শ্রাবণের জলভরা মেঘের অঝোর বর্ষণ তার গতি কমিয়েছে একটু একটু করে । থৈ থৈ প্রকৃতি। সবুজে সবুজ। মাঠে মাঠে কচি ধানগাছ গুলো বেশ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ঘোষণা করছে আগামির সুফল বার্তা । যেন বলতে চাইছে ---মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো / দোলে মন দোলে অকারণ হরষে।"
ঘন মেঘের সন্নিবেশের ফাঁকে ফাঁকেই বেশ একপ্রস্থ কড়া রোদ উঠে যায়। তবে কাঁচা সোনার মতো সে রোদের রঙ। মাথার ওপর সূর্য। দিন রাতের দৈর্ঘ্য ক্রমশ সমান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে মহাজাগতিক নিয়মে। ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা চলে। জীববিজ্ঞান বলে দিনের আলো মাঝেমাঝে কম আর মাঝেমাঝে বেশী হলে ধানগাছের সালোকসংশ্লেষ ভালো হয়। ফসল পুষ্ট হয় এবং ভাদ্রমাসেই রোদছায়ার লুকোচুরি বেশী হয়। ভাদ্রের নিজেরই বুঝি ভাবনা থাকে কিভাবে সারাবছরের খাদ্য মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে পারবে। তবে এবছর যেন ভাদ্র একটু অন্যসুরে কথা বলছে।নিয়মের হেরফের হচ্ছে। ভাবনার বিষয়!
উপচে পড়া নদী খাল বিলে বন্যা লাগে এই ভাদ্রে। গ্রামের প্রান্তিক মানুষগুলো হিমশিম খায় বন্যাকে সামাল দিয়ে চলতে। ভাবনার কথা বৈকি! আর এ বছর যে পরিমাণ বৃষ্টি এবং হড়পা বানে পাহাড় ধ্বসে কাদামাটিজলে যেভাবে উত্তরভারতের মানুষের প্রাণহানি ও জনপদের ধ্বংস হয়ে চলেছে খুবই ভাবনার বিষয়। এদিকে গ্রাম ছেড়ে বন্যা নগরকেন্দ্রিক হচ্ছে। দেশের প্রায় প্রতিটি নগর একঘন্টা বৃষ্টি হলেই জলের তলায় চলে যাচ্ছে। ভাবনা চিন্তা করতে হবে এ ব্যাপারে। উন্নয়নের নামে স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বহুতল নির্মাণ আর নির্মান। সে আবাসন হোক বা বিপণন কেন্দ্র। হোক --- আপত্তি নেই। কিন্তু ভাবনায় শিউরে উঠতে হচ্ছে যে সর্বত্র নিকাশী নালা বা পয়:প্রণালী বন্ধ করে সেইটুকু জায়গাকেও দখল করা হচ্ছে এবং এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। যে কোনো সামাজিক বাস্তুতন্ত্রে এ এক অমার্জনীয় অপরাধ।যৌথজীবনযাপনের প্রাথমিক শর্তই লঙ্ঘিত হচ্ছে দুর্মর দাপটে। কেউ বলার নেই দেখার নেই ---না নাগরিক কমিটি না ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ। ভাবনা তো হবেই। মহেঞ্জোদারো হরপ্পাতে সুগঠিত পয়ঃপ্রণালী ছিল। একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের নেই। ড্রেনের বদলে জল রাস্তার ওপর দিয়ে ছোটে। অতএব আমাদের ভাবনাকে ছোটাতে হবে ঠিক ট্র্যাকে।
তবে মাছের মরশুম এই ভাদ্র। মিষ্টি জলের চিংড়ি কাতলা ট্যাংরা বোয়াল আর নোনা জলের ইলিশ । ভাদ্রে যত ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি তত ইলিশ মাছের আমদানি। আর আছে ভাদ্রের গণেশ পুজো রান্না পুজো, বিশ্বকর্মা পুজো। এক ব্যাপার বটে। বাঙালির যে কত পুজো!!! পান্তভাত খাওয়ার পুজো। আসলে এখানেও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান। ভাদ্রের প্রচন্ড রোদের তাপে আইঢাই অবস্থা। শরীর ঠান্ডা করার একটা পদ্ধতিকে নিয়মে ফেলে ভরা ভাদ্রের ঐশ্বর্যে সুন্দরী করে তোলা। মনসা দেবীর আরাধনা। সাপের ভয় ভাবনা থেকে গ্রামবাংলার মানুষজন সুরাহা খোঁজে এই পুজোয়। এবছর উদ্বেজনক সংখ্যায় সর্পদংশনে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।এখনো মানুষ ঝাড়ফুঁক ওঝাকে বিশ্বাস করে। ভাবনার উন্নয়ন ঘটে নি।
প্রবাদ আছে ভাদ্রের পনেরো দিন চাষীর পনেরো দিন মুচির। তীব্র কড়া রোদে মুচি শুকিয়ে নেয় ঢাকের চামড়া। মায়ের আবাহনের সময় এল যে! ওদিকে মৃন্ময়ী মূর্তি শুকোনোর জন্যও চাই কটকটে রোদ ---বেশ ঘন্টা চারেক ক'রে। দশ পনেরো দিন। ঠিকঠাক রোদ না উঠলে মৃৎশিল্পীর কপালে ভাঁজ পড়ে। বাড়তি ইলেকট্রিক খরচ করে শুকোতে হবে। আর পনেরো দিন ঝমঝমে বৃষ্টিতে চাষী খুশি হয়। ধানের গোড়ায় জল জমলে ধানের শীষে দুধ জমে। ধান পুরুষ্ট হয়। এরপরেই ত চাষীর ছুটি। অন্তত দুমাস। ভাবনা নেই।
🍂
ভাদ্রের দিকে আড়ে আড়ে চায় সেই একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা গাছটা। তার ভাবনা-- তার সৃষ্টি কি করে এত নীচুতে মানুষের কাছে পাঠানো যায়। সময় যে এসে গেল! তাই সে নিজেই পড়ে ধুপধাপ। তালতলায় যাবার তালে তালে থাকে ছেলে বুড়ো। তালফুলুরী কে ভালোবাসে না জানতে চাই।
যদি তাল না পড়ে ---ভাবনা করব নিশ্চয়ই।
ফুলুরীর গন্ধে যখন ম ম করে চারপাশ তখন হয়তো সন্ধ্যামণিফুলের গোছা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো এক নবীনা-- দুবেণী দুলিয়ে ---এক ভীরু বিকেলে কোনো এক কদমতলিতে। হাত খানি বাড়িয়ে এসে দাঁড়ায় কোনো এক ভুবন ডাঙার নবীন নওল কিশোর। প্রথম কদমফুল নিয়ে।
কোথা থেকে যেন সুর ভেসে আসে---ভরা বাদর মাহ ভাদর /শূণ্য মন্দির মোর।
হঠাৎই ডেকে ওঠে আকাশ। বিজুলি চমকিয়া ওঠে । তিমির নিবিড় রাত্রি হয় ঘনঘোর।
আবার পরের প্রভাতেই হয়তো ঘননীল আকাশের নির্মল রোদ আর সাদা মেঘ নিয়ে ভাদ্র হেসে দাঁড়ায় গৃহস্থের উঠোনে অথবা কাশের বনে।
1 Comments
ভাবনাটা যে কি ভালো লাগলো,
ReplyDeleteঠিক ওই তালফুলুরীর মত।