জ্বলদর্চি

মোরামের রাস্তা /তড়িৎ চক্রবর্তী

মোরামের রাস্তা

 তড়িৎ চক্রবর্তী


বায়নালার সুরেনদা'র বাড়িতে থাকার সময় বেশ জোরে বৃষ্টি এলো। গ্রামের মাটির রাস্তায় কাদা মাখামাখি। খেয়াদা বাজারের মোরমের রাস্তায় ওঠার আগে, দশের পুকুরে পাধুয়ে গুঁড়ি ফেলা সিঁড়ি দিয়ে উঠে চটি পরে সামনে তাকাতে, তাকে দেখলাম। আগেই আমাকে দেখতে পেয়ে রাস্তার একধারে খিরিশ গাছে ঠেস দিয়ে সিঁটিয়ে দাড়িয়ে ছিল। মাথায় বড়ো ঘোমটা একেবারে নাক ঢেকেছে। আটপৌরে সাদা খোলের লাল পেড়ে শাড়ি, কালো চকচকে ব্লাউজ, পায়ে হওয়াই চটি। সঙ্গে বছর দুয়েকের একটা বাচ্চা।
বুঝলাম এখন ওর নিবাস এখানে, এই খেয়াদার কোন পাড়ায়। হয়তো হাটে এসেছিলো, ফিরে যাচ্ছে পাড়ায়।
ও'কি একা!
পরি কোথায়? পরি মানে ওর বর পরিতোষ নস্কর। একরাশ বিস্ময় আমাকে নাড়া দিলো।
কিছুক্ষন আমরা চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলাম। বাচ্চাটা ওর পায়ে হেলান দিয়ে কোমর ভেঙে দাঁড়িয়ে ছিল।
এবার ও’ বাচ্চাটার হাত ধরে সামনে হাঁটতে শুরু করতে, আমিই ডাকলাম, 
-'বিমলা।'
পিছন ফিরে তাকালো। একপা একপা করে এগিয়ে এলো।
🍂

-'বিমলা আমার মতো আর একবার চা দিস।'
ও’র পাঁচ মিনিটও দেরি হতনা। খুব যত্ন করে আমার প্রিয় একটা ক্রিমক্রেকারের সাথে এক কাঁচের গ্লাস লাল চা এসে যেতো। সাথে এক গ্লাস জল একটা আলাদা প্লেট চাপা দিয়ে। ও’ জানে চা খাবার আগে আমি প্রতিবার জল খাই।
মায়ের অনুপস্থিতিতে বিমলা এই অকৃতদার লেখকের বাড়ির সব কাজের পরিচারিকা তখন।
সেবার গোসাবার ফুলমালঞ্চ এলাকায় ভীষণ ঝড়ে অনেকগুলো ঘর পড়ে যাওয়ায় আমার মায়ের মহিলা সমিতি রিলিফ দিতে যায়। মা ফেরে বিমলাকে নিয়ে। ঝড়ে ওদের ঘর চাপা পড়ে ওর বাবা, মা, ছোটো ভাই মারা গিয়েছে। বিমলা সেসময়ে স্কুলে গিয়েছিলো, স্কুল বাড়ির ক্ষতি হয়, কিন্তু বিমলা প্রাণে বাঁচে। ও'র তখন বয়েস বছর বারো কি তেরো। প্রথম দিকে পড়াশুনা করতো, মা স্কুলে ভর্তি করেও দিয়েছিলেন কিন্তু পরে পড়াশুনা ছিল তার খুব অপছন্দের। মাকে বলেছিল, ঘরের কাজই ওর বেশি পছন্দের। ওর ইচ্ছে বাড়িতে মার কাছে যতটা পারবে শুনেশুনে পড়বে কিন্তু স্কুলে কিছুতেই যাবেনা।
কিছুদিনের মধ্যে বিমলা মায়ের প্রায় অভিভাবক হয়ে উঠলো। সকাল থেকে মা কখন কি খাবে, কখন ওষুধ খাবে, বাজার, রান্না এমনকি ঘরদোর পরিষ্কার সব নিজে করতো।
মাকে সে অনুরোধ করে কাজের লোক ছড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু বাগানের কাজের জন্যে পরিতোষকে রাখা হয়েছিল। সে বেশ কর্মঠ যুবক।
চলছিল ঠিকই। 
হঠাৎ মা কার্ডিয়াক স্ট্রোকে একদিনের মধ্যে আমাদের ছেড়ে গেল।
ইতিমধ্যে আমার প্রেমিকা মল্লিকার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও শেষ হয়ে গিয়েছিল।
আমি লেখালিখি করেই দিন কাটাতাম। সেরকম বন্ধুবান্ধব ছিলনা। মাকে ঘিরেই জগৎ ছিল আমার। বড়ো একা হয়ে গিয়েছিলাম। 
সেই সময় আমার অভিবাবক কাম বন্ধু হয়ে গেলো বিমলা।
বাড়িতে আমি আর বিমলা। বিমলা তখন বছর বাইশেকের। আমি প্রায় চল্লিশের কোটায়। আমরা প্রায় সারাদিন পাশাপাশি কাছাকাছি থাকতাম। সে আমার সারাদিনের রুটিন জেনে গিয়েছিল, সবকিছু হাতের কাছে জুটিয়ে দিত, না বলতেই। এমনকি আমার লেখা শুনত ঘাড় কাট করে।
মাঝেমাঝে ঠিক সময় স্নান বা ওষুধ না খেলে ধমকও দিত।
সংসারের যা নিয়ম। আমরা আরো একটু যেন কাছাকাছি আসতে শুরু করেছিলাম।
এবার জেনো একটু বেশীই কাছাকাছি এসে গিয়েছিলাম।
মাঝেমাঝে যে সাহিত্যের আসরে যেতাম, তাও যেতে মন চাইতো না। বুঝতে পারতাম বিমলার সাথে থাকার ইচ্ছে বাড়তে লেগেছিল।
একরাতে আমরা নিজেদের শরীর নিয়ে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেললাম।
পরের দিন সে ব্রেকফাস্ট দিতে এসে জানালো, সারাদিনের রুটিন মতো সব ঠিক করে রেখেছে। জামা কাপড় কেচে সাজিয়ে রেখেছে, টাকা পয়সা ড্রয়ারে যথাস্থানে আছে।
হঠাৎ বিমলার এই ব্যবহারে আমি অবাক হলাম।
-'ঠিক করেছি চলে যাবো।' বিমলা বললে।
-'কোথায় যাবি। তুই বাকি জীবন আমার সঙ্গে থাকবি।' অনুরোধের সুরে বলেছিলাম।
-'না। তা হয়না। কাল সারারাত ভেবেছি। আমাদের এই মধ্যবিত্তের অবাস্তব সাজানো সংসার কিছুদিনই শেষ হবে। এতো নাটকের বিবেকের ভূমিকা। এখনো নায়ক তো ভিলেন হয় নি। এখানে আর থাকতে চাইনা। এ স্বপ্ন কিছুদিনে ভাঙবে। আর যার টানে ছিলাম, সে'তো নেই।'
-'কোথায় যাবি ঠিক করলি কিছু!'
-'হ্যাঁ। পরিতোষ অনেক আগেই বলেছিল আমাকে বিয়ে করতে চায়, তার সাথে ঘর বাঁধবো। হয়তো খুব বড়ো ঠোকাঠুকি হবেনা। মাটির ঘর। অভাবী সংসার। এটাই তো আমার জন্যে। বামুন হয়ে চাঁদ ধরার চেষ্টা আমি করিনা।'
আমি অনেক বুঝিয়ে ছিলাম। সে নাছোড়বান্দা।
বিমলা সেদিনই চলে গেলো।
তার আর কোন খবর পাইনি। পাবার চেষ্টাও করিনি।
তার কথা ভুলে গিয়েছি। মেতেছিলাম গভীর ভাবে সাহিত্য চর্চায়।
আজ তার সঙ্গে দেখা হওয়াতে জানলাম,
তার দু’টি মেয়ে, একটি ছেলে। এই ছোটটি মেয়ে। বেশ ভালোই আছে। খাস জমিতে ঘর বানিয়েছে।
বিমলা বিকালে গ্রামের মাঠ থেকে আনা শাকপাতা হাটে বিক্রি করে। আর পরি নস্করদের জমিতে ক্ষেতমজদুরি করে।
পরি মাটির দাওয়ায় বসে তাকে গান শোনায়, পালা বলে। পরি এখন এই গ্রামের পালাগানের মাস্টার।
বেশ আছে বিমলারা। সংসার তার অভাবের হলেও সুখের।
নববর্ষের নতুন আকাশের মতো ওদের স্বপ্নকে সেলাম করে সোনারপুরের দিকের মোরামের রাস্তা ধরলাম।

Post a Comment

0 Comments