বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ৯২
ডুমুর
ভাস্করব্রত পতি
"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব'সে আছে
ভোরের দোয়েল পাখি চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ
জাম বট কাঁঠালের হিজলের অশ্বত্থের ক'রে আছে চুপ।" ---
বাংলার মুখ, জীবনানন্দ দাশ
বাংলার অতি পরিচিত ডুমুরকে বলা হয় উদুম্বুর, ফল্গু, ন্যগ্রোধ, সদাফল, অপুষ্পফল, সিতবস্কল, রাজিকা, কঠিনা, খরবল্লী, ফলসম্ভারী, জঘনে ফলা, জন্তুফল ইত্যাদি। ওড়িয়াতে বলে ডিমিয়ি। এছাড়াও ইংরেজিতে ফিগ, হিস্পানিতে হিগো, হিব্রুতে তীনাহ, ইতালিতে ফিকো, ফরাসিতে ফিগুই, রাশিয়ান ও জার্মানে ইনজাহির, গ্রীকে সুইস বলে। প্রাচীন ভারতে ডুমুরকে 'মলপু' বলা হত। এই 'মলপু' নামকরণের পেছনে এর উপকারী গুণাবলীই দায়ী।
ডুমুর ও পাতা
বৈশ্যকন্যার গর্ভে নমঃশূদ্রের ঔরসে জন্মানো সন্তানকে বলে শ্বপচ। এঁদের জীবিকা হবে কুকুর পালন করা এবং এঁরা খাদ্য হিসেবে কুকুরের মাংস খাবে। এই শ্বপচের কন্যার গর্ভে নমঃশূদ্রের ঔরসে যে সন্তান হবে, সে হবে 'মলপু'। তখন তাঁদের জীবিকা হবে মানুষের মল পরিস্কার করা। তাঁদের বসবাস করতে হবে গ্রামের শেষ প্রান্তে। এই মলপু'ই হল মেথর। আমাদের আলোচিত ডুমুর নাকি মেথরের মতো কাজ করে বলেই বলা হয় 'মলপু'।
রাশি রাশি ডুমুর
সুশ্রুতের টীকাকার ডল্বন এই ডুমুরকে 'মলপুঃ' বা কাকোডম্বরিকা বা কাকডুমুর বা কাকডুমুর বলে উল্লেখ করেছেন। চক্রদত্ত সংগ্রহে দেখা যায়, ভগন্দর বা Fistula চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ডুমুরের রস কাজে লাগে। যার ব্যবহারে ভগন্দর ফেটে যায়, আর বিষাক্ত পুঁজ ও রক্ত বের করে সারিয়ে তোলে। অর্থাৎ বিষাক্ত ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে দেয় ডুমুর। অর্থাৎ যে ভেষজটি খেলে প্রতিদিনের আহার্য্য খাদ্যের মল পেট থেকে নিষ্কাষিত হয়, কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দেয়, অর্থাৎ মেথরের মতো কাজ করে -- তাইই 'মলপু'। তাই ডুমুর হল মলপু। কোরআন শরীফে ডুমুরের নাম 'ত্বীন'। বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে এই শব্দটি। বর্তমানে যে শহরকে দামেশক বলা হয়, একসময় এর নাম ছিল ত্বীন।
গাছ ভর্তি ডুমুর
বেশ কয়েক রকমের ডুমুর বাংলাতে জন্মাতে দেখা যায়। সবমিলিয়ে ৬০০ প্রজাতির ডুমুর থাকলেও এরাজ্যে পাওয়া যায় ১১২ জাতের ডুমুর। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল মলপু বা কাকডুমুর (Ficas hispida Linn)। এটি Moraceae পরিবারভুক্ত। হিন্দিতে বলে কাঠগুলারিয়া এবং সংস্কৃতে কাকোডুম্বরিকা। আকারে খুব ছোট। রান্না করে খাওয়া হয়। কাকডুমুরের রস এবং গাছের ছালও শ্বেতী রোগের মহৌষধ। এছাড়াও আছে সাধারণ ডুমুর (Ficus roxburghii), বলাডুমুর (Ficus heterophylla Linn), জয়াডুমুর (Ficus cunia Roxb) এবং যজ্ঞডুমুর (Ficus glomerata)। এই যজ্ঞডুমুর গাছ সাধারণ ডুমুর গাছের চেয়ে বড় হয়। এদের পাতা ডুমুরপাতার চেয়ে ছোট এবং মসৃন। ফলগুলি ডুমুরের চেয়ে বড়। পেকে গেলে লাল মধুর স্বাদ হয় এবং ফলের মধ্যে পোকা জন্মায়। কাঁচা ফল কেটে দিলে আঠা বের হয়। গ্রীষ্মকালে এই পাকাফলের সরবৎ অনেকে খায়। কালিফোর্ণিয়ার ডুমুর হিসেবে পরিচিত 'আঞ্জীর' আসলে কাবুলিডুমুর (Ficas carica)। 'উদুম্বুর' থেকে 'আঞ্জীর' শব্দটি এসেছে। একে ফল্গু ফল, ফল্গুনীও বলে। আসলে ধুলিকনাকে বলে 'ফল্গু'। আরব এলাকার ধুলি ধূষরিত এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বৃক্ষই 'ফল্গু'। চরক এই 'ফল্গু' নামকরণটি করেছিলেন। আঞ্জীরের ফল বড় বড় এবং মিস্টি। ড্রাই ফ্রুটস হিসেবে মালার আকারে বিক্রি হয়।
ডুমুর
আরবী আঞ্জীর খুব উপকারী রক্তপিত্তের চিকিৎসায়। সুশ্রুতের রক্তপিত্ত চিকিৎসাতেও কাকডুমুরের রস খাওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। ডুমুর হল ভীষণভাবে কামোদ্দীপক, কোষ্ঠ পরিষ্কারক, বাতজনক, বমনকারক ও রক্ত পরিষ্কারক। কঠিন সোরিয়াসিস রোগের প্রতিষেধক। ডুমুর ফল নিয়মিত খেলে অকাল গর্ভপাত থেকে মুক্তি মেলে। খাই খাই রোগ নিরসনে, পচা ঘা থেকে মুক্তি পেতেও ডুমুরের অবদান রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের রান্নাঘরে ডুমুর একটি অতি জনপ্রিয় ফল। ডুমুরের পোস্ত রসনা তৃপ্তিকারী।
ডুমুর হল শাখা প্রশাখা যুক্ত মাঝারি ধরনের একটি গাছ। ৮ -১০ ফুট উঁচু হয়। এদের পাতাগুলি খসখসে এবং বোঁটায় সুক্ষ্ম রোঁয়া আছে। ডুমুরের ফল কাটলেই দেখা যায় তার মধ্যে বহু, ফুল রয়েছে। আসলে ডুমুরটি হল পুষ্পধি। এজন্য একে বলে অন্তঃপুষ্প। এদের পুষ্পবিন্যাস উদ্ভিদবিদ্যার ভাষায় উদুম্বুর পুষ্পবিন্যাস নামে পরিচিত। ফলের মধ্যে পোকা হয়। তাই বলে জন্মফল। বট, অশ্বত্থ, ডুমুর এই জাতীয় ফল। যেহেতু এদের কাণ্ড থেকে আঠা জাতীয় রস বেরোয়, তাই বলে ক্ষীরিবৃক্ষ। পাকা ডুমুর পাখিতে খাওয়ার পর মলত্যাগ করলেই তার মধ্যে যে বীজ থাকে সেই বীজ থেকেই নতুন গাছ জন্মায়। সাধারণভাবে মাটিতে বীজ পড়লে চারাগাছ জন্মায়না।
ডুমুরের ছড়াছড়ি
রূপ যৌবন নিয়ে মিছিমিছি গর্ব করা উচিত নয়। সময়ে সময়ে যৌবনের পরিসমাপ্তি ঘটবেই। তাই নিয়ে বলতে শোনা যায় -- 'মিছে ডুমুরের গুমর কর / পাকলে ডুমুর খসে পড়ে মর'। গুরুত্বহীন ব্যক্তির কাজকর্ম নিয়ে বলে থাকি -- 'ছাতারে পাখি নৃত্য করে ডুমুর গাছে বসে / কালো পেঁচা রাজা হবে, লোকে মরে হেসে'। আমরা কথায় কথায় বলে থাকি -- 'ডুমুরের ফুল, সাপের পা' প্রবাদটি। যার অর্থ হল অগোচরে থাকা বস্তু। যাকে দেখা যায়না সচরাচর। বহুল ব্যবহৃত এই প্রবাদটি বাংলা সাহিত্যেও অনুসৃত হয়েছে। যেমন, দাশু রায়ের পাঁচালিতে আছে 'ইদানীং ডুমুরের ফুল, হয়েছ তাতে প্রতিকূল, তোমার প্রতি আমি হতে নারি'। আবার শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখায় পাই 'বাপরে, আজকাল যে ডুমুরের ফুল হয়ে উঠেছেন, কেবল বড় বড় লোক নিয়ে ব্যস্ত, আমার মত গরীব লোকের সাধ্য কি আপনার কাছে ঘেঁষা'। আরেকটি প্রবাদের মধ্যে মেলে -- 'হুমুরের ঘর ডুমুরে ছায়, তিনজনে মটকায় যায়'। অর্থাৎ একজন ঘর ছায়, কিন্তু প্রচার হয় যে, শুধু মটকা ছাইতেই তিন জন লাগে। নবনীতা দেব সেন তাঁর 'ডুমুর' কবিতায় লিখেছেন --
'আবার যদি ফিরতে চাই এই দরদালান
এই বাগানকুঠি ছেড়ে তোমার ঐ ডুমুর গাছের
ছায়ায়,
বন্ধু , তুমি কি আমাকে জায়গা ছেড়ে দেবে?
পথের শেষ নেই, এই দরদালান অনন্ত,
এই বাগান সীমাহীন, এতগুলো থাম তুমি জন্মেও দেখোনি,
এত শিউলি, এত যুঁই, এত আম, জামরুল,
এত আমি -- এ তোমার সবগুলি
চোখ একসঙ্গে মেলে দিলেও ধরা পড়বে না,
এত পায়রা আসে এ বাড়ির ছাদে,
এত খরগোশ এ বাগানের গর্তে গর্তে,
বন্ধু, তোমার ডুমুর গাছের ছাউনি থেকে তুমি এর কণাটুকুও জানতে পাবে না --
এত বুড়ো বুড়ো কালবোস
এদের কালো দীঘিতে!
সবকিছু ছেড়ে দিয়ে, দিনরাত পথ চ'লে,
দিনরাত সব পথ একা চ'লে চ'লে
যদি আমি ফের ফিরতে চাই,
বন্ধু, তোমার ডুমুর গাছটি কি ছায়া দেবে?'
🍂
0 Comments