আমি আমার মতো
পর্ব -১৬
সুকন্যা সাহা
মাতৃভাষার আদর
সদ্য গেল আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস ।প্রতিটা মাতৃভাষার নিজস্ব গন্ধ আছে , আছে আদরের টান । লোকে বলে বাংলা নাকি পৃথিবীর অন্যতম মিষ্টি ভাষা । তবে আমার মনে হয় পৃথিবীর প্রতিটা ভাষাই মিষ্টি আদরের ;সেই ভাষাভাষী মানুষের কাছে ।পূর্ববঙ্গের লোক আমরা । দেশ ছেড়েছিলেন দাদু সেই ছেচল্লিশ সনে । আমার জন্ম এখানে হলেও পরিবারে অনেকদিন পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিল ভাষার টান ।কি মিষ্টি যে লাগত ! যৌথ পরিবারে বড় হওয়ার সুবাদে কাছ থেকে শুনেছি দাদু, ঠাকুমা, পিসি ঠাকুমার মুখের পূর্ব বঙ্গীয় বাঙ্গাল ভাষা । সেই টানে থাকত অপিনিহিতি অর্থাৎ বর্ণের পরে অবস্থিত ই কার আর উকার এর বর্ণের আগে উচ্চারিত হওয়া । আর ছিল প্রচুর নতুন শব্দ । মুড়িকে বলত হুড়ুম , বিড়ালকে মেকুর , চিংড়ি মাছকে ইচা মাছ ... সেই শব্দ গুলোর আলাদা মায়া ছিল ; ছিল পূর্ববঙ্গীয় জলজ ঘ্রাণ । আর ভাষার কথা আসলেই অবশ্যম্ভাবী ভাবে এসে যেত বাংলা দেশের কথা ... সেদেশের নদী -নালা -খাল -বিল আর প্রকৃতির কথা । সেদেশের মানুষ আর সংস্কৃতির কথা ।আসত দেশভাগ আর তার যন্ত্রনার কথাও।এদেশে বাঙ্গাল বাড়ির অন্যতম চিহ্ন ছিল বাঙ্গাল রান্না ।মূল থেকে উৎপাটিত পূর্ববঙ্গীয়রা দ্যাশের শেষ নির্দশন হিসেবে ধরে রেখেছিল রান্না বান্নাকে আর সেইসব রান্নায় থাকত পূর্ববঙ্গীয় ঝাঁজ আর যত্নের মম মিশেল। কচু বাটা, কলাপাতায় ইচা মাছ ভাপে , থোড়ের ঘণ্ট , ইচা মাছ দিয়ে মোচার ঘণ্ট , মৌরালা মাছের ঝাল চচ্চড়ি, আমের টক বা আম দিয়ে মটর ডাল মুখে লেগে থাকত এসব রান্না । আমার ঠাকুমার হাতে খেয়েছি বিনা তেলে লাউ দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল ।কাঁচা মরিচ আর গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে রান্না করা সেই ঝোল যখন বড় কড়াইতে গব গব করে ফুটত সারা বাড়ি আমোদিত হত সেই ঘ্রাণে ।আমার এক দূর সম্পর্কের ঠাকুমা যখন ডাল ফোড়ন দিতেন তখন সারা পাড়া ছড়িয়ে পড়ত সেই গন্ধ। ভাষার কোমল টানে অনেক অনাত্মীয়কেও আপন করে নেওয়া যেত।মায়ের কোলের মতো মাতৃভাষার কোলও বড় আদরের।জীবনের শেষ দিনগুলোতে এসব কথা বড় অনুভূত হয়। তখন শিকড়ের টানে দ্যাশের মাটির কোলে মাতৃভাষার নরম প্রশ্রয়ে বড় ফিরতে ইচ্ছে হয়...
"আবার আসিব ফিরে
ধানসিঁড়িটির তীরে
এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়
শংখচিল শালিখের বেশে ..."
জ্বলদর্চি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। 👇
0 Comments