চাতকের কান্না
পর্ব-৩
মৌসুমী ভট্টাচার্য্য
তৃষা স্তম্ভিত হয়ে যায় খবরটা শুনে। তাদের মারাঠি প্রতিবেশী মিঃ কুলকর্ণী আই.সি.ইউ তে ভর্তি,বাইপাস সার্জারী হবে। নীলা,মিসেস কুলকর্ণী ভেঙ্গে পড়েছে মানসিক ভাবে। তৃষা আর নীলা সমবয়সী, কখনো কখনো ছুটির দিনে আড্ডা হয়,দু জনেই সুখ দুঃখ শেয়ার করে। সম্পূর্ণ বিপরীত মানসিকতার দুই বান্ধবী,সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির শিকার,এরা কখন অজান্তেই কাছাকাছি চলে এসেছিল। নিঃসন্তান এই দম্পতির সমস্যা জর্জরিত জীবন,তাদের অর্থনৈতিক ডামাডোল,উচ্চ রক্তচাপ,মধুমেহ জনিত সমস্যা,সবকিছুই তৃষাকে তাদের প্রতি সমব্যথী করে তোলে। “ ক্যায়া হোগা,ক্যায়সে হোগা? ইতনী বড়ী রকম!ম্যায় তো কুছ নেহী জানতী’’, নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলে। তৃষা নীলাকে অনেকবার বুঝিয়েছে যে টাকা পয়সার দিকটা যেন দেখে,সেভিংস এর ব্যাপারে যেন কড়া মনোভাব রাখে। কিন্তু নীলা বিরক্ত হয়,আফটার অল তাদের জীবন,তাদের ইচ্ছেমত চলবে। নীলা হাউস ওয়াইফ,রান্না ছাড়া একজন স্ত্রীর আর কোন দায়িত্ব আছে,তা সে বোঝে না।রান্নাও এত তেল মশলা দিয়ে রাঁধে! তৃষা বোঝাত যে এসব খাবার স্বাস্থ্যকর নয়,কিন্তু নীলা শুনত না। মিঃ কুলকর্ণীর ব্যাবসা ফেল হয়ে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া, নীলার নানা অস্ত্রোপচার,বারবার দীর্ঘদিনের জন্য নার্সিং হোমে থাকা,চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ভার মেটাতে এই দম্পতি জেরবার হয়ে গেছল। ব্যবসা ডোবার পর কুলকর্ণী সাধারণ একটা চাকরি করছেন,কিন্তু সেভিংস নেই বললেই চলে। প্রতি মাসে দেনা শোধ করার পর,সংসার খরচার পর এই দম্পতির বেহিসেবী শপিং করে। লেটেস্ট কুকিং রেঞ্জ,এক্সারসাইজ মেশিন থেকে জামাকাপড়,কি নয়! কোন হেলথ ইন্সুরেন্স নেই,এই বিপদে কাজে আসত তা হলে। তৃষা বুঝতে পারে না,কি ভাবে সাহায্য করবে! এত মোটা অঙ্কের টাকা চট্ করে ম্যানেজ করা,এক অসম্ভব ব্যাপার! তৃষা নিজের একাউন্ট থেকে হাজার দশেক টাকা নার্সিংহোমে জমা দিল। এর বেশী লুজ এমাউন্ট রাখে না,ফিক্সড ডিপোজিট করে ফেলে, সামনেই রনির উচ্চ শিক্ষা শুরু হবে। নীলার গয়না ডিপোজিট করে এক প্রাইভেট সংস্থা থেকে টাকার ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু সেটাও পর্যাপ্ত নয়,বাইপাস হলে আরো লাগবে।
সারাদিন নীলার সাথে দৌড়োদৌড়ি করে দুপুরে খাবার সুযোগও হয় নি,রাত আটটায় যখন বাড়ি ফিরল,তখন ক্ষিদেয়,ক্লান্তিতে শরীর বইছিল না। কিন্তু না,ডিনার রেডি করতে হবে। বিকেলে কাজের লোক আসে নি, এঁটো বাসন পড়ে আছে,ব্যালকনিতে মেলা কাপড়গুলো আনা হয় নি। অনীক কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে, খাবার রেডি ছিল না। সে কিছুই না খেয়ে টিভিতে নিউজ দেখছে,রনি পড়ছে,সামনে বিস্কুটের কৌটো খোলা। তৃষা তাড়তাড়ি পোশাক পাল্টে,ভাত চড়িয়ে দেয়,আরেক বার্নারে দ্রুতহাতে তিন কাপ কফি বানিয়ে লিভিংরুমে আসে। “ নিজে কফি বানিয়ে খেতে পারলে না? রনিকেও তো দিতে পারতে!” তৃষা বিরক্তিতে ফেটে পড়ে। অনীক কিছু বলে না,গম্ভীর মুখে নিউজ দেখতে থাকে,এসব তুচ্ছ কথার জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করে না।তৃষার ক্ষিদে পেলে,ঘর এলোমেলো দেখলে ভীষণ রাগ হয়। ভাতের ফেনা ঝরাতে ঝরাতে গজগজ করতে থাকে,সমস্ত হতাশা উপুর করে দেয়। রনিরও ক্ষিদে পেয়েছে,তাই ভাত বেড়ে হাঁক দেয়, “ খেতে এস তোমরা’’। রনি দ্রুত এসে যায়,কিন্তু অনীক আসে না। “ আমার খাবার ঢেকে রাখ,পরে খাব’’,অনীক বলে। আগুন জ্বলে যায় মাথায় তৃষার, “ দেখ,আজ নাখড়া করো না,পারছি না আর। জানতেও চাইলে না কেন আজ দেরী হল,কোথায় গেছলাম!খেয়ে উদ্ধার করো’’।
অনীক এসে বসে ডাইনিং টেবিলে,তবু কোন প্রশ্ন করে না। তৃষা নিজেই বলে কুলকর্ণীদের কথা।পরের দু দিন তৃষা ভীষণ ব্যস্ত থাকে নীলার সাথে। কুলকর্ণীকে এনজিওপ্লাস্ট করা হয়,দুদিন পর ছেড়ে দেয়া হয়। কলকাতার এই প্রসিদ্ধ নার্সিংহোম রোগীদের গলা কাটার জন্যও বিখ্যাত।অনীক এসে একবার নার্সিংহোমে কুলকর্ণীকে দেখে গেল,খুব সমবেদনার সাথে বলল যে সে সবসময় পাশেই আছে,কোন দরকার হলে নীলা যেন বলতে দ্বিধা না করে!নীলা অভিভূত, “ সাচ এ নাইস পার্সন হি ইজ! ইউ আর এ লাকি উম্যান’’। এ ধরনের কথা তৃষাকে প্রায়শই শুনতে হয় এবং তার গা পিত্তি জ্বলে যায় শুনলে। অনীকের সুশ্রী চেহারা,অন্য মহিলাদের সাথে এমন সুন্দর করে কথা বলে যে ওরা মোহিত হয়ে যায়। ঘরের অনীক আর এই অনীক,ভিন্ন দুই ব্যক্তি।
🍂
তৃষার আরো ধাক্কা খাবার ছিল।রাজীব কুলকর্ণী বাড়ি ফেরার পর অনেক প্রতিবেশী,বন্ধু,কলিগদের তাদের বাড়িতে সমাগম,নীলার তৃষাকে আর পাত্তা না দেয়া,প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে মানব চরিত্র নিয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ তথা মেজাজ আরও খিঁচড়ে যাওয়া। সেদিন সন্ধ্যায় নীলার বাড়িতে চিকেন স্যুপ নিয়ে গেছে,ঘরভর্তি লোকজন। নীলা সবাইকে বলছে,কি করে সে যমদুয়ার থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে এনেছে ইত্যাদি কিন্তু নীলা একবারের জন্যও তৃষার কথা উল্লেখ করল না। সামান্য ব্যাপার হলেও তৃষার একটু খারাপ লাগল। এ কদিন,নীলার পাশে তৃষা আর রাজীবের এক কলিগই ছিলেন। চিকেন স্যুপ ডাইনিং টেবিলে রেখে নীলাকে বলতে গেল,নীলা কোন মনোযোগ না দিয়ে,তৃষার দিকে না তাকিয়ে বলল, “ হা,ওহা রাখ দো’’। তৃষা বেশ আহত হল,চুপচাপ বাড়ি ফিরে গুম হয়ে রইল। অনীকের সাথে চাকরী নিয়েও কথা হয় নি এখনো।
অনীক দিল্লী অফিসে কথা বলল,তারা জানাল এর পর থেকে ফরেন ট্রিপ সংক্রান্ত ফাইল সোজা অনীকের কাছেই যাবে।আর পরের মাসেই জার্মানী যেতে হবে মাসখানেকের জন্য। অনীকের মেজাজ কিছুটা শান্ত হল,ফরেন ট্রিপের জন্য নয়,তার সাথে প্রতারনা হচ্ছে,তার সুরাহা করা দরকার।সেদিন সন্ধ্যায় একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল,যাবার পথে সিঙ্গারা,ল্যাংচা নিয়ে নিল। এ গুলো সে ভালবাসে,মনে করতে চেষ্টা করল তৃষা কি পছন্দ করে আর রনি! মনে মনে লজ্জিত হল, না তার মনে নেই।
যদি ভালয় ভালয় সব মিটে যায়,মানে জার্মানী ট্যুর,তবে নেক্স্ট ইয়ারে ফ্যামিলি নিয়ে ইউরোপ ট্রিপ দেবে। এটা মনে আছে,তৃষা খুব বেড়াতে ভালবাসে আর ইউরোপ ট্যুরের স্বপ্ন অনেকদিনের। সত্যি অনেকদিন হয়ে গেল সে তৃষার সাথে ভাল করে কথা বলে না,বেড়ানো তো দূর! এবার তৃষা আর রনিকে একটু খুশী দেবে,আফটার অল্,ওরাই তো তার ফ্যামিলি। মৃদু হাসি মুখে ,ফুরফুরে মেজাজে,সে ঘরে ঢোকে। আজ সে অন্য অনীক !ঘরে ঢুকে দেখে তৃষা নিউজ পেপারে চাকুরীর কলাম খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। হাতে পেন, মাঝেমাঝে গোল মার্ক করছে। অনীককে দেখে সরিয়ে রাখল,কিছু যেন লুকোতে চাইছে। অনীককে চা দিতে কিচেনে গেল। অনীক হেসে বলল, “ চা-এর জন্যে ভাল ‘টা’ও এনেছি। সবাই মিলে খাব।’’ গলা তুলে রনিকে ডাকল।
(চলবে)
0 Comments