন করা। এইভাবেই 'জুবিলিয়াস' থেকে 
‘জুবিলী’ শব্দটি ক্রমে একসময় সারাবিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করলো।

এইবার পরিচিত হয়ে নেওয়া যাক নানারকম বর্ষপূর্তির নামের সংগে –

প্রথম বর্ষপূর্তি – পেপার জুবিলী
দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি – কটন জুবিলী
তৃতীয় বর্ষপূর্তি – লেদার জুবিলী
চতুর্থ বর্ষপূর্তি – লাইনেন জুবিলী
পঞ্চম বর্ষপূর্তি – উড জুবিলী
ষষ্ঠ বর্ষপূর্তি – আয়রণ জুবিলী
সপ্তম বর্ষপুর্তি – উল জুবিলী
অষ্টম বর্ষপূর্তি – ব্রোঞ্জ জুবিলী
নবম বর্ষপূর্তি – কপার জুবিলী
দশম বর্ষপূর্তি – টিন জুবিলী
একাদশ বর্ষপূর্তি – স্টীল জুবিলী
দ্বাদশ বর্ষপূর্তি – সিল্ক জুবিলী
ত্রয়োদশ বর্ষপূর্তি – লেস জুবিলী
চতুর্দশ বর্ষপূর্তি – আইভরি জুবিলী
পঞ্চদশ বর্ষপূর্তি – ক্রিস্টাল জুবিলী
সপ্তদশ বর্ষপূর্তি – টার্কোয়াইজ জুবিলী
অষ্টাদশ বর্ষপূর্তি – ল্যাপিস জুবিলী
বিংশ বর্ষপূর্তি – চায়না জুবিলী
পঞ্চবিংশ বর্ষপূর্তি – সিলভার জুবিলী
তিরিশতম বর্ষপূর্তি – পার্ল জুবিলী
পঁয়ত্রিশতম বর্ষপূর্তি – কোর‌্যাল জুবিলী
চল্লিশতম বর্ষপূর্তি – রুবি জুবিলী
পঁয়তাল্লিশতম বর্ষপূর্তি – স্যাফেয়ার জুবিলী
পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তি – গোল্ডেন জুবিলী
পঞ্চান্নতম বর্ষপূর্তি – এমার‌্যাল্ড জুবিলী
ষাটতম বর্ষপূর্তি – ডায়মন্ড জুবিলী
পঁয়ষট্টিতম বর্ষপূর্তি – ব্লু-স্যাফেয়ার জুবিলী
পঁচাত্তরতম বর্ষপূর্তি – প্লাটিনাম জুবিলী
আশিতম বর্ষপূর্তি – ওক-ওয়েডিং জুবিলী

এরকম আরো আছে বা থাকতে পারে। তবে আপাতত সেগুলি এই প্রতিবেদকের সংগ্রহসীমার বাইরে।



খোকার বায়না 

 রূপা চক্রবর্ত্তী 
 
 বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর 
 কচু পাতার 'পরে ,
 রয় না খোকার পড়াতে মন 
 রয় না আপন ঘরে | 

 মুখ বাড়িয়ে জানলা দিয়ে 
 তাকায় কচুর বনে ---
 কোলাব্যাঙে গান ধরেছে 
 খেয়াল খুশি মনে |

 সোনাব্যাঙে ঢোলক বাজায় 
 ঝুনঝুনিতে টিয়া ,
 ভেজা চড়ুই উড়ে বলে 
 আজ শেয়ালের বিয়া |

 বায়না করে সেজে খোকা 
 ছাতা মাথায় দিয়ে ---
 দেখতে যাবে  মায়ের সাথে 
 শেয়াল মামার বিয়ে |


ছোটোবেলা
রিয়া মন্ডল
নবম শ্রেণী
জওহর নবোদয় বিদ্যালয়
পশ্চিম মেদিনীপুর

আবার আমি চাই  সে  পেতে ছোটোবেলা
যেখানে নেই পড়াশুনো শুধুই আছে খেলা।


রোজ বিকেলে খেলতে বসে রাধতাম আমি ভাত
ধুলো বালির মিথ্যে খাবার খেতাম সারা রাত।



চারিদিকে ঘুরে ঘুরে নিতাম কাদার খোজ
কাদার পুতুল গড়তে দিতাম ঠাম্মুকে রোজ রোজ।


হঠাৎ করে খেলার মাঝে যখন ডাকে মা
এখন আমি খেলা ছেড়ে কোথাও যাবো না।


আর তো এখন পাই না সেসব পুতুল গড়ার খেলা
আবার আমি চাই সে  পেতে সেই ছোট্ট বেলা।


এইভাবে কাটত  মোদের শৈশবের দিনগুলি
কাদামাখা দিনগুলো সব কি করে যে ভুলি?


ধারাবাহিক ভ্রমণ
ব্যাংককের দুর্গাপুজো

জয়তী রায়

 পুজোর আছে গভীর নিবিড় অর্থ। বিশেষকরে দুর্গাপুজো। দেশে বিদেশে যেখানে যত বাঙালি আছে দুর্গাপূজার মহালগ্নে মেতে ওঠে উৎসবে , আলোর মত ছড়িয়ে পড়ে মন্ত্র। ভুলিয়ে দেয় সমস্ত দুঃখ। সৃষ্টি করে নতুন এনার্জির। নতুন করে বেঁচে উঠতে শেখায় দেবীশক্তি। ইয়া দেবী সর্ব ভূতেষু / শক্তি রুপেনু সংস্থিতা

  কোথায় আছে এমন মন্ত্র? যা উচ্চারণ মাত্র ধমনীতে ফুটে ওঠে নতুন প্রাণ? নতুন ভাবনা? নতুন শক্তি?


 ২
    
প্রতিটি দুর্গাপূজা জন্ম দেয় আলাদা আলাদা গল্পের। সে গল্প কখনো রূপকথা কখনো চুপকথা। পুজো থাকে, দেশ বদলে যায়, দেশ বদলে যায়, গল্পের মধ্যে আসে নতুন চমক। আজ আমরা তেমন এক গল্প বলব। থাইল্যান্ড তথা শ্যামদেশের গল্প। ব্যাংককের কিছু জন বাঙালি আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরবে এমন এক সংস্কৃতির কথা, যা থেকে বুঝতে পারবেন, ব্যাংকক সুদু নাইট ক্লাব নয়, ফুর্তিতে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা নয়, এখানেও প্রদীপ জ্বলে, ফুলে ফুলে সাজিয়ে তুলে আরাধনা করা হয় দেবী দুর্গার।

 
  
     এখানে  একটাও শিউলি গাছ নেই। নদী আছে। কাশফুল নেই।  নেই তো নেই!  যা আছে তাই কম কি! আছে নীল আকাশ। সাদা মেঘ আর সেই এক আশ্চর্য আলো, যে আলো কেবল শরতকালের নিজের সম্পত্তি। ঘরে জানালায়, বারান্দার টবে , লুটোপুটি খেতে খেতে আলো বলে , এসে গেছি। মন খারাপ ছুঁড়ে ফেলে সেজে ওঠো এবার। সেই আলোতে ব্যাংকক সেজে ওঠে, আর জন্ম হয় নতুন গল্পের। নতুন রূপকথার। 


    ৩

 সে সাজে বটে ব্যাংকক। একটাই বাঙ্গালী পুজো। হই হই রৈ রৈ করে এলাহি প্রস্তুতি শুরু হয়। মূর্তি থেকে পুরোহিত  , মহিলা পুরুষের সাজ পোশাক থরে বিথরে আসতে থাকে কলকাতা থেকে।  ব্যাংকক তো আর আমেরিকা নয় , যে, কলকাতা আসতে গেলে  হাজার হাঙ্গামা পোয়াতে হবে। টুক করে আকাশে উড়াল দাও আর ফুক করে পৌঁছে যাও, তারপর সারাদিন বাজার ঘুর ঘুর , শাড়ী রে, টিপ রে, দুল রে___কিনে কেটে আবার পাখা মেলো। পাঁচদিন পাঁচরাত সাজ। সকালে একরকম। রাতে আরেকরকম। ছবি উঠবে। চার পাঁচ ক্যামেরা রেডি। কলকাতায় যায় বলে কেউ যেন ভেবো না, ব্যাংককে শাড়ী বা সালোয়ার মেলে না। স অ ব  মেলে। পহুরাত  _এক জায়গা। যেখানে ইন্ডিয়ার সব মিলবে। দামটা কেবল দুই গুণ। আর দেখতেও চড়া গোছের।  পোষায় না। 
     সেই সময় নবরাত্রি  শুরু হয়। অনেকগুলো অঞ্চল আলোয় আলোয় সেজে ওঠে।  সিলোম...নামে, এক জায়গার রাস্তা জুড়ে কালী গণেশ শিব দুর্গার বড় বড় মূর্তি। লোকের ঢল নামে সেখানে। রাতের বেলায় দলে দলে থাই নারী পুরুষ আসে। পুজো দেয়। কি উৎসাহ। কি ভক্তি। কি নিষ্ঠা। আবেগের জোয়ারে ভেসে যায় , ভাষার বাধা, সংস্কারের বাধা। তোমারও যা , আমারও তাই। ভেদ নেই। না ধর্মে। না মানুষে। ভেদ শুধু চিন্তনে। অসুররূপী নেতিবাচক চিন্তা বর্জন করে, ইতিবাচক চিন্তার আলোয় সাজানোর প্রয়াসের নাম হল পূজা। নতুবা মূর্তি বলো সাজ বলো সব অর্থহীন। 

      
  ৪

পুজো তো শুধু পাঁচদিনের জন্য হয় না। তিনমাস ধরে তার প্রস্তুতি চলে। অফিসে যারা কট্টর সাহেব, বিরাট বিরাট দায়িত্ব পালন করে, তারাই আগমনীগানের প্র্যাকটিস করছে গম্ভীর হয়ে। নাটকের কঠিন কঠিন বাংলা শব্দ ইংরেজি অক্ষরে লিখে নিয়ে দুলে দুলে মুখস্থ করছে। নাটকের দিন,  কুশী লবের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রম্পটারের। সে দিন তাদের দেমাক কত! অভিনেতা অভিনেত্রীদের লাইন ধরিয়ে দিতে গিয়ে প্রম্পটারের কি কায়দা! সে এক মজা বটে। 
ছোটদের / বড়দের ... কত যে প্রোগ্রাম। আমরা সকলেই সেগুলো পরিচালনা, মেকাপ, স্টেজ সাজানো করতাম। ব্যাংকক এবং ভারতী বাঙালি ক্লাব বিশ্বাস করত না বাইরের ট্যালেন্ট খুঁজে আনতে, তারা নিজেদের মধ্যে থেকেই প্রতিভা খুঁজে দারুণ সমস্ত প্রোগ্রাম উপহার দিত। 

 সবচেয়ে মজার ছিল , রিহার্সাল। ঘুরে ঘুরে প্রত্যেক বাড়ি হত, আর এলাহী খাওয়া দাওয়া। মনে রাখতে হবে, মিষ্টি পযর্ন্ত বাড়িতে তৈরি করা। 
রিহার্সালের আনন্দ সাংঘাতিক। বাড়ি একেবারে গম গম করত। 
এই প্রসঙ্গে হয়ে যাক এক আনন্দের গান।

  ৫

 তবে যত যাই হোক, বিসর্জনের মত উত্তেজনা আর কোনোদিন নেই। ভারতী ক্লাবের বাঙ্গালীরা উত্তম মধ্যম খেটে খুটে পরিশ্রম করে পকেট খালি করে অর্থ দিয়ে পুজোটা দাঁড় করায়, বিসর্জনের দিন , চোখের জল আর ধরে রাখা যায় না। সক্কলের মন খারাপ।  তবু যেতে তো হবে। চল দুগ্গি জলের তলে/ ফিরে আসিস মায়ের কোলে/ চল দুগগি হিমালয়ে/ নিজের পতির আশ্রয়ে।।
   মিষ্টি শান্ত আর আদুরে নদী হল ছাও প্রা। তার বুকের উপর দিয়ে তর তর করে বয়ে চলছে দুটো নৌকা। থেকে থেকে উঠছে জয়ধ্বনি__বলো বলো দুগ্গা মাই কি । আসছে বছর আবার হবে। সে এক ব্যাপার বটে। মাঝনদীতে ব্যালান্স রেখে, মাকে বিসর্জন দিয়ে, জল ছিটিয়ে__ফিরে এসে, মিষ্টি মুখ। গলা জড়াজড়ি আরো কত কি। 
( গান)
      শিউলি গাছ নেই তো কি হল? মনের বাগানে শিউলি ফুটলেই হল। দেশে নেই তো কি হল? ভালোবাসার অমোঘ টানের জোয়ার ঘুচিয়ে দেবে দেশ বিদেশের ফারাক। 
  

কত ঘটনা ঘটল। বিপর্যস্ত হয়ে গেল ব্যাংকক।  এবারের পুজো নিয়ে আসবে কেমন গল্প? গল্পের তো মৃত্যু হয়না। তবে সে রূপকথা হবে না কি চুপকথা? সে কথা কেউ জানে না। প্রার্থনায় থাকি, অপেক্ষায় থাকি, মা এসো মা, কাটিয়ে দাও সব সংকট। ফিরিয়ে দাও প্রাণ।


স্মরণীয়
(মতি নন্দী)
কলমে - পীযূষ প্রতিহার


   বাংলা সাহিত্যের জগতে মতি নন্দী তাঁর খেলাধূলা নিয়ে অসাধারণ সব লেখার জন্য বিখ্যাত। ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করলেও বাংলায় খেলাধূলাকে বিষয় করে সাহিত্য সৃষ্টির জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর আগে এ বিষয়ে বাংলায় খুব একটা উল্লেখযোগ্য লেখা কিছু ছিল না। মতি নন্দী উত্তর কলকাতার তারক চ্যাটার্জী লেনে ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন চুনিলাল নন্দী ও মা ছিলেন মলিনাবালা দেবী। তাঁর স্কুলের খাতায় নাম ছিল মতিলাল নন্দী। তিনি স্কটিশ চার্চ স্কুল থেকে ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন।

 ১৯৫০ সালে আই এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর যথাক্রমে ১৯৫১ সালে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিপ্লোমা অর্জন করেন এবং ১৯৫৭ সালে মনীন্দ্র চন্দ্র কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে স্টেট ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির এপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ শুরু করলেও তা বেশিদিন করেননি। ১৯৬৯ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর এই পেশায় ছিলেন। শেষের দিকে আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া বিভাগের সম্পাদক হিসেবেও সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি কলকাতা স্পোর্টস জার্ণালিস্ট ক্লাবের সভাপতি ছিলেন বেশ কিছুদিন।

    সাহিত্য সৃষ্টিতে গোড়া থেকেই অত্যন্ত গোছানো ও খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি। সাহিত্য রচনা বেশ কিছু বছর ধরে করলেও ১৯৫৬ সালে প্রথম ছোটোগল্প প্রকাশিত হয় 'দেশ' পত্রিকায় 'ছাদ'। ঐ বছরই 'পরিচয়' পত্রিকায় 'চোরা ঢেউ' নামে অন্য একটি গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৫৮ সালে 'শারদীয়া পরিচয়' পত্রিকায় মতি নন্দীর লেখা গল্প 'বেহুলার ভেলা' ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তাঁর রচিত বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাস হল - 'কোনি', 'নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান', 'দূরদৃষ্টি', 'ছায়া', 'সাদা খাম' প্রভৃতি। শিশু কিশোরদের জন্যও লিখেছেন অসাধারণ সব জনপ্রিয় উপন্যাস ও গল্প। তাঁর রচিত কয়েকটি বিখ্যাত শিশু সাহিত্য হল- 'স্ট্রাইকার', 'স্টপার', 'ননীদা নট আউট', 'অপরাজিত আনন্দ', 'কলাবতী সিরিজ', 'বুড়ো ঘোড়া', 'শিবা' প্রভৃতি। মতি নন্দীর লেখা বিখ্যাত কয়েকটি গল্প সংকলন হল- 'বেহুলার ভেলা', 'নির্বাচিত গল্প', 'শ্রেষ্ঠ গল্প', 'গল্পসংগ্রহ', 'আম্পায়ারিং' ইত্যাদি। প্রবন্ধ সাহিত্যেও তিনি খেলাধূলাকে জুড়ে নিয়েছেন আপন ভালবাসায়। তাঁর লেখা কয়েকটি বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন হল- 'খেলার যুদ্ধ', 'ক্রিকেটের আইনকানুন', 'ক্রিকেটের রাজাধিরাজ' ইত্যাদি। ক্রীড়া বিষয়ক ছাড়াও মতি নন্দীর লেখার মধ্যে রয়েছে সামাজিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর লেখায় উত্তর কলকাতার নগর জীবনও স্থান পেয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্র হিসেবেও প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্যে 'কোনি' এবং 'স্ট্রাইকার' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'ফাইট কোনি, ফাইট' - সংলাপটি তো খেলাধূলার জগতে ভীষণভাবে ব্যবহৃত হয় উৎসাহদানের জন্য। 

    মতি নন্দী ১৯৭৪ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য আনন্দ পুরস্কার পান। তাঁর লেখা 'সাদা খাম' উপন্যাসের জন্য ১৯৯১ সালে সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০০০ সালে শিশু কিশোর সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য 'বাংলা একাডেমী' পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'শরৎ স্মৃতি' পুরস্কার পান ২০০২ সালে।

      ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি এই মহান স্রষ্টার জীবনাবসান হয়।


পাঠপ্রতিক্রিয়া

(ছোটোবেলা ৮৯ পড়ে দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে যা লিখলেন।)

জ্বলদর্চি  ছোটবেলার বিশেষ সংখ্যা ৮৯ আসার পরে সেটি আগাপাশতলা পড়ে ফেললাম। কারণ পত্রিকাটি আমার ভীষণ ভালো লাগে। ছোটবেলা লেখা থাকলেও আমাদের বড়দেরও পড়তে বেশ ভালো লাগে কারণ বড়দের মধ্যেও তো একটা ছোটবেলা লুকিয়ে থাকে।

প্রথমেই বলি ফটোগ্রাফি অত্যন্ত সুন্দর, মৃণাল ঘোষের তোলা। কলকাতায় এখনো দেখা যায় মানুষের টানা রিক্সা যা আমাদের নস্টালজিক করে তোলে।
ধারাবাহিক "জয়াবতীর জয়যাত্রা" তে দেখি জয়াবতীর সাহসী কথা। সত্যি তো আগুন দেবতা হলে তা কখনোই পুড়িয়ে মারত না, দেবতার সন্তান তো আমরা। এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের "বিসর্জন" নাটকের রঘুপতি পুরোহিত ও ভিখারিনী বালিকা অপর্ণা র কথা মনে পড়ে গেল।
ছোট্ট মেয়ে অষ্টম শ্রেণীর শ্রীপর্ণা ঘোষের আঁকা ছবিটিও বেশ সুন্দর।
এরপরে বন্দনা সেনগুপ্তের "জুটি" গল্পে দেখি কালু-ভুলু অর্থাৎ একটি বছর বারো ছেলে আর কালো রঙের নেড়ি কুত্তার এক সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
এরপরে আছে মিষ্টি মেয়ে স্নেহা দাসের আঁকা একটি নৌকার ছবি, যেন এই পত্রিকাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেই কথায় বলছে।
তারপরই অদ্রিজা সাঁতরার  লেখা একটি সুন্দর কবিতা সেখানে সে আগের দিনের সঙ্গে এখনকার পরিবেশের পার্থক্য খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছে।
তারপরে আবার একটি ছোট্ট বন্ধু জয়দীপ সাহারা  আঁকা একটি গ্রাম্য পরিবেশের ছবি যা মন ভরিয়ে দেয়।
এরপর দেখি নবম শ্রেণীর ছাত্র অঙ্কিত ঘোষের লেখা এক কল্প বিজ্ঞানের গল্প সেখানে অঙ্কিত একটি ভালো মেসেজ দিয়েছে, এটি পড়ে মন ভরে গেল। এইটুকু বাচ্চা এত ভাবতে পারছে গাছের জন্য, পরিবেশের জন্য, আর আমরা বড়রা তা বাস্তবে পরিণত করতে পারছি কই!

এরপরেই জয়তী রায়ের লেখা ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনীতে এবারে শ্যাম দেশ তথা থাইল্যান্ডের কথা উঠে এসেছে, প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি আমিও থাইল্যান্ডে ২০০৭ এবং ২০০৯ দুবার গেছি, এক সুন্দর দেশ সুন্দর সংস্কৃতি। তবে লেখিকা ওখানে অনেক দিন আছেন । তিনি সেখানকার ঘুমন্ত রাজ্যের কথা বলেছেন এবং সুমেরু মাউন্টেন প্যালেসের মত এক অদ্ভুত জায়গার কথাও তিনি বলেছেন। তার বর্ণনা  এত সুন্দর মনে হয় যেন আমরা চোখের সামনে দেখছি।

স্মরণীয় ধারাবাহিকে পীযূষ প্রতিহার এক সুন্দর প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে খুব সুন্দর বিশ্লেষণ করেছেন।

সবশেষে বলি মাননীয় সম্পাদক মহাশয়া মৌসুমী দি (ঘোষ) এর জন্য পত্রিকাটি দিন দিন অলংকরণে ও আঙ্গিকে খুব সুন্দর হয়ে উঠছে। "জ্বলদর্চি" র শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।

পাঠপ্রতিক্রিয়া -২
(জ্বলদর্চি ছোটোবেলা ৮৯ পড়ে অসীম হালদার যা লিখলেন) 

প্রতি সংখ্যার নতুন নতুন প্রচ্ছদ দিয়ে সাজিয়ে তোলা ওয়েব পত্রিকাটির সাথে সখ্যতা বহুদিনের। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের এখন কত্তো পড়াশুনোর চাপ! শুধু কি পড়া, কোচিংএও দৌড়াতে হচ্ছে রুদ্ধশ্বাসে। তারপর তো লেগেই আছে ক্লাস টেস্ট। সেখান থেকে তোমরা যেভাবে সৃজনমূলক কাজকর্মেও সময় দাও, তা অবশ্যই তোমাদের নিজস্ব প্রতিভা। তাও কেমন বকাবকিও খেয়ে যাও বাবা মায়েদের কাছে, তাই না! আরে জানি রে বাবা। আমিও তো আমাদের বাড়িতে সেইরকম এক আধটু করে থাকি তোমাদের বন্ধুদের সাথে। ব্যস্, তারপর একটু রাগ, অভিমান আর কি। আবার কিছুক্ষণ বাদে যেই কি সেই। তোমাদের কর্মকাণ্ড কিন্তু সেই চলছেই। আর তাতেই আমাদের আনন্দ, তোমাদের খুশি। 

জানতে পারলাম যে মৃণাল আঙ্কেলের পাঠানো এবারের প্রচ্ছদের ছবিটা দেখে তোমাদের কষ্ট হচ্ছে। হবে নাই বা কেন ... টানা রিক্সায় চালকের হাঁটা বা দৌড়ানোর গতির ওপরেই নির্ভর করে কোন জায়গায় পৌঁছানো। গায়ে একটা স্যাণ্ডো গেঞ্জি, লুঙ্গিটাকে ভাঁজ করে খালি পায়ে সাধারণতঃ যাঁদের এখনও দেখা যায় কোলকাতার কিছু নির্দিষ্ট এলাকায়, তাঁদের কথা নিয়ে লেখা কাহিনী তো আমার পড়া নেই। তোমাদের সন্ধানে যদি থাকে, আমায় জানিও। কাঁধে রাখা গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে আরোহীকে নিয়ে দৌড়ে চলা মানুষটির দৃষ্টি থাকে কত তাড়াতাড়ি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবে। দক্ষিণ কোলকাতার বালিগঞ্জ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে একবার এই রিক্সায় চড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। কারণ তখন সময় কম, সময়ে পৌঁছাতে না পারলে প্রেয়ার লাইনে ঢোকা যাবে না। বুঝতে পারি, কত জোরে সেই চালক রিক্সা নিয়ে দৌড়েছিলেন, যার জন্য সেদিন স্কুল করা সম্ভব হয়েছিলো। পারিশ্রমিক হিসাবে যা দেওয়া হয়েছিল, তার চাইতে প্রয়োজন মিটেছিলো অনেক বেশি। এটা স্বীকার না করলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। তবে কি জানো তোমরা, এই ছবিটা দেখে আমার দুঃখটা অন্য কারণে লাগছে। আমরা তো এখন দৌড়ানোর গতি বলো, মাধ্যম বলো, সবকিছুতেই এগিয়ে যাচ্ছি। পাশে, পিছনে কে বা কারা পড়ে থাকলো, তাদের পানে চাইছি না। তাই এখন নিজের প্রয়োজনমতো গাড়ি পেয়ে যাচ্ছি হাতের এক চুটকিতে। ফলে তাঁদের দৌড়ানোর গতির ওপর আর ভরসা করতে হচ্ছে না, পয়সার ভারে দর কষাকষির ঝামেলাও ভোগ করতে হচ্ছে না। বলা যেতে পারে, তাঁদের প্রয়োজনীয়তা দুরন্ত গতির কাছে ম্রীয়মান হয়ে পড়ছে নিয়ত। ট্র্যাজেডি সেখানেই। সেই ভাবনায় মন তাই ভারাক্রান্ত।

সৃজন নিয়ে এবার দু চার কথা। শুরু করতে চাই বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে। সায়নীর আঁকা ছবির প্রসঙ্গে বলতেই হয়, এই মহাপুরুষের ছবি এঁকে প্রমাণ করে দিয়েছে যে আজও ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে এই প্রজন্মের কচিকাঁচারাও কতখানি আবেগপ্রবণ। বিশেষ করে একটি কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায় আমার কথা, প্রতি সংখ্যাতেই পীযূষবাবুর কলমে উঠে আসা বিভিন্ন মনীষীদের কথা। এবারের সংখ্যায় যেমন, বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে লেখাটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৮৪ বছর আগে এই মহামানবের আবির্ভাবে সত্যই ধন্য হয়েছিলো দেশের মাটি, মুখে মুখে আজও ধ্বনিত হয় 'বন্দে মাতরম্' গানটি। এ তো গেলো কিছু বক্তব্য তাঁর সৃজন নিয়ে। 
কিন্তু লেখার স্বাধীনতায় কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তোমাদের জানাই। ক্লাসে তখন 'বঙ্কিমচন্দ্র' প্রসঙ্গ এলেই সবাই বলাবলি করতাম, 'বাপ্ রে যা কঠিন কঠিন ভাষা!' তা একদিন হলো কি, মাতৃভাষায় যদি সেরকম শক্ত ভাষা থাকে আর যদি তা জানার আগ্রহ থাকে, তাহলে কি আর সমস্যা! কিনেই ফেললাম, বঙ্কিম রচনাবলী। শুরু হলো গল্পগুলো প্রথম থেকে পড়া। কিন্তু কঠিন ভাষার অর্থ দুর্বোধ্য লাগছে। নোট করতে লাগলাম এবং স্যারের কাছ থেকে তার অর্থ জেনে লেখা শুরু করলাম।  আমার কাছে তখন তা আর কঠিন মনে হলো না। আসলে তখন বঙ্কিমচন্দ্রকে ভালবাসার মধ্যে যেটা আমার মনে হয়েছিলো, তা হলো তাঁর উল্লিখিত কঠিন ভাষাকে সুস্পষ্টভাবে জানা, তাতেই ছিল আনন্দ। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন দিকে তাঁর বিচরণ নিঃসন্দেহে নজরকাড়া। সময়টাই তো তখন ছিলো কতো কঠিন, তা তো তোমরা জেনেছো।

এবার আসি স্নেহার আঁকা নৌকা নিয়ে। দাঁড় বাইতে বাইতে ক্লান্ত মাঝি হয়তো একটু বিশ্রাম নিচ্ছে গাছের তলায়। আর তার ফাঁকে ঘাটে বাঁধা নৌকাখানি ভাসতে ভাসতে চলেছে জলের স্রোতের সাথে খেলা করতে করতে। দুঃখময় জীবনে মাঝিদের বুঝি এভাবেই সংগ্রাম চলে নিয়ত! 

'অনুযোগ' এর কথা আর কি বলি অদ্রিজা, তোমায়! গ্রামছাড়া, সবুজ মাঠছাড়া মানুষকে চলে আসতে তো হয় কখনো শহুরে জীবনে। যেখানে শ্রীপর্ণার আঁকা ছবির মতন রাস্তায় রাস্তায় বিদ্যুতের লাইন আছে, আলোয় ঝলমলে গোটা পরিবেশে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। মানুষের ব্যস্ততার মধ্যে দু দণ্ড কথা বলার মতো ফুরসতই মেলে না। তাই মন পড়েই থাকে গ্রামের মেঠোপথের দিকে। একমত হয়ে বলতে চাই:-

তৃষ্ণা জেগে ওঠে বার বার
গাঁয়ের মেঠো পথের তরে।
স্নিগ্ধ ছায়ায় বসবো কবে ..
ভাবি তাই চার প্রহরে।
অচেনা সব লাগে কেবল
বুঝি না কিছুই রহস্য।
গতির জোরে খুশি উধাও
মোবাইলে বাড়ে আলস্য।

অদ্রিজার মতো কষ্ট পাওয়ার দলে আমিও ছিলাম। ছোটবন্ধু জয়দীপ সেই কষ্ট থেকে আমাদের মুক্তি দিল। তার হাত ধরে চলে গেলাম গ্রামের বাড়িতে। খোলা দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসে মা কাকিমাদের সকালবেলা ফুল তোলা, উঠোনভর্তি ধানের গোলা, পুকুরের জলে মাছেদের অবাধ ঘুরে বেরানো ইত্যাদি দেখতে বড়ো ভাল লাগে আমারও যে। তেমন কিছু ছবির কল্পনা করে তার ছবি আঁকার চেষ্টাকে সেলাম।

টাইম মেশিনের সাহায্যে এবার চলে যাই শ্যামরাজ্যে, যেখানে জড়িয়ে আছে প্রাচীন যুগের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা। সেইসব খুঁজে নিয়ে ঘোরার আনন্দ সার্থক হয়। জয়তী রায় আলোকপাত করেছেন এমনভাবে যে সেখানে বেরাতে যাওয়ার আগ্রহ তৈরী হলো। তোমরা কেউ হয়তো সেখানে ঘুরেও এসেছো। আর ব্যাঙ্কক মানেই পাটায়া! মানে ফিল্মি দুনিয়ার তারকাদের চোখে পড়ে যাওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয়ও নয়। যাইহোক, যারা আমার মতো না যাওয়ার দলে, চলোই না হয় একবার টাইম মেশিনে করে চলে যাই। 
সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু অঙ্কিত আমাদের সকলের মাথায় একটা প্রশ্ন ঢুকিয়ে দিলো যে! আমরা, মানে ধরো যারা শুধু দৌড়েই চলেছি এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে, সবটাই তো নিজের জন্য। তাই তো! আর সেজন্য কোন কিছু বাড়তি চিন্তাও করছি না; যেটা মনে হচ্ছে, করেও ফেলছি স্মার্টলি। মাঝখানে যেটা হচ্ছে, তা হলো আমরা উন্নতির শিখরে পৌঁছে গিয়ে ধারেকাছে কোত্থাও সবুজের দেখা পাচ্ছি না। কী সাংঘাতিক ব্যাপার স্যাপার বলো তো! অম্বলেশ্বরের কথা তো জানলে। এর শিক্ষা কে নেবে বা দেবে গো! প্রশ্নটা কিন্তু মাথাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু উত্তর? কে দেবে? 'মানুষজাত' বড়ো নিষ্ঠুরই।

তবু বলবো বন্দনা সেনগুপ্ত আমাদের একটু স্বস্তি দিলেন। কালু ভুলুর এই জুটি আছে বলেই না এখনও আমরা বেঁচে। না হলে কবে কোন দুষ্টুদের উৎপাতে সারা দেশটা ধ্বংস হয়ে যেতো। এ গল্প আবার প্রমাণ করলো "জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" প্রেমহীন সমাজে এমন গল্পের ভাবনা থেকে আমাদের শেখার আছে যে একটা মানুষের যেমন বাঁচার অধিকার আছে, তার সমান অধিকার আছে একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার। যে শিক্ষিতের অবয়বে কিছু মানুষের দুরভিসন্ধি সহজে ধরে ফেলেছে একটি সারমেয়। এরাই আসল হিরো, আমিও বলবো।

কথায় কথায় বেলা যখন সারা হলো, মনে পড়লো তৃষ্ণা বসাকের সেই দীর্ঘ ধারাবাহিক উপন্যাসটির কথা বলা হলো না। এটা ২৫তম পর্ব। সংস্কার ভেঙ্গে তর্পণ করার প্রসঙ্গে জয়াবতীর সোজাসাপটা আলোচনা নিঃসন্দেহে 'জয়াবতীর জয়যাত্রা'কে সিদ্ধ করেছে। বলা বাহুল্য, জয়াবতীর কপালে বিজয়টীকা পড়ানো শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই তো ধরো না কেন, গত বছর একটি দুর্গাপুজোয় চারজন নারী কিভাবে সর্বপ্রথম প্রথা ভেঙ্গে পৌরোহিত্য করে দেখিয়ে দিলেন যে কোনকিছুই নারীদের কাছে অসম্ভবের নয়। সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই উপন্যাস পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে, আমার বিশ্বাস।

আমার কথাটি ফুরোল, তবে নটেগাছটি মুড়োনো গেল না; কারণ জ্বলদর্চির পাতা রঙীন হয়ে আবার আসছে আগামী রবিবার, যার যাত্রাপথে মৌসুমীদির অবাধ বিচরণ তোমাদের সৃজন নিয়ে। দেশজুড়ে এখন প্রভু জগন্নাথদেব আলোচনার কেন্দ্রে। বিশ্বকর্মার গুরু অনন্ত বাসুদেব মহারানার হাতের জাদুতে কিভাবে জগন্নাথদেব অসম্পূর্ণ মূর্তিতে দেশবাসীর কাছে পূজিত হলেন, তাই নিয়ে কিছু পড়াশুনো করে নিও। ঠাম্মা দাদাভাইদের কাছ থেকেও শুনতে পারো সে সম্বন্ধে। কিন্তু এর মধ্যে সামান্য চিন্তা ধরাচ্ছে আবার করোনা। অতএব, বাড়তি সাবধানতার সাথে থাকা শুরু আবার। জ্বলদর্চির সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা।


আরও পড়ুন 

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি