যেতে যেতে পথে- ৩০/রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে

রোশেনারা খান

পর্ব ৩o

২০০৪ এ বাবলি পার্মানেন্ট চাকরি পেয়ে গেল। পোস্টিং বরাকরে। কিন্তু তখনো ওর কন্ট্রাক্ট পিরিয়ড শেষ হয়নি।  তাই এখানে কাজ করলেও মাইনে নিতে যেতে হত বরাকর। এই ২০০৪ সালে কোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে পক্ষে বিপক্ষে জোর তর্ক বিতর্ক চলছিল। সেইসময় একটা মজার ব্যপার লক্ষ্য করতাম, বিরোধীরা সবসময় অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে কথা বলতেন। ক্ষমতায় থাকত যে দল, তারা বিরধিতা করত। তো এই বিষয়ে আলোচনার জন্য ‘অঙ্গনা লাইভ’ থেকে আমাকে আবার ডাকা হল। আমি আগের দিন মেয়ের কাছে সিঙ্গুর চলে গেলাম। ছুটি নেওয়া যাবে না, তাই ও  এবার আমার সঙ্গে যেতে পারবে না। ওদের সঙ্গে কথা হল হাওড়া স্টেশনে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বড় ঘড়ির নিচে একজন দাঁড়িয়ে থাকবে। যদিও সে আমাকে চেনে, তবুও বলল, যদিন আপনার সাড়ির কালারটা বলেন। বললাম আমি হলুদরঙের সাড়ি পরে যাব। পরদিন একাই সিঙ্গুর থেকে ট্রেনে হাওড়া স্টেশনে এসে বড় ঘড়ির নিচে দাঁড়ালাম। মিনিট দশ পরে সেই ছেলেটি এল এবং আমাকে চিনেও নিল।
            গাড়িতে ওঠার পর ছেলেটি বলল, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীকেও তুলতে হবে। তার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাঁড়িয়েই রইল, তিনি বের হচ্ছেন না। প্রায় ৪৫ মিনিট পরে দলবল নিয়ে বেরিয়ে এসে দুজনকে আমাদের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে, আরও কয়েকজনকে নিয়ে নিজের গাড়িতে উঠলেন।  তখন উনি মাদ্রাসার কয়েকটি পদে ছিলেন এবং কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওনার জন্যই স্টুডিওতে পৌঁছাতে দেরি হল। গাড়ি থেকে নেমে আমি ওয়াসরুমে যাওয়ার জন্য একটি রুমে ঢুকেই দেখছি সুদীপ্ত বসে কাজ করছেন। আমাকে দেখে বললেন, এবার আপনার প্রতিপক্ষ খুব  শক্তিশালী। শুনে আমি সামান্য হাসলাম। মেকআপ করার সময় ছিলনা, মেকআপ ম্যান একটা আয়না আর পাউডারের পাফ হাতে দিয়ে বললেন,মুখে পাফটা বুলিয়ে নিন। আসলে মুখ তেলতেলে হলে আলো পড়লে রিফ্লেক্সন হবে।
            একেবারে কাঁটায় কাঁটায় দুটোতে অঙ্গনা লাইভ শুরু হল। শর্মিষ্ঠা মাঝখানে বসেছে। ওর ডান দিকে আমি, বাম দিকে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। আর ওনার সঙ্গে আসা লোকগুলি ক্যামেরার বাইরে ঠিক আমার মুখোমুখি বসেছে। আমাকে ভয় দেখানো বা ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য কিনা জানিনা। যাইহোক, অনুষ্ঠান শুরুর আগেই সিদ্দিকুল্লা সাহেব শর্মিষ্ঠাকে বললেন, আমাকে যেন ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ না করা হয়। শুনে মনে হল উনিই বেশ চাপে আছেন।
          ‘মাঝে মাঝে মৌচাকে ঢিল ছুড়তে ভাল লাগে, আমাদের আজকের বিষয়’  ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এখনই চালু হোক’।  পক্ষে বলবেন সমাজকর্মী ও লেখিকা রোশেনারা খান এবং বিপক্ষে বলবেন সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী, এভাবেই শর্মিষ্ঠা অনুষ্ঠান  সুরু করে প্রথমে আমাকেই প্রশ্ন করলেন। - প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আমি এদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বলতে উপস্থিত হয়েছি। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার  প্রশ্নই ওঠে না। আর আজকের আলোচনার বিষয়ে বলব, ‘অভিন্ন  দেওয়ানি বিধি এখনি চালু হোক’ থেকে ‘এখনি’ শব্দটি  সরিয়ে  রেখে আমি  প্রয়োজনীয়তার কথাটুকুই বলতে চাই।
        প্রশ্ন উত্তরের সঙ্গে তর্ক জমে উঠল। উনি পুরুষের একাধিক বিয়ের সমর্থনে যুক্তি দেখালেন, প্রথম স্ত্রী যদি বন্ধ্যা হয়, সে ক্ষেত্রে পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে সংসারে সুখশান্তি নিয়ে আসে। আমি ওনাকে প্রশ্ন করলাম স্বামী যদি সন্তান জন্মদানে অক্ষম হন আপনি কি সংসারে সুখশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য স্ত্রীকে আর একজন স্বামী গ্রহণের বিধান দেবেন? উনি কোনও উত্তর দিতে পারেন নি। পরে বললেন, মুসলিম পুরুষের চারটি বিয়ের অধিকার আছে বলেই তারা একাধিক করছে, তা তো নয়। ক’জন শিক্ষিত পুরুষ একাধিক বিয়ে করছে?-করছেন না যখন, খন এই অধিকার বাতিলের দাবি করচ্ছেন না কেন? আসলে শিক্ষিত মুসলিম পুরুষেরাও স্ত্রীকে ভয় দেখিয়ে অনুগত রাখার জন্য এই আইনি অধিকার হারাতে চান না। এটা পুরুষের অস্ত্র। একজন অস্ত্রধারী মানুষের সঙ্গে একজন নিরস্ত্র মানুষের শান্তিপূর্ণ সহবস্থান কি সম্ভব?
            প্রতিটি প্রশ্নে উনি নাস্তানাবুদ হলেন। যে সমস্ত ফোন কল আসেছিল, তার মধ্যে মাত্র দুটি কল ওনার পক্ষে ছিল। বাকিসব আমাকে সমর্থন করে। একজন এমন বিশ্রী ভাষায় ওনাকে আক্রমণ করেন যে, শর্মিষ্ঠা ফোন কেটে দিতে বাধ্য  হয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষের পরেও শর্মিষ্ঠার পরিচিত একজন ফোন করে ওঁকে বলেন, শীতের কমলালেবুটাকে আর একটু চটকাতে পারলে না? অনুষ্ঠান কেমন লাগল? এবিষয়ে শ্রোতাদের চিঠিও আসত, তার থেকে বেছে নিয়ে ২/১ টি চিঠি পড়া হত। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বহু আলোচিত বিষয় হওয়ার কারণে বহু মানুষ যে অনুষ্ঠানটি দেখেছেন যে তা বোঝা গেল রাজ্যের ও বাইরে থেকে আসা প্রচুর চিঠিতে। তার মধ্যে যে দুটি চিঠি পড়া হয়েছিল্‌, সেগুলিতে আমার যুক্তিকে সমর্থন করা হয়ে ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমিও অনেক ফোন পেয়ে ছিলাম।


          একবার শুটিং শেষ করে মেদিনীপুর লোকালে বাড়ি ফিরছিলাম।‘লেডিস কামরায় আমার পাশে এক মধ্যবয়সি ভদ্রমহিলা বসেছিলেন, বেশ আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা।কিছুক্ষণ পরেই দুজনের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। খড়গপুর ‘আই আই টি’  তে বাড়ি। নাম ঝর্ণা চক্রবর্তী। ওনার স্বামী আই আই টি তে অধ্যাপনা করতেন। দুই মেয়ের একজন আমেরিকায়, অন্যজন রাজ্যের বাইরে থাকে। আমার পরিচয় জেনে জিজ্ঞেস করলেন, মেদিনীপুরের শরৎপল্লিতে যে ‘সারদা কল্যাণ ভাণ্ডার’ নামে একটি সংস্থা আছে, আমি জানি কি না। আমি জানতাম না। আসলে শরৎপল্লি কোথায়? সেটাই আমার জানা ছিল না। উনি বললেন, ওনারা কী কী কাজ  করেন। এখান থেকে সাহায্য পেয়ে কত দুঃস্থ ছেলেমেয়ে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কতজন বিদেশ পাড়ি গিয়েছে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম এমন একটি সংস্থা আমি বহুদিন ধরে খুঁজছিলাম। মেয়ে যখন মিশন গার্লসে পড়ত, তখন শুনেছিলাম, ওর বন্ধু মউলি মিশ্রের মা একটি সমিতির সঙ্গে যুক্ত।মেয়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছিল, ওঁদের সমিতি সাংস্কৃতি চর্চা করে। বুঝলাম এটা আমার জায়গা নয়। যাইহোক, আমাদের কথার মধ্যেই সালোয়ার-কামিজ পরা একটি মেয়ে সীট থেকে উঠে এসে ঝর্ণাদিকে প্রণাম করে বলল, ম্যাম আমি আপনাদেরই মেয়ে। আমি সারদা কল্যাণ ভাণ্ডার থেকে আর্থিক সাহায্য পাই। মেয়েটির কথা শুনে আমার ভীষণ ভাল লাগল। ঝর্ণাদি নামার আগে আমার ঠিকানা, ফোন নাম্বার নিলেন। 
            এই সাক্ষাৎ সম্ভবত ২০০৩ সালের শুরুর দিকে। এরপর জুলাই মাসে ডাক মারফৎ সারদা কল্যাণ ভাণ্ডার থেকে সংস্থার প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য একটি আমন্ত্রণ পত্র পেলাম। জুলাইয়ের শেষ শনিবারে বিদ্যাসাগর হলে খুব বড় অনুষ্ঠান হল। ঝর্ণাদি ছাড়া কাউকেই চিনিনা, উনিই এক ফাঁকে সংস্থার সম্পাদিকা রেখাদির (সরকার) সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ২০০৪ সালে শ্রী শ্রী সারদা দেবীর সার্ধশতবর্ষ  জন্মদিন উপলক্ষে সংস্থাটি বেশকিছু কর্মসূচী গ্রহন করে ছিল। ২০০৩ থেকেই সেগুলি শুরু হয়েছিল। তার মধ্যে ছিল মহিলা সম্মেলন। এর মধ্যে ঝর্ণাদির একটি চিঠি পেলাম। দীর্ঘ চিঠি। ২৯/০২/০৪ সারদা কল্যাণ ভাণ্ডার যে মহিলা সম্মেলনের আয়োজন করেছে, সেখানে মহিলা সংক্রান্ত চারটি বিষয়ের মধ্যে একটি হল ‘পারিবারিক সংহতি রক্ষায় গৃহিণী ও গৃহবধূর ভুমিকা’।এতে যে সমস্ত গৃহিণী ও গৃহবধূরা অংশগ্রহণ করবেন তাঁদের থেকে পাঁচজনকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচন করা হবে। বাকিরা শুনবেন এবং প্রশ্নও করতে পারেন। ঝর্ণাদির আমার টিভি প্রোগ্রাম খুব ভাল লেগেছে। তাই উনি চান আমি এই সম্মেলনে যোগ দি স্পিকার হিসেবে। তার জন্য অফিসে গিয়ে একটা ফর্ম ফিলাপ করে জমা দিতে হবে। একদিন মাসতুতো ভাইকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম। অনেক কথা হল রেখাদি, ঝর্ণাদি, তপতীদি সঙ্গে। ফর্ম জমা দিয়ে এলাম।
            বলার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে। বাড়ি থেকে লিখে নিয়ে গিয়েও দেখে বলা যাবে। এটা আমার পছন্দ হলনা। তাহলে তো অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে গিয়ে পড়া যাবে! তাছাড়া আমার দেখে বলা হয় না। যাইহোক নির্দিষ্ট দিনে খান সাহেব আমাকে রাঙ্গামাটিতে সারদা কল্যাণের কল্যাণ পিঠে পৌঁছে দিলেন। ওখানে পৌঁছে নাম এন্ট্রি করলাম। রেখাদি আমাকে দেখে বললেন, ঝর্ণা তোমার রোশেনারা এসে গেছে। ঝর্ণাদি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কখন বলতে চাও? অনেক মহিলা যোগ দিয়েছেন, তাই সাতজনকে স্পিকার ঠিক করা হয়েছে। আমি ২/৩ জনের পরে বলতে চাইলাম। কারণ আমি আগে শুনতে চাই।
          ওখানে গিয়ে শুনলাম মিরাদি(মিরাতুন নাহার) এসেছেন। ওনার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। সামনা সামনি দেখা হয়নি। তাই ঝর্ণাদিকে বললাম, আমি মিরাদির সঙ্গে দেখা করতে চাই। ঝর্ণাদি তখন স্বপ্নাদিকে(স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, উনি তখন খড়গপু্র ‘আই আই টি’র অধ্যাপিকা) বললেল, এ হল রোশেনারা, ও মিরাতুন নাহারের সঙ্গে দেখা করতে চায়, একটু নিয়ে যাওনা। মিরাদি আমাকে দেখেই বললেন, তোমাকে টিভিতে যেমন দেখি, তুমি তো তার থেকে অনেক সুন্দরী! তারপর কিছু কথা হল। চারটি আলোচনা সভা এক সঙ্গে শুরু হল। আমাদের যিনি বলতে উঠলেন, তাঁর হাতে একগোছা কাগজ, তিনি কাগজ দেখে যে বলতে শুরু করলেন তাঁকে থামিয়ে না দিলে তিনি থামতেন। কারণ তখনও তাঁর কাগজ পড়া হয়নি শেষ হয়নি। তৃতীয় নাম্বারে আমাকে ডাকা হল। আমি বলতে শুরু করতেই সবাই চুপ করে শুনতে লাগলেন। আমি বলেই চলেছি। যে মেয়েটি সময় দেখাচ্ছিল। সেও চুপচাপ বসে শুনছে। একসময় আমাকে নিজের থেকেই থামতে হল। শুরু হল করতালি। এরপর যাঁদের বলতে ডাকা হল, তাঁরা অল্প কথায় বক্তব্য শেষ করার আগে বললেন, আমরা আর কী বলব? মিসেস খান সবই বলে দিয়েছেন। জনে জনে বলতে লাগলেন, ‘খুব ভাল বলেছেন’। দেখলাম  রেখাদিও খুব খুশি। ঝর্ণাদি বললেন রেখাদি তোমাকে সময় দেখাতে নিষেধ করেছিলেন, বেশিক্ষণ তোমার বক্তব্য শোনার জন্য। মনটা খুশিতে ভরে গেল। এত সব জ্ঞানী গুণীদের সামনে বক্তব্য রাখা, তাঁদের প্রশংসা পাওয়া, এক নতুন অভিজ্ঞতা। 
                                                                                                                                              ক্রমশ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি