নেতাজির পুরুলিয়া সফর/সূর্যকান্ত মাহাতো

জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

পর্ব - ৩২

নেতাজির পুরুলিয়া সফর

সূর্যকান্ত মাহাতো


স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্ণ হল। সেই পূর্তি উপলক্ষে দিকে দিকে নানান রকমের উৎসব ও  অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে। অথচ এই আগস্ট মাস এলেই স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর কথা খুব মনে পড়ে। মনটা তখন বড় উদাস হয়ে ওঠে। কিছুটা ভারাক্রান্তও। কারণ এ মাসেই তার জীবনে দুটো বড় বড় বিপর্যয় ঘটেছিল। একটি হল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার। কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশনে নেতাজির সভাপতি পদে পুনরায় দাঁড়ানো নিয়ে কংগ্রেসের মধ্যেই সদস্যরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। নির্বাচনে গান্ধীজী সুভাষের চরম বিরোধিতাও শুরু করেছিলেন। সেটা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, নেতাজির বিরুদ্ধে পট্টভি সীতারামাইয়াকে প্রার্থী পর্যন্ত দাঁড় করিয়েছিলেন। কংগ্রেসের ইতিহাসে যা কখনও ঘটেনি। কোনও দিন সভাপতি পদ নিয়ে নির্বাচন হয়নি। গান্ধীজির বিরোধিতায় সেটাও সম্ভব হল। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সংবাদপত্রে একটি বিবৃতিও দিয়েছিলেন, "আসন্ন কংগ্রেস অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসুর পুনর্ণির্বাচন দেশের পক্ষে ক্ষতিকর হবে" (ফিরে দেখা গান্ধীজি ও নেতাজি/ নারায়ণ সান্যাল)। তা সত্ত্বেও নেতাজির ২০৫ ভোটে নাটকীয় জয়লাভ ঘটেছিল। নেতাজি পেয়েছিলেন ১৫৮০, পট্টভি পেয়েছিলেন ১৩৭৫। এরপরেই গান্ধীজির সেই ঐতিহাসিক উক্তি: " পট্টভি সীতারামাইয়ার পরাজয় আমারই পরাজয়।" পরে গান্ধী পন্থী নেতাদের ইস্তফা, নেতাজির সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। এবং সবশেষে ১৯৩৯ সালের ১১ই আগস্ট কংগ্রেস তাকে দল থেকেই বহিষ্কার করেছিল। অন্যটি হল ১৮ই আগস্ট ১৯৪৫-এ তার বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর প্রকাশ। সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যক্তিগত জীবনে এই দুটো ঘটনা নিয়েই সব থেকে বেশি চর্চা যেমন হয়েছে, তেমনি কালি খরচও হয়েছে।

আর অদ্ভুতভাবে এই দুটো ঘটনার সঙ্গে নেতাজির ও পুরুলিয়ার মধ্যে একটা যোগসূত্রও যেন রচিত হয়েছে। গান্ধীসহ কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতাদের চরম বিরোধিতা সুভাষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। তাই কংগ্রেসের মধ্য থেকেই একটি বামপন্থী উপদল গঠনের প্রয়োজন তিনি অনুভব করেছিলেন। তাই ১৯৩৯ সালে ৩রা মে গঠন করলেন "ফরওয়ার্ড ব্লক"। তার নিজের কথায়, "ফরওয়ার্ড ব্লক" হল "যুগ ধর্মের প্রকাশ"। ফরওয়ার্ড ব্লক এর সংগঠনকে আরও বেশি শক্ত ও মজবুত করার জন্যই তিনি পুরুলিয়া সফর করেছিলেন।
এর আগেও তিনি পরপর দুবার পুরুলিয়া সফর করে গেছেন। তবে এবারের সফরটা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। কারণটা ছিল কংগ্রেসের ভূমিকা। একদিকে কংগ্রেস তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কংগ্রেস ইংল্যান্ডকে পরোক্ষ ভাবে সমর্থন করতে চাইছিল। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন কংগ্রেস কোনও আন্দোলনে যেতে চাইছিল না। বরং 'ধীরে চলো' বা 'আপস নীতি' অবলম্বন করতে চাইছিল। যেটা সুভাষচন্দ্র বসু কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তার যুক্তি ছিল যুদ্ধে কোনঠাসা ইংল্যান্ডের এই দুঃসময়েই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা উচিত। তাই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটা অভিনব প্রতিবাদের পদ্ধতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন। যেখানে যেখানে কংগ্রেসের সম্মেলন বসবে ঠিক সেখানেই তিনি প্রতিবাদস্বরূপ একটি আপস বিরোধী সম্মেলন করবেন।

ত্রিপুরীর পর কংগ্রেসের পরবর্তী অধিবেশন বসার কথা রামগড়ে। ১৯৪০ সালের ১৯, ২০ ও ২১শে মার্চ তারিখ। সেইমতো রামগড়েও একটি 'আপস বিরোধী' সমাবেশের আয়োজন করবেন বলে স্থির করেন সুভাষ। রামগড় ছিল মানভূমের পাশেই। তাই 'আপস বিরোধী' সমাবেশে বিপুল জমায়েত গড়ে তুলতেই তিনি পুরুলিয়া সফর করেছিলেন।

সফরের আগের দিন তথা ৮ই ডিসেম্বর তার ধুম জ্বর। পুরুলিয়া 'ফরওয়ার্ড ব্লক' এর সংগঠক অন্নদা প্রসাদ চক্রবর্তী সুভাষকে আগের দিন ফোন করেছিলেন, সফর সূচী সুনিশ্চিত কিনা জানার জন্য। ফোন ধরেছিলেন সুভাষের মা। বললেন, "প্রচন্ড অসুস্থ সুভাষ। ও কি যেতে পারবে।" কিন্তু অনমনীয় সুভাষ পাশ থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠেছিলেন, "আমি অবশ্যই যাব। তোমরা প্রস্তুত থাকো।"

১০৩° ডিগ্রি জ্বর নিয়েই সুভাষ ৩১৫ আপ হাওড়া- চক্রধরপুর ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন। দিনটা ছিল ১৯৩৯ সালের ৯ ডিসেম্বর। পুরুলিয়া স্টেশনে নেমে চা পান করেছিলেন। বাইরে তখন থিক থিক করছিল জনতার ভিড়। মাস কয়েক আগেই তিনি কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তাই কংগ্রেসের অনুগামীদের কাছ হতে মাঝেমধ্যেই তাকে শুনতে হয় নানা কটুক্তি। বাদ গেল না পুরুলিয়াও। ভিড়ের মাঝেই কংগ্রেসের অনুগামীরা উচ্চস্বরে সুভাষকে বলতে লাগলেন, "Brainless creatures is going"। এই কটুক্তি শুনে সুভাষ কোন প্রত্যুত্তর দেয়নি। কেবল মুচকি হেসেছিলেন। তবে বুঝতে হয়তো পেরেছিলেন লড়াই কত কঠিন হতে চলেছে।

নীলকন্ঠ চট্টোপাধ্যায়ের "আউট হাউসে" বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়েছিল। বিশ্রামের পর প্রচারে বেরোবেন বলে যখন সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত, ঠিক তখনই গাড়ি নিয়ে সমস্যা দেখা গিয়েছিল। কারণ সেই সময় পুরুলিয়া সহ সমগ্র মানভূমে কংগ্রেসের দারুন দাপট। তাই কংগ্রেসের কোন কর্মী তাকে গাড়ি দিয়ে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করলেন। অবশেষে পঞ্চকোট রাজবংশের প্রকৃতীশ্বর লাল সিং দেও তার নতুন কেনা গাড়ি Hill Man car no BRT 114 গাড়িটি দিলেন। এই গাড়িতেই দিনভর সুভাষচন্দ্র মানভূমের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে ঘুরে প্রচার করেছিলেন।

১৯৩৯ সালের ১১ই ডিসেম্বর "মুক্তি" পত্রিকা সে সম্পর্কে একটি খবরও প্রকাশ করে। "শহরের নানা স্থানে বহু তোরণ ও পত্র পুষ্পের দ্বারা শহরটিকে সজ্জিত করা হয়।। তাহার পর সুভাষচন্দ্র বসু আনাড়া, রঘুনাথপুর, পলাশকোলা, কাশিপুর, লধূড়কা, লক্ষ্মণপুর ও হুটমোড়া পরিদর্শন করেন ও সম্বর্ধনা সভায় বক্তৃতা দেন। সর্বত্র তাহাকে টাকার তোড়া উপহার দেওয়া হয়। দ্বিপ্রহরে শ্রীযুক্ত বসু ঝালদা, তুলিন, জয়পুরে বক্তৃতা করেন। সন্ধ্যায় পুরুলিয়ার জনসভায় তিনি বক্তৃতা দেন।"

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস যখন মারা যান সুভাষ তখন জেলে। তাই জেল থেকে ছাড়া পেয়েই সুভাষ  ১৯২৭ সালের ২২ অক্টোবর পুরুলিয়াতে প্রথম আসেন। উদ্দেশ্য দেশবন্ধু পত্নী বাসন্তী দেবীকে সমবেদনা জানানো। কারণ সুভাষ তাকে 'মা' বলে ডাকতেন। তার এই পুরুলিয়া সফরের অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।

তা হঠাৎ পুরুলিয়াতে কেন?আসলে দেশবন্ধুর পরিবার তখন পুরুলিয়াতেই থাকতেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবী একবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডক্টর নীলরতন সরকার তখন স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য তাকে কোনও শুষ্ক স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দেশবন্ধু তখন পুরুলিয়াকেই বেছে নিয়েছিলেন। ১৯০৪-০৫  সালে পুরুলিয়ায় আমেরি সাহেবের একটি বাগান বাড়ি কিনেছিলেন। বাড়িটির নাম ছিল "Clarks Bunglow"। পরে এর নাম বদল করে রাখা হয় "Retreat"। দেশবন্ধুর মা নিস্তারিণী দেবীও এ বাড়িতেই থাকতেন। নিস্তারিণী দেবীর মৃত্যুর পর স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হলে ডঃ বিধান চন্দ্র রায় এই "Retreat" বাড়িটিকে একটি "বালিকা মহাবিদ্যালয়" রূপে গড়ে তুলেছিলেন। সেই মহাবিদ্যালয়ের নাম দেশবন্ধুর মায়ের নামেই রাখা হয়। যা এখন "নিস্তারিণী কলেজ" নামে পরিচিত।

এরপর সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৮ সালের দোল পূর্ণিমায় ফের পুরুলিয়া এসেছিলেন। পুরোপুরি স্বাধীনতা সংগ্রামে পুরুলিয়াবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতেই তিনি এই সফর করেছিলেন। রামচন্দ্রপুর গ্রামে বসেছিল সেই সভা। পাশাপাশি গ্রাম ছাড়াও বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান থেকে প্রচুর মানুষের ভিড় জমে ছিল সেই জনসভায়। দীর্ঘ দেড় ঘন্টা টানা বক্তৃতা দিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯২৮ সালের ১২ই মার্চ "মুক্তি" পত্রিকা সেই দীর্ঘ ভাষণের কথা হুবহু প্রকাশ করেছিলেন। বাঁকুড়া থেকে পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রাপথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সুভাষচন্দ্রকে দারুন রকমের আকৃষ্ট করেছিল। ভাষণে সেই কথা তিনি তুলেও ধরেন,"বাঁকুড়া থেকে আসার সময় রাস্তার দুধারের সুন্দর দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল যে এ কেমন সুন্দর দেশ--- যেখানে এমন নীলাকাশ, শয্যাপূর্ণ মাঠ--- কল কল নদী..."

সেই ভাষণে বলেছিলেন, আমাদের উৎপাদিত শস্য ইংরেজরা কেড়ে নিয়ে নিজেদের দেশে চলে যাচ্ছে বলেই আমাদের দেশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ছে। না হলে আমাদের এক বছরের উৎপাদিত ফসল দুই বছর চলার কথা। সেই ভাষণে বিদেশি পণ্য বয়কটের উপরই বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। বিদেশি নুন, কেরোসিন তেল, বিদেশি কাপড় বয়কটের উপরেও জোরালো বক্তব্য রেখেছিলেন। পরিবর্তে দেশি নুন, রেডির তেল, দেশী কাপড় ব্যবহার এবং বাঁকুড়া রেশম শিল্পের উপর বিশেষ জোর দেওয়ার কথা বলেছিলেন।

রামচন্দ্রপুরের ভাষণেই তিনি প্রথম স্বরাজ আনার দুটো সহজ পথের কথা বলেছিলেন। একটি হলো প্রকাশ্যে সশস্ত্রভাবে ইংরেজদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কারণ ভারতীয়দের অস্ত্র ছিল না। ইংরেজরাই ভারতীয়দের কাছে অস্ত্র রাখা আইন করে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন।

 দ্বিতীয় পথটি ছিল, ইংরেজদের হাতে মারতে না পারলেও ভাতে মারতে হবে। কীভাবে! সেই পথও বলে দিয়েছেন। ইংল্যান্ড ছোট দেশ। তাদের উৎপাদিত খাবারে সারা বছর চলে না। তাই তারা বিদেশে দ্রব্য রপ্তানি করে খাবার আমদানি করে। এভাবেই তারা কাঁচামালও সংগ্রহ করে। সুতরাং ওদের দ্রব্য সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে পারলেই ওদের সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। এবং ওরা বিশাল ক্ষতির মুখে পড়বে। তখন স্বরাজের পথও অনেকটা সুগম হবে।

শুধু তাই নয়, সেই ভাষণে সাইমন কমিশনেরও নিন্দা করেছিলেন। তিনি বলেন, "এটাকে (সাইমন কমিশন) আমরা পাঠাতে কতবার বারণ করেছি।" সেই সঙ্গে আবারও বলেন,"বিলাতের ঘাড়ে যদি তাদের স্বাধীনতার যোগ্যতার বিচারের জন্য একটা কমিশন পাঠানো হয় তাহলে ইংরাজ কি বলবে?"

যে কোনও ধরনের সংগ্রাম বা আন্দোলনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া সেই আন্দোলন বা সংগ্রাম কখনোই সফল হয় না। এই চরম সত্যটা সুভাষচন্দ্র বসু দারুনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই বক্তৃতা মঞ্চে তিনি বারবার বলেছেন,"এটা গরীবের দেশ--- বড়লোকের স্বরাজ সাধনা না করলেও চলে। কিন্তু গরীবদের করতেই হবে। যদি অন্ন পেতে চাও, যদি জাতটাকে বাঁচাতে চাও, তবে সবাই এস।"

এ শুধু কংগ্রেসে আহ্বান নয়। সেইসঙ্গে বলেছিলেন,"তাদের সহানুভূতি পেতে গেলে তাদের কথা চিন্তা করতে হবে। তাদের দুঃখ বুঝতে হবে। সমিতি করে তাদের দুঃখ কষ্ট ঘুচাতে হবে।"

একই সঙ্গে জনতাকে কংগ্রেসের ছাতার তলায় আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং তাদের প্রতি নেতৃত্বের কী ভূমিকা নেয়া উচিত সে কথাও তিনি তার ভাষণে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। কারণ আন্দোলনে জনগণের শক্তিই শেষ কথা হয়ে ওঠে। সাধারণ জনতার কথা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বলেই আজ এত বছর পরেও তিনি সকলের নয়নের মনি হয়ে আছেন।

১৯২৮ সালে মহাষ্টমীর দিন তিনি আরও একবার পুরুলিয়ায় আসেন। পুরুলিয়া শহরেই স্থানীয় ইউনিয়ন ক্লাবে বক্তৃতাও রেখেছিলেন। ভারতের ভবিষ্যৎ কী! মুক্তির পথই বা কী! দেশের বর্তমান অবস্থা, এসব কথা সেদিনের বক্তৃতায় বারবার উঠে এসেছিল। বিলাতি দ্রব্য বর্জনকে ভাষণে বিশেষ জোর দেয়া হয়েছিল। তার যুক্তি ছিল বিলাতি দ্রব্য সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে পারলে ইংরেজদের ১১০ কোটি টাকার আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে এক বছরের মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়ে যেতে পারে। সুতরাং এই বিলাতি দ্রব্য বয়কটের উপরেই তার ভাষণ গর্জে উঠেছিল।
এরপর মানভুমে সুভাষচন্দ্র শেষ পা রেখেছিলেন তার মহানিষ্ক্রমন বা দেশ ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে। আমার মনে হয় তাঁর মহানিষ্ক্রমনের প্রধান দুটো যে কারণ হতে পারে তার একটি হল, বারবার ইংরেজ কর্তৃক কারারুদ্ধ হওয়া। নেতাজি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ২০ বছরের (১৯২১ - ১৯৪০) মধ্যে ১২ বছর জেলে কাটিয়েছেন। এই কুড়ি বছরে তাঁকে মোট ১১ বার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এতবার আর এত দীর্ঘ সময় বোধহয় আর কাউকে জেলে কাটাতে হয়নি। সুতরাং দেশে থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে একটা পরিপূর্ণ লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেওয়া তখন সম্ভব ছিল না। অন্যটি হল, জাতীয় কংগ্রেসের মতো দলের মনোভাব দেখে তাঁর মনে হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে দলের ভূমিকা যেন অনেকটাই ধীর। ততটা আগ্রাসী নয়। তাই তিনি কূটনৈতিক চালে বাজিমাত করতেই এবং বৈদেশিক শক্তির সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতা অর্জনেরও একটা প্রচেষ্টা করতেই তাকে ছদ্মবেশে বিদেশে পালাতে হয়েছিল। 

 ১৯৪২ সালের ১৪ জানুয়ারি 'মহম্মদ জিয়াউদ্দিন' নামে এক লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির ট্রাভেলিং ইন্সপেক্টর এর ছদ্মবেশে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। গাড়ির চালক ছিলেন শিশির কুমার বসু। গাড়ির গন্তব্যস্থল ছিল 'গোমো স্টেশন'। এই 'গোমো' স্টেশনে আসার পথেই তার মানভূমে পদার্পণ। অবশেষে 'গোমো' স্টেশনে 'কালকা মেল' ধরে রাত্রি দেড়টার সময় তিনি সকলকে গুডবাই জানিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন।

নিবন্ধের চিত্রগুলো "মানভূমে সুভাষচন্দ্র" বই থেকে গৃহীত।

তথ্যসূত্র: ১) স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস/ অমলেশ ত্রিপাঠী
২) মানভূমে সুভাষচন্দ্র/ দিলীপ কুমার গোস্বামী
৩) ফিরে দেখা গান্ধীজী ও নেতাজি/ নারায়ণ সান্যাল

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯