পারুল এবং একটি জিজ্ঞাসা /শ্রীজিৎ জানা

পারুল এবং একটি জিজ্ঞাসা

শ্রীজিৎ জানা



আদালতের রায়ে সাজা ঘোষণা হল পারুলের। ছ'বছরের জেল সাথে আড়াই হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা।বারবার যখন জর্জ সাহেব পারুলকে জিগ্যেস করছেন,
--রায় নিয়ে তুমি কী কিছু বলতে চাও?
দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকার পর কঁকিয়ে উঠে কান্নায়। ভেজা চোখের তারা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে বিদ্যুৎ। গলার স্বরে আছড়ে পড়ে ক্ষোভের ঢেউ। অভিমানের জলোচ্ছ্বাস।
---কী কথা বোলবো জজবাবু? তমাদের আইনে শুদু সাজাই দিতে জানে। মায়ের কষ্ট জানে নি। একটা মেইয়া মানুষের যন্তনা বুজেনি। কুন জ্বালায় একটা 
মা তার কোলের ছ্যানাকে অপরকে দিয়ে দেয়,তমাদের আইন তা কুনু দিনই বুজবেনি। ঠিক করেছ পারুলকে শাস্তি দিয়েছ। এমন রাক্ষসী  মায়ের ত ফাঁসি হলেই ভাল হত।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলেই পড়ে যায় কাঠগড়ার। আদালতের ভিতর চাপা গোলমাল বাঁধে। তড়িঘড়ি চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা  হয়। সেই মুহুর্তে আদালতের কাজ স্থগিত রাখেন জর্জ সাহেব।

পারুলের জন্ম এদেশেই। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ভাগ্য নিয়ে এসেছে সে। ধনীর ঘরে মেয়ে সবদিন একমাত্রই হয়। কিন্তু অভাবের সংসারে মেয়ের সংখ্যা একমাত্র হয় না। যৌন তাড়না নাকি ছেলের আশা নাকি শিক্ষার অভাব তা নিয়ে সমাজের ভাবনার অন্ত নেই। ভাবনা আর উপায়ের যখন গাঁটছড়া বাধা হবে, তার মাঝে কত শত পারুল জন্মে যাবে দেশে।হাড়-হাভাতে মা-বাবার ঘরে যেভাবে পারুল জন্মেছে। গ্রামে একটা স্কুলবাড়ি আছে সে দেখেছে। স্কুলের সামনে ফাঁকা মাঠে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেছে সবার সাথে। কিন্তু স্কুলের ভিতরের বইখাতার সাথে তার যোগাযোগ হয়নি কক্ষনো।
মা লোকের বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটত। ছোট থেকেই মায়ের আঁচলের খুঁটে বিধাতা তার ভাগ্যকে বেঁধে দিয়েছিল। মা মারা গেলে পারুল হয়ে উঠে মুখার্জি বাড়ির কাজের মেয়ে। প্রথমটা রাজী হতে চায় না পারুল। কিন্তু অভাবের সংসারে মনের দাবী-দাওয়া জোর খাটে না। তার উপর মা মরা মেয়ে। কেইবা বুঝবে মেয়ের মনের কথা। পাড়াপড়শিরা পারুলকে বোঝায়,
--- বাগ্দী মেইয়ার হাতের রান্না বামুনরা খাবে দু'বেলা, ইটা কী কম ভাগ্যের লো! মা তোর ছিল বাসন ধুয়ানি,তুই হলি রান্নি!!তাবাদে বাপ ত তোর মোদো মাতাল। পেটে-পঁদে পাবি। মাস ফুরালে মাইনা পাবি,চিন্তুা কিসের তোর?
পারুল জানে চিন্তা করলেও কেইবা তার বুকের পাথর নামাবে!! ঘাড় নীচু করে মুখার্জিদের হেঁসেলে ঢুকে যায় পারুল।

গরীব ঘরের মেয়েদের আর কিছু না দিক ভগবান,চোখ টাটানো শরীর একখানা দ্য্যয়। মুড়ি-পান্তার রসে যৌবন বর্ষার জলভরা মেঘের মতো অমন  ছলছলিয়ে উঠতে পারে তা পারুলকে না দেখলে মনে হয় না।সেই মেঘ ছুঁয়ে দেখতে অনেকেরই ইচ্ছে হয়। মুখার্জি কর্তারও হয়। সুযোগ পেলেই চোখ দিয়ে গিলে খায় গোগ্রাসে। ফিনফিনে সুতোর আস্তরণ ভেদ করে উদ্ভিন্ন দেহাভাষ ঠিকরে বেরোয় শরীর থেকে। দারিদ্র্যের অসহায়তা লজ্জাকে আবরিত করতে পারে না। চোখের লোভকেও প্রতিহত করতে পারে না। এরইমাঝে সম্বন্ধ আসতেই পারুলকে বসতে হয় গাঁয়ের কালি ঠাকুরের থানে। রূপ দেখেই বিনা পণে বিয়ে করতে চায় পারুলকে। পাশের গাঁয়ে ঘর শম্ভুর।ট্রাকের হেল্পার সে। বিয়ের প্রথম রাতে পারুলকে সাপের মতো দুহাতে পেঁচিয়ে শম্ভু বলে,
---মাইরি তুই আলাদা জিনিস! মেইয়াদের শরীর দূর থেকে দেকতম। এমন নরম তুলতুলা কখন জানতম নি।
পারুলের শ্বাস যেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ময়রা দোকানে ময়দা দলাইমলাই করতে দেখেছে পারুল। শম্ভুর শক্ত দুটো পাঞ্জার মাঝখানে সে যেন একটা ময়দার পিন্ড। অসহ্য অত্যাচার নাকি নির্মম আদর বোঝা হয়ে উঠেনি কোনদিন পারুলের।
পরের ঘরের হেঁসেল সামলেছে কতদিন। এবার থেকে নিজের সংসারে মনভরে রাঁধাবাড়া করবে। গুছিয়ে সাজাবে সংসার। স্বামীর শরীরি খিদের আঁচড়কামড়কে অত্যাচার বলতে নেই, বলতে হয় সোহাগ।এমন সোহাগ নাকি বহু ভাগ্য করে জোটে।পারুল উনুনে ঘুঁটে দিতে দিতে ভাবে পুরুষের  শরীরের খিদে এই উনুনের গনগনে আঁচের মতো। যাই দেবে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। অন্যের ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোন দাম দেবে না। এইসব সাতপাঁচ ভাবনার মাঝেই পেটে সন্তান আসে তার। শম্ভু শুনেই বলে উঠে,
---দ্যাক্ মোর কিন্তু ব্যাটাছ্যানাই চাই।
---উসব কী মানুষের হাতে থাকে,বল?
----মেইয়াদের হাতেই সব বুজলু।
কার হাতে আসলে সৃষ্টির রহস্য লুকানো তা জানার আগেই পারুল মেয়ের জন্ম দ্যায়। শম্ভুর মুখে খুশির ছিটেফোঁটা  আভা চোখে পড়ে না। হসপিটাল থেকে বাড়িতে এনেই শম্ভুর সাফ জবাব,
--ইবার যা হইছে হোক। পরের বার ব্যাটা না হলে যে মুখে বেরাবি ওই মুখেই বাপের ভিটায় সজা উঠবি।

বছর না গলতেই আবার মা হতে হয় পারুলকে। এবার কিন্তু শম্ভুর নিদান মতো দ্বিতীয় মেয়েটাকে বুকে নিয়ে বাপের ভিটেতে উঠতে হয় তাকে। ভাই তার মুখের উপর জানিয়ে দ্যায়,
--এসেছ এক কণে চালা টাঙিয়ে থাক। মোর সঙে কুনু লেপসা রেখ নি।
দুর্ভাগ্যের স্বর সবদিন নীচু থাকে। পারুল ভাইয়ের মুখের উপর রা'কাড়ে না।কোলে দু'দুটো দুধের শিশু।মা হয়ে কোথায় ফেলবে তাদের।স্বামীর দুয়ারে জোর করে থাকতে পারত সে। কিন্তু চাপা অভিমান তাকে বাধ্য করায় চলে আসতে। মনে মনে গর্জে উঠে,
---দুনিয়ায কুনুদিন কি মেইছ্যানারা দাম পাবে নি। ছ্যানা-মেইয্যা  সমান যারা বলে তারা শুদু বই পড়ে বলে,লেকচার দিয়ে বেড়ায়,জীবন দিয়ে বুজেনি।
চোয়াল শক্ত করে আবার কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে পারুল। জুটেও যায় একটা বাড়ির কাজ। তবে টোটোয় করে যেতে আসতে হবে তাকে। মেয়ে দুটোকে পাড়ার এক ঠাকুমার কাছে রেখে কাজে বেরিয়ে যায় পারুল।
ধীরে ধীরে পায়ের তলায় মাটি শক্ত করে সে। তবে শম্ভু এই কদিনে তাদের কোন খোঁজ নিতে আসে নি। পারুল শুনেছে আবার বিয়ে করতে নাকি উঠেপড়ে লেগেছে সে। পাড়ার কাকি-খুড়িরা স্বান্ত্বনা দ্যায়,
---অত জেদ করিসিনি পারু। যত হোক সোয়ামি ত তোর। বুজিয়ে বল না।
---অকে আর বুজাবনি খুড়ি। উ শুদু শরীল চায়।আর ব্যাটা। ব্যাটা দিতে পারলেই ভাল।নিজের মুরাদ নাই মোর উবরে রাগ ফলাচ্ছে! 
---শুনচি সে যে আবার বিয়া কোরবে।
---যেদিন করবে সেদিনই শাঁখা সিঁদুর ফেলাব।  বলে রাখিঠি। পেটের দুটা মেইছ্যানার পতি যার টান নাই সে ক্যামন বাপ বল দিখি। অমন ভাতারের মুখে জুন জ্বেলে দিই।

কিছুদিন পরেই পারুল ভাই-বৌয়ের কাছে শম্ভুর বিয়ের খবর পায়। ভোর না হতেই রাগে এয়োতির  চিহ্ন মুছে ফেলে সে। পাড়ায় তাকে গালমন্দ করতে ছাড়ে না। কিন্তু পারুলও মুখ বন্ধ না রেখে উত্তর দ্যায়। বলে,
---যে মোদের টান টানেনি তাকে শরীলে বয়ে বেড়াবো ক্যানে?এখন আমি ঝাড়া হাত-পা বুইলে। ওই মেইয়া দুটাই আমার সব।
কিন্তু সময়ের স্রোত কাকে কখন কোন তীরে টেনে তুলে বোঝা বড় দায়। ইদানীং আসতে যেতে পারুলের সাথে পরিচয় হয় রবিউলের। রাজমিস্ত্রির কাজে মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছে সে। প্রথমটায় মুসলমান জেনে ধারেকাছে ঘেঁষতে দ্যায়নি পারুল। কিন্তু রবিউল পিছু ছাড়ে না। গায়ে পড়ে কথা বলতে চায়। তাকে দেখে আর পাঁচটা লোকের মতো মেয়েখেকো মনে হয় না পারুলের। চোখের চাউনিতে বড্ড মায়া মেশানো যেন। তারপর কথা হয় একদিন সামনাসামনি। কথা ধীরে ধীরে ডালাপালা মেলে দ্যায় বসন্তের রঙিন দিগন্তে। কুঁড়ি ধরে রিক্ত শাখায়। জাতপাতের অন্তরাল মুছে গিয়ে নিবিড় সম্পর্কের সংরাগে রাঙা হয়ে উঠে দুজনের জীবন। কতবার পারুল নিজেকে শাসন করেছে নিজেই,
---এসব কী কচ্ছু পরুল? আর পা দেইসিনি আগুনে!উ যে জাতের জানাজানি হলে কুথাও থান পাবিনি। তোর দুটা মেইছ্যানা আছে।
যতবার নিজেকে বাঁধতে চেয়েছে ততবার বাধন খুলে গেছে রবিউলের কথায়। সুখেদুখে বিপদেআপদে দূর থেকে রবিউল আগলে রাখে তাদের। না চাইতেই সব পৌঁছে দেয় সে। তবে বাড়িতে আসতে মানা আছে তার। পারুল তাকে বোঝায়,
---তুমি বিয়াসাদি করনি। আমার দুটা ছ্যানা আছে। ক্যানে তুমি মোর পিছানে পড়ে আছ?তা বাদে আমি তমাদের জাতের নই। তমাকে ভাল লাগে,তবে জাত খুয়াতে পারব নি।
---আমারও তমাকে খুব ভাল লাগে?বুস্ স?
---কিন্তু শেষমেষ কী হবে বল দিখি?
--যা হবে দেখা যাইবে। এখন ত কথা বইলবে,দেইখা কইরবে নাকি?তমাকে না দেখলে মনটা ক্যামন জেন হয়।
পারুলেরও মনের ভিতর তার জন্য যে হাহাকার করে সেকথা জোর করে চেপে রাখে। কিন্তু সত্যিকারের  চাওয়া বেশিদিন অবদমিত থাকে না। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো হঠাৎ জেগে উঠে।  চারিদিক ধোঁয়া আর লাভা স্রোতে ঢেকে দ্যায়। 
সেদিন ঝড়জলের রাতে একা ফিরতে ভয় করছিল পারুলের। ফোনে ডাকে রবিউলকে। অটো থেকে নেমে বাঁধ ধরে কিছুটা আসতে হয়। পাশাপাশি হাঁটছিল দুজনে। তখনো ঝিরঝির করে ঝরছিল বৃষ্টি। মাথায় যেন বিদ্যুৎ চমক দিল পারুলের। হঠাৎ করে জাপ্টে ধরে রবিউলকে। রবিউল নিজেকে ছাড়াতে চায় না অমন দৃঢ় বন্ধনের আবেশ থেকে। তার পর কোথা থেকে যেন অঝোর বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল চরাচর। এমন বৃষ্টিতে শম্ভুকে নিয়ে ভিজতে চেয়েছিল পারুল। শম্ভু বৃষ্টির মাদকতা বোঝেনি,ক্ষুধার্ত মাংসাশীর মতো শুধু মাংসের স্বাদ পেতে চেয়েছে। অযাচিতভাবে যে মানুষটা সব দিয়ে যাচ্ছে,তাকে এই উপহারটুকু পারুল ভালবেসেই উজাড় করে দ্যায়।


রবিউল কথাটা জেনে ভেঙে পড়ে। পারুলের সামনে চোখ নামিয়ে বলে,
---বিশ্বাস কর ক্যানে তমার কুনো ক্ষতি কইরতে চাইনি। আমি তমাকে ভালবাসি।তুমি চাইলে...
বলেই হাত দুটো ধরে ফেলে পারুলের। ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নেয়,
---মন খারাপ করনি। তমার ত দোষ নাই। কারো দোষ নাই। ভালবসায় দোষ কিসের?
---লোকে যে তমার বদনাম দিবে?তুমি মেইয়ামানুষ!
---পুরুষের খিদা থাকতে পারে,ভালবাসা থাকতে পারে,মেইয়াদের থাকতে পারেবে নি ক্যানে?সে ত ব্যাটার পাবার লোভে আমাকে ছিঁড়ে খেত। আমরা ভালবেসেছি দুজনে দুজনকে। ই আমাদের ভালবাসার ফল। অ্যাকে আমি লষ্ট কোরবোনি কিছুতেই।
---কিন্তু অর বাপের নাম কী হবে? আমাকে সেই অধিকারটাও ত দিইতে চাইচ্ছ নি।
---দ্যাখি না পারুলের কপালে আর কত কী লিখে রেখেছে ভগমান!তুমি এখন যাও।
প্রবল দুর্যোগের মেঘ তার ভাগ্যাকাশের পশ্চিম কোনে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছিল। পারুল খেয়াল করেনি।তার গর্ভের ভিতরেও ক্রমে বড় হচ্ছিল সন্তান। কতদিন আর চেপে রাখা সম্ভব। জানাজানি হতেই সরগরম হয়ে উঠে পাড়া। রে রে করে ঝাঁপিযে পড়ে পারুলের উপর। গ্রাম সালিশে কত রকম অশ্রাব্য প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় তাকে। ভাইয়ের হাতে জুতো পেটা খেতে হয়। তবু মুখ খোলে না পারুল। সালিশি নিদানে গ্রাম ছাড়তে হয় তাকে।
 গ্রাম ছাড়িয়ে প্রায় তিরিশ কিমি দূরে সদর শহরে একটা থাকার ব্যাবস্থা  করে দ্যায় রবিউল। কাজও দ্যাখে দ্যায় তাদের এক স্বজাতির বাড়িতে।
দুটো মেয়ে আর পাঁচ মাসের পেটের সন্তান নিয়ে পারুলের আরেক পথচলা শুরু হয়। 
মতিউর আর ইসমাতারা বিবির কোন ছেলেপুলে নেই। আর হবেও না কোনদিন।শুধু টাকাই আছে কিন্তু নিঃসন্তান দাম্পত্যজীবনে সুখ তাদের এযাবতকাল অধরা। পারুলের মুখে সব কথা শুনে প্রস্তাবটা তাদের পক্ষ থেকেই আসে। কিছুতেই রাজি হতে চায় না পারুল। দিনরাত মাথায় ঘুরতে থাকে চিন্তা। রবিউলকে সব কথা জানায়। রবিউল বলে,
---তুমি ত আমার কথা মাইনছ না। এবার যা ভাল বুঝ কর। আসি আর অর মধ্যি থাইকব না।
কর্তা-গিন্নি দুজনেই পারুলকে বোঝায়,
---আমরা তোমার সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ কোরবো। তোমার দু'মেয়ের ভবিষ্যতেরও ব্যাবস্থা করে দুব আমরা। তবে এটাকে তুমি বিনিময় ভেবো না। তুমি আমাদের মেয়ের মতো। ভালবেসেই সব কোরবো। তবে একটাই শর্ত থাকবে কোনদিন তুমি ছেলের দাবী নিয়ে আসতে পারবে না।

বুকে পাষাণ চাপিয়ে শেষমেষ সিদ্ধান্ত নিয়েই নেয় পারুল। ডাক্তারি চিকিৎসা থেকে নার্সিংহোমে ভর্তি সবই দায়িত্ব নেয় মতিউর। ছেলে হয়েছে দেখে ইসমাতারা বিবি আনন্দে কেঁদে ফেলে। পারুলের মাথার পাশে দাঁড়িয়ে কপালে হাত বুলোতে থাকে। ভাড়া বাড়ির বদলে একমাস  মতিউরের বাড়িতে থাকবে পারুল। তেমনই কথা হয়েছিল।
অসম্ভব ফুটফুটে হয়েছে ছেলেটা। পারুল চোখ ছাড়া করতে চায় না। ইসমাতারা সারাদিন ছেলেটার কাছে কাছেই থাকে। 
মাস ফুরোতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে পারুল। এদিকে কথামতো মতিউর সব ব্যাবস্থা পাকা করে কাগজপত্র ধরিয়ে দ্যায় হাতে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে ছেলেটাকে বুকের কাছে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠে পারুল। মতিউর আর ইসমাতারার হাত ধরে বলে উঠে,
---মোর নাড়ি ছ্যাড়াঁ ধন। ভালবসার ফল। অকে বড় মানুষ কোরো। আমি ত রাক্ষসী মা পুতনা,মোর নরকেও কুনুদিন ঠাঁই হবে নি। তবু ত জানব ছ্যানাটা আমার ভাল জায়গায় আছে। গভ্ভে ধরেছিলম। লষ্ট হতে দেইনি কারো ভয়ে।
বলেই ধীর পায়ে মেয়েদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে পারুল। রাতে আর রাঁধাবাড়া করে নি। পরের দিন কী হবে,কোথায় যাবে ভেবে ভেবে ঘুমিয়ে যায়। সকাল না হতেই পুলিশ দরজায় হাজির হয়। ছেলে বিক্রির দায়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তাকে। সাখে মতিউর আর ইসমাতারাকেও।
খবর ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। নিউজে নিউজে ভেসে বেড়াতে থাকে পারুলের কুকীর্তির ইতিহাস। শিশু ও নারীকল্যান দপ্তররের আধিকারীক ক্যামেরার সামনে বলেন,
---ইটস্ এ ক্রাইম। এর ঘোরতর শাস্তি দরকার। তবে অলরেডি শিশুটিকে হোমে রাখার ব্যাবস্থা নেওয়া হয়েছে।
 ডি এম সাহেব মিডিয়াকে জানান,
---এমন কাজ একজন মা কী করে করতে পারেন সেটা ভেবেই আমি তো কমপ্লিটলি স্পিচলেস।

আদালত চত্বরে পারুলের সন্তান বিক্রির মামলার রায় নিয়ে মিডিয়া থেকে রাজ্যবাসী সবাই উৎসুক। সেই রায ঘোষণার পরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে পারুল। চিকিৎসায় একটু সুস্থ হতেই প্রিজন ভ্যানে তোলার তোড়জোড় করে মহিলা পুলিশের দল। হাতকড়া পরিয়ে পারুলকে যখন কোর্টের বারান্দা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল রবিউল। তাকে দেখামাত্রই চীৎকার করে উঠে পারুল,
---শালা হারামির বাচ্চা। তুই পুলিশকে খপর দিইছিলু আমি ছ্যানা বিক্রি করেছি। তোর নরকেও ঠাঁই হবে নি। তুই আমার ছ্যানার এতবড় সব্বনাশ করলি। তোকে ঘেন্না করি। থুঃ।
থুতুটা কার গায়ে পড়ল খেয়াল করে নি কেউ। কারণ তখন পারুলের দিকেই ছিল সকলের চোখ এবং সব রিপোর্টারের ক্যামেরা।

পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি