কুলকুলতি /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -- ৪৬

কুলকুলতি

ভাস্করব্রত পতি 

"কুলকুলতি কুলবতী / তিন কুলে দিয়ে বাতি / আমার যেন হয় স্বর্গে বাতি / বাপ মা আর শ্বশুরের কুল / আমি দিলাম পাঁটারীর ফুল / হরি প্রিয়া তুলসী দেবী করি নমস্কার / অন্তকালে হই যেন ভবনদী পার"।

কার্তিক মাসে মহিলারা নিজের বাবা মা এবং শ্বশুরবাড়ির সকলের মঙ্গল কামনায় ও নিজের স্বর্গলাভের বাসনায় এই লৌকিক উৎসবটি পালন করে থাকে। ড. শীলা বসাক 'কুলকুলতি' সম্পর্কে লিখেছেন -- "আদিম প্রক্রিয়াজাত পিতৃগনের উদ্দেশ্যে জল, আলো ও খাদ্যদান"। এটি কুমারী ও সধবা মহিলাদের যৌথ ব্রত। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলী, বাঁকুড়া জেলায় পরিলক্ষিত হয় এই লৌকিক উৎসব।

কুলকুলতি পূজায় তিনটি করে প্রদীপ, ফুল, কুলপাতা, দূর্বা লাগে। বিকেলবেলা এই ফুল তোলে ছোট ছোট মেয়েরা। একসময় এই উৎসব পালন করতে মেয়েদের মধ্যে ছিল ভীষণ উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং আগ্রহ। এখন এসবের চল লুপ্তপ্রায়। কুলকুলতি পূজোয় দেবতাকে ফুল দেওয়ার সময় মেয়েরা বলে -- "কুলকুলতি কুলবতী / সাত ঘরে সাত দিও বাতি / অরণ ঠাকুর বরণে / ফুল ফুটবে চরণে / এই ফুলটি তুলবে যে / সাত ভাইয়ের বোন সে / কার্তিক মাসের রাসে / কলার ভেলা ভাসে / ফুল দিলাম, তুলসী দিলাম / স্বর্গে দিলাম বাতি / সব ঠাকুরকে প্রণাম করি / লক্ষ্মী সরস্বতী"। 

কুলপাতা একটি অত্যন্ত আবশ্যিক উপকরণ। কুল গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম - Ziziphus zizyphus। এটি Rhamnaceae পরিবারভুক্ত। ইংরেজিতে বলে Jujube বা Chinese date। অনেকে বলেন কুলপাতা লাগে বলেই 'কুলকুলতি'। কিন্তু আসলে কুলে বাতি বা বংশে বাতি দেওয়ার মানুষের কামনায় এই লৌকিক উৎসব -- তাই 'কুলকুলতি'। আসলে এর অর্থ 'কুলের লক্ষ্মী'। লক্ষ্মী তথা বাড়ির মহিলারাই এর মূল কারিগর। হাতজোড় করে কুলপাতা দেওয়ার সময় কূলের বা বংশের সার্বিক মঙ্গল চায় ঐ ব্রতী। তাই সে কুলের লক্ষ্মী। তখন মুখে আওড়ায় -- ”কুলপাতা কুলপাতা ঝাঁকড়ি / সতীন বেটা মাকড়ি / সাত সতীনের সাত কৌটা / আমার মায়ের নব কৌটা / নব কৌটা নড়ে চড়ে / সাত সতীনের মুখটি পুড়ে / ওরে পাখি ময়না / সতীন যেন হয়না"।

পয়লা কার্তিক থেকে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা তুলসীতলায় পুজো করতে হয়। অনেক যায়গায় অবশ্য তুলসীতলায় একটি গর্ত খুঁড়ে পূজোপাঠ চলে। অনেকটা ঠিক যমপুকুর ব্রতের মতো। কেউ কেউ কুলকুলতির সঙ্গে যমপুকুর ব্রতের মিল রয়েছে বলেন। যদিও অঞ্চলভেদে উপচারে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।

এতে কোন শাস্ত্রীয় মন্ত্রতন্ত্রের বালাই নেই। স্রেফ কিছু মৌখিক ছড়া রয়েছে -- জল তোলার, প্রদীপ জ্বালানোর, পুজো করার, তুলসী গাছের গোড়ায় জল দেওয়ার এবং শাঁখ বাজানোর সময়ে। তুলসী মন্দিরে প্রথমে তিনটে কুলপাতা এবং তার ওপর তিনটে দূর্বা দিয়ে তিনটে প্রদীপ তেল সলতে দিয়ে সাজিয়ে বসাতে হয়। সেখানে দূর্বা দেওয়ার সময় বলা হয় -- "দূর্বা দূর্বা নারায়ণ / তুমি দূর্বা ব্রাহ্মণ / তোমার শিরে ঢালি জল / অন্তকালে পাবো ফল"। প্রথমে পুকুর ঘাট থেকে জল আনতে হয়। সে সময় বলা হয় -- "জলে আছে জলকুমারী / ডাঙায় আছে হরি / এক ঘটী জল দাও মা / হরি পূজা করি"। এই জল ঢালা হয় তুলসীমঞ্চে। তখন বলা হয় -- "তুলসী তুলসী মাধবলতা / ও তুলসী কৃষ্ণ কোথা? / কৃষ্ণ গেছে গোচারণে / তোমার শিরে ঢালি জল / অন্তর থেকে দিও স্থল"। এক্ষেত্রে আরও একটি ছড়ার সন্ধান মেলে -- "তুলসী তুলসী মাধবীলতা / কও তুলসী মিষ্টি কথা / কিষ্ট কথা শুনলাম কানে / গড় করি মা শ্রীচরণে"।

শিক্ষক অরিজিৎ দাস অধিকারীর মতে, সাধারণতঃ গরীব এবং দুঃস্থ পরিবারের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই তাঁরা তাঁদের সময়মতো বিয়ের জন্য পরিবারের লোকজন যাতে উদ্বেলিত হয়ে না ওঠে, সমস্যার মধ্যে না পড়ে তার জন্য এই এই লৌকিক উপচারটি পালন করে থাকে অবিবাহিত মেয়েরাই।

একমাস ধরে প্রতিদিন পূজা হয়। এজন্য প্রয়োজন ৩০ টি মাটির প্রদীপ। নিজেরাই এজন্য তৈরি করে নেয় প্রয়োজনীয় প্রদীপ। প্রতিদিনই ঘটোস্থাপন হয় এবং প্রসাদ হয়। তুলসী মন্দিরের সামনে মাটি দিয়ে শিবলিঙ্গ বানানো হয়। সন্ধ্যায় প্রয়োজন টক কুলের পাতা। এই পুজোয় বসবার জন্য কোনো আসন নেওয়া হয়না। খড় বিছিয়ে বসতে হয়। কথা বলা বন্ধ। শাঁখ বাজানো এবং ধূপ ও প্রদীপ জ্বালানো হয়। প্রদীপ জ্বালানোর সময় বলা হয় -- "সাঁঝ সলতে পরমবাতি / সন্ধ্যে দেখায় ভগবতী / কোথায় আছে দেবগণ / সন্ধ্যে দেখায় নারায়ণ"। আর শাঁখ বাজানোর সময় বলা হয় -- "শাঁখে আছে শঙ্খধ্বনি / শাঁখ বাজায় মহামুনি"। তিনখানা কুলপাতা এবং তুলসিপাতা ৩ বার করে নিয়ে ঘুরিয়ে কচুপাতার পিছনে ফেলতে হয়। পুজোর শেষে বাতিটি ঐ শিব লিঙ্গের সামনে রাখতে হবে। সেখানেও ফুল দিয়ে সাজাতে হবে।

১লা কার্তিক থেকে পূজা শুরু হয়। পূজার সময় উচ্চারিত হয় -- "কুলকুলতি কুলের বাতি / সন্ধ্যা দেব সারা রাতি / এক ঘটি জল তুলি / শিবের মাথায় জল ঢালি”। এছাড়াও কোথাও কোথাও বলা হয় -- "কুলকুলতি কুলের বাতি / তোমার তলায় দিয়ে বাতি / অরণ ঠাকুর বরণে / ফুল ফুটেছে চরণে / এ ফুলটি যে তুলবে / সাত ভাইয়ের বংশে / সাবিত্রী সত্যবান / কার্তিক মাসে রাসে / ধুপ ধুনো বাসে / ধুপ, দীপায় নমঃ"। আবার অন্যত্র একটু আলাদা ভাবে বলা হয় -- "কুলকুলতি কুলবতী / সাত ঘরে দিয়ো বাতি / অরুণঠাকুর বরণে / ফুল ফুটেছে চরণে / এই ফুলটি যে নেবে / সাত ভাইয়ের বোন হবে / কার্তিক মাসে রাসে / ধূপধূনো ভাসে / ফুলমালা আর আলোর মালা / ছোট্টো ভেলা দোলায় দোলা / কুলবতীর হাতের নাড়া / ভেলা ভাসে গন্ধে ভরা / এই গন্ধ যেদিক যায় / সাত ভাই পাই সেথায় / এসো আমার সাত ভাই / তার জন্য ভেলা ভাসাই / সাতটি ঘরে বাতি দিই / কুলবতীর পুণ্যি নিই / দেহের ঘর শুদ্ধ করি / তোমায় ঠাকুর গড় করি"।

ভালোভাবে বিয়ে যাতে হয় তার জন্য হিন্দু অবিবাহিত মহিলারা শেষ দিনে 'উপবাসী' থাকে সারাদিন। নতুন পোশাকে মেয়েরা এই ব্রত পালন করে। এই দিনই তাঁদের মনোস্কামনা পূরণের শেষ দিন। দীর্ঘ এক মাসের ব্রত শেষে এদিন তাঁদের সাফল্য কামনার দিন। এ দিন পুজোর জন্য প্রয়োজন ৭ রকমের করে পিঠে, মিষ্টি, ফুল, কচুপাতা, প্রদীপ, মোমবাতি, আতপ চাল এবং দুধ। এছাড়া লাগবে ৩৪ টি কুলপাতা। পূজো হয় সন্ধ্যায়। কিন্তু জলে ভাসানো হয় ভোরবেলা। সূর্য ওঠার আগে। ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে কলাগাছের ভেলায় মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বেলে ভাসানো হয়। এইসময় যেন অন্য কেউ তাঁদের এই ভাসানোর কাজ দেখতে না পায়। এই সাবধানতা নেওয়া হয়, কেননা সকলের বিশ্বাস যে, কেউ এই ভাসান প্রক্রিয়া দেখতে পেলে তাঁদের মনের কোনো কামনা বাসনা পূরণ হবেনা। তাই নিরবে নিভৃতে এবং সচেতনভাবে ভাসানের কাজটি করে। এরপর স্নান সেরে বাড়ি যায় সবাই।

এই দীপ জ্বালানোর পেছনে অবশ্য শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। বলা হয় যে কার্তিক মাসে দীপ জ্বালালে ভগবান শ্রীবিষ্ণু আনন্দিত হয়ে দীপদানকারীর সকল পাপ দূর করে দেন। ‘স্কন্দ পুরাণে’ অনুসারে কার্তিক মাসে কেউ ঘিয়ের প্রদীপ বা তিল তেলের প্রদীপ বিষ্ণু মন্দিরে জ্বালান, তবে সে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করবে। যাবতীয় পাপ থেকে রেহাই মিলবে রাধাকৃষ্ণের মন্দিরে দীপদান করলে। 'শ্রীহরিভক্তিবিলাস' গ্রন্থে পাওয়া যায় যে কার্তিক মাসে দেবালয় সহ গৃহে দীপ জ্বালালে শ্রীহরি খুশি হন। আর বংশের সন্তান যদি দীপ জ্বালায়, তবে গোটা বংশের মুক্তি লাভ হবেই। তাই কার্তিক মাসে আয়োজিত হয় দীপাবলীর। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে আকাশপ্রদীপ তোলা হয় এই মাস জুড়েই। আর কুলকুলতিতে তো প্রদীপ প্রজ্জ্বলন আবশ্যিক উপচার।

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন