জ্বলদর্চি

ইতিহাসের ফাঁদ -৮/ অভিজিৎ লাহিড়ী


ইতিহাসের ফাঁদ -৮
অভিজিৎ  লাহিড়ী


মহানির্বাণ বলল—‘শুনুন, আমরা এতদিন ধরে ধরে ভেবেছি সেই প্রাচীন অশোকের শিলালিপির সন্ধান ধবলগিরিতেই ছিল। কিন্তু…’

ঋতব্রত থামিয়ে বললেন—‘না, আমি নিশ্চিত ধবলগিরি নয়। কারণ শিলালিপি নয়, এটা ধাতব লিপি। আর এই ধাতব লিপির উল্লেখ যে টেক্সটে আছে, সেটা স্পষ্ট করে বলছে— উচ্চভূমি নয়, গুহার গহ্বরে গোপন ধাতু।’

হাজরা হাসলেন—‘বাহ ভাই, তোমরা তো পুরো ড্যান ব্রাউন হয়ে গেছ! কিন্তু একটা কথা বলি—ধবলগিরি বরফঢাকা এলাকা। আর অশোকের সময় কনফার্ম যে লিপিগুলো ছিল, সেগুলো ব্রহ্মি, খোদাই করা ছিল পাথরে, নয়তো তাম্রপাত্রে।’

মহানির্বাণ চোখ মুছল—‘ঠিক! আর এই লিপির বর্ণনা, প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ দ্বিপান্তর সুত্রে পাওয়া যায়— সেখানে বলা আছে “নবপত্থরের অন্তরালে গুহার স্তম্ভে ধাতুর অক্ষরে উৎকীর্ণ বাণী।” এই “নবপত্থর” শব্দটাই ক্লু।’

ঋতব্রত চট করে বললেন—‘নবপত্থর… সেটা উদয়গিরি-খণ্ডগিরি অঞ্চল ছাড়া কোথাও হয় না। ওটাই তো ভারতের প্রাচীনতম খোদাই গুহা।’

হাজরা ভেপে আরেকটা টান দিয়ে বললেন—‘মানে… ওই ধাতব লিপি কোনও সাধারণ শিলালিপি নয়। ওটা একধরনের অ্যালয়— যা জল, বাতাস, আগুন— কিছুতেই নষ্ট হয় না।তাহলে এবার চল ভাই, গন্তব্য—উদয়গিরি-খণ্ডগিরি।’
🍂

মহানির্বাণ দ্রুত স্যাটেলাইট ম্যাপ খুলল তার ট্যাবলেটে।

—‘ঠিক আছে, সেখানেই আমরা যাচ্ছি। কিন্তু সাবধান হতে হবে… নো গড আমাদের ট্রেস করছে।’

চাঁদের আলো ফিকে, পুরনো পাথরের রাস্তা বেয়ে ক্যারাভান এসে দাঁড়াল উদয়গিরি-খণ্ডগিরির গেটের কাছে। ওরা তাড়াতাড়ি নেমে এল। সামনে ছড়ানো বিশাল গুহা, শিলাস্তম্ভ, অদ্ভুত শান্তি।

ঋতব্রত বলল—‘লিপিটা কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে?’

মহানির্বাণ বলল—‘দেখুন, এখানে গজলিপি গুহা আছে। প্রাচীন কালে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের গোপন দলিল সেখানেই রাখার রীতি ছিল।লিপিটা সেখানেই।’

ওরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল সেই গুহার সামনে। ঠিক তখনই—ভোঁ-ভোঁ শব্দ! দুটো কালো এস ইউ ভি এসে দাঁড়াল। বেরিয়ে এল মহারূপ চ্যাটার্জি আর ওর দলবল।

মহারূপ চিৎকার করে বলল—‘আরে বাঃ! সত্যিই তো! তারকাটা বুড়ো  আর  ইতিহাসে পন্ডিত হাজির, সঙ্গে মহানির্বাণ…সবকটাকে এখানেই সাইজ করতে হবে। শুধু প্রফেসর গুহ বাদে ’।

তার নাটকীয় ভঙ্গিমায় হাততালি, মুখে বিষাক্ত হাসি।
—‘আজ এখানেই তোমাদের সব খেলা শেষ! এই ইতিহাসের হ্যাকিং-এর পাট চুকিয়ে দিচ্ছি।’

লোকগুলো অস্ত্র বার করল। চারপাশ টানটান উত্তেজনা।


ঠিক তখন— হাজরা এগিয়ে এলেন।ভেপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন—‘শোনো ভাই, কাল থেকে তোমাদের এই ফিল্মি ডায়লগ শুনে আমি হাঁফিয়ে যাচ্ছি। তুমি আসলে জানোই না তুমি নিজে কোথায় আছো।’

মহারূপ হেসে বলল—‘এত কথা বলার সময় নেই।’

সে পিস্তল তুলল।

হাজরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।তারপর গভীর গলায় বললেন—‘তুই জানিস তো, সম্মোহনের এক প্রাচীন পদ্ধতি আছে— ত্রিকোণ দৃষ্টি। চোখের কোণে আলো-ছায়ার রিফ্লেক্স, বারে বারে সাব-লিমিনাল মেসেজ,আর… এই ছোট্ট কম্পন।’

হাজরা ফিসফিস করে কয়েকটা শব্দ বললেন—
‘অন্তরে নিরাকার, বাহিরে ছায়া… শূন্য শূন্য শূন্য…’

মহারূপের চোখ কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। হাত থেকে পিস্তল পড়ে গেল। দোল খেতে খেতে সে মাটিতে পড়ে গেল—অজ্ঞান।

ঋতব্রত হতবাক—‘এটা কী করলেন?’

হাজরা হাসলেন—‘ডিপ থেটা ইন্ডাকশন। পদ্ধতিটা ভুলে গিয়েছিল সবাই… আর আমি ভুলিনি।’

তড়িঘড়ি ওরা গুহায় ঢুকল। পাথরের সিঁড়ি, ঠাণ্ডা বাতাস, মশালের আলো। একটা পুরনো স্তম্ভের গা ঘেঁষে পাথরের ভেতর থেকে বের করা হল একটা মেটাল প্লেট। ধাতব। ভারী। অদ্ভুত এক ভাষা।

ঋতব্রত ধীরে ধীরে প্লেট ছুঁয়ে বলল—‘পালি ভাষা… কিন্তু লিখন অদ্ভুত… যেন মেশানো।’

গুহার শীতল অন্ধকার। চারদিকে পাথরের গা-ছমছমে নীরবতা। মাঝে রাখা ধাতব লিপিটা নিঃশব্দে চকচক করছে। তামাটে, আবার যেন সোনালি আভা। তার গায়ে খোদাই করা অক্ষর— যেন ভাষা নয়, যেন শব্দেরও আগে কোনও আদিম সংকেত।

ঋতব্রত ধীরে ধীরে মোবাইলের আলো ফেলে বলল—
‘পালি ভাষা… কিন্তু এই অক্ষর… এটা তো আমি কখনও দেখিনি।এটা সিম্পল ব্রাহ্মি নয়। ব্রাহ্মি, খরোষ্ঠী আর গ্রান্থম—মিশ্র একটা ভার্সন।’

হাজরা ভেপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হালকা হেসে বললেন—‘অদ্ভুত নয়?পুরনো, অথচ টাইমলাইনের সঙ্গে মিল নেই।এই লিপির অস্তিত্ব প্রমাণ করে— এটা সত্যি। আর সেই সত্যিও আবার সিম্যুলাক্রাম—দেখছো একটা, ভিতরে লুকিয়ে আছে আরেকটা।’

মহানির্বাণ মাথা নাড়ল—‘আমাদের ক্রিপ্টো এনালিস্টরা অনেক আগে আন্দাজ করেছিল এই ধরনের হাইব্রিড লিপি।কিন্তু… এভাবে সামনে…’

ঋতব্রত চশমা ঠিক করে মোবাইলের আলো ফেলে পড়তে লাগল—প্রথম লাইনে খোদাই করা—‘ধম্মো সরণং গচ্ছামি’।

তারপরের লাইন…অদ্ভুত অক্ষর… অদ্ভুত সংকেত…
এক কোণায় আঁকা তিনটি বৃত্ত। ত্রিভুজের মধ্যে।
তিনটি গোলাকার চিহ্ন—ত্রিসূত্রের প্রতীক।

হাজরা বললেন—‘এটা ট্রিপল রিফিউজ সিল। কিন্তু… এটা অশোকের কোনও প্রচলিত শিলালিপিতে নেই।’

ঋতব্রত বলল—‘কিন্তু এই সিল কি কোনও কোড?
কোনও ম্যাপ? কোনও সূত্র?’

হাজরা হালকা হেসে বললেন—
‘পালিম্পসেস্ট বোঝ?একটা সত্যির ওপরে আরেকটা সত্যির প্রলেপ।তার ওপরে আবার জেল-কোটিং করা মিথ্যে।এই লিপি সেই পালিম্পসেস্ট।’

মহানির্বাণ হাতে ধরা হলোট্যাব খুলে থ্রিডি স্ক্যান দেখাল।হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে ফুটে উঠল খোদাই।

—‘দেখুন, এখানে লেখা—যুদ্ধ অনর্থক, ত্যাগ অনিবার্য, কিন্তু ক্ষমতার চক্র চিরকাল ঘুরে চলে। এই কথাটা কোথাও নেই অশোকের প্রচলিত ডিক্রিতে।’

ঋতব্রত অবাক হয়ে বললেন—‘মানে— যুদ্ধ-পরবর্তী অহিংসার কাহিনি বানানো?’

হাজরা হেসে বললেন—‘তুমি বললে, আমি ভাবলাম।
এই লিপির পাঠোদ্ধার কোনওদিন শেষ হবে না।কারণ এই সত্যির সামনে দাঁড়ানোর সাহস কম লোকেরই আছে।’

ঋতব্রত স্তব্ধ। তাঁর মনে পড়ল…এই অনিশ্চিত সত্যি খোঁজার পথেই তো হাঁটছে সে এতদিন…

সকাল হয়েছে।উদয়গিরির গুহার বাইরে আলো ফুটেছে। ঝিরঝিরে বাতাস বয়ে চলেছে পাহাড়ের গা ছুঁয়ে।

ক্যারাভান ধীর পায়ে এগোচ্ছে নিচের দিকে। ভেতরে নিঃশব্দ। ঋতব্রত তাকিয়ে আছে সেই ধাতব লিপির প্রতিলিপির দিকে।মহানির্বাণ মিত্র পাশে বসে, শান্ত গলায় বললেন—‘আমরা সিম্যুলেশনের কাজ শুরু করব।ঋতব্রত বাবু, আপনাকে আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।আপনার গবেষণা—এটাই শেষ চাবিকাঠি।’

ঋতব্রত স্তব্ধ। শুধু বললেন—,‘আপনারা— কবে থেকে জানতেন এসব?’

মহানির্বাণ বললেন—‘আমরা সবটা জানতাম না। তবে যখন বুঝলাম ইতিহাসের বিকৃতি মানুষের মস্তিষ্কের ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলে— তখন থেকে চেষ্টা করছি বিকল্প সিম্যুলেশন তৈরি করতে।আর আপনি—আপনিই এই কাজের জন্য নির্বাচিত।’

ঋতব্রত কিছু বললেন না। তাঁর চোখের কোণে ভেসে উঠল একটা অদ্ভুত উদ্বেগ।

—‘আমি থাকব না। তোমাদের সিম্যুলেশনে আমি যাব না।’

বললেন হাজরা।

মহানির্বাণ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল—‘কিন্তু কেন, ডক্টর হাজরা?আপনি আমাদের সঙ্গে থাকলে…’

হাজরা ভেপের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—‘তোমাদের গেম আমার ধাতে সয় না।আমার শূন্যপন্থার সবচেয়ে বড় সত্যি—কোনও সত্যি নেই।না ইতিহাস, না ভবিষ্যৎ। সবটাই ন্যারেটিভ। আর যখন সেটাই জীবন, তখন আমি কেন আরেকটা ফাঁদে পা দেব?’

ঋতব্রত চুপ।হাজরার চোখে অদ্ভুত দীপ্তি—অস্বীকারের, বিদ্রোহের, হাসির।

তিনি আবার বললেন—‘তোমরা করো।আমি দেখব।আমি ভেসে যাব…তোমাদের ম্যাট্রিক্স-এর বাইরে।’

ক্যারাভান এগিয়ে চলল।কেউ বলল না আর কিছু।

ঋতব্রতের চোখে জ্বলছে—জিজ্ঞাসা, উত্তেজনা, আর অনিশ্চয়তা।

— 

পরিশিষ্ট 

ডক্টর হেমাঙ্গ হাজরা ফিরে এসেছেন কলকাতায়।ঘরের ভেতর অন্ধকার।তাঁর ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে শহরের ছাইরঙা বর্ষা সকাল। দেয়ালে ঝুলছে পুরনো ছবি, বুকশেলফে সাজানো দুষ্প্রাপ্য বই আর ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের জটিল সরঞ্জাম।

হাজরা বসে আছেন তাঁর প্রিয় ভেপ হাতে, চোখে সেই বিদ্রুপ আর নির্লিপ্তির পুরনো ছায়া।হলোস্ক্রিন চালু করেছেন।ডার্ক ওয়েবের ডিপ লেয়ার খুলছে একটার পর একটা।সংকেতের রেখা নেচে উঠছে স্ক্রিনে—অদ্ভুত কিছু সংকেত, শব্দ, বিকৃত ছায়া।

হঠাৎ—স্ক্রিনের মাঝখানে বড় করে ভেসে উঠল—

‘ঋতব্রত গুহ: সিম্যুলেশন ৩.০ তে লকড। বেরোনোর কোনও উপায় নেই।’

হাজরা চোখ সরালেন না।ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মৃদু গলায় বললেন—‘এই খেলা কে খেলছে?কারা? কিসের জন্য?’

স্ক্রিনের কোণ থেকে আরেকটা বার্তা ফুটে উঠল—‘জি ও ডি প্রোটোকল: ব্রিচড। অজানা হোস্ট সনাক্ত করা গেছে। সিম্যুলেশন নিয়ন্ত্রণ ছিনতাই।’


ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।সব আলো নিভে গেল।শুধু সেই স্ক্রিনের ঝিকিমিকি আলো আর হাজরার মুখের অদ্ভুত অদ্ভুত ছায়া।

তিনি দাঁড়ালেন ধীরে।হাতে ভেপ, চোখে বিদ্রুপের চিকচিকে আলো।অভ্যস্ত হাতে খুললেন সাইবার-ট্রান্সমিশনের আরেকটা লেয়ার।নিজের সাথেই মৃদু গলায় বললেন—

‘ঋতব্রত গুহ… আটকে গেছে।গল্পের ভেতর। সিম্যুলেশনের খাঁচায়।তাকে টেনে বের করতেই হবে।কিন্তু এবার…নিয়ম পাল্টে গেছে।এখন খেলার নিয়ম আমি ঠিক করব।’

হলোস্ক্রিনের কোণায় আবার উদ্ভাসিত হল—‘লোড হচ্ছে: সিম্যুলেশন ৪.০—আরম্ভ: ডক্টর হেমাঙ্গ হাজরা।’

দূরে হঠাৎ বজ্রের গর্জন। কোলাহল ভেদ করে, নিস্তব্ধতার বুক চিরে শুরু হল নতুন খেলা।

বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারেন 👇

Post a Comment

0 Comments