পাহাড়পূজা /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -- ২৭

পাহাড়পূজা

ভাস্করব্রত পতি

কানাইসর পাহাড়ে পাহাড়পূজা মেদিনীপুরের এক আঞ্চলিক লৌকিক উৎসব। বেলপাহাড়ীর দক্ষিণ পশ্চিম দিকে ৬ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ের সারি। এখানেই আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবার আয়োজিত হয় এখানকার পাহাড় পূজা। বেলপাহাড়ী থেকেও যাওয়া যায়। অথবা দক্ষিণ পূর্ব রেলের চাকুলিয়া থেকেও ট্রেকারে যাওয়া যায়।

৩০০ মিটার উঁচু বেলপাহাড়ীর গাড়রাসিনিতে আষাঢ়ের দ্বিতীয় শনিবার পূজা হয়। কানাইসর পাহাড়ে পূজা হয় আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবার। এখানকার পাহাড়পূজাই সর্ববৃহৎ। খড়িপাহাড়িতে আষাঢ়ের চতুর্থ শনিবার হয়। বেলপাহাড়ীতে ৩৪৫ মিটার উঁচু চিতি পাহাড় সংলগ্ন গ্রামগুলি হল বালিচুয়া, বদাডি, নটাচুয়া ইত্যাদি। এই চিতি পাহাড়ে আষাঢ়ের চতুর্থ রবিবার হয়। এর সাথেই যুক্ত বেলপাহাড়ীর খট্টধরা মৌজার ২৫০ মিটার উঁচু সোরেঙ্গাসিনি পাহাড়। এখানেও পূজা হয়। পার্শ্ববর্তী ধলভূমগড়ের গোটাশিলা পাহাড়ে পূজা হয় আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবারের পর যে মঙ্গলবার আসে সেইদিন। ফুলডুংরি পাহাড়েও পূজা হয় এই সময়। শ্রাবণের প্রথম মঙ্গলবার চুটিয়াভদরি এবং চন্দনপুরের মধ্যে খড়িডুংরি পাহাড়ে পূজা হয়। ২০০ মিটার উঁচু লালজল পাহাড়ের আদিম মানুষের গুহার নিচেও একদিনের মেলা হয়। আষাঢ়ের শেষ মঙ্গলবার লোয়াদা ও চুটিয়াভদরি গ্রামের মাঝে অবস্থিত গজডুংরি পাহাড়েও পূজো হয়। 
প্রায় ৭০০ ফুট উঁচু এই কানাইসর পাহাড়ের উপরেই একসময় পূজা হত। একটা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনো আছে সেখানে। কিন্তু এখন ওখানে পাহাড়পূজা হয়না। নিচে হয়। কেন নিচে হয় তা নিয়ে একটা সুন্দর কাহিনী রয়েছে। ড. মধুপ দে জানিয়েছেন সেই কাহিনী --- "কানাইসর পাহাড়ের পূজার নিয়ম ছিল, পূজা এবং বলি শেষ হবার পরে আর ভুলেও সেদিন সেখানে ফিরে যাওয়া যাবে না। শোনা যায়, একবার বলি ও পূজার শেষে পাহান ভুল করে বলির খড়্গটি পাহাড়ের উপরে ফেলে চলে এসেছিল। পাহাড় থেকে নামার সময়ে মনে পড়ায় মাঝ রাস্তা থেকে সে উপরে ফিরে গিয়েছিল৷ উপরে উঠে দেখে যে, পাহাড় দেবতা দুটো বাঘের সঙ্গে বলির মাংস খাচ্ছেন। পাহানকে দেখে দেবতা রেগে খড়্গটি তাঁর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলেন যে, আর কোনো দিন যেন সে উপরে পূজা করতে না আসে। এবার থেকে পূজা যেন নিচেই করে। দেবতার ভয়ে হোক, কিংবা বাঘের ভয়ে হোক, কিংবা পাহাড়ে ওঠার দুর্গমতার জন্যই হোক, সেই থেকে পূজা প্রথমে হয় পাহাড়ের নিচে ‘হরির থান' নামক একটি প্রশস্ত স্থানে। দ্বিতীয় পূজা হয় পূর্বদিকে পাহাড়ে ওঠার মাঝামাঝি একটি অপ্রশস্ত স্থানে। এই ঢালু ও অপ্রশস্ত স্থানে একসঙ্গে বেশি লোক থাকতে পারেনা বলে, একদল পূজা দিয়ে নামলে আর এক দল উপরে উঠতে পারে। এখানে পূজার থানে একটি প্রায় দেড়শ ফুট লম্বা ও আশি ফুট চওড়া পাথর আছে। প্রকাণ্ড বেধবিশিষ্ট এই পাথরের উপরে মাঝখানে একটি গর্ত আছে। পূজার পরে ব্রতীরা তাঁদের মনস্কামনা পূর্তির জন্য গর্তের উপরে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে গর্তের নীচে হাত পেতে থাকে। পুষ্পাঞ্জলির ফুল যদি হাতে পড়ে, তবে পাহাড় দেবতা পূজা নিয়েছেন ও মনস্কামনা তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে বলে ব্রতীরা বিশ্বাস করে।"
'কানাইসর' নামের মধ্যে দুই দেবতার খোঁজ মেলে।  
                     কানাই + সর > কানাইসর
'কানাই' অর্থে শিব। আর 'সর' অর্থে দুর্গা। এই কানাইসর পাহাড়ের একটি অংশকে বলে 'রাজা' পাহাড়। আর একটি অংশকে বলে 'রাণী' পাহাড়। শ্রাবণ মাসের প্রথম রবিবার রাজা পাহাড়ে কানাইবাবার তথা শিবের পূজা হয়। মুরগী ও পাঁঠা বলি হয়। এই পূজাতে কোনো মহিলার প্রবেশ নিষিদ্ধ। এমনকি এই পূজার প্রসাদও মহিলাদের খাওয়ার বিধান নেই। বিশেষ করে যেসব মহিলাদের এখনো বিয়ে হয়নি বা তাঁদের বাচ্চা হওয়ার বয়স রয়েছে তাঁদের এই প্রসাদ দেওয়া যাবে না। শুধুমাত্র যেসব মহিলা আর সন্তানের মা হবে না, তাঁরাই খেতে পারে। ডুলুং নদী পেরিয়ে নিয়েও যাওয়া যাবেনা কানাইবাবার প্রসাদ। নদীর এপারেই খেতে হবে। কানাইবাবার পূজক হলেন খেড়িয়া শবর গোষ্ঠীর মানুষ কেন্দ্রাপাড়ার সন্তোষ শবর। তিনিই মূল পূজক। 

আর রাণী পাহাড়ে আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবার 'সর' মায়ের তথা দুর্গা মায়ের পূজা হয়। এই পূজার পূজক হলেন ঢেঙ্গাআম গ্রামের সহদেব নায়েক। এখানে পাঁঠার পাশাপাশি মুরগি বলিও দেওয়া হয়। লুচি, মাংস ও কাঁঠাল খাওয়ার প্রাচীন চল রয়েছে এখানে। আসলে বর্ষার শুরুতে ভালো চাষের আশায় বৃষ্টির কামনায় পাহাড়পূজায় শামিল হন মানুষজন। প্রকৃতিকে সন্তুষ্ট রাখার ভাবনায় পাহাড় পূজা। এই কানাইসর পাহাড়ের অর্ধেক অংশ পড়ে বেলপাহাড়ী ব্লকের সন্দাপাড়া পঞ্চায়েতের মধুপুর মৌজায়। বাকিটা পড়ে ঝাড়খণ্ডের চাকুলিয়া ব্লকের মধ্যে। দুই রাজ্যের সীমান্তে কয়েক বর্গমিটার জুড়ে পাহাড়টির অবস্থান।

কানাইসর পাহাড়পূজাতে ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন মৌজার মানুষ ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত থাকেন। সেই গ্রামগুলি হল দুয়ারিশোল, জয়নগর, তুলসীবনি, শালগেড়িয়া, জোড়াআম, কিয়াশোল, বিদ্যহ, ভাণ্ডারু, বৈকুন্ঠপুর, শিলাখুনি, দুবরাজপুর, পচাপানি, বেহারপুর সহ আরো তিনটি গ্রাম ঢেঙ্গাআম, লুহামাইলা ও বরালটা। এই মৌজাগুলির প্রতিটির একজন করে গ্রামপ্রধান পূজার কমিটিতে আছেন। এঁদের মধ্যে প্রধান নির্বাচিত করা হয়েছে (২০১৬) জয়নগরের সমায় মাণ্ডিকে‌। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের যেসব গ্রামের মানুষ এই পাহাড়পূজায় যুক্ত থাকেন সেগুলি হল শিলদা, মধুপুর, সীতাপুর, ঝেঁটাড়া, কেন্দ্রাপাড়া, চুটিয়াভদরি, মুনিয়াদা, খাঁকড়িঝর্ণা, ডুমুরিয়া এবং বাগালপাড়া। এগুলির মধ্যে খাঁকড়িঝর্ণা গ্রামের দেওয়া পাঁঠা প্রথম বলি দেওয়া হয়।

পাহাড়পূজায় এখানে মূলতঃ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ উপচার পালন করেন। আবার মুণ্ডাদের আরাধ্য দেবতা 'সিংবোঙ্গা' আসলে পাহাড় দেবতা। তাঁরা আষাঢ় মাসে কানাইসর পাহাড়ে পাহাড় দেবতার পূজা করলেও মুণ্ডা কিশোরীদের 'কানফোঁড়' অনুষ্ঠান করে ১ লা মাঘ। যা 'টুকাই লুতুর' নামে পরিচিত। বাগাল সম্প্রদায়ের লোকেরা এই ১ লা মাঘ আইখান দিনে পাহাড় পূজা করে। এজন্য তাঁরা উইঢিপি কেটে এনে পাহাড়ের প্রতীক হিসেবে শুদ্ধাচারে পূজা করে ফুল, ফল, সিঁদুর সহ হাঁড়িয়া নিবেদনের সাথে সাথে বলিদানের মাধ্যমে। এঁরা পাহাড়পূজা করে গবাদি পশু যাতে না হারিয়ে যায় এবং রোগাক্রান্ত না হয় এই কামনায়। কালো পাঁঠাবলি দিয়ে সেই পাঁঠা ও খিঁচুড়ি সহযোগে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এইদিনে মুণ্ডাদের মতো বাগাল কিশোরীদের 'কানফোঁড়' করার উত্তম দিন বলে বিবেচিত। ঐ কিশোরী নতুন কাপড় পরে আলপনা দেওয়া মাটির  মেঝেতে রাখা কাঠের পিঁড়ি 'মারুয়া' তে বসে। আর দেহরীর অনুমতি নিয়ে বেলকাঁটা দিয়ে কানফোঁড় করা হয়। আর একজন ঘরের চালে উঠে পিঠা ছড়ায় সেখানে। ফোঁড় শেষ হলে সেখানে রাখা একটা জ্যান্ত মুরগিকে আছড়ে মেরে ফেলা হয় কিশোরীর মঙ্গল কামনায়। এইদিনে বাগাল সম্প্রদায়ের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে 'জোড়' বা প্রনাম করে।
কানাইসর পাহাড়ের উপর পাহাড়পূজা না হলেও প্রচুর লোকজন এখানে ওঠেন। মনোরম পরিবেশ অবলোকন করেন। অত্যন্ত দুর্গম এবং শ্বাপদসংকুল পাহাড়ী পথ। ছোটখাটো একটা ট্রেকিংয়ের আস্বাদন মিলবে পাহাড়ের মাথায় উঠলে। এখানে শ্রীনাথ বাস্কে নামের এক সাধুবাবার ছবি টাঙিয়ে পূজা চলে। মানুষ এখানে শুকনো চিঁড়ে, নকুল দানা এবং নারকেল দিয়ে পূজা দেয়। এখানে মূল পূজক হলেন বেলপাহাড়ীর সীতাপুর গ্রামের রামেশ্বর কর্মকার। দুদিন ধরে পূজো চলে শ্রীনাথ বাস্কের। এই রামেশ্বর কর্মকার নিজেকে সাধুবাবার শিষ্য বলে দাবি করেন। কানাইসর পাহাড়ের উপর মিলবে কাঁচা ছোলার ২০ - ২৫ টি দোকান। এছাড়া মিলবে ঠাণ্ডা জল, নানা খাওয়ার দোকান। 

কানাইসর পাহাড়ের নিচে বসে বিশাল মেলা। বিভিন্ন এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন আসেন। অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও এখন আসছেন। দুদিনের মেলা। প্রথম দিন সকলের জন্য খোলা। দ্বিতীয় দিন শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষজন আসেন। মেলায় দেদার বিক্রি হয় কাঁঠাল, জিলিপি, বাদ্যযন্ত্র, পাথরের সামগ্রী থেকে হাঁড়িয়া, মদ, বিয়ার ইত্যাদি। ভাত খাওয়ার হোটেল বসে যায়। বহু দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এখানে। ভিড়ে ভিড়াক্কার হয়ে ওঠে কানাইসর সংলগ্ন এলাকা। 'ঘঙ' পাতার টুপি এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। বারোডাঙা, মালিবনি গ্রামে এগুলো তৈরি হয়। এ এক অন্য ধরনের লৌকিক উৎসব। একটা আস্ত পাহাড় হয়ে ওঠে উপাস্য দেবতা।

Comments

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি