জ্বলদর্চি

কুকশিমা /ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১০০
কুকশিমা

ভাস্করব্রত পতি

ছোট গুল্মজাতীয় কুকশিমা গ্রামাঞ্চলের একটি অতি পরিচিত উদ্ভিদ। একে কোথাও কোথাও তাম্রচূড়া, বনমূলো, ডানকোনী, কাকরোন্দা, কুকুরশুঙ্গা, কুকুরশোঁকা, শিয়ালমতি, শিয়ালমুত্রী বা শিয়ালমূত্রা বলে। সংস্কৃতে কুকুন্দর, কুক্কুরাদ্রু, হিন্দিতে কুকুরোন্দা, নেপালীতে কুকুর ঘাস, তামিলে কাট্টুমুল্লাঙ্গি, নারাক্কারাণ্ডাই, তেলুগুতে আদভিমুলাঙ্গি, কারুপোগাকু, কন্নড়ে গান্ধারী, সাম্ব্রানী গিডা, গুজরাটিতে কোলহার, পিলো কাপুরিও, মারাঠীতে ভামুরদা, বুরাণ্ডো বলে। ইংরেজিতে বলে Little Ironweed। বাংলাদেশের ফেনীতে বলে করমূতা।

কুকশিমার বিজ্ঞানসম্মত নাম Blumea lacera। এটি Compsitae (Asteraceae) পরিবারের অন্তর্গত। ক্রান্তীয় আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ফ্লোরিডা সহ ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশে মেলে এর ৬০ ধরনের প্রজাতি। 
ষোড়শ শতকের ভাবপ্রকাশ (উত্তর প্রদেশের মথুরাবাসী ভাবমিশ্র প্রণীত) গ্রন্থে মেলে 'কুকুন্দর' গাছের নাম। এটিই আমাদের আলোচিত কুকশিমা গাছ। এই কুকুন্দর গাছের পাতার আকৃতি রমণীর গোপন অঙ্গের মতো বলে উল্লেখ করেছেন শুশ্রুত। আবার শব্দরত্নাবলীতে 'কুলাহল' নামে যে ভেষজের কথা রয়েছে, তা 'শব্দস্তোম্ মহানিধি'কারদের অভিমতে এটিই কুকুরশোঁকা গাছ। এই 'কুলাহল' শব্দটি পাই পঞ্চম ষষ্ঠ শতাব্দীর বাগভট গ্রন্থের সূত্রস্থানের ১৫ অধ্যায়ে সুরসাদিগণের ৩১ শ্লোকে - 'কুলং ভূমিং আহলতি কুলাহল'। 
কুকশিমার ফুল

মোটামুটি প্রায় ২ ফুট উঁচু হয়। এদের কাণ্ড ও ডিম্বাকার পাতা বেশ রোমশ। নরম ও তুলতুলে। পাতার বোঁটার দিকটি সরু এবং কিনারা ঢেউ খেলানো। পাতা ও কাণ্ডের সংযোগ স্থল থেকে ছোট ছোট শাখা বের হয়। গাছ সরল। এই গাছে একটা অন্যরকম গন্ধ পাওয়া যায়। যা কিনা কুকুরের খুব প্রিয়। তাই কুকুর এই গাছ শুঁকলেই মুত্র ত্যাগ করে বলে এর নাম হয়েছে কুকুরশোঁকা। তবে কারও কারও অভিমত, কুকুর এই গাছের গন্ধ শুঁকে নিজের শরীর সুস্থ আছে কিনা সেটা পরখ করে।
রাস্তার পাশে হয়ে আছে কুকশিমা গাছ

কুকশিমা গাছ শীতের শুরুতে জন্মায় আর শীতের শেষের দিকে ফুলে ফোটে। ফুল গুচ্ছাকারে হয়। ভেতরের অংশ হলুদ। আর ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে সেই গাছে ফল হয়। সেটি বীজকোষে পরিনত হয়। এদের বীজ প্যারাসুটের মতো উড়ে যেতে পারে। এটি বংশবিস্তারের একপ্রকার কৌশল। 

এটি একটি ভেষজ গাছ। এর পাতা ও মূলে নানা ঔষধি গুণ রয়েছে। এটি অজীর্ণ দোষ, পুরাতন আমাশয়, চুলকানি, পা ফোলা, মুখ ফোলা, চোখে ঠাণ্ডা লাগা, কলেরা, ফিতা কৃমি, জ্বর, সর্দি কাশি এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী। এটি পাঁচন রান্না করার সময় দেওয়া হয়। কুকশিমার পাতা শাক হিসেবে ছোট মাছের সাথে রান্না করেও খাওয়া যায়।
🍂

Post a Comment

0 Comments