জ্বলদর্চি

শব্দে গাঁথা মণি-মালা : ৬০ / সালেহা খাতুন

বিতানের বিয়েতে

শব্দে গাঁথা মণি-মালা : ৬০ / সালেহা খাতুন 

নদী ছাড়া তো কোনোদিন থাকিনি। সভ্যতার মতো সত্যি সত্যিই আমি নদীমাতৃক। বিশেষ করে চটকলের অভ্যন্তরে যে কদিন যাপন করেছি সঙ্গী ছিল ঐ নদীই। ইতিহাস সাক্ষী ব্রিটিশরা সবকটি চটকলই প্রতিষ্ঠা করেছিল হুগলি নদীর দুই তীরে। তাই একটু অবসর হলেই নদীর সঙ্গে কথা হতো। নদী যাপন চলতো । কখনও দেখতাম চক্ষুভরে, কখনো বা দুই হাতে ছুঁয়ে, কখনো বা তার বুকের ভেতর প্রবেশ করে। কিংবা নৌবাহনে তার ওপর দিয়ে যেতাম চলে। এমনই একদিন সন্ধ্যায় শ্যামনগর থেকে নৌকায় চেপে চলে গেলাম পরপারে তেলেনীপাড়ার চটকল এলাকায় । কী বৈপরীত্য গৌরীশঙ্কর জুটমিলের সঙ্গে তেলেনীপাড়ার চটকলের। রাস্তাঘাট যেন কেমন আলাদা আলাদা। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা চটকলের অভ্যন্তর যেন যক্ষপুরীর মতো। বাংলাভাষী মানুষও কম। কেমন একটা দৃষ্টি হানছে লোকজন। সালাউদ্দিনকে বললাম ফিরে যাবো। তখন জীবনে অবকাশ যাপনের সুযোগই আসতো না, তবুও যেটুকু সময় পাওয়া যেতো নির্ভেজাল আনন্দে কাটতো। মন তখনও এতোটা জটিল হয়ে যায় নি।

এক একদিন চলে যেতাম ব্যারাকপুর গান্ধীঘাটে। নদীকে ওখানে সমুদ্রের মতো মনে হয় । ছলাৎছল জল বৃহৎ ঘাট ছুঁয়ে যায়। ঘন গাছপালায় ঘেরা নীরব নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে ধ্যানমগ্ন হয়ে যেতাম দুজনে। জল ছুঁয়ে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনো একটা গল্পে পড়ে ছিলাম নদীকে ছুঁতে পারা মানে নিজের ব্যক্তিগত একটা জীবন থাকা। এজন্য ইন্দিরা গান্ধী সময় পেলেই নদীকে ছুঁয়ে আসতেন।

ব্যস্ততার শেষ নেই জীবনে। তখনো এবং এখনো। নিজের পড়াশোনা তো ছিলই তার ওপর সালাউদ্দিনের তিন শিফটের ডিউটির চক্কর। ‘এ’ শিফট হচ্ছে সকাল ছটা থেকে সন্ধে ছটা, ‘বি’ শিফট হচ্ছে সকাল দশটা থেকে রাত দশটা আর ‘সি’ শিফট হচ্ছে রাত দশটা থেকে সকাল দশটা। সপ্তাহে সপ্তাহে রোটেশন অনুযায়ী ডিউটি আওয়ার চেঞ্জ হতো। এর মাঝখানে টিফিন আওয়ার, লাঞ্চ আওয়ার ছিল। ফলে এরকম চাকরিতে কোয়ার্টারে থাকতেই হতো। আর বাড়ির লোকেদেরও এই চক্রাকারে ঘুরতে হতো। এজন্য ‘এ’ শিফটটাকেই একটু ভদ্রজনোচিত মনে হতো। সন্ধেটা একটু নিজেদের মতো নদীর ধারে কাটানো যেতো।

শ্যামনগরে কোয়ার্টার এরিয়ার প্রতিবেশীদের সুখ দুঃখ আনন্দ উদযাপনে যোগ দিতে হতো। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরো পরিবারের নিমন্ত্রণ থাকতো না। গুজরাটি, মারোয়াড়ি  কিংবা রাজস্থানি অনেক কলিগের বিয়েতে তখন সালাউদ্দিন একা একাই গেছেন। কেননা সেখানে আমার নিমন্ত্রণ ছিল না। আবার আমার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব যখন দুজনকেই নিমন্ত্রণ করেছে তখন সালাউদ্দিন যেতে পারেন নি। ঐ একই দোঁহাই ছুটি না পাওয়া। আমি একাই গেছি। এম. ফিল.-এ পড়াকালীন বিতান বিয়ে করে আটানব্বইয়ের ডিসেম্বরে। শ্যামনগর থেকে সাঁতরাগাছি চলে এসেছি স্যারের বাড়ি। স্যার বিশাখা বাপ্পাদা আমরা একসঙ্গে গেছি বিতানের বিয়েতে। আইলাইনারে আমাদের সাজিয়ে দিয়েছে বাপ্পাদা। অনিতা, নমনা, নীনা সব বন্ধুরা বিতানের বিয়েতে একত্রিত হয়েছি। আর মনে হয় এভাবে একত্র হইনি আমরা।

🍂
বড়ো মেসো টিঙ্কুদির বিয়েতে আমাদের নিমন্ত্রণ করলেন। সেখানেও বাবা-মার সঙ্গে গেলাম। কর্মবীর জামাতা যেতে পারলেন না। বর সঙ্গে আসেনি অতএব কথা তো শুনতেই হলো। বেলাল দুলাভাই বললেন, ‘আরে আমি আজ একটা সিজার ছেড়ে চলে এলাম, আর সালাউদ্দিন আসতে পারলো না’। দুলাভাই তো স্বাধীন, অন্য আর এক ডাক্তার বন্ধুকে সিজারের ভার দিয়ে চলে এসেছেন কিন্তু কোম্পানির চাকরিতে সে উপায় নেই।

শুধুমাত্র হাকিম অর্থাৎ আমার জ্যেঠতুতো দাদার বিয়েতে দুজনে যোগ দিতে পেরেছিলাম। বরযাত্রী বৌভাত সব আনন্দই উপভোগ করি। আর সব থেকে বেশি আনন্দ ওর শ্বশুরবাড়ি একেবারে গঙ্গার ধারে হওয়ায়। নদী আর আমি বার বার একাত্ম হয়ে যাই। নদীতে যেমন জোয়ার ভাটা আসে মনও যেন তেমনি হয়ে যায়। কখনো সুখের আতিশয্যে আত্মহারা আবার কখনো বা দুঃখের প্রাবল্যে দিশাহারা। তবে স্যারের আদর্শ অনুসরণের চেষ্টায় নিমগ্ন থেকে চেষ্টা করি সুখে বিগতস্পৃহ এবং দুঃখে নিরুদ্বিগ্নমনা থাকতে।

অথচ অনিতার বিয়েতে যেতে না পারার দুঃখ আমাকে আজো কুরে কুরে খায়। সেবার সালাউদ্দিনের হাতে অনন্ত সময় থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ওঁর কুড়েমির জন্য যেতে পারি নি। আর তখন বাবার বাড়িতে ছিলাম, বাবাও একা একা যেতে দিলেন না। পরে অবশ্য আমি অনিতার সাথে দেখা করেছিলাম।
অনিতার বিয়েতে যেতে না পারার দুঃখ ভুলেছি ছবি দেখে

শ্যামনগরের আনন্দের দিনগুলো বড়ো ক্ষণস্থায়ী হয়ে গেল। সাতানব্বই থেকে নিরানব্বই মাত্র দু’তিন বছর সেখানে কাটাতে পেরেছি। বিশ্বকর্মা পুজো বা দুর্গাপুজোর সময় মিলের ভেতরকার সব ডিপার্টমেন্টগুলো আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন সালাউদ্দিন। আমি যদি লেখালেখিতে বিশেষ দক্ষ হতাম সে সব নিয়ে কত কিছু যে সৃষ্টি হতো! আফশোস হয়। কিছুই হলো না বলে। 

প্রসেস কন্ট্রোল অফিসার থেকে সালাউদ্দিনকে পাঠানো হলো বিমিংয়ের মতো উত্তপ্ত বিভাগে। উত্তাপে ছটফট করতে থাকেন আঠাশ উনতিরিশের তরতাজা যুবক। অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শ্বশুরমশাই বললেন, ‘উনি বাবুমানুষ। এসিতে বসে কলম পিষবেন আর কি- এই তো বাসনা ওর’। ওঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি আমি। ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রথম দিন থেকে ওঁকে বন্ধু বলে মানি। সালাউদ্দিন বললেন, ‘কে চাকরি করবে আগে ঠিক করো’। সবে তো নেট পাশ করেছি। এখনো কত প্রক্রিয়া পেরোতে হবে কে জানে। নেটের সার্টিফিকেট হাতে পেতে পেতে একটা ইন্টারভিউয়ের ফর্ম পূরণের ডেট পেরিয়ে গেছে। ফলে সাতানব্বইয়ের ডিসেম্বরের নেট কোয়ালিফাই করলেও আটানব্বই-নিরানব্বইয়ে  ইন্টারভিউ দিতে পারলাম না। বাপ্পাদাকে জিজ্ঞেস করলাম আমার চাকরি পেতে আর ঠিক কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? বাপ্পাদা বললো মোটামুটি সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে তোমার দু’হাজার একের মধ্যে চাকরি হয়ে যাবে।

(ক্রমশ)

Post a Comment

0 Comments