পথরেখা গেছে মিশে-পর্ব ২/ মিলি ঘোষ

পথরেখা গেছে মিশে-পর্ব ২

প্রতিভার অন্তরালে

মিলি ঘোষ

তখন বাড়িতে গ্যাসও ছিল না। অন্ধকার থাকতে উঠে অপার মা উনুন ধরাত। তারপর চা থেকে শুরু করে সারাদিন চলত ওই উনুনের সামনে বসে কাজ। বড়ো সংসারে একার হাতে সব সামলাত। 
 তবু মা'কে বড্ড বিরক্ত করত অপা। খুব জ্বালাত। কতবার খুন্তি নিয়ে তেড়ে এসেছে। দৌড়ে পারেনি অপার সাথে। তবে কখোনো ধরতে পারলে অপার কপালে অশেষ দুর্গতি। বোনকে বাঁচাতে দাদারা, দিদিরা ছুটে এসেছে কতবার। চপেটাঘাতগুলো ওদের পিঠেই পড়েছে। অপা বেঁচে যেত শারীরিকভাবে। কিন্তু মুখের বর্ষন চলত আরো কিছুক্ষণ। আস মিটিয়ে মারতে না পারলে যা হয়, রাগটা তো রয়েই যেত। ঠিক কী কী অন্যায় করত, আজ আর অপার মনে পড়ে না। বোধহয় সেটা গৌণই। নাহলে, পরে প্রসঙ্গ উঠতই। 

শুধু তো রান্না না। সংসারের যাবতীয় কাজ মা একার হাতে সামলাত আর অপা ভাবত মা তো করবেই। মায়েরা তো এমনই হয়। কত সহজে সব কিছুকে স্বাভাবিক মনে হতো অপার। বাড়িতে খেলার চল ছিল। আজ একজনের পা মচকাত, কাল আর একজনের পা কেটে যেত। সব ক্ষেত্রে ধন্বন্তরি অপার মা। চুন হলুদ গরম করে দেওয়া, ওষুধ লাগিয়ে দেওয়া, কারোর পায়ে কাঁটা ফুটলে সেটা বার করে আনা, কিছুই বাদ ছিল না। আসলে অপার মায়ের খেলার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। নিজেও একসময় স্পোর্টসে প্রাইজ পেয়েছে প্রচুর। তাই কারোর খেলাতে বাধা দেয়নি কখনও। 
কোথায় কোন মাঠে ঘাটে খেলে বেড়াত অপা, মা খোঁজও নিত না। চোখের আড়াল হলেই যে দুশ্চিন্তা, সেরকম অবস্থাও ছিল না। তবে যেখানেই খেলতে যাও, ফিরতে হবে সন্ধ্যের মধ্যে। এটা একটা অলিখিত নিয়ম ছিল। বিকেল শেষ হলে সবাই যে যার মতো বাড়ির পথে।  

এরপর বাড়িতে যখন গ্যাস এলো, কিছুটা সুবিধা হলো অপার মায়ের। কিন্তু বসে থাকার মানুষ তো সে নয়। ফাঁক পেলেই সেলাই করছে, নয় ছবি আঁকছে, নয়তো কোনো বই পড়ছে। আর সেলাইয়ের কী বাহার! সূচের কাজ, উলের কাজ, মেশিনে জামা বানানো, সবটাই নিখুঁত। অপা শুনেছে বড়োদের কাছে, বিভিন্ন সেলাই প্রতিযোগিতায় মায়ের পুরস্কার পাওয়ার কথা। 'দৈনিক বসুমতি' পত্রিকায় অপার মা'র সেলাইয়ের বর্ণনা বেরোত ছবি সমেত। দুঃখের বিষয় ১৯৯২ সালে এই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

অপার জন্মের অনেক বছর আগের কথা। অপার বাবা তখন মুর্শিদাবাদে একটি স্কুলের শিক্ষক। ওই স্কুলে অপার মা সরস্বতী পুজোয় আলপনা দিত বালি, রঙ ইত্যাদি মিশিয়ে। দূর দূরান্ত থেকে গ্রামের মেয়ে বউরা মাঠের পথ ধরে লাইন করে সেই আলপনা দেখতে আসত। অপার মা'কে তারা ডাকত 'মাস্টারনি'। মুর্শিদাবাদে থাকতেই জেলাভিত্তিক সেলাই প্রতিযোগিতায় অপার মা প্রথম হয়ে পুরস্কার হিসেবে একটা হাতির দাঁতের ঘোড়ার গাড়ি পেয়েছিল, যা অপাদের বাড়ির শোকেসে রাখা থাকত। 

 এই মা দিনে দিনে হয়ে উঠল শুধুমাত্র ঘরণী। এত প্রতিভা দাম পেল না। সংসার সংসার করে সব হারিয়ে গেল। বাড়ির পুজোয় মা'কে আলপনা দিতে দেখেছে অপা। পরে অবশ্য মায়ের সন্তানদের মধ্যে যাদের আঁকার হাত ভালো, তারাই দায়িত্ব নেয়। তবে সেলাই চলতই। অনেকটাই সংসারের প্রয়োজনে। একটা জামা ছিঁড়ে গেলে আর একটা আসবে, সে রেওয়াজ তখন ছিল না। মা'ই সেলাই করে দিত সবার জামাকাপড়। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় ছিল যেটা, অপারা পুজোতে কেউ কেনা জামা পরেনি। সব জামা মেশিনে বানিয়ে দিত মা। অনেকেই ভাবত, দোকান থেকে করানো। মা বানাতে পারে এত নিখুঁত পোশাক, বিশ্বাস করতে কোথাও একটু আটকাত হয়তো। দিনের বেশিরভাগ সময় যার রান্নাঘরে কাটে, তার প্রতিভার ব্যপারে কৌতূহল মানুষের না থাকাই স্বাভাবিক। 

পুজোর ছুটি বলে কিছু ছিল না অপার মায়ের। সপ্তমী পার হয়ে গেল, অষ্টমী যেতে বসল, অপার মা'র মেশিন থামে না। পর্দাগুলো তখনও রেডি হয়নি। তারপর নবমী থেকে শুরু হতো নানারকম খাবার বানানো। সে তো আর একটু আধটু নয়। বানিয়েই যাচ্ছে, বানিয়েই যাচ্ছে। অপার বাবার ছাত্রছাত্রীরা আসবে বিজয়ার প্রণাম করতে, তারই প্রস্তুতি চলছে। কতরকম সুস্বাদু খাবার। সবাই খেয়ে ভালো বলত, ব্যাস, অপার মা তাতেই খুশি। এই জীবনধারায় কোনওরকম পরিবর্তন ছিল না। একইভাবে চলত যুগ যুগ ধরে। পুজোর আনন্দ বলতে অষ্টমীর দিন পাড়ার পুজো মণ্ডপে পুজো দিয়ে অঞ্জলি দেওয়া আর দশমীর বিকেলে ঠাকুর বরণ করে সিঁদুর খেলে বাড়ি ফেরা। ব্যাস এ'টুকুই। এরপরেও কখনও মনে হয়নি অপার, এই মানুষটারও জীবনে আনন্দের প্রয়োজন আছে। এই মানুষটারও শরীর বলে একটা পদার্থ আছে। সংসার থেকে অপা একটা জিনিসই শিখেছিল, মায়েরা এমনই হয়। 

কিছুটা বড় হবার পরে, মা'কে একটু একটু করে বুঝতে শিখল অপা। খুব হয়তো না, অল্প হলেও বুঝত। ইতিমধ্যে বন্ধুদের সাথে ঠাকুর দেখতে যাবার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে সে বাড়ি থেকে। বাড়ি ফিরে দেখত, মা বাড়িতে একা বসে আছে। অপা বুঝত, সবার জীবনে আনন্দ আছে, শুধু মা'র নেই। একটা চাপা কষ্ট হতো। 
এত যে পরিশ্রম করত, কখনও বলত না, পড়া বাদ দিয়ে ঘরের কাজ কর। বই সামনে রেখে অপা যে কী পড়ছে, সে অপাই জানে। কিন্তু মা জানে, মেয়ে তার পড়াশুনা করছে। তার মধ্যে নাচ প্র্যাকটিস কর, হারমনিয়াম নিয়ে বোস, এসব দিকেও পূর্ণ নজর ছিল। তবে সেই যে মা'কে বুঝতে শুরু করল অপা, সেটা দিনে দিনে বাড়তেই লাগল। আসলে অপা তখন নিজের চোখে জগৎ দেখতে শুরু করেছে। বন্ধুদের সাথে বেরোনো বন্ধ করেনি ঠিকই, কিন্তু ঠাকুর দেখা বন্ধ করল। বাড়ির দুর্গা ছেড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে আর দুর্গা খুঁজতে যায়নি অপা। 

অপার বিয়ের পরে ওর মায়ের জীবনে এল এক বিরাট ছন্দপতন। কর্কট রোগে আক্রান্ত হলো অপার বাবা। দাদারা বাবাকে নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করত। আর অপার মা ঘরে বসে চিন্তা করত। সব তো তাকে বলা হতো না। তাই সন্দেহ, দুশ্চিন্তা বেড়েই যেত। যেদিন অপার বাবার বায়প্সি রিপোর্ট এল, অপা সেদিন নার্সিংহোমে। মা'ও উপস্থিত। মা'কে আড়াল করেই একে একে সবাই জেনে গেল রিপোর্ট। কিন্তু মায়ের মনকে, মায়ের চোখকে কেউ কোনওদিন ফাঁকি দিতে পেরেছে ?
 উঠে এসে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, "কী হয়েছে, তোরা আমাকে বলছিস না কেন ?"
 ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রসঙ্গ। কিন্তু ধকলটা তো নিতে হলো তাকেই। বাবার সেবা শুশ্রুষার পুরো দায়িত্ব নিল মা একা। মা'রও যে বয়স বাড়ে, মা'রও যে কষ্ট হয়, বুঝতেই পারল না অপারা কেউ। 
 
 নিজের স্বামীকে বাঁচানোর জন্য জান লড়িয়ে দিল অপার মা। কিন্তু বাবা মারা যাবার পর থেকেই কেমন যেন চুপ করে গেল মা। এইবার যেন সে টের পেল, তারও বয়স হয়েছে। গ্রাস করল চূড়ান্ত একাকিত্ব। ছেলে-বউরা তো কাছেই ছিল। তবু রাস্তার দিকে তাকিয়ে বারান্দায় বসে থাকত, যদি মেয়েরা কেউ আসে। বোধহয় বুঝতে পেরেছিল, বেলা শেষ হয়ে এসেছে। সবাইকে দেখার ইচ্ছা হতো। 
 অপার বাড়িতে তখনও ফোন আসেনি। মাঝেমাঝে বুথ থেকে মা'কে ফোন করত অপা। কিন্তু কথা বলে বুঝতে পারত, মা সব কথা ঠিক যেন শুনতে পায় না।  অপার মেয়ে তখন একদমই ছোটো। এতটুকু বাচ্চাকে নিয়ে বেশি যেতেও পারত না মায়ের কাছে।  মোবাইল তো দূর অস্ত, একটা ল্যান্ড ফোনও ছিল না অপার বাড়িতে। ফোন যখন এল, মা তখন আর কানে শুনতে পায় না। 

এরপর হঠাৎই কাউকে কিছু না বলে ছুটি নিয়ে নিল অপার মা। এই প্রথম সৃষ্টিকর্তা বোধহয় তার প্রতি সুবিচার করলেন। ভুগতে হলো না। ঘুমের মধ্যেই পাড়ি দিল অজানার দেশে। 
অপার বাবার এবং মায়ের চলে যাওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান খুব বেশি বলা যায় না। কিন্তু এই মধ্যের সময়টায় অপার মা অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেছিল। এই নীরবতার একমাত্র কারণ কি স্বামীর প্রতি অভাববোধ ? নাকি আরো কিছু।
নিজের জীবন থেকে অপা যেটুকু বুঝেছে, শিল্প-সাহিত্য এমন এক মহাসাগর, যেখানে একবার ডুব দিলে মানুষ তার স্বাদ পেয়ে যায়। জীবন যদিও সুযোগ পেলেই ছুরি শানায়। তবু, ঢেউয়ের তালে তালে বহুদূর ভেসে যাওয়া যায়। 
অপার মা কী সেই জায়গাতেই আঘাতপ্রাপ্ত হলো ? জীবনের হিসেব মেলে না কারোরই। তবু একজন মানুষ, যার শিরায় শিরায় শিল্পীসত্তা, শুধু সংসারের তাড়নায় তার সব কিছু মুছে গেল। জীবনের শেষ প্রান্তের নীরবতা কী সে'কথাই বলে গেল ?

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. পরবর্তী পর্বের জন্য উন্মুক্ত হয়ে র‌ইলাম।

    ReplyDelete
  2. ধন্যবাদ

    ReplyDelete
  3. খুব দরদি মনের লেখা 👌👌

    ReplyDelete
  4. আমরা প্রায় অনেকেই নিজেদের ঘরে ঘরে অপার মা কে দেখেছি.এখনকার মত জীবন বোধটা স্বচ্ছ ছিল না তাই জানতে অজান্তে সেই মা দের কষ্ট দিয়ে ফেলেছি রে মিলি.....এখন সেই দিনগুলো ফিরে পেতে ইচ্ছে করে.....সেটা সম্ভব নয় বলে চোখের জল শুকায় না

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি