গওহরজান - এক বিস্মৃত অধ্যায় - ১৬/দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

গওহরজান - এক বিস্মৃত অধ্যায় 
পর্ব - ১৬                                

দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী    


ক্রমে দাদরা শেষ করেন গওহরজান। তখন ভোর হব হব করছে। রাজা দিগম্বর মিত্তির বুঝি কিছু ভাবছিলেন মনে মনে। তিনি আসলে জানতেন সেই গানটার কথা। অসাধারন সে গান। সব আসরে গাওয়াও হয় না। তবে হলে সমঝদারেরা সমঝে যায় যে এ হলো হিন্দুস্থানের নাইটিঙ্গেলের এক বিরল নজরানা। সেই বিরল গানটির কথা হলো - 'যমুনে, এই কি তুমি সেই যমুনা প্রবাহিণী'। রাজা বাহাদুর দিগম্বর মিত্তিরের অনুরোধে আধফোটা ভোরের বিলাসী প্রহরে গওহরজান সেই গান ধরলেন। নেচে নেচে মুদ্রা দেখিয়ে গওহরজান মহারাজের কাছে পেশ করলেন সুরের নজরানা। সারেঙ্গীওয়ালা আর তবলচির ফিনফিনে আদ্দির শেরওয়ানি ঘামে ভিজে গেছে ততক্ষনে। বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে গওহরের কপালে, ঠোটের উপরে। অমন কালোয়াতি পেশ করার মেহনত তো কম নয়। রাজা বাহাদুর এবারে ফরাস থেকে উঠে পড়লেন। নিজের গলা থেকে বহুমূল্য মুক্তোর হার খুলে নিয়ে পরিয়ে দিলেন গওহরজানের গলায়। 'বহুত খুব বাঈজী, বহুত খুব। সত্যি তুমি দেখালে বটে। আমার ঝামাপুকুরের বাড়ির শুকনো বৈঠকখানায় সত্যি সত্যি যমুনার ধারা বইয়ে তবে ছাড়লে'! 
কতদিন আগেকার কথা এসব। তখনও সময় গড়িয়ে গড়িয়ে ঢিমে তালে চলত। কলকাতার বাবুদের বিলাসের ঢঙই ছিল অন্য ধারার। বাস্তবিক তাঁরা গুণীর গুণপনার কদর করতে জানতেন। আর সত্যিকারের কলাবৎ শিল্পীও জন্মেছিল ছিল বটে সে যুগে। ওস্তাদেরাতো বটেই, সেইসঙ্গে কলকাতার ধ্রুপদী সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করতে এসেছিলেন বেশকিছু বাঈজী। সবাই হয়ত গওহরজান ছিলেন না।
বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক ঘটনায় তিতিবিরক্ত হয়ে গওহরজান তখন কলকাতাকে চির বিদায় জানিয়ে মহীশূরে চলে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে ফেলেছেন। মহীশূরের রাজা ওয়ারিয়াররা তাকে সসম্মানে নিয়ে যেতে চেয়েছেন ওখানে।         
এরপরে গওহরজানকে আমি দেখেছিলাম বৃন্দাবন বসু লেনের সেই গুহ বাড়ির জলসাঘরে। প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় পৌঁছানো হিন্দুস্তানের নাইটিঙ্গেল ভাও করে সেখানে গিয়ে উঠেছিলেন 'কৌন গলি যায়ে মোরে শ্যাম'।            সেই আসরেই এক কাণ্ড ঘটে ছিল। গান চলছে, তবলচি ঠেকা দিচ্ছে, কিন্তু হঠাৎই আসরে ভেসে এলো এক পুরুষ কন্ঠ 'এটা ঠিক হচ্ছে না। আপনার গানের ইজ্জত চলে যাচ্ছে এতে -'।                 
গওহরজান ততক্ষণে চমকে উঠেছেন, অন্যান্য শ্রোতারাও। কে বললে ওকথা? ভিড়ের মধ্যে বোঝা গেল না। সবাই সুরে এমনই বিভোর। তখন প্রৌঢ়া গওহরজানই শ্রোতাদের মাঝে চোখ ফিরিয়ে শুধোলেন 'ইয়ে বাত কৌন বোল রঁহে হ্যায়?' তখন ফরাসের ওপরে উঠে দাঁড়িয়েছেন ওস্তাদ তবলিয়া ভূতেশ্বর বাবু। তাঁকে চিনতেন  গওহরজান। গুণী তো গুণীকে চিনবেই। গওহরজান হেসে বললেন 'ও ভুতো বাবু, আরে আইয়ে আইয়ে তসলিম রাখিয়ে, পেশ কিজিয়ে জনাব-'।                     
ভূতেশ্বর বাবু সত্যি সত্যি ডুগি তবলাটাকে আগলে বসে পড়েছিলেন সেদিন। ঘাটটাকে একবার বেঁধে নিয়েই বোল ফোটালেন। কখনও 'ধাগে নাগে নাগে ধিন', কখনও 'ধা ধিনা না তিনা'। কোয়েলকণ্ঠী গওহরজানের গানের সঙ্গে পাল্লাকষে তখন তাল দিলেন ভূতেশ্বর বাবুর তালিম নেওয়া হাতের চেটো। কাওয়ালীর আড়ির ঠেকায় বুঁদ হয়ে গেল মজলিশ। সুরের রংবেরঙের ফুল ফুটতে শুরু করলো যেন মাতোয়ারা সভায়।                     
সেই শেষবার ভগ্নহৃদয় গওহরজান কলকাতায় এসেছিলেন। তারপর হিন্দুস্তানের নাইটিঙ্গেলকে কোঙ্কনীদের দেশেই ইন্তেকালের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে শুনতে কি গওহরজানের মনে পড়েছিলো সুদূর কলকাতায় গাওয়া সেই দাদরা গানের কলি? 'ফাঁকি দিয়ে প্রানের পাখি উড়ে গেল আর এল না' নাকি হৃদয়ের গোপন কোণে বেহাগের মত প্রতিধ্বনি তুলেছিল সেই চমকদার ঠুমরির প্রথম দুটো লাইন। 'জংলা পাখি কখনো পোষ না মানে কোরোনা কোরোনা পীরিত বিদেশী সনে'। এ কথার জবাব একমাত্র দিতে পারতেন গওহরজানই, আর কেউ নয়"।
বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড বন্ধ হয়ে যাবার পরে গওহরজানের গান প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেল। তিন মিনিটের অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে গাওয়া সপ্তকে গান অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং অনভিজাত বলে মনে হতে লাগল। যাইহোক ১৯৬৮ সালে বম্বেতে গওহরজানের একটি ফটোগ্রাফির উন্মোচন করেন দেওধর স্কুল ও ইণ্ডিয়ান মিউজিকের সভাপতি শেঠ খাটাউভাই বল্লভদাস। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন বোম্বের হিন্দুস্তানী সংগীতের বামনরাও দেশপান্ডে, মঘুবাই কুরদিকর, উস্তাদ আজমত হুসেন, উস্তাদ লতাফত হুসেন প্রভৃতি দিকপাল সঙ্গীত ব্যক্তিত্বেরা। শ্রী দেশপান্ডে উল্লেখ করেছিলেন কিভাবে গওহরজানের গায়কী রীতি গোবিন্দরাও তম্বেকে মারাঠা নাট্য সংগীতে পাঞ্জাবি অঙ্গ ব্যবহার করতে প্রভাবিত করেছিল। গওহরের সৃষ্ট ঠুমরী যা বেগম আখতার এবং সিদ্ধেশ্বরী দেবীর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গওহরজানের কাছে স্বল্পসময়ের প্রশিক্ষিত মেহমুদভাই যিনি সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে গওহরজানের গাওয়া কয়েকটি ঠুমরী ও খেয়াল গানের উপস্থাপনা করেছিলেন। এইভাবে গওহরজানের সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা ও শোনার মাধ্যমে অনেকেই গওহরের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করেন। ১৯৯৪ সালে এইচ এম ভি ও সারেগামা কোম্পানির পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানস চয়েস' নামে গওহরজানের ১৮টি বিখ্যাত গানের এক সঙ্কলন বেরিয়েছিল। তবে ভারতীয় রেকর্ডিং শিল্পের পরিবর্তন ও মূল কান্ডারীকে মনে রাখার জন্য খুব একটা কারওরেই মাথাব্যথা ছিল না। ফলে এই ভাবে তিনি ধীরে ধীরে প্রায় বিস্মৃত একটি চরিত্রে পরিণত হতে শুরু করলেন। 

সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ শ্রী ডি,পি, মুখার্জি  ১৯৫২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর আকাশবাণীতে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতা 'মিউজিক এ্যাণ্ড মিউজিসিয়ানস'-এ এবং পরে 'ইণ্ডিয়ান লিসনারে' প্রকাশিত -  গওহরজানের সময়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন এই ভাবেই। "আমাদের সময়ে গওহরজান নামে এক শিল্পী ছিলেন এবং তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবুও ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। আমি কোনোক্রমে সঙ্গীত জগতে বেশ পরিচিতি আছে এমন এক বন্ধুর সঙ্গে তার বাড়িতে প্রবেশ করার উপায় বের করলাম। তিনি সেসময় এক নবাবকে গান শোনাচ্ছিলেন। তিনি গাইলেন আড়ানা, বাহার, সুহা, সুঘরী, কিন্তু নবাবের পছন্দ ছিল ঠুমরী। স্পষ্ট মনে আছে উনি আড়ানায় একটা ধ্রুপদ গাইলেন, ওই রাগেই গাইলেন সাদ্রা, তারপর তৃতীয় খেয়ালটিও গাইলেন ওই আড়ানাতেই। তখন থেকেই আড়ানায় মনোযোগ দেওয়া আমার কাছে কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি দেশের সেরা শিল্পীরা গাইলেও। পরে অনেকবারই প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তাঁর গান শোনার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে আজকের বিশ্ব জানতেই পারলো না কিভাবে ঠুমরীর শরীরী আবেদনের আড়ালে একজন বিরাট মাপের খেয়াল গায়ক হারিয়ে গেল। দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য গওহরজান পুশতু গান বা যে কোন ধরনের চটুল গান গাইলেও তাঁর একটা বিরাট ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিল। তাঁর পরেও অনেক অসাধারণ খেয়াল শিল্পী নিশ্চয়ই এসেছেন, কিন্তু তাঁদের আমি শ্রেষ্ঠ বলবো না। তাঁরা নিঃসন্দেহে দক্ষ, কিন্তু খুব অনিয়মিত গাইলেও গওহরজান যে উচ্চ মানের খেয়াল গাইতেন, তার চেয়ে অনেক পিছিয়ে।" 
পরিশেষে গওহরজানের লেখা একটি গানের লাইন দিয়ে এই লেখা শেষ করছি 
"হাম তো মরকর ভি কিতাবোঁ যেঁ রহেঙ্গে জিন্দা,    
গম উনহি কা হ্যায় জো মর জাঁয়ে তো গুজর জাতে হ্যাঁয়"। 

অর্থাৎ আমি মৃত্যুর পরেও, আমাকে নিয়ে লেখা বইয়ের মধ্যে অমর হয়ে থাকবো, কিন্তু তাদের জন্য করুণা হয়, যারা শুধু মরে না, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।                         
  সমাপ্ত

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি