নির্মল মাইতি (জাতীয় শিক্ষক, শিক্ষক আন্দোলনের নেতৃত্ব, পাঁশকুড়া) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২৮

নির্মল মাইতি (জাতীয় শিক্ষক, শিক্ষক আন্দোলনের নেতৃত্ব, পাঁশকুড়া)

ভাস্করব্রত পতি

ভালোবাসতেন মাকে। প্রভাবতী দেবী। জীবনের উত্তরণের পিছনে তাঁর অবদানই সবচেয়ে বেশি। ১৯৭৫ এর ১০ ই জানুয়ারি সেই জন্মদায়িনী মায়ের মৃত্যুতে সন্তানের মাতৃপ্রেম আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু মায়ের সেই কল্যাণস্পর্শ চিরদিন কাছে রাখতে সেই সন্তান পণ করে বসলেন জীবনে কোনোদিন বদনেশায় আসক্ত হবেন না। জুতো পরবেন না। চুল আঁচড়াবেন না। বিড়ি সিগারেট খাবেন না। পান খাবেন না।

না, পাঁশকুড়ার শ্যামসুন্দরপুর পাটনা হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নির্মলচন্দ্র মাইতি আমৃত্যু কোনোদিনই জুতো পরতেন না। লোকে বলে 'খালিপদ হেডমাস্টার'। জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন শিক্ষাকে। আজীবন তিনি শিক্ষার প্রসারে নিবেদিত থেকেছেন। শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। তারই স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৪ এর ৫ ই সেপ্টেম্বর মেলে 'জাতীয় শিক্ষক' এর অনন্য সম্মান।

১৯৩৫ এর ৩১ ডিসেম্বর জন্ম। পাঁশকুড়ার শ্যামসুন্দরপুর পাটনা গ্রামে। মাত্র তিন মাস বয়সেই পিতৃদেব রাসবিহারী মাইতি মারা যান। চরম দারিদ্র আর অভাবকে সঙ্গী করে প্রতিকূল পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন নিরক্ষর মায়ের হাত ধরে। একসময় পরের বাড়ি থেকে তরকারি চেয়েও খেতে হয়েছে। এভাবেই কেটেছে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মল মাইতির নির্মম শৈশব। তবে থেমে থাকেনি পড়াশুনা। নিজের চেষ্টা আর মায়ের আশীর্বাদই তাঁকে উত্তীর্ণ করে দারিদ্রের নিদারুণ কষাঘাত থেকে। মিলেছিল পরিত্রাণ।
রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে এক সময়। তাই সব সময় তাঁর মনের দরজায় আঁকা থাকতো অন্যেরা যেন এমন কষ্ট না পায়। তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষার বিস্তারই পারে মানুষকে তার পথ চেনাতে। পথ দেখাতে। আলোকিত পথ খুঁজে দিতে। প্রকৃত শিক্ষাই হয়ে উঠতে পারে মূল পরিত্রাতা। এটাই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মর্মে মর্মে।

১৯৫৬-৫৭ তে স্নাতক হয়েই যোগ দেন ভোগপুর কেনারাম হাইস্কুলে। এরপর একদিকে নিজের স্কুলের পরিচালনার গুরুভার, অন্যদিকে নারী শিক্ষার বিস্তারে ১৯৭১ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করলেন কৃষ্ণচরণ বালিকা বিদ্যালয়। নানা বাধা বিপত্তিকে ঠেকিয়ে তিনি তা করে দেখালেন। চিরদিন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছেন। ১৯৬১ তে পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক সমিতির সভাপতি হন। তাঁরই উদ্যোগে মেদিনীপুর জেলায় ৩০ টি স্থানে ২০০ টি বিদ্যালয়ের অনুমোদন পায়। এই দৃপ্ত ভূমিকার দরুণ তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে অভিহিত করেন 'মাইটি নির্মল' নামে।
বেঁটেখাটো মানুষ। খদ্দরের জামা পরেন। পায়ে জুতো নেই। অতি সাধারণ জীবনযাপন। অসম্ভব পরিশ্রমী। আদর্শনিষ্ঠ মানুষ। মহাত্মা গান্ধীর প্রভাব আদ্যন্ত। স্বামী বিবেকানন্দকে অনুসরণ করেন চলার পথে। শিক্ষক জীবনে আদর্শবোধ, নিয়মানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলপরায়নতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন সর্বাগ্রে। নির্লোভ মানসিকতা, সৎচরিত্র, আত্মবিশ্বাস, ধর্মের প্রতি সুগভীর টান, কর্তব্যে অবিচলতা আর দক্ষ সংগঠক হিসেবে মানুষের সেবা করে গিয়েছেন। লোকমুখে তিনি ‘পাঁশকুড়ার গান্ধী'। এ হেন মানুষ আজ বিরল। এত বড় মানের এবং বড় মাপের মানুষের অন্তরে নেই একফোঁটা অহঙ্কার। এটাই তাঁর সম্বল। তাঁর কথায়, 'আদর্শ কখনও মরে না। আমরা সবাই চলে যাবো। কিন্তু আদর্শ বেঁচে থাকবে চিরকাল'।

নির্মল মাইতি সম্পাদনা করেছেন "পাঁশকুড়া থানার ইতিহাস" এবং "পূর্ব মেদিনীপুর হেরিটেজ তথ্যপঞ্জী" বই দুটি। এছাড়া 'পাঁশকুড়া সাহিত্য সংস্কৃতি মঞ্চ'র প্রতিষ্ঠাতা তিনিই। তাঁর লেখা প্রবন্ধে এসেছে 'শিক্ষক সমাজ একটু ভাবুন', 'পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার স্বরূপ', 'জীবন গঠনে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব', 'সার্ধশতবর্ষে বিশ্বকবি ও কর্মবীর বিজ্ঞানাচার্য লহ প্রনাম', 'শিক্ষা ও সমাজ', 'কম্যুনিজম ভারতীয় আদর্শের পরিপন্থী ', 'বর্তমান সমাজে গান্ধীজীর প্রাসঙ্গিকতা ', 'নন্দীগ্রামে সূর্যোদয় -- যাঁরা অন্ধ, তাঁরা বেশী দেখে তাঁরা....', 'বিদ্যাসাগর ও বর্ণপরিচয় ', 'স্বামীজী -- লহ প্রনাম', 'জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম সাহিত্যিক দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৯৬৩-১৯১৩)', 'অগ্নিশিশু -- ক্ষুদিরাম বসু ', 'প্রবাদপ্রতীম নেতা সুশীল ধাড়ার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি', 'আজকের শিক্ষাব্যবস্থা ও আমাদের সমিতি' ইত্যাদি বিষয়গুলি।

শুধু এই শ্যামসুন্দরপুর পাটনা হাইস্কুল নয়, তিনি নারী শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন পাটনা কৃষ্ণচরণ বালিকা বিদ্যালয়। তাঁরই উদ্যোগে ১৯৭৮ এ আত্মপ্রকাশ করে হরেকৃষ্ণপুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ মিশন। এরপর ২০১৩ এর ২৪ শে মে তিনি সূচনা করেন সিদ্ধিনাথ মহাবিদ্যালয়ের। একসময় শ্যামাদাস ভট্টাচার্য এবং রজনীকান্ত প্রামাণিক ছিলেন নির্মল মাইতির রাজনৈতিক পরামর্শ দাতা। তাঁর মননে PLAIN LIVING AND HIGH THINKING। যা দেখে নিজেকে পরিশীলিত করা যায়। যা জেনে নিজেকে উন্নত করা যায়। যা আত্মীকরণ করলে একটা উন্নত সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা যায়। আসলে তিনি সকলের কাছে বটবৃক্ষের মতো। যাঁর ছায়ায় উজ্জ্বল এক বিস্তীর্ণ প্রজন্ম।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. স্যার সমর্পকে অনেক জানাগেলো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন