দূরদেশের লোকগল্প— এশিয়া (মালয়)/জলের জীব ডাঙার জীব/চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প— এশিয়া (মালয়)

জলের জীব ডাঙার জীব

চিন্ময় দাশ

সমুদ্রে ঘেরা দেশ। চার দিক জুড়ে কেবলই জল আর জল। যে দিকেই চোখ মেলো, গভীর নীল জলের চাদর বিছানো।
তো সেই সমুদ্রের ধারে থাকে এক কাঠবেড়ালি। গাছেই তার বাসা। গাছেই তার ঘোরাফেরা, সারাদিন এ গাছে ও গাছে লাফালাফি।
কিন্তু ডাঙায় থাকলে কী হবে, জলের কাছে তো আসতেই হয়। সব প্রাণীকেই আসতে হয় জলের কাছে। সে তুমি যেখানেই থাকো না কেন। গাছের ডগাতেই থাকো, কিংবা গর্ত খুঁড়ে মাটির তলায়—জলের কাছে আসতেই হবে তোমাকে। ছোট্ট কাঠবেড়ালি থেকে বিশাল বপুর হাতি, সারাদিনে নিদেন একটি বার জল খেতে আসতে হয় সবাইকেই।
জলের কাছে এসে এসে, এক বন্ধু হয়েছে কাঠবেড়ালির। সে নিজে থাকে ডাঙ্গায়। বন্ধুত্ব হয়েছে এক জলের জীবের সাথে। 
ছোট্ট একটা মাছ। কাঠবেড়ালির লেজের সিকিভাগও নয় তার চেহারা। তবু সেই পুঁচকেটার সাথেই ভাব হয়েছে তার। 
ছোট্টটি হলে কী হবে, কেরামতি আছে সে মাছের। ডাঙ্গাতেও উঠে আসতে পারে জল ছেড়ে। পেটের নীচের চারখানা পাখনা তখন তার চারটে পা হয়ে যায়। তিরতির করে জল ছেড়ে উঠে আসে খানিক দূর। (দীঘা বা সমুদ্রতীরের এলাকায় এ মাছের নাম—ডাকুর।)
জলের জীব ডাঙ্গায় আসে। তেমন কোন কসরতও করতে হয় না। দিব্বি বুকে হেঁটে উঠে আসে। এটাই পছন্দ হয়ে গেছে কাঠবেড়ালির। তাছাড়া, নিত্যদিন দেখা হয়ে যায়। ভাব হয়ে গেছে দুজনের। জল খেতে সমুদ্রের কাছে এলেই, এটা ওটা নিয়ে গল্প করে দুজনে। কিছুটা সময় কেটে যায়।
একদিন দুপুর গড়িয়ে গেল, কাঠবেড়ালির দেখা নাই। ডাকুর মাছটা বসে আছে তার জন্য। হোলটা কী? এত দেরি তো করে না কোন দিন! বিপদ আপদ কিছু হোল না তো?
ভাবতে ভাবতে কত সময় গেল। কাঠবেড়ালি এল বেশ অনেকটা দেরিতে। হাসি নাই মুখে। অন্য দিনের মত লেজ নাচাচ্ছে না তিড়িংবিড়িং করে।
মাছ বলল—কী বন্ধু, কী হয়েছে? দেরি করে এলে কেন? মনমেজাজও ভালো নাই ঠেকছে। 
--আর বোল না, ভাই। ভারি বিপদ বাড়িতে। অসুখ করেছে বউটার। 
মাছ বলল—শরীর থাকলে অসুখ বিসুখ হতেই পারে। মন খারাপ করে বসে থাকলে তো আর সমাধান হবে না। বদ্যি ডাকো। চিকিচ্ছে করাও।
--সে কী আর করিনি, ভাই? বউয়ের অসুখ, চুপ করে কী আর বসে থাকা যায়? কাঠবেড়ালি বলল—খরগোশ আছে না? ডাঙ্গায় সে-ই হোল আমাদের সবার বদ্যি। ভারি জ্ঞানগম্যি খরগোশের।
--তাহলে তো ঝামেলা মিটেই গেল। ডাকো তাকে। সে এসে সারিয়ে তুলুক। 
--ডেকেছিলাম। এসেও ছিল। কিন্তু এমন ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে গেল, আমার মাথা খারাপ হবার জোগাড়।
মাছ বলল—কী বলেছে বদ্যি?
--সে এক অদ্ভূত নিদান। বলেছে, মাছরাঙার ডিম আনতে হবে। তিন দিন খাওয়াতে হবে সেই ডিমের রস। দিনে তিন বার। তবেই বাঁচবে বউটা। তুমিই বলো, মাছরাঙার ডিম আমি পাই কোথায়? 
মাছ একটু চুপ করে রইল। খুব ভেঙে পড়েছে কাঠবেড়ালি। এমন মনমরা তাকে দেখা যায় না কোন দিন। মাছ বলল—ঠিক আছে। নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও। কাল চলে এসো সকাল না হতেই। পেয়ে যাবে নিদান। মন খারাপ করে থেকো না। 
কাঠবেড়ালি বলল—আরে শোন শোন। অত সহজ নয় জিনিষটা। যে সে মাছরাঙা হলে হবে না। যে পাখি মাপে ছোট, লেজও ছোট্ট যেগুলোর। এমনই মাছরাঙা পাখির ডিম হতে হবে।
--আচ্ছা গো, আচ্ছা। ছোট লেজওয়ালা মাছরাঙার ডিমই পেয়ে যাবে তুমি। ভাবনা কোর না। বাড়ি যাও এখন।  
***                      ***                ***
পর দিন। সকাল হয়েছে কি হয়নি। কাঠবেড়ালি এসে হাজির। হাজির আছে মাছও। তার সামনে আস্ত একটা ডিম। 
দেখেই তো কাঠবেড়ালি আনন্দে আত্মহারা। ভাবতেই পারছে না, এত সহজে এই দুর্লভ জিনিষটা হাতের মুঠোয় এসে যাবে। 
গদগদ গলায় কাঠবেড়ালি বলল—অনেক ধন্যবাদ তোমাকে, বন্ধু।
--বন্ধুকে ধন্যবাদ দিতে হয় না। আপদে বিপদে পাশে থাকব, তবেই না আমরা বন্ধু। মাছ বলল কাঠবেড়ালিকে।
কাঠবেড়ালি বলল—কিন্তু ভাই, অত সহজে পেলে কোথায় তুমি জিনিষটা?
--সে তুমি পরে শুনো একদিন। আজ যাও। চিকিতসা শুরু করো আগে। 
কাঠবেড়ালি বাড়ি চলে গেল নাচতে নাচতে। বউয়ের চিকিতসার ঔষধ পাওয়া গেছে, তাকে আর পায় কে? ডাকুরও জলে নেমে গেল। 
মাছরাঙার ডিম জোগাড় করতে তেমন কোন হয়রানি হয়নি মাছের। আসলে মাছরাঙারা বাসা বানায় জলের কাছাকাছিই। জলের লাগোয়া খাঁড়িতে গর্ত করে বাসা বানায় তারা। সে বাসায় পৌঁছে যাওয়া ডাকুরের কাছে জল্ভাত। 
ভোরবেলা উঠে চলে গিয়েছিল মাছরাঙাদের পাড়ায়। তক্কে তক্কে ছিল। যেই দেখল, একটা পাখি বাসা ছেড়ে বেরিয়ে গেল, অমনি সুড়সুড় করে ঢুকে, একটা ডিম নিয়ে চলে এসেছে তার গর্ত থেকে। বন্ধুর জন্য এটুকু করাই যায়। 
    ***                ***                 ***
এইভাবে কিছুদিন না যেতেই, ডাকুরের বউয়ের অসুখ হোল। সে কাঠবেড়ালিকে বলল—তোমাদের বদ্যি কি আমার বউয়ের চিকিতসা করতে পারবে?
কাঠবেড়ালি বলল—ডাঙার সকলের চিকিতসাই তো করে সে। জলের জীবেদের পারবে কি না, বলি কী করে বলো তো? 
এ কথার কীই বা জবাব দেবে ডাকুর? চুপ করে রইল। কাঠবেড়ালি বলল—ঠিক আছে। কাল খরগোশকে ডেকে নিয়ে আসব আমি। সে নিজে দেখে বলুক, কিছু বিধান দিতে পারে কি না। 
পরদিন লাফাতে লাফাতে এল এক খরগোশ। দেখে শুনে যা বলল, শুনে তো মাছের মাথায় হাত। একেবারেই অসম্ভব কাজ। আকাশের বাজ মাথায় এসে ভেঙে পড়ল তার।
একেবারে অসম্ভব এক জিনিষের বিধান দিয়েছে কবিরাজ—কুমিদের কলিজার এক টুকরো মাংস যদি এনে দিতে পারো, রোগী বাঁচিয়ে তোলা আমার কাজ। 
--কিন্তু এ কী আর সম্ভব না কি? কাঠবেড়ালি বলে উঠল। কোথায় একটা ছোট্ট ডাকুর মাছ, আর কোথায় কুমীর! কী যে বলো না তুমি, বদ্যি? 
--শোন বাপু, যেমন অসুখ, তেমনই তো হবে তার ঔষধ। তোমরা জোগাড় করে উঠতে পারবে কি পারবে না, তা দিয়ে তো আর চিকিতসা হবে না। গম্ভীর গলায় বলে দিয়ে, চলে গেল খরগোশ। 
কাঠবেড়ালি যখন ঘরে ফিরল, মুখ গম্ভীর। ছটফটে মানুষটা একেবারে চুপচাপ। তার বউ জানতে চাইল—কী গো, চিকিতসার কিছু উপায় হোল? 
--কবিরাজ  যা বলে গেল, সে একেবারেই অসম্ভব জিনিষ। কোন উপায়ই নাই জোগাড় করবার। কাঠবেড়ালি বলল—কুমীরের হৃতপিণ্ডের টুকরো চাই। সে জিনিষ জোগাড় করা কি আর সম্ভব না কি? 
তার বউ বলল—এটা কোন অসম্ভব কাজ হোল নাকি? অতি সহজ কাজ। বুদ্ধিশুদ্ধি বলে কি মাথায় কিছু নাই তোমার? 
কাঠবেড়ালি তো চমকে গেল বউয়ের কথা শুনে—বলো কী তুমি? এটা অসম্ভব নয়? 
--ভেবে দেখলে, অসম্ভব বলে কিছু নাই। ভাবতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। তবেই না উপায় বেরুবে? হাল ছেড়ে দিলে, চলে কখনো? 
বউ আবার বলল—কুমীরের হাঁ কত বড়ো, জানো না তুমি? 
--জানি। 
--কুমীর কত মাথামোটা, জানো না তুমি?
--জানি।
--কোন কাজই সে ভেবে চিন্তে করে না, সেটা জানো না তুমি?
--তাও জানি।
বউ এবার লাফিয়ে উঠল—তাহলে তো হয়েই গেল, কেল্লা ফতে। 
কী করতে হবে, কাঠবেড়ালিকে সব বুঝিয়ে বলে দিল সে। দিয়ে, বলল—পারবে কি না, ভেবে দেখ। না পারলে, এখনই পরিষ্কার করে বলো। আমি যাবো তাহলে। 
কাঠবেড়ালি তো অবাক—তুমি যাবে?
বউ আরো অবাক হয়ে বলল—যাবোই তো? আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল, সেটা তো আমি ভুলতে পারি না। উপকারীর উপকার করতে হয় সবার আগে। পরে অন্য কাজ। 
কাঠবেড়ালি বলল—নাগো, না। তোমাকে যেতে হবে না। আমিই যাবো। গুছিয়ে করবোও কাজটা। তুমি দেখে নিও। 
        ***             ***            ***
পরদিন সকালে উঠেই বেরিয়ে পড়েছে কাঠবেড়ালি। খুঁজে খুঁজে একটা নারকেল গাছ বার করল সমুদ্রের ধারে। জলের উপর ঝুঁকে আছে গাছটা। তরতর করে গাছে উঠে গেল কাঠবেড়ালি। কুটকুট করে করে কেটে একটা ফুটো করল একটা ডাবে। জল খেয়ে, ভিতরে বসে রইল কুণ্ডলী পাকিয়ে।
ভিতরে বসেছে কাঠবেড়ালি। মুখটি বের করে রেখেছে ফুটো দিয়ে। আসলে চোখ তার নীচে জলের দিকে। কতক্ষণ বাদে, একটা কুমীর সেদিক দিয়ে চলেছে ভাসতে ভাসতে। এর জন্যই অপেক্ষা করে বসে আছে কাঠবেড়ালি। যেই না কুমীর গাছের নীচটায় এসেছে, কুট করে ডাবের বোঁটা কেটে দিল সে। অমনি ঝপাং করে ডাব গিয়ে পড়ল কুমীরের সামনেটিতে। 
আর যায় কোথায়? বিরাট হাঁ কুমীরের। কী জিনিষ, কেমন জিনিষ, সেটা খায় কি খায়  না—আগুপিছু কিছুই ভাবল না কুমীর। কপ করে গিলে ফেলল জিনিষটাকে। সেটা তার খাদ্য কি খাদ্য নয়, সে বিচারের মগজ তো কুমীরের নাই। আস্ত একটা বোকার বেহদ্দ একেবারে। 
এদিকে হয়েছে কী, ডাব কুমীরের পেটে এসে পড়েছে। কাঠবেড়ালিকে আর পায় কে? সুড়ুত করে বেরিয়ে পড়ল ডাবের ভিতর থেকে। পেট ফুটো করতেই, কলিজাটা পেয়ে গেল সামনেই। 
অমনি কামড়াতে শুরু করে দিল। একটা ছোট্ট টুকরো হলেই কাজ হয়ে যেত তার। কিন্তু কুমীর মারা না পড়লে, এই গর্ত থেকে বেরুনো যাবে না। সেজন্যই সে কুটি কুটি করে কাটতে লেগেছে কুমীরের হৃতপিণ্ডটাকে।
অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে পেটের মধ্যে। ভয়াণক ছটফট করতে করতে, জলের কিনারায় এসে পড়েছে কুমীর। খানিক বাদে, মরেই গেল বেচারা। বালির উপর পড়ে রইল চিতপটাং হয়ে।  
তার ছটফটানি থেমে গেল। কাঠবেড়ালি বুঝে গেছে, কুমীরের লীলাখেলা শেষ।  পেটের খোঁদল থেকে বেরিয়ে এল চটপট করে। মুখে কুমীরের কলিজার বড় একটা টুকরো। 
ডাকুর এলো সকাল হতেই। কলিজার টুকরো আনা হয়েছে। খবর দিতেই, কবরেজ মশাইও এসে গেল তাড়াতাড়ি। তিন দিনের চিকিতসা চলল। দিব্বি সেরে উঠল ডাকুর মাছের বউ। 
তার পর? তারপর আর কী? বর বউ দুজনে মিলে ধন্যবাদ দিতে গেল কাঠবেড়ালিকে। কাঠবেড়ালি হেসে বলল—তুমিও একদিন আমার বউকে বাঁচিয়েছিলে, বন্ধু। ধন্যবাদের কিছু নাই এতে। ডাঙায় থাকি, বা জলে—পরস্পরের বন্ধু আমরা। একজনের প্রয়োজনে অন্যজন তার পাশে দাঁড়াবে, সেটাই তো বন্ধুত্ব! তাই না?
 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন