মেদিনীপুর শহর
রেখা ও লেখা – শুভ্রাংশু শেখর আচার্য্য
মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল
মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল, বাংলার পাশাপাশি ভারতের প্রাচীনতম স্কুলগুলির মধ্যে একটি। মেদিনীপুরের মানুষ বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র মেহতাব রায়বাহাদুরের অর্থনৈতিক সহায়তায়, ১৮৩৪ সালের ১৪ নভেম্বর এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কয়েকটি খড়ের কুঁড়েঘর এবং ১৮ জন ছাত্র নিয়ে। প্রথম প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন হিন্দু কলেজের প্রাক্তন পণ্ডিত রসিকলাল সেন। সরকার ভারতে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের নীতি গ্রহণ করলে ১৮৩৬ সালে এই স্কুলটিকে সরকার অধিগ্রহণ করে জেলা স্কুলে পরিণত করে এবং সরকারি স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন এফ টাইড। আগুনে পুড়ে কুঁড়ে ঘরের প্রথম স্কুল ভবনটি নষ্ট হয়ে গেলে সরকারি সহায়তায় ১৮৪০-৪১ সালে নতুন পাকা ভবনটি নির্মিত হয়।
ব্রিটিশ শাসন কালে এই স্কুলের ছাত্র এবং শিক্ষকরা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান রেখেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরাম বসু, অনাথ বন্ধু পাঁজা এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের আরও কিছু প্রাক্তন ছাত্র হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সৌম্যশঙ্কর বসু। হেমচন্দ্র কানুনগো, জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু, প্যারিলাল ঘোষের মতো শিক্ষকরা তাঁদের জাতীয়তাবাদী শিক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ব্রাহ্ম সমাজ নেতা ঋষি রাজনারায়ণ বসু প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছিলেন।
সুজাগঞ্জ জগন্নাথ মন্দির
শহরে ঢোকার মুখেই আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঋজু গড়নের এই মন্দির। তবে, এখন যে মন্দির আমরা দেখি, সেটি প্রকৃতপক্ষে জগন্নাথের দ্বিতীয় মন্দির। অনুমান করা হয় আদি মন্দিরটি খ্রিস্টীয় দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ওড়িশার গঙ্গবংশীয় কোনও নৃপতি সেটি নির্মাণ করেছিলেন। শহরের একেবারে দক্ষিণ সীমায়, ওড়িশা ট্রাঙ্ক রোডের উপর, কংসাবতী নদীর কোলে অবস্থান ছিল মন্দিরের। ১৮৩৯-৪০ সালে কংসাবতীর ভয়ানক বন্যায় ভেসে যায় সেই মন্দিরটি। পরে শহরের নামকরা জমিদার জন্মেঞ্জয় মল্লিক উদ্যোগী হয়ে বর্তমানের মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন তাম্বুলী সম্প্রদাভুক্ত। মন্দিরে নিবদ্ধ প্রতিষ্ঠালিপিটিতে লেখা রয়েছে : “শ্রীজগন্নাথ বাসার্থং শ্রীজগন্নাথ মন্দিরং/শ্রীজগন্নাথ পদাব্জাস্তৈঃ তাম্বুলিনি করৈঃ কৃতং ১৭৭৩ শুভমস্ত সকাব্দা / |” অর্থাৎ মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল ইং ১৮৫১ সাল বা বাংলা ১২৫৮ সন।
নতুনবাজার এলাকার সামান্য পশ্চিমে সুজাগঞ্জ পল্লীর ভীমতলাচক| ইটের তৈরী দক্ষিণমুখী মন্দিরটি কলিঙ্গশৈলীর নবরথ শিখর দেউল রীতিতে নির্মিত। মূল মন্দিরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে চারচালা রীতির এক জগমোহন | মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি উন্মুক্ত নাটমন্দির, গরুড়স্তম্ভ এবং দ্বিতল বিশিষ্ট নহবতখানা। দৈর্ঘ্য প্রস্থে ২১ ফুট ও উচ্চতায় প্রায় ৭৩ ফুট মন্দিরটিতে সামান্য পোড়ামাটির অলঙ্করণ ছাড়াও, পঙ্খের নকশি-ভাস্কর্যও দেখা- যায় । এছাড়া মন্দিরের কাঠের দরজাটির পাল্লার উপর দশাবতারের মুর্তি সম্বলিত খোদাইকাজ রয়েছে।
সেন্ট জন’স চার্চ
১৮৫১ সালে ইংল্যান্ডের চার্চ মিশন সোসাইটি কর্তৃক নির্মিত, মেদিনীপুরের সেন্ট জনস চার্চ ইতিহাস এবং বিশ্বাসের এক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১৮ সালে সংস্কার করা গির্জাটির মনোরম চূড়া, স্তম্ভ এবং সম্মুখভাগ ঔপনিবেশিক যুগের স্থাপত্যের একটি চিত্তাকর্ষক নিদর্শন। মেদিনীপুরের শহরের সেখপুরায় অবস্থিত, এই গির্জাটি ধর্মীয় নিষ্ঠার এক মর্মস্পর্শী প্রতীক। এই গির্জার সামনেই রয়েছে কবরস্থান যা বারবার মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও তার সাথে জড়িত দেশমাতার বীরপুত্রদের কথা।
১৯৩১ সালের ৭ এপ্রিল মেদিনীপুর জেলা স্কুলের (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল) প্রদর্শনীতে বিপ্লবী বিমল দাশগুপ্ত ও জ্যোতিজীবন ঘোষের ছোঁড়া গুলিতে নিহত কুখ্যাত জেলাশাসক জেমস পেডি্কে সমাধিস্থ করা হয় এই চার্চ চত্বরে। ১৯৩২ সালের ৩০ এপ্রিল বিপ্লবী প্রদ্যোত ভট্টাচার্য এবং প্রভাংশু পালের ছোঁড়া গুলিতে জেলা পরিষদে জেলা বোর্ডের বৈঠকে নিহত হন জেলাশাসক রবার্ট ডগলাস। এখানে রয়েছে তাঁর সমাধি। ১৯৩৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর পুলিশ মাঠের ফুটবল ম্যাচে বিপ্লবী অনাথবন্ধু পাঁজা এবং মৃগেন্দ্রনাথ দত্তের গুলিতে নিহত অত্যাচারী জেলাশাসক বার্নাড এডওয়ার্ড জন বার্জের সমাধিও রয়েছে এখানেই। এছাড়াও ১৯২০ সালে গোদামূড়ি সংলগ্ন জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় জন্মের পর থেকে জনবিচ্ছিন্ন জঙ্গলে নেকড়েদের কাছে প্রতিপালিত দুই বোন অমলা ও কমলাকে। ১৯২১ সালে ২১ সেপ্টেম্বর জোসেফ অমৃতলাল সিং -এর অনাথ আশ্রমে মৃত্যু হয় অমলার। এই চার্চ চত্তরে রয়েছে সেই বিশ্ময় বালিকার সমাধিও।
মেদিনীপুর রেলওয়ে স্টেশন
মেদিনীপুর স্টেশন দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ে জোনের খড়গপুর রেল বিভাগের খড়গপুর-বাঁকুড়া-আদ্রা লাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশন। ইংরেজ শাসনকালে বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে স্থাপিত হয় যা পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয় দক্ষিণ-পূর্ব রেলের শাখায়। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯০১ সালে, খড়গপুর-মেদিনীপুর শাখা লাইন খোলা হয়। গৌরবময় এই রেল স্টেশন তার ১২৫ বছরের ইতিহাসে বহু মনিষীর চরণস্পর্শে ধন্য হয়েছে।
মেদিনীপুর স্টেশনে মহাত্মা গান্ধী পদার্পণ করেন দু’বার। তার মধ্যে দু’বার এই স্টেশন দিয়ে । প্রথমবার, ২০ অক্টোবর ১৯২১ সালে (বুধবার) দুপুর ২ টোর সময় লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলকের স্মৃতিতে বানানো "তিলক স্বরাজ ভান্ডার"-এর জন্য অনুদান সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে ছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখ। দ্বিতীয়বার, চিত্তরঞ্জন দাসের প্রয়াণের পর তাঁর বাড়িটিতে ‘চিত্তরঞ্জন সেবাসদন’ নামক একটি সেবাসদন তৈরীর উদ্দেশ্যে তহবিল সংগ্রহের জন্য ৫ জুলাই, রবিবার, ১৯২৫ রাত্রে মেদিনীপুর স্টেশনে নামেন। স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন দেবেন্দ্রলাল খান ও তাঁর ভাই বিজয়লাল খান।
বার্ধক্যে উপনীত, প্রায় পদচারণায় অক্ষম, রবীন্দ্রনাথ মেদিনীপুরে নবনির্মিত বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন উপলক্ষে এই স্টেশনে এসে নামেন ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাত্রি ১০টায়। ওই রাতেও প্রবল শীতকে উপেক্ষা করে বহু মানুষ স্টেশনে ভিড় জমান কবিকে দেখার জন্য।
ঝাড়গ্রামের জনসভায় বক্তব্য রাখার উদ্দেশ্যে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর এই স্টেশনে পদার্পণ ঘটে ১৯৪০ সালের ১২ মে, রবিবার। কালজয়ী বাংলা সিনেমা ‘বসন্ত বিলাপ’ –এর সাথেও জড়িয়ে আছে এই স্টেশন। স্টেশনের পুরানো চালচিত্র সময়ের সাথে বদলে গিয়েছে অনেকটাই। বর্তমানে ‘অমৃত ভারত’ প্রকল্পের সৌজন্যে এই স্টেশন আমূল পরিবর্তিত হয়ে একেবারে আধুনিক ও ঝকঝকে হয়ে উঠতে চলেছে।
মেদিনীপুর রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম
মেদিনীপুরের এই আশ্রমটি ১৯১৪ সালে স্বামী বিবেকানন্দের প্রত্যক্ষ শিষ্য শ্রীশরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয় ভক্তদের দ্বারা বর্তমান স্থানে ‘রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনকার ছোট দ্বিতল ভবনের সেবাশ্রমটির প্রথম তলায় ছিল মন্দির এবং সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল এবং দ্বিতীয় তলায় ছিল অফিস। নাড়াজোল রাজ পরিবার কর্তৃক এই ভবনটি আশ্রমকে উপহার দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে শ্রী শ্রী মা সারদার ট্রেনে কলকাতায় যাওয়ার পথে, ভক্তরা মেদিনীপুর রেলওয়ে স্টেশনে তাঁর সাথে দেখা করে, সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠার কথা জানিয়ে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। আশ্রমটি শ্রীরামকৃষ্ণের দুই প্রত্যক্ষ শিষ্য স্বামী সুবোধানন্দজী এবং প্রেমানন্দজীর দ্বারাও আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছিল।
১৯৩১ সালে, মিশন এটির দায়িত্ব নেয় এবং ‘রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম’ নামকরণ করে। কয়েক বছর পর, এর নামকরণ করা হয় ‘রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম’। ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে স্বামী বিশোকত্মানন্দজী মেদিনীপুর আশ্রমের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যার ফলে আশ্রমটি ক্রমবর্ধমান হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ১৯ আগস্ট, প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিদ্যাভবন এবং দাতব্য চিকিৎসালয় চালু হয়। ১৯৫১ সালে, পঞ্চম শ্রেণী থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি চালু হয়। একই বছরে, স্বামী বিশুদ্ধানন্দজী মহারাজ একটি ছাত্রাবাসও খোলার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি খোলা হয়। ২৫ এপ্রিল, ১৯৭৪ সালে, স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী মহারাজ ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের একটি মনোরম মন্দির সহ নতুন মন্দিরটি্র উদ্ধোধন করেন। ১৯৮৬ সালে আশ্রমটি মঠ এবং মিশনে বিভক্ত করা হয়। ভক্ত এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদার দান এবং সহায়তার মাধ্যমেই এই সবকিছু সম্ভব হয়েছিল।
পুরাতন জল ট্যাঙ্ক
পাথুরে লাল মাটির এলাকা মেদিনীপুর শহরে প্রাচীন কাল থেকেই জলের প্রধান উৎস কংসাবতী নদী। কিন্তু গ্রীষ্মকালে প্রায় শুকনো থাকত বলে শহরে জলের অভাব ভয়াবহ হত। শহরের এই সমস্যা সমাধানে ১৯২৪ সালে জনস্বাস্থ্য দপ্তর একটি জলাধার নির্মাণ করে। সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ময়ূরভঞ্জের মহারাজ পূর্ণচন্দ্র ভঞ্জ, বর্ধমানের মহারাজাধিরাজ বীজয়চাঁদ মহতাপ, মহিষাদলের রাজা সতীপ্রসাদ গর্গ, নাড়াজোলের বিধান পরিষদ সদস্য দেবেন্দ্রলাল খান, মেদিনীপুর পুরসভার চেয়ারম্যান বাবু উপেন্দ্রনাথ মাইতি, মেদিনীপুর জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান বাবু রমেশচন্দ্র মিত্র, বিধান পরিষদের সদস্য বীরেন্দ্রনাথ শাসমল সহ মোট ২৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। নামকরণ করা হয় নাড়াজোলের রাজা নরেন্দ্রলাল খানের নামে ‘রাজা নরেন্দ্রলাল খান ওয়াটার ওয়ার্কস’।কেরানিতলা থেকে স্টেশন যাওয়ার রাস্তায় শহরের উচ্চতম স্থানে অবস্থিত এই জলাধারটির পুরোটাই ইট দিয়ে তৈরি। কংক্রিট বিহীন প্রায় ২০ ফুট উঁচু এই জলাধারের মাঝে রয়েছে ইটের তৈরি একটি গোলাকার পিলার আর তাকে ঘিরে বাইরে চারিদিকে আড়াই ফুটের দেওয়াল। কেন্দ্র থেকে বাইরের দেওয়াল পর্যন্ত চারিদিকে ১২টি আর্চের ওপর রয়েছে এই জলাধার। ৫০ হাজার গ্যালন জলধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই জলাধারের বাইরের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে ১২টি জানালা।
বি এন ইলিয়াস এন্ড কোম্পানি নামক একটি পার্সি সংস্থার তৈরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে শুরুর সময়ে জল তোলা হত। পরে ১৯৭২ সালে রাজ্য সরকার সেই সংস্থা অধিগ্রহণ করে। ২০২৪ সালে এই ঐতিহ্যবাহী জলাধারটি নিঃশব্দে শতবর্ষ অতিক্রম করেছে।
0 Comments