পিঞ্জর /শ্রীজিৎ জানা

পিঞ্জর

শ্রীজিৎ জানা


বাড়িতে লোক গিজগিজ করছে সারাক্ষণ। পাড়ার লোক বলে যদুবংশ। নিজেরাও হাসিমুখে বলাবলি করে, --রাবণের গুষ্ঠি আমরা! কোন অনুষ্ঠান পড়ল কী লৌকিকতা করতে ট্যাক ফাঁকা ফতুর হয়ে যাবে!! 
--ওইজন্যে আমাদের নেমতন্ন দিতে গাঁয়ে ভয় পায়।
তা ভয় পেলেও বড় কর্তার কিছু আসে যায় না।এমন ভাঙনের অকালে সে বেঁধে রাখতে পেরেছে তার পরিবারকে। দশরথ সামন্ত। বয়েস বিরাশি।স্ত্রী সৌদামিনী। চার ছেলে রাম লক্ষ্মন ভরত শত্রুঘ্ন। মেয়ে দুটি সবিতা আর কবিতা। অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে তাদের। চার বৌমাও এসেছে ঘরে। নাতি নাতনি নিয়ে মাথা গুন্তি কুড়িজন সদস্য। তার উপরে কাজের লোক আছে জন চারেক। হরি আর জগেন জমিজমার কাজ দেখে। নকুল সারাদিন লেগে থাকে হেলে- গাইয়ের পিছনে। চনি হেঁসেলের কাজে বৌদের হাতে হাত লাগায়। চার বেলা পাত পড়ে এদের।আর মাস ফুরালো দশ কেজি মোটা চাল সাথে খাটুনি মাফিক নগদ টাকা। চনি বাদে কারো বাড়ি দশরথ কর্তার গাঁয়ে নয়। তিনজনেই এসেছে পশ্চিমের জঙ্গলমহল থেকে। বার কয়েক ধানের কাজে জন খাটতে এসেছিল। তারপর থেকেই দশরথ কর্তার ঘরে আটমেনা হয়ে থেকে যায়। সবার ঘরেই বউ ছেলে মেয়ে নাতিপুতি আছে। আগে পালা করে ঘর গেলেও,আজকাল কেউ যেন যেতেই চায় না। দশরথের ছেলেমেয়ে নাতিনাতনিদের এরা নিজের ভাবে। সামন্ত বাড়ির লোকজন এদের অতটা নিজের  ভাবে কিনা সন্দেহ। তবে হুকুম খাটাতে ছেলে থেকে বুড়ো কেউ কম যায় না। এ নিয়ে মনে করবার জো থাকবে কেন? সামন্তরা হোলো মুনিব। মুনিবের মন জুগিয়ে চলাই তো তাদের কাজ। গায়ে গতরে দিতে হবে একশো, তেল মাখিয়েও চলতে হবে একশো।

দশরথ কর্তার চার ছেলে চার অবতার। রামের পেটে বিদ্যে নেই বেশি। গায়ে খাটুনির জোর আছে বিস্তর। সারাবছর জমিতেই পড়ে থাকা তার কাজ। কর্তা বলে,
---বড় কোচা মোর লখ্যি চরিত্ত বইয়ের বিনন্দ রাখাল। লাত মেরে যা পুঁতবে তাই হবে। অর জন্যেই ত ডাঙা বল আর জলা বল সব জমিতেই ধান-আনাজে হেউঢেউ খেলছে।
শুধু জমিতে খাটতেই পারে রামচন্দ্র। তাত-বাত তাকে সহজে কাবু করতে পারে না। এমন কি বউয়ের কাউচানি  না। কথায় কথায় মঞ্জরী ঝনঝন করে উঠে,
---অই খাটারই মুরাদ আছে। আর ত কিছু পারবেনি জম্মে। নিজেদের জন্যে ত ভাবলেনি কুনু দিন। অন্য ভাইদের দেখে শিক।
সারাদিনের হাড় খাটুনির শেষে বউয়ের কথায় কান দ্যায় না রামচন্দ্র। দশরথ সামন্তর শিক্ষা সে ছোট থেকে মনে রেখেছে। মায়ের সঙ্গে বচসা বাঁধলেই সে বাপকে বলতে শুনেছে,
--ম্যেঁয়া ম্যেঁয়ার মত থাকবে। পায়ের জিনিসকে কুনুদিন মাথায় তুলবেনি।
রামচন্দ্র জানে বউ মানে হেঁসেল ঠেলবে,পুরুষদের খাতিরদারি করবে,ছেলেমেয়ে মানুষ করবে। আর রাতে বিছানায় সুখ দেবে পুরুষকে। এইসব করতেই মেয়েদের জন্ম। তাদের মা সৌদামিনী তাই করে এসেছে এতদিন। মঞ্জরী তার কানের কাছে নিত্যদিন হাবিজাবি আউড়ে গেলেও কান দ্যায় না। তারচে জোর জবরদস্তি পাঁজাকোলা করে তুলে বিছানায় ফেলে লাঙল চষার মতো মঞ্জরীকে তুলোধোনা করে ঘুমিয়ে যায়। মঞ্জরী লোহার মতো শরীরটার অত্যাচার সহ্য করে কিছুক্ষণ। অসহ্য লাগে নাকি আরাম এতদিনেও বুঝে উঠতে পারেনি সে। এরই মাঝে তিন সন্তানের মা হয়েছে মঞ্জরী।
সেই একরত্তি  বয়েসে বাপের বাড়ির চৌকাঠ ডিঙিয়ে  হেঁসেলে ঢুকেছে সে। সুখ তার কাছে দজিল দুয়ারে তারের খাঁচায় ঝোলানো পোষা টিয়া কুচির মতো। পেটপুরে দানাপানি পায় চারবেলা। মাঝেসাঝে মন ভালো থাকলে কেউ কেউ আদুরে গলায় কুচি বলে ডেকে শুকনো সোহাগ ঢেলে যায়। কুচি ভাবে কত না খাতির করে তাকে। ব্যাস্ ওইটুকুই। দূরের নীলাকাশে ডানা মেলবার অবকাশ যে কোনদিনই তার কপালে জুটবে না তা সে নিশ্চিত জানে। দুর্বল দুটো ডানা কোনদিন খাঁচা ভাঙতে পারবে না। পারবে না বলেই খাঁচার অন্দরকেই ভাবে তার মুক্তির আশমান। মঞ্জরী জানে তার স্বামীর শিকলের মতো শক্ত হাতের ফাঁস খুলে,শ্বশুরের ভিটের মায়া ভুলে, ছেলপুলের টান কাটিয়ে এজন্মে তার বেরোনো সম্ভব নয়। যদিও তার অন্য কোথাও  মাথা গোঁজবার ঠাঁই নেই।
রামচন্দ্র যখন জমির আলে বসে জিরেন দেয়। শুক শুক করে বিড়ি টেনে ধোঁয়া ছাড়ে। তখন ভাবে আর বিড়বিড় করে বলে,
---শালা জীবনটা খেটে খেটেই হেজে গেল। বউটা বলে মিথ্যা নয়। কিন্তু কী আর কোরবো! ছ্যানাপনা গুলা যদি বড় হয়ে কিছু করে ত করু। বাপটার মুখের দিকে চেয়ে এত খাটি, নইলে ক্যালা পড়েছে মোর খাটার।
মেজ লক্ষ্মণের ধানের আড়ত আছে রসিকগঞ্জ বাজারে। দিনরাত আড়তের গুদামে পড়ে থাকে। কোনদিন ইচ্ছে হলে বাড়িতে আসে নতুবা নয়। টাকা ছাড়া বিশেষ কিছু বোঝে না সে। প্রতি পাউড়িতে জাব্দা খাতার হিসাব কষার মতো করে হিসাব কষে। মেজ বউ আরো এক কাঁটা উপরে। চরকির মতো ঘুরে বেড়ায় ঘরময়। দেওয়া -নেওয়া, ভাগ-ভিয়েনে মেজবউ বাড়ির এক নম্বরে। স্বার্থের দড়িতে একটু টান লাগলেই এর-তার কাছে খমখম করে বলে বেড়ায়। 
বিয়ের বহু বছর পর জমজ ছেলে হয় মেজবউের। লক্ষ্মণের মুখে আনন্দ তো ধরে না। একটা ভারী পাথর যেন তার ছাতি থেকে নেমে গেল। সব ভাইয়ের ছেলেপুলে থাকলেও তারই কেউ ছিল না।  মানে হোলো তার অংশের সম্পত্তি যেত মায়ের ভোগে। কিন্তু পঞ্চানন্দ  ঠাকুর মুখ তুলে তাকালেন। হবি ত হ একেবারে জোড়া ছেলে। সবই ঠাকুরের কেরামতি। খুশিতে লুকিয়ে লক্ষ্মণ মেজবউকে ভারী একটা হার দ্যায়। কিন্তু মেজবউ জানে তার স্বামীর পৌরুষের তেজ! আর কেউ না জানুক। সবাই আড়ালে তাকে বাঁজা বলে টিটকিরি করে বেড়াত। সংসারে সেও তো কম খাটে না।  শুনবে কেন সে লোকের কথা। লুকিয়ে নিজের ডাক্তারি পরীক্ষা করে। জানতে পারে তার মা হতে বাধা নেই। তার মানে যত দোষ তার স্বামীর। এত সহজে মেজবউ অংশীদারিত্ব ছাড়তে রাজি নয়। লোকের মুখে শুনেছে স্বামী গুদামঘরে মেয়ে নিয়ে মাঝেসাঝে রাত কাটায়। মেজবউ ভাবে সেও শোবে অন্যের কাছে। খিদের জ্বালায় নয়,স্বার্থের তাগিদে। একদিন বাগে পেয়ে গোয়ালঘরে নকুলকে জাপ্টে ধরে। এক গোছা টাকা গুঁজে দেয় হাতে। নকুল টাকার চেয়ে মেজবউকে দেখে লকলক করে উঠে। গাঁয়ে তার হাড় জিরজিরে বউ। মন ভরে না কিছুতে। এ যেন চাঁদ হাতে পাওয়া। রাতে রাতে মেজবউ গোয়ালঘরে আসে। আর নকুল তার জমে থাকা ইচ্ছেগুলোকে সজোরে উগরে দ্যায় মেজবউয়ের নরম শরীরে। নকুল তার পর থেকে সহজে  ঘরে যেতে চায় না। মেজবউ ছেলেপুলের মা হলেও নকুলের কাছে যেতে ছাড়ে না। লক্ষ্মণ তাকে সন্তান দিতে পারে নি। অমন সুখও দিতে পারে নি। এখন তার ভরভরন্ত সংসার। সংসারের ভিতর আরেকটা সংসার।
দশরথের বাড়িতে ফিবছর অঘ্রানে লক্ষ্মী পুজো হয়। সারা গ্রামে নেমতন্ন পড়ে। কুটুমবাটুম কাউকে বাদ দ্যায় না। তিন দিন ধরে চলে খাওনদাওন। একমাত্র ওই সময় মুম্বাই থেকে বাড়িতে আসে সেজ ছেলে ভরত। পাড়াগাঁয়ে বলে টাকার কুমীর। যদ্দিন দেশে থাকে দু'হাতে টাকা ওড়ায়। নামীদামী ব্রান্ডের মদ বইতেই দু'জন থাকে।বছরের ওই একবার পেট পুরে বিদেশি গিলতে পায় বলে একদল তো ভরতের পিছু ছাড়ে না। পায়ের তলা পর্যন্ত চেটে যেন ধবধবে পরিস্কার করে দিলে ধন্য হয়। ভরতের বউ ছেলেমেয়েদের গায়ের গয়নাগাটি  দেখে গাঁয়ের মেয়েবউরা হাঁ করে চেযে থাকে। মনে মনে হয়তোবা নিজের ভাগ্যের বুকে লাথি মারে। গাঁয়ের লোকজন ভরতের সোনার কাজ নিয়ে মাচার ঠেকের আলোচনা গরম করে। 
---দেক নসিব কাকে বলে!
--অ্যাকেই বলে দশরথ সাঁতের ব্যাটা। বামুনদের মেইছ্যানা টার কপালে জোর করে না  সিঁদুর দিবে,না গেরামে সালিশ বসবে,আর না উ বোম্বে যাবে।
---যাই বল বিশা বামুন জাত না ভেবে যেদি মেইছ্যানাটাকে তখন দিয়ে দিত আজ ধরে কে?
--- কেলুর কথা শুন তখন ছ্যানা পড়ে টেনে আর মেইছ্যানাটা এইটে! বিয়া বল্লেই বিয়া।
---তুই ঠিক বোলছু কিন্তু জানু বিশা বামুনের ঝিয়ের এখন কী দশা। ওই ত বাপের দয়রে এসে আছে। বরটা হাড় ডিগডিগা বাজারের দোকানে সকালে পুজা করে।রাতে মদ গিলে বকে মরে।
---তবে মেইছ্যানাটা আগের মতো আছে। পুরা সাদা ধপধপা ডবকা মাল।
---আরে শুনি নাকি ভরতের সঙ্গে হালে আবার ইন্টুপিন্টু চালু হইচে। কত দামী একটা ফোন নিয়ে উ ঘুরে জানু! অত টাকা কুথা পেইছে বল দিখি! সব ভরতের ঝেড়ে।
---শুনি, উই ত নাকি সংসার চালায় অদের।
ভরত এখনো ভুলতে পারেনি সেদিনের কথা। ছোটবেলার কথা সহজে মন থেকে মোছা যায় না। খুব ভাল লাগত তার এইটের সুদীপাকে। ওই বয়েসেই বিয়ে করতে চাইত ভরত। বন্ধু দুখা তাকে বলে,
---তোদের টাকা থাকতে পারে হাজার। কিন্তু তরা মাহিষ্য, অরা বামুন। কীকরে হবে তুই বল।
কথাটা একবারে ফেলে দেবার নয়। অথচ সুদীপা একটু চোখের আড়াল হলেই কালসাপাটির মাঠের মতো মনটা ফাঁকা ফাঁকা লাগত। একদিন তাই বৌদির সিঁদুর নিয়ে স্কুল ছুটির পর বাঁধের বটতলায় জোর করে কপালে ঘষে দ্যায় ভরত। গ্রামে সেদিন হুলুস্থুল ব্যাপার। সালিশ বসে আটচালায়। জরিমানা হয় ভরতের সাথে নাক খৎ। অপমানে ভোরেই ট্রেন ধরে সোজা বোম্বে হাজির।  এদিকে খোঁজ আর খোঁজ। সকলে ধরে নেয় দশরথের সেজ ছেলে আর নেই। সেই ছেলেই পাঁচ বছর পর হঠাৎ গ্রামে এসে সবাইকে চমকে দ্যায়।
আজও নেশার ঘোরে ভরত বলে,
--জানিস গ্রামের টান আলাদা জিনিস! বাইরে এত কামাই! মদ-মাগী কোনটারই অভাব নাই সেখানে। তবু দেশে এলে মনটা ঠান্ডা হয়। বটতলায় বসলে হেবি লাগে।
এরই মাঝে কেউ হয়তো কথা পাড়ে,
---ভরতদো দেশে একটা তুমি আলাদা ঘর কর মাইরি। মন খুলে সেথায় পাটি কোরবো সবাই। 
--- কথাটা ভাবিনি এমন নয়। কিন্তু বাপটা আছে ত।তবে এবার থেকে দু'মাস ছাড়া আসবো দেশে।
শেষের কথাটার সাথে আর কেউ কথা জুড়তে সাহস পায় না। তার ঘনঘন আসার কারণ যে বিশা বামুনের মেয়ে তা জানে সবাই। শুধু সামনে অত মদ আর মদের চাট খামোখা হাতছাড়া হয় সেই কারণে মুখে তালাচাবি এঁটে রাখে সকলে। 

ছোট ছেলে শত্রুঘ্ন প্রাইমারি স্কুলে চাকুরী করে। তার উপরে পার্টির হোমরাচোমরা নেতা। খালি বিক্রমপুর কেন, আরো পাঁচ-দশটা গ্রামের লোক তাকে চেনে। ঘরের কোন কিছুতেই সে তেমন একটা নাক গলায় না। এমন কি ছেলেমেয়েরা কোন ক্লাসে পড়ে সেটুকুর অব্দি খবর রাখে না। শুধু রাতটুকু বাড়িতে থাকে। মনের ভিতর তার রাক্ষুসে স্বপ্ন সাপের মতো হিসহিস করে ছুটে বেড়ায়। তাকে এম. এল.এ হতেই হবে। উপরতলার নেতাদের তোয়াজ করে চলে হরবখত্। বাড়ির কুকুর ভুলুর মতো তাকে পার্টির বিশ্বস্ত হতে হবে। সেই লক্ষ্যেই শত্রুঘ্ন মরিয়া।

দশরথ ছেলেদের মধ্যে ছোটর কাছেই কেবল গলার স্বরটা মিহি করে।সেই সুযোগে ছোটবউ পায়ে পা তুলে কাটায়।বড় আর মেজ রাগে বড়াসাপের মতো ফুললেও কামড় দিতে পারে না। ছোটবউ বুঝতে পারে। কিন্তু সহজে তাদের সাথে লাগতে যায় না। উল্টে হেসেলুটে কথা বলে। ঠেস মেরে জায়েরা কথা বললেও গায়ে মাখে না। বরের কাছে শিখেছে,
---সহজে রাগতে নেই। কাজ হাসিল করতে হলে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়।
মাথা ঠান্ডা রেখেই ছোট বউ এই বাড়ি থেকে নানানিধি জিনিস লুকিয়ে বাপের বাড়ি চালান দ্যায়। চোখে পড়েনি কারো তবে অনেকেই আন্দাজ করে।

দশরথের বয়েস বিরাশি,সৌদামিনীর সত্তর। সামন্ত গিন্নীর কোমর পড়েছে দু'বছর। বিছানায় পড়ে থাকে রাতদিন। দশরথের বুড়ো হাড়ে এখনো তেজ যথেষ্ট। মুখে সারাক্ষণ খিস্তি-খেউড় লেগেই আছে। কাজের লোক থেকে বউমা,নাতিপুতি কাউকে ছাড়ে না। জগেন যদি হঠাৎ বলে ফেলে,
---বয়স ত হইচে কত্তা। ইবার এট্টু থাম ক্যানে।
অম্নি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে দশরথ,
---তুই থাম ভিকমাগা। অম্নি এই ঠাটবাট ধরে রেখেছি। এরা ভাল মুখের পাত্তর নয়। বাখান না দিলে কুটিটিও লাড়বেনি। সব বিচি দিবে।

জগেন থেমে যায়। পল মাড়াই করা গরুর মতো সে এই সংসারের খুঁটিতে বাঁধা হয়ে ঘুরে চলেছে। এখানেই তার জীবনের তিনভাগ সময় কেটেছে। শেষটুকু নিজের গাঁয়ে কাটাতে চায়। কিন্তু বন্ধন কেটে বেরুতে পারে না সহজে। আপন কারা, পর কারা-সেটাই গুলিয়ে ফেলেছে জগেন।
চনিই শুধু দশরথকে ভয় পায় না।দশরথও বিধবা চনিকে গালিগালাজ দেয় না সহজে। সেই কবে থেকে দশরথের দেখভাল করে চনি। গিন্নি বিছানায় পড়া থেকে দশরথকে তেল মাখিয়ে স্নান করাতে হয় তাকেই। তেল মাখতে মাখতে এই বয়সে আলাদা এক সুখ পায় দশরথ। চনির হাত এখনো বেশ নরম লাগে দশরথের। বুকেরটাও বাতাবি লেবুর চেয়েও বড়। সৌদামিনীর কবেই চুপসে ঝুলে গেছে। দশরথ বাঘের মতো চওড়া পাঞ্জা দিয়ে চেপে ধরে চনির বুক। বাধা দ্যায় না চনি। কতবারই তো এমন করেছে দশরথ। এর চেয়েও অন্য কিছু করেছে। এখন আর পারে না। শুধু গলার স্বর নামিয়ে বলে,
--চনি সেটাতেও এট্টু ভাল করে মাখি দে।
চনি মাখায় সানন্দে। ঘরে তার এক ছেলে এক মেয়ে। বর কবেই গত হয়েছে। দশরথের সংসারে কাজ করেই তার দিন চলে। পাঁচ কাঠা ধানি জমি তাকে লুকিয়ে কিনে দিয়েছে দশরথ। আজকের দিনে এতটা কে কার জন্য করে! চনি তাই দশরথের সংসার ছেড়ে যেতে চায় না। এমন কী দশরথের বুড়ো হাতের থাবা থেকেও নিজেকে বাঁচাতে চায় না। 

সৌদামিনী সন্দেহ করত চনিকে একসময়। বিছানায় পড়া থেকে সেই সন্দেহ আরো জোরালো হয়েছে তার। গুয়েমুতে লেপ্টে থাকলেও চনিকে কাছে ঘেঁষতে দ্যায় না। বড়বউ বড়ছেলে তার দেখভাল করে। চনি বিড়বিড় করে গাল পাড়ে সৌদামিনীকে,
---মরেও নি বুড়ি শুকনি। শুয়ে শুয়ে অই চিল্লি যাবে। এখনো যেন অর ভাতার অন্যকে লিয়ে পালি গেল! ই-কি হইচে তোর আরো হবে,পোকা পড়ে মোরবি। শাউড়িকে তখন কম জ্বালিছু! সব্বনাশি!
বিছানায় পড়ে থেকে গায়ে তার ঘা-পচন শুরু হয়েছে। দশরথ দিনে একবার হলেও সৌদামিনীর ঘরে আসে। মাথার পাশটায় বসে। তাতেই যেন সৌদামিনীর সুখ। আরো কটাদিন বাঁচার ইচ্ছেটা তখন তার মাথাচাড়া দ্যায়।

দশরথ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কখনোকখনো কোথায় যেন তলিয়ে যায়। ভাবে জীবনের যাকিছু হিসাবকিতাব এখানেই ফয়সালা হয়ে যায়। কেউ কারো জন্য নয় সংসারে। গতর যদ্দিন কদর তদ্দিন। সে নিশ্চিত জানে শুধু তার চোখ বুজানোর অপেক্ষা।তারপরই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে তার ঘরদোর বিষয়আশয়। মনটা উদাস হয়ে উঠে তার। দলিজদুয়ারে কুচি টিয়ার খাঁচার দিকে নজর চলে যায়। বহুক্ষণ ধরে ক্যাঁ-ক্যাঁ করছে পাখিটা। বোধহয় দানাপানি দ্যায়নি তাকে। বয়েস হলে সবাই অবহেলার পাত্র হয়ে যায় স্যসারে। কুচিটাও অনেকদিন হোলো তার বাড়িতে আছে। পাখিটারও মায়া পড়ে গ্যাছে এখানে। খাঁচার দরজা খুলে দিলেও উড়ে পালায় না। উড়ে গেলে পাখিটা বেঁচে যকবে। কিন্তু খাঁচাটার ঠাঁই হবে শেষ পর্যন্ত কোন আস্তাকুঁড়েয়।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি