বৌদ্ধ দর্শন -- ৬ /বিশ্বরূপ ব্যানার্জী

বৌদ্ধ দর্শন -- ৬
বিশ্বরূপ ব্যানার্জী 

তার পর আর এক দিন সিদ্ধার্থ যখন প্রাসাদ উদ্যানের পথ ধরে যাচ্ছিলেন তখন তাঁর চতুর্থ পূর্ব নিমিত্ত দর্শন হলো । তিনি দেখলেন এক সন্ন্যাসীকে । তিনি এর আগে কখনও কোনও সন্ন্যাসীকে দেখেন নি । এঁর প্রশান্ত অপরূপ মূর্তি দেখে তিনি যেমন বিস্মিত হলেন তেমনি মুগ্ধ হলেন। ছন্দক তাঁকে জানালো ," ইনি একজন সন্ন্যাসী সংসার ত্যাগ করে  দুঃখ কষ্ট জ্বালা যন্ত্রণা হাত হতে মুক্তির পথ খুঁজছেন । সংসারের জরা ,ব্যাধি ও মৃত্যুর কবল হতে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তাঁর এই সংসার পরিত্যাগ" । সিদ্ধার্থ এর আগে তিনটি পূর্ব নিমিত্ত দেখেছেন : জরা , ব্যাধি ও মৃত্যু । এই সন্ন্যাসীও তাঁর কাছে এক নুতন দৃশ্য । তাঁর মনে এক নুতন 
চিন্তার উদয় হলো । তিনি ভাবলেন তিনিও সন্ন্যাসী হবেন।

সংসার ত্যাগ করে মুক্তির পথের সন্ধান করবেন । এই ভাবনাটি তাঁর মনে পোষণ করে তিনি প্রমোদোদ্যানে প্রবেশ করলেন । সেখানে তিনি ভাবে বিভোর হয়ে একটি প্রস্তরাসনে বসে আছেন এমন সময় সংবাদ এলো যে মহারানী যশোধরা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন । এ সংবাদ শুনে তাঁর মনে৷ হলো তাঁর সংসার ত্যাগ সংকল্পের ক্ষেত্রে একটি বড়ো বাধা তাঁর সামনে এবার উপিস্থিত হয়েছে । এটি একটি বড়ো
বন্ধন হয়ে দাঁড়াবে তাঁর সামনে । তিনি সন্ধ্যা আগমনের
সঙ্গে সঙ্গে ই প্রাসাদে প্রবেশ করলেন । আর সেই রাত্রেই
তিনি সিংহাসন, রাজত্ব, সুন্দরী স্ত্রী এবং নবজাত শিশু
পুত্রকে পরিত্যাগ করে সুমহান সত্যের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন । বাইরে মুক্তির স্নিগ্ধ বাতাস তাঁকে বুঝি সান্ত্বনা দিলো। তিনি বাইরে এসে প্রথমেই এলেন বনবাসী মুনি ঋষিদের কাছে । তিনি মহাতপা আলার (আড়ার) কাছে তাঁর সমস্যা নিয়ে এলেন । ভাবলেন এই দার্শনিক মনীষীর  নিকট হতে  তিনি জড়া ,ব্যাধি ও মৃত্যুর ভয় হতে রক্ষার পথ খুঁজে নিতে পারবেন । কিন্তু তিনি তাঁর নিকট হতে সেরকম কোনও পথের সন্ধান না পেয়ের অন্য গুরুর সন্ধানে চারিদিকে
খুঁজে বেড়াতে লাগলেন । তাঁর দ্বিতীয় গুরু হলেন মহামুনি 'উদ্দক' (উদ্রক) । তাঁর কাছ হতেও তিনি অভীষ্ট পথের খোঁজ পেলেন না ।  তিনি তখন 'উরুবেল'(উরুবিল্ব ) বন ভূমিতে প্রবেশ করলেন । এই বনে পাঁচ জন ঋষির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটলো । এঁরা ছিলেন জ্যোতিষী ব্রাহ্মণ সুদত্ত  ও তাঁর ই চার জন বন্ধু । এই সুদত্তই বুদ্ধ জন্ম কালে একটি মাত্র আঙুল
তুলে সিদ্ধার্থ যে কেবল বুদ্ধই হবেন এই ভবিষ্যৎ-বাণী
 করেছিলেন ।  এঁরা পাঁচ জন সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী
হবেন বলে একত্র বনে এসেছিলেন । উরুবিল্ব বনে এসে বোধিসত্ত্ব ঠিক করলেন তিনি আর গুরুর সন্ধান করবেন না । এইসময় তাঁর তিনটি সাদৃশ্যের ( analogy) কথা তাঁর মনে এসে তাঁকে তাঁর লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর করে দিলো । সে গুলি হলো :

(১) যখন এক খন্ড কাঠ কাঁচা থাকে ও জলে ভিজে থাকে তখন আগুন জ্বালিয়ে সেটা ব্যবহার করার প্রচেষ্টা সব সময়েই ব্যর্থ হয় । সেখানে আগুন কিছুতেই জ্বলে না। 

সত্য অনুসন্ধানও ঠিক সেই রকম । মানুষ যখন ইন্দ্রিয় ভোগে নিয়োজিত থাকে তখন সে পার্থিব সুখেই ডুবে থাকে তখন সে কঠোর পরিশ্রম করলেও সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। 

(২) সেই কাঁচা কাষ্ঠ খন্ড যদি জলে ভিজা নাও থাকে তবুও সেখানে আগুন জ্বালানো যাবে না । কেননা কাঠটি অপক্ব যেখানে দাহ্যতাই  নাই । ঠিক তেমনি মানুষ যদি ইন্দ্রিয় ভোগে লিপ্ত নাও থাকে অথচ তার মনে ভোগাসক্তি  প্রবল থাকে তবে সত্য উপলব্ধির সব প্রয়াসই ব্যর্থ হতে বাধ্য ।

(৩) সেই কাষ্ঠ খন্ড যদি বিশুদ্ধ হয় আর তাতে বিন্দু মাত্র
  আর্দ্রতা বা ভিজা ভাব না থাকে তাহলে সেকগানে7 সহজেই  অগ্নি উৎপাদন করা যাবে । ঠিক তেমনি সত্যান্বেষী মন যদি সর্বতো ভাবে অর্থাৎ কায়-মনো-বাক্যে  ইন্দ্রিয় সুখ বর্জন করে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে  তবে সে অবশ্যই সত্য উপলব্ধি করতে পারবে । বুদ্ধের মনে এই যুক্তি যেন এক বিদ্যুৎ চমক এনে দিলো । তিনি প্রশান্ত মনে তপশ্চর্যায়
নিরত হলেন । চরম মুক্তির পথ যে তাঁকে খুঁজে আনতেই
হবে, মানব জাতিকে বার্ধক্য ,পীড়া ও মৃত্যু ভীতি হতে তাঁকে যে মুক্ত করতেই হবে ।

প্রথম অবস্থায় তিনি নিঃশ্বাস বায়ু নিরুদ্ধ করে প্রাণায়াম শুরু করলেন ।তিনি এর ফলে অপরিসীম কষ্ট ভোগ করতে লাগলেন ।সাধনার এই প্রথম অবস্থায় তিনি নিকটস্থ গ্রামে ঘুরে ঘুরে দরিদ্র গ্রাম বাসীদের নিকট হতে ভিক্ষা করতেন আর প্রাপ্য ভিক্ষায়  কায়ক্লেশে পেট চালাতেন । এই ভিখারি রাজাকে দে খে গ্রামবাসীরা সকলেই অবাক হয়ে যেতো  এই ভাবে কেটে গেলো সুদীর্ঘ কাল । কিন্তু সিদ্ধার্থ সত্যের পথ তবুও পেলেন না । তাঁর উদ্দেশ্য তবুও সফল হলো না । ভাবলেন সাধনা হয়তো ঠিক মত হচ্ছে না । তাই আরও কঠোর সাধনা করতে চেয়ে তিনি ক্রমে ক্রমে খাওয়া কমিয়ে দিতে লাগলেন । ভাবলেন আত্ম পুষ্টির কথা ভাবেন বলেই হয়তো সত্য কাছে আসছে না । শেষে তিনি সিদ্ধ তন্ডুলের  জল (মাড়/ফেন)শুধু মাত্র গন্ডুষ করতেন । কিন্তু এই সুকঠোর  তপস্যাতেও তিনি কোনও সুফল পেলেন না । তিনি এই খাদ্য বর্জনের ফলে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলেন । শরীর  অস্থিচর্ম সার হয়ে পড়তে লাগলো । কিন্তু তাঁর ইচ্ছা-শক্তি কিন্তু অটুট ছিলো তবুও । তিনি হতাশ হন নি । সংকল্পচ্যূতও হলেন না । শরীরের  দুর্বলতাকে আমলও দিলেন না । কিন্তু তিনি তো মানুষ । এই দুর্বল শরীর নিয়ে পথ চলতে চলতে একদিন পথের মাঝেই মূর্ছা গেলেন । তাঁর সাধন প্রণালী গুলি খুবই কঠিন ছিলো । কিন্তু এতো করে ও তিনি তাঁর আকাঙ্খিত মুক্তি পথের সন্ধান পেলেন না ।
এই রকম এক পর্যায়ে  তাঁর হঠাৎই কেন জানি মনে হলো  আত্ম নিগ্রহের এই পথ সম্ভবত মুক্তি লাভের প্রকৃত পথ নয় । এ পথ ভুল আর উল্টো দিকে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে । ভ্রান্ত এই পথ ধরে চলে তিনি কোনও দিনই সত্যের খোঁজ পাবেন না । তিনি আরও বুঝলেন দেহের নির্যাতন নয় মনের নিয়মিত ও সতর্ক অনুশীলনের মধ্য দিয়েই মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যাবে । এর পর হতে তিনি আবারও গ্রামে গ্রামে ঘুরে  ভিক্ষা অন্নে দিন কাটাতে লাগলেন । তিনি মনের অনুশীলনে সদা তৎপর রইলেন । তাঁর সঙ্গে আরও যে পাঁচ জন এসেছিলেন তাঁরা ধরে নিলেন সিদ্ধার্থকে ধরে রাখলে তাঁদের আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে আর উন্নতির আশা নাই । তাই তাঁরা সিদ্ধার্থকে ত্যাগ করে 'ইসিপতন মিগদায়' (ঋষিপত্তন মৃগদাব)বনে চলে গেলেন । বোধিসত্ব একলা।
 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন