অয়ন মুখোপাধ্যায়ের কবিতা গুচ্ছ
যে শব্দগুলো পরীক্ষায় আসেনি
চিরপ্রশান্ত স্যার ঠিক সময়ে ক্লাসে ঢুকতেন—
ঘড়ির কাঁটার মতো নয়,
বরং ঘড়ির ভেতরের ফাঁকা জায়গার মতো।
আমরা তখনও জানতাম না,
ঠিক সময় মানে
ধীরে ধীরে কিছু না বলা শিখে নেওয়া।
বাংলা পড়াতে পড়াতে
তিনি বোর্ডে কয়েকটা শব্দ লিখতেন।
চক থামত,
তারপর সেই শব্দগুলো মুছে ফেলতেন ।
সেগুলোর আর কোনোদিন দরকার পড়েনি
আমাদের পরীক্ষায়,
বা পরের জীবনে।
চিরপ্রশান্ত স্যারের ক্লাসে
আমি লাস্ট বেঞ্চে বসতাম।
জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতাম ।
আর দেখতাম
বলাগড় স্কুলের খালের দিকের মাঠ—
ফাঁকা।
মানে, স্যারের সংলাপগুলোও
আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
ঘণ্টা পড়ত।
আমরা উঠে পড়তাম।
স্যার একবার তাকিয়ে
চুপ করে বই বন্ধ করতেন—
যেন এটাই পাঠ্যসূচি।
আজ এত বছর পরে
কবিতা লিখতে বসে বুঝি,
চিরপ্রশান্ত স্যার
আমাদের কোনো শব্দ দিয়ে যাননি।
আমাদের দিয়ে গেছেন
একটা দীর্ঘ ফাঁকা লাইন—
যার ভেতরেই আমরা সারাজীবন
উত্তর লিখে চলেছি।
চিরপ্রশান্ত স্যারের নোটবই
চিরপ্রশান্ত স্যারের একটা নোটবই ছিল
যেটা আমরা কোনোদিন খুলে দেখিনি।
ক্লাসে তিনি বই খুলতেন না—
খুলতেন জানালা।
বলাগড় স্কুলের ভাঙা পাঁচিল পেরিয়ে
খাল, মাঠ, কদম গাছ, আমের মুকুল
একসঙ্গে ঢুকে পড়ত ক্লাসঘরে।
বাংলা তখন আর বিষয় থাকত না,
একটা নিঃশব্দ হাঁটা হয়ে যেত।
তিনি কখনও বলতেন না—
“এটা গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি শুধু কিছু লাইন এড়িয়ে যেতেন,
যেন জীবনের সব কিছু
ধরা পড়ে না প্রশ্নপত্রে।
আমি লিখতাম,
তারপর আবার কেটে দিতাম।
তিনি প্রথম বলেছিলেন—
ওই কেটে দেওয়া দাগগুলোর
ভেতরেই তোর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।
চিরপ্রশান্ত স্যার
আমাকে শিখিয়েছিলেন
ভুল করাকে ভয় না পেতে—
কারণ সঠিক উত্তর
প্রায়ই
নীরবতার ভেতর লুকিয়ে থাকে।
আজ, যখন আমি শিক্ষক হয়ে
ফাঁকা খাতা দেখি,
আমি তখন বুঝে যাই—
এটা আসলে স্যারেরই নোটবই,
যেটার লেখা এখনো শেষ হয়নি।
🍂
যে প্রশ্নটা তোলা হয়নি
চিরপ্রশান্ত স্যার
কখনও প্রশ্ন ধরতেন না—
তিনি প্রশ্নটা রেখে দিতেন
ক্লাসঘরের বাতাসে।
আমরা তখন উত্তর খুঁজতাম
বইয়ের পাতায়,
পাতা উল্টাতাম, দাগ দিতাম,
কিন্তু প্রশ্নটা
কোথাও লেখা থাকত না।
তিনি জানতেন—
সব প্রশ্ন উচ্চস্বরে করলে
সময় সেগুলোকে
ভোঁতা করে ফেলে।
বলাগড় স্কুলের দুপুরে
রোদ পড়ত ধীরে,
খালের জল নড়ত না।
স্যার টেবিলের উপর
চক দিয়ে লিখে
নিজের মনেই মুছে ফেলতেন,
তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন—
যেন দেখছেন
আমরা কবে
নিজেরা নিজেদের কে
প্রশ্ন করতে শিখব।
তিনি কখনও বলেননি
কী ভাবতে হবে।
তিনি শুধু জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন—
যেখানে ভাবনাটা
নিজে থেকে এসে বসতে পারে।
আজ, এত বছর পরে,
যখন চারপাশে
দেখি সব প্রশ্নের উত্তর রেডি
সব মতামতের গায়ে দাম লেখা,
তখন বুঝি সব শব্দের ব্যবহার নির্ধারিত—
এখন বুঝি,
চিরপ্রশান্ত স্যার
আমাদের কিছু শেখাননি।
আমাদের শুধু শিখিয়েছিলেন
প্রশ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখতে—
যাতে একদিন
উত্তর আসার আগেই
আমরা নিজেদেরকে
হারিয়ে না ফেলি।
লিখে চলেছি একা
স্যার,
আমি কিন্তু হারিয়ে যাইনি।
আমি শুধু ভিড়ের ভেতর
নিজেকে ব্যবহার করা বন্ধ করেছি।
আপনি যেমন করতেন—
আপনার কবিতার বই ছিল লাইব্রেরিতে,
আমাদের পাঠ্যসূচিতে নয়।
আপনি জানতেন—
শেখানো আর দেখানো এক জিনিস নয়।
আমি তেমনই
শব্দের শেষে এসে
চুপ করে থাকি।
সবাই যখন জিজ্ঞেস করে—
“কোথায় পৌঁছোলি?”
আমি চুপ করে থাকি।
আপনি শিখিয়েছিলেন,
পৌঁছনোর থেকেও
জরুরি লেখার ভঙ্গিমা।
আজকাল সবাই লেখালেখি করে
বড় বড় কথা বলে—
কত পুরস্কার লাইক শেয়ার পোস্টার,
তালিকা, আলো।
আমি জানি—
আপনি হলে জানালাটা খুলতেন,
আলো কে ঢুকতে দিতেন,
নিজে সরে দাঁড়াতেন।
আমার লেখাগুলো
সবাই পড়ে না।
কিছু লাইন মাঝপথে থেমে যায়,
কিছু লেখা খাতাতেই
থেকে যায়।
তবু আমি লিখি—
কারণ আপনি বলেছিলেন,
সব লেখা শেষ হওয়ার জন্য নয়।
স্যার,
আমি আপনার মতোই
কিছু প্রশ্ন রেখে দিয়ে এসেছি
পাতার ফাঁকে।
আজকাল সব উত্তরকে বিশ্বাস করি না,
সব নীরবতাকেও না।
একদিন যদি কেউ এসে বলে—
“এত বছর পরে তুমি কী পেলে?”
আমি বলব—
আমি হারিয়ে যাইনি।
আমি লিখে চলেছি একা—
যাতে ভিড়ের মধ্যে
12 Comments
Awesome
ReplyDeleteধন্যবাদ
DeleteBah! Besh valo laglo.
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteআরো লিখে চলুন,খুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteআপনার স্যারের প্রতি রইলো আমার শ্রদ্ধা । পাশাপাশি একরাশ শ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা রইলো সেই লেখনী,,সেই কলমের জন্যও ,,যে কলমই পারে তাঁর লেখনীর মধ্যে দিয়ে তাঁর শিক্ষকের উদ্দেশ্যে এই শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। খুব ভালো লাগলো কবিতা দুটি
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteভালো লাগলো। চিরপ্রশান্ত স্যারের সঙ্গে মানসিক কথোপকথন ও স্বগতোক্তি চিরকাল চালিয়ে যান, অয়ন!
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteভালো লাগলো
ReplyDeleteধন্যবাদ
Delete