জ্বলদর্চি

মৃত্যুবিলাস /পুলককান্তি কর

চিত্র-শুভম দাস

মৃত্যুবিলাস

পুলককান্তি কর

থানার নম্বরটা ডায়াল করতে করতে ওয়ার্ড সিস্টার বিরক্তি ভরা মুখে বললেন, ‘বুড়োটা বড্ড জ্বালাতো। এত আপত্তি যখন হাসপাতালে ভর্ত্তিই বা হওয়া কেন।’ 
শিখা সিস্টার বললেন, ‘উনি তো চাননি! বাড়ীর লোকজন জোর করে ভর্ত্তি করে দিলে কী করবেন!’ 
– হ্যালো! চোখের ইশারায় শিখা সিস্টারকে চুপ করতে বললেন ওয়ার্ড সিস্টার। 
– বলুন। 
– আমি আর. বি. এম হাসপাতাল থেকে সিস্টার বলছি। আমাদের মেল ওয়ার্ডের একটা পেসেন্ট অ্যাবস্কন্ডেড হয়েছে ঘন্টা দেড়েক হল। 
– নাম কি? 
– মুক্তেশ্বর মুখোপাধ্যায়। 
– বয়স কত? 
– ছিয়াত্তর। 
– বাড়ীর লোককে খবর দেওয়া হয়েছে? 
– ফোন করছি, কেউ ফোন তুলছে না। 
– এত সিকিউরিটি নিয়ে কী করেন আপনারা? ফালতু উটকো ঝামেলা। একে স্টাফ কম, এই শীতের রাতে কোথায় ছাপ মারতে যাবো বলতে পারেন? বিরক্তি নিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন অফিসার। 
– শিখা সিস্টার বললেন, ‘কী বলল? আসছে?’ 
– আসবে তো বটেই। ঠিকানা টিকানাগুলো রেডি রাখ। রাতের পুলিশ, এমন হম্বিতম্বি করবে চাকরি নিয়ে না টানাটানি পড়ে। বাড়ীর লোকগুলোও তেমনি। হাসপাতালে রোগী আছে, হুঁশ নেই। এতবার মোবাইল বাজছে নাকে সর্ষে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। 
শিখা বললেন, ‘ভদ্রলোকের তো ছেলে নেই। বাড়ীতে একাই থাকতেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তারাই হাসপাতালে দিয়েছে।’ 
🍂

– না দিয়েই বা কী করবে? লাস্ট স্টেজ ক্যান্সার। চিকিৎসা না করালে বলবে মেয়ে জামাই দেখলো না। ওয়ার্ড সিস্টার মুখ ঝামটা দিলেন। 
সিস্টারের রাগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়, শিখা বোঝেন সে কথা। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি যা, মুক্তেশ্বরের সপক্ষে বলারও কিছু নেই; কিন্তু শিখা জানেন মুক্তেশ্বর মানুষটা ভালো। গত পনেরো দিনে ওঁর সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল শিখার। ওষুধ টষুধ দিতে গেলে নিজে থেকে দু চারটে কথা বলতেন। দু-তিন দিন আগে তো ভরসা করে বলেই ফেলেছিলেন, হাসপাতাল থেকে নিজে সই করে বেরোনো যায় না? 
– না। পেশেন্ট পার্টি লাগে সই করতে। 
– আমার এখানে এক মুহূর্ত ভালো লাগছে না সিস্টার। 
– কী করবেন বলুন, সাধ করে তো আর কেউ এখানে আসে না। 
– আমার এখানে থেকে লাভটা কী? ভালো যখন হবেই না কোনওদিন, শেষ কটা দিন মিছিমিছি গারদে থাকি কেন? 
কথাটা ঠিক। তবে শিখা সেদিন বলেছিলেন, ‘ইঞ্জেকশন গুলো দিলে আপনার ব্যথার উপশম তো হয়! সেই লাভটুকুই বা কম কী?’ 
– আমার দরকার নেই সিস্টার। আপনি আমার পার্টি হয়ে সই করে দিতে পারেন না? 
– চাকরি চলে যাবে মেসোমশাই। এখানে সব সি সি ক্যামেরা লাগানো আছে। আর তাছাড়া আপনার মেয়ে এসে এখানে ঝামেলা করবে। কেন মিছিমিছি অশান্তি বাড়াবেন? 
চুপ করে গিয়েছিলেন মুক্তেশ্বর। শিখা ভাবলেন নিশ্চই সেদিন থেকেই মনে মনে প্ল্যান সেরে রেখেছিলেন তিনি, সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে পালানো যায়। কিন্তু এখন এসব বললেই ঝামেলা, উল্টে সবাই তাঁকে দুষবে, সময়মতো কেন তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন নি। কিন্তু শরীরের যা অবস্থা, তিনি বাড়ী না গিয়ে গেলেনই বা কোথায়! বাড়ী নিশ্চই যাবেন না। কেননা বাড়ীর লোকদের উপর তাঁর যথেষ্ট ক্ষোভ, ওরা জোর করে আবার হাসপাতালেই দিয়ে যাবে। কোনও বন্ধু-বান্ধবের বাড়ী গেলেও নিশ্চই কেউ রাখবে না। কেই বা ওর মেয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে উটকো অশান্তি বইবে। শিখার মনটা অজান্তেই বড় বিমর্ষ হয়ে গেল। এত এত রোগী আসে। কারো কারো সাথে মানসিক নৈকট্যও হয়; তাদের জন্যই কষ্ট বেশী। কী আর করা? জগতের নিয়মই তো এই। 
ভ্যান রিক্সা থেকে যখন মুক্তেশ্বর নামলেন, তখন সকাল প্রায় নটা। হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে খড়গ্‌পুর সেখান থেকে বাস, শেষে রিক্সা। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত একটা গ্রাম সময় তো লাগেই। যেখানে রিক্সা নামালো, এখন সেখানে বেশ বাজার টাজার বসে। আগে কিছুই ছিল না। এখানে মস্ত বড় একটা দিঘী আছে, তার চার ধারে অনেকগুলো বটগাছ আর অশ্বত্থ। বেশ মন খারাপ করা নিঝুম একটা পরিবেশে এই দোকানপাট বড় বেমানান। দীঘির একপারে তাঁদের বাড়ির পারিবারিক শ্মশান; ওঁর মা, বাবা, ঠাকুরদার মৃত্যু ফলক বসানো আছে এখনও। ইচ্ছে করেই ওই পথটাই ধরলেন মুক্তেশ্বর। অনেকদিন পরিবারের কারোর মৃত্যু হয়নি বোধহয়। জায়গাটা বেশ জঙ্গল মতো হয়ে গেছে। বেশীর ভাগটাই তুলসীর বন। কেমন একটা ঝাঁঝালো বনজ গন্ধ এসে নাকে লাগলো তাঁর। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলেন। কষ্ট হয় বড়। প্রাণ ভরে শ্বাস নিতেও যে কত কষ্ট! নিজের মনে হেসে সাহস আনলেন মুক্তেশ্বর। ওঁর বন্ধু দীনেন খুব বলে, 'বুঝলি ভূতো, কষ্ট হচ্ছে মনে। মন কষ্টকে অনুভব করতে চাইলেই কষ্ট পায়। কষ্টবোধটাকে একদম পাত্তা দিবি না।' ওই সাহসেই তো বাইরে বেরিয়ে এসেছেন মুক্তেশ্বর।
 একটু এগোতেই এক বৃদ্ধের সাথে দেখা। দড়ির মতো চেহারা, শনের মতো চুল আর দাড়ি। ওঁকে দেখে বেশ অবাক হয়ে উনি বললেন, ‘ছোট বাবু না?’ 
মুক্তেশ্বর অনেকক্ষণ ওঁর দিখে চেয়ে বললেন, ‘রানা, কেমন আছো?’ 
– এই বেঁচে আছি বাবু। তা আপনি কেমন? 
– এই আছি। 
– আপনার চেহারা তো একেবারেই ভেঙে গেছে। কোনও অসুখ-বিসুখ করেছিল নাকি? 
– হ্যাঁ গো। ভারী অসুখ। 
– মেহ রোগ? না কি ক্ষয়? রানা বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন। 
– সেসব কিছু না হে। মারন রোগ হয়েছে আমার। ক্যান্সার। 
– ও হো। তা আপনি চিন্তা করেন না বাবু, বিশ্রাম নিন গিয়ে, কাল সকাল সকাল একটু মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করে দেবো আমি, দেখবেন রোগ-জ্বালা নিমেষে কোথায় পালিয়ে যাবে! 
রানা কথাটা বললেন বটে, তবে ওঁর ভেতরে সেই আগেকার দিনের মতো আত্মবিশ্বাস দেখা গেল না। মুক্তেশ্বর হাসি মুখে বললেন, 'বেশ তো, যেও কাল। তোমার মন্ত্রের অসাধ্য কী?' 
– ধীর পায়ে পা বাড়ালেন মুক্তেশ্বর। যৌবনে এই মানুষটির ভারী দাপট ছিল। মুক্তেশ্বর যখন ছোট, তখনই রানা যুবক। কিন্তু জমিদার বাড়ীর ছেলে হওয়ার সুবাদে বা যে কোনও কারণে তিনি ওকে ওর ডাকনাম ধরেই ডাকতেন বরাবর। কৈশোরের বিস্ময়ে তিনি অবাক হতেন – তিন তিনটে বউ পুষতো লোকটা – সব কটাই ফর্সা আর সুন্দরী। গাঁয়ের লোক বলতো ও নাকি বশ করতে জানে। কামরূপ-কামাখ্যায় গিয়ে নাকি তন্ত্রসাধনা শিখে এসেছিল সে। কারোর ঘরের গাই দুধ না দিলে, সে মন্ত্র পড়ে সেই দুধের ধারা ফিরিয়ে আনতে পারতো। আবার কেউ দুষ্টুমি করে অন্যের গাই এর দুধ বন্ধ করিয়ে দিতো ওকে দিয়ে 'বান' মেরে। এটাই ছিল রানার ব্যবস। ছোটবেলায় মনে আছে, হাতে পায়ে কাটা কিংবা ঘা হলে, ভয়ে কেউ রানার সামনে আসতো না। ওর দৃষ্টি লাগলে সেই ঘা কোনওমতে সারবে না। এটাই ছিল সাধারণের বিশ্বাস। মুক্তেশ্বরও মেনে চলতেন তা। আজ সবকিছু বদলে গেছে। বয়সের ভারে জীর্ণ ভেঙে পড়া প্রাসাদের মতো রানারও ভেঙে গেছে সবকিছু। গ্রামের লোকজন কি এখনও ওকে ভয়ে সমঝে চলে? মনে তো হয় না। 
খানিকটা গিয়েই নিজেদের পুরনো বাড়ীটার সামনে এসে দাঁড়ালেন মুক্তেশ্বর। খণ্ডহর। মস্ত বড় বড় দালান, চারিদিকে লতানে গাছ। বড়দাদের বাড়ীতে চাবি থাকে, বড়দা গত হওয়ার পর থেকে এদিকে নজরও কমে গেছে। বড়দার বড় ছেলে হাবু দাঁড়িয়ে আছে দূরে, গলায় বিশেষ জোর নেই। ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই, ঢিপ করে প্রণাম ঢুকে বললো, 'কাকা তুমি?' 
– হ্যাঁ রে। চাবিটা খুলে দিবি? 
– একটা খবরা খবর দিয়ে আসবে তো! ও বাড়ী এখন সাপ খোপের আড্ডা – ওখানে থাকার দরকার নেই। আমাদের এ বাড়িতেই থাকো। 
– না রে হাবু, আমি বেশ থাকতে পারবো; তুই খুলিয়ে দে। 
হাবুর হাঁক পাড়লো, ‘মা, ও মা, দ্যাখো কে এসেছে?’ 
মাথায় ঘোমটা দেওয়া যে ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন, তাঁর মুখটা দেখে বড় ধাক্কা খেলেন মুক্তেশ্বর। বয়স কি এভাবে সবকিছু গ্রাস করতে পারে? বড়দা বিয়ে করে যখন বউদিকে নিয়ে এলো, তখন মুক্তেশ্বরের সারাটা পৃথিবী তখন এই মহিলাটিকে ঘিরে। বউদির রূপের কাছে বড়দা নিছকই মুক্তের মালা গলায় বাঁদর। নেহাৎ তখনকার দিনে সম্বন্ধ করে বিয়ে হতো। এই নির্বন্ধে স্বয়ং প্রজাপতি যে কোন কারণে সম্মত হলেন, তা বিস্ময় জাগাতো অনেকের মনে। বউদি আধা শহরের মেয়ে, তখনকার দিনের বি.এ পাশ। লেখাপড়া, অল্প গান নাচ জানা এই মহিলাকে দেখলে মুক্তেশ্বরের ‘কিন্নর দল’ গল্পের কথা মনে পড়তো। বউদির কী সুন্দর ঠান্ডা হাত ছিল, গায়ে হাত বুলোলেই সব কষ্ট জড়িয়ে যেত। বউদি ওঁকে দেখেই 'ঠাকুর পো' বলে জড়িয়ে ধরলেন বটে, তবে সেই ছোঁওয়া আর অনুভব হল না। তবু আন্তরিকতা ষোল আনা ছিল; বউদি বললেন, 'এ কী বেশে এলে ঠাকুর পো! চেহারা এত ভেঙে গেছে কেন?' 
মুক্তেশ্বর মনে মনে ভাবলেন, একই প্রশ্ন তো তাঁরও। কিছু বলার আগে হাবু চেঁচিয়ে বললো, ভেতরে গিয়ে স্নান খাওয়া কর কাকা! ধকল গেছে, রেস্ট নাও আগে। 
– তুই একটু লোক লাগিয়ে ঘরটা ঠিক করিয়ে দে বাবা। 
– সে দেবো' খন  
বলতে বলতেই একটা জিপ এসে উপস্থিত বাড়ীর উঠোনে। পুলিশের গাড়ি। অফিসার নেমে বললেন, মুক্তেশ্বর বাবু কই? হাবু বলল, কেন বলুন তো? 
– উনি কি এখানে এসেছেন? 
– আগে ব্যাপারটা তো খুলে বলবেন। কী হয়েছে কাকুর? আপনি বা তাঁর খোঁজে এখানে এসেছেন কেন? 
মুক্তেশ্বর এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমিই মুক্তেশ্বর।’ 
অফিসার একটা হাত দিয়ে ওঁর হাত টেনে বললো, 'চলুন'। 
– কোথায়? 
– আপাতত থানায়, তারপর ভাবা যাবে। 
মুক্তেশ্বর খেয়াল করলেন বউদি, হাবুর মুখ ভয়ে উৎকণ্ঠায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ওরা হয়তো ভাবছে উনি মস্ত বড় অপরাধ করে ওদের বাড়ী আশ্রয় নিয়েছেন। ভুলটা ভাঙানো দরকার, কিন্তু এক্ষুনি রোগের কথাটা বলার ইচ্ছে ছিল না। তিনি একটু স্থির হয়ে হাবুকে বললেন, ‘ওনাকে বসতে দে।’ 
অফিসার বললেন, ‘বসার সময় নেই; চলুন ইমিডিয়েটলি।’ দিনকাল বদলেছে। আজকাল জমিদার বাড়ির আগেকার মতো বোলবালা চলে না। মুক্তেশ্বরের মনে আছে, আগে থানার লোকেরা কখনও গ্রামে ঢুকতে হলে ওঁর বাবার থেকে পারমিশান চাইতো। যাক গে, কী আর করা! মুক্তেশ্বর বেশ কড়া গলায় বললেন, 'কেন আমি কি চোর, নাকি ডাকাত?' 
– আপনি হসপিটাল থেকে না বলে অ্যাবস্কন্ডেড হয়েছেন। আপনার মেয়ে থানায় এফ. আই. আর করেছে।
– তো আমি কি মাইনর? নাকি মেয়ের ধারি? আর সবচেয়ে বড় কথা হাসপাতালের আগামী চার দিনের মত চার্জ আগাম জমা দেওয়া আছে। আপনি আমাকে হাসপাতালে ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারেন না। চিকিৎসা করানো বা না করানো আমার মৌলিক অধিকার। 
অফিসার এবার কিছুটা দমে গেলেন। একটু থেমে আবার কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব গম্ভীর করে বললেন, 'এটা আমার ডিউটি। আপনি কলকাতায় ফিরে মেয়ের সাথে বুঝে নিন।' 
মুক্তেশ্বর ওঁর আই.এ.এস এর সরকারি আইডেনটিটি কার্ডটা দেখিয়ে বললেন, 'আমাকে আইন শেখাতে আসবেন না অফিসার। বহু বছর এসব ঘেঁটেই অবসর নিয়েছি। আপনি মেয়েকে ফোন করে বলে দিন, আমি গ্রামের বাড়ীতে এসেছি। আপনার কাজ ছিল অ্যাবস্‌কন্ডেড কে খুঁজে বের করা। আপনার কাজ শেষ। বাকীটা তো দুই প্রাপ্তবয়স্ক এবং মানসিক ভাবে সুস্থ দুই মানুষের বোঝাপড়া।’ 
– তো স্যার মেয়েকে ফোনটা তো আপনিই করে দিতে পারতেন। আমাদের এত ঝক্কি পোয়াতে হত না। ওঁদেরও তো চিন্তা হয়। 
– করেই দিতাম। ফোন কি আমার কাছে ছিল? হাসপাতালে ভর্তির সময়েই তো মেয়ে নিয়ে চলে গেল। 
– ওঃ। ঠিক আছে। স্যার প্লীজ আমার ফোন থেকেই মেয়ের নম্বরে কথা বলে নিন। আমিও দায়মুক্ত হই। 
মুক্তেশ্বর হাসলেন, বললেন ‘নম্বর আমার মুখস্থ নেই। থানা থেকে ওর নম্বর জোগাড় করুন, তবেই না।’ 
অফিসার বিমর্ষ মুখে বললেন, 'আবার আর এক ল্যাঠা।' 
মুক্তেশর মুচকি হেসে বললেন, ‘থানায় গিয়ে কাজটা সেরে ফেলুন। দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করবেন না।’ 
বাড়ীর উঠোনটায় একটা পুরোনো দিনের আরাম কেদারা পেতে দিয়েছে হাবু। সূর্য সবে অস্ত গেল। সন্ধ্যার অন্ধকার যেন ঝুপ করে নেমে পড়লো চারপাশের গাছের ডালে। গ্রামেরই একটা মেয়েকে আপাতত জোটানো গেছে ঘর-মোছা, রান্নাবান্নার জন্য। বউদি কিছুতেই এই ব্যবস্থায় রাজী হচ্ছিলেন না, মুক্তেশ্বরের পীড়াপীড়িতে নিমরাজী হয়েছেন। তবে রোজ দিনই এটা ওটা নিজে হাতে করে নিয়ে আসেন। এই সময়টা এসে তিনি হ্যারিকেন জ্বালিয়ে দেন, তবে আজ আসেন নি এখনও। ওঁর বাড়ীতে আজ মই পূজো। গ্রামে ফসল ওঠার আগে বাড়ীর সামনের জায়গাটা ভালো করে গোবর দিয়ে নিকোনো হয়। ধানের বোঝা এসে থাকে ওখানে। ঘাস টাস চেঁছে, কোদাল দিয়ে সমান করে এমন ভাবে পরিষ্কার করা হয়, ঠিক যেন বাড়ীর মেঝে। তার ঠিক মাঝখানে থাকে একটা লম্বা খুঁটি। ধান ঝাড়াইয়ের পর বাড়ীতে পোষা বলদ দিয়ে ‘পতুল মাড়ানো’ হয়। গরুগুলো দড়ি দিয়ে এই খুঁটির সাথেই বাঁধা থাকে। পঞ্জিকা দেখে সেই খুঁটি পূজো হয় একদিন, ওটাই মই পূজো। মুক্তেশ্বরের মনে পড়ে, শেয়ালের ডাক না শুনলে, নাকি রাতের ওই পূজো শুরু হয় না। গ্রামের দুষ্টু ছেলেরা এই রাতে মিছিমিছি 'হুক্কা হুয়া' ডেকে কত লোককে আগে বিদ্রান্ত করত। 
আর ছিল মকর সংক্রান্তি। নতুন ফসলের উদযাপন। ঘরে ঘরে পিঠে পায়েস হত সেদিন। তার আগে অঘ্রাণ মাসের প্রতিটি বৃহস্পতিবার গ্রামের প্রত্যেকটি ঘরে লক্ষ্মীপূজো হত, মুক্তেশ্বর জানেন না এখনও হয় কিনা। ওঁর মা বুধবার রাত তিনটে সাড়ে তিনটেতে ঘুম থেকে উঠে সারা ঘরের চারিদিকে গোবর জল ছিটিয়ে বাড়ীর উঠোন থেকে ঠাকুর ঘর পর্যন্ত আলপনা আঁকতেন। কী সব দিন ছিল তখন। চার পাশের এই অন্ধকারটা এখন বেশ চোখ সওয়া হয়ে গেছে। সামনের এত বড় উঠোনটা জংলা আগাছায় ভরে গেছে, হাবু কবে পরিষ্কার করাবে কে জানে। 
চোখটা বন্ধ করে এলোমেলো কথা ভাবছিলেন মুক্তেশ্বর, হঠাৎ একটা স্পর্শে চোখ খুললেন, সেই পুরনো দিনের ঠান্ডা ভেজা ভেজা স্পর্শ। 'বউদি, কাজ মিটলো?' 
– হ্যাঁ। পুজো বাকী, বউমাকে বলে এলাম, ও বাকীটা করে নেবে। কিন্তু মালতী হ্যারিকেনটা জ্বেলে যায়নি? 
– রোজ এসে তুমি করো বলেই বোধ হয়! 
– তা কেন? আজ তো আমি ওকে বলেই রেখেছিলাম আসতে দেরী হবে আমার। সে যেন সন্ধ্যা টন্ধ্যা দিয়ে যায়। আজকালকার মেয়েরা যেন কী! ওর মা এত বছর ধরে কাজ করেছে, মাকে দেখেও তো দায়িত্ব কর্তব্য শিখতে পারে! 
– ছাড়ো এসব। ভাগ্যিস আলো জ্বালেনি। অন্ধকারটা বেশ ভালো লাগছিল। বৌদি মনে পড়ে, তুমি এই রকম এক অন্ধকার সন্ধ্যায় আমার সাথে পুকুর পাড়টায় বসে গেয়েছিলে, 'আমার আঁধার ভালো?' 
– সে সব দিন কি আর ভোলা যায় ভাই? 
তুমি গানটা একদমই ছেড়ে দিয়েছিলে বোধহয়। 
– হ্যাঁ। এ বাড়ীতে ওসবের কদর তো কেউ করতো না বৌ মানুষদের কাছ থেকে! তুমিই যা পীড়াপীড়ি করতে। হাবু হওয়ার পর থেকে সব বন্ধ। 
– একটু শোনাবে? 
– না ঠাকুরপো। তুমি শুনতে চাইছো ভেবে যতটা ভালো লাগছে, বেসুরে গেয়ে সেই রেশ আর কাটাতে চাই না। আজ চল্লিশ বছর যাবৎ আমি একটু সুর করেও কোনও কথা বলিনি। 
– হাবুর পরও তো তোমার দুটো ছেলে মেয়ে! ঘুম পাড়ানী গানও কি গাইতে না? 
– না। তুমি তো তখন কলকাতায় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। তাই বোধহয় জানো না। আমার কাজ ছিল শুধু সন্তান উৎপাদন আর প্রয়োজনের সময় তাদের দুধ খাওয়ানো। বাকী নাড়াচাড়া সব শাশুড়িমা-ই করতেন, নইলে লখীন্দরের বউ। 
– ও! আমাদের সেই বংশানুক্রমিক ধাই! ও বেঁচে আছে? 
– না। 
– জানো, আমার জন্মও কিন্তু ওরই হাতে। তা তার মেয়ে টেয়ে কি এখন এই কাজ করে? 
– না। যুগ বদলেছে ভাই। আজকাল গ্রামে অনেক কোয়াক ডাক্তার। ওরাই ডেলিভারি করায়, কেউ কেউ পাশের গ্রামের হাসপাতালেও নিয়ে যায়। 
– ওঃ। 
– ঠাকুর পো, তোমার কি ভারী কোনও অসুখ? 
– কেন বলো তো?
– তোমার চেহারাটা একেবারেই ভেঙে গেছে। সেদিন পুলিশকেও বলছিলে, তোমার মেয়ে জামাই নাকি তোমাকে হাসপাতালে দিয়েছিল, তুমি লুকিয়ে পালিয়ে এসেছ। হাবু কয়েকদিন ধরেই আমাকে বলছে, তোমার খোঁজ খবর নিতে, দরকার পড়লে শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আনবে ও। 
– ডাক্তার থেকে পালাবো বলেই তো চলে এসেছি বৌদি। 
– এটা কি কোনও কাজের কথা? রোগ হলে তো ওষুধপথ্য করতে হয়। 
– তা হয় ঠিক কথা, কিন্তু আমার রোগের তো কোনও চিকিৎসা নেই, তবুও ডাক্তাররা জোর করে গারদে পুরে রাখে। জীবনের শেষ শ্বাসটুকুও কি নিজের শরীর দিয়ে নিতে পারবো না আমি? 
– কী হয়েছে তোমার ঠাকুরপো? 
– ক্যান্সার। সারা শরীরে ছড়িয়ে গেছে। বাঁচবো না বেশী দিন। 
বউদি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, 'বালাইষাট! এমন কথা বলো না ঠাকুর পো! তুমি বুঝি সেই জন্য মেয়ে জামাইকে না বলে পৈত্তৃক ভিটেয় এসেছো? 
– আমি শহরের মানুষদের মতো মরতে চাই না বউদি। 
– শহরের লোকেরা কেমন মরে? দেখিনি তো কোনওদিন। 
– ওই মৃত্যুতে কোন আড়ম্বর নেই বউদি। মরে গেলে সস্তার খাটে তুলে শ্মশান ঘাটে একটা ল্যাংপ্যাঙে বাতার চাংড়িতে তুলে দেয়। অপরিষ্কার মেঝেতে কেবল শবের লাইন। তার মধ্যে তুমি একটা নাম্বার হয়ে শুয়ে থাকো। 
– ওমা! পুরুত তুরুত আসে না? 
– ওই আসে, কিসসু জানে না। দু মিনিট অং বং চং – দেখলে তোমার ভক্তি শ্রদ্ধা উবে যাবে; আমাদের এদিকের শ্মশানে যে একবার শবদাহ দেখেছে, তার আর ইলেক্ট্রিক চুল্লীতে পোড়ার শখ হবে না। মৃত্যু তো নয়, যেন এক উদযাপন।
– মৃত্যুকে উদযাপন করা যায় বুঝি? এমন একটা ভয়ংকর বিষয়! 
– মৃত্যুই তো জীবনের চরম সত্য বৌদি। জন্মেছো যখন, একে মানবে না ই বা কেন? জীবনের সমস্ত কিছুতেই যখন উদযাপন করেছি, আমি চাই আমার মৃত্যুও উদযাপিত হবে আমি মরার পর। 
– ভাবতে পারি না ঠাকুরপো। আমার তো মনে হয় ওই চুল্লী টুল্লীই ভালো। চোখের আড়ালে চলে যায় মুহূর্তে। প্রিয় যে মানুষটার গায়ে একটু ফোস্কা উঠলেই আমরা শিউরে উঠি, তার দেহ তিন চার ঘন্টা ধরে দাউ দাউ আগুনে পুড়বে, বিষয়টা চোখে দেখা কষ্টকর। 
– তুমি আমার মেয়ের মতো কথা বললে বউদি। আসলে তোমাদের অনেক কিছুই অনুমান তো। এই বাড়ীর বউ হওয়ার সুবাদে কখনও তো পরিবারের কারোর দেহ দেখার সুযোগ হয়নি তোমার। দেখলে দেখতে, শেষকৃত্য ঠিক কী রকম হয়। আর আমাদের ভট্টাচায্যি মশাই বিষয়টাকে সম্পন্ন করেনও অদ্ভুৎ। 
আচ্ছা, ভট্টাচায্যি মশায় বেঁচে আছেন এখনও? 
– হ্যাঁ। তবে কাজে-কর্মে আর যান না। বয়স হয়েছে অনেক। 
– তা ওঁর ছেলে কাজকর্ম শিখেছে, নাকি ফেরেব্বাজি করে কাটায়? 
– এ বাড়ীর কাজটাজ গুলো তো ছেলেই করে। 
– বৌদি আমি মরলে, চেষ্টা করো যেন বাপ ভট্টাচায্যিই আসেন। বলো, আমার অনুরোধ! 
– বারবার মরার কথা বলো না ভাই, কষ্ট হয়। 
– বলতে তো হবেই বউদি। সময় আমার বড় কম। জানো, আমার মা, বাবা, ঠাকুরদা সবার এই শেষ যাত্রা টুকু আমি মনে রেখেছি। মৃতদেহকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে তাকে ঘি মাখিয়ে স্নান করায় জানো? 
– না। 
– তারপর তাকে হাঁটু ভাঁজ করিয়ে বসায়। যে মুখাগ্নি করে, সে মালসায় ওখানেই রান্না করে ওর মুখে পিণ্ড দেয়। 
– বড় অমানবিক ঠাকুর পো। এসব কোনও সুস্থ লোক দেখতে পারে?
– আমার তো উল্টোটাই মনে হয় বউদি। মানুষটাকে শেষ বারের মতো সাজিয়ে গুছিয়ে অনন্ত লোকে পাঠানোর জন্য একটা শোকের আবহ থাকাটা অত্যন্ত জরুরী। যে লোক এতগুলো বছর সাথে ছিল, তাকে কি এরকম দায়সারা ভাবে, কখন লাইন আসবে – এই বিরক্তি নিয়ে বিদায় দেওয়া যায়? নাকি কখন ঝামেলা মিটবে – এই ভেবে ঘন ঘন ঘড়ি দেখা যায়? ভাবটা এরকম, চুল্লীতে ঢোকাতে পারলে বাঁচি। এটাই যদি সত্যি হয় ওই রিচুয়ালস এর ভড়ংবাজিই বা কেন? 
– তুমি কি এই আকাঙ্ক্ষায় গ্রামে চলে এসেছ ঠাকুর পো? 
– অনেকটা। 
– বাকীটা তবে কী? 
– দ্যাখো, জীবনের শেষ কটা দিন এরকম নিজের বাড়ীর চেনা পরিবেশ ছেড়ে, কাছের লোকজনদের বাদ দিয়ে, গায়ে মাথায় একগাদা যন্ত্র নিয়ে বেঁচে থাকা প্রলম্বিত করতে আমার একটুও ইচ্ছে করে না। কী হবে? জ্ঞানহীন ভাবে দশ দিন ভেন্টিলেটারে বেঁচে থেকে কী লাভ? 
– প্রিয়জনেরা তো ওতেই শান্তি পায় ঠাকুরপো। যেভাবে হোক কেউ বেঁচে আছে এটাই বড় স্বস্তি। 
– শুনতে তোমার খারাপ লাগবে বৌদি, ইদানিং যেন আমার এইটাই স্বার্থপরতা বোধ হয়। শেষকালে অসুস্থ লোকের হ্যাপা পোয়াতে হল না, মৃত্যুর কষ্ট দেখতে হলো না, উপরন্ত বেশ মোটা টাকা খরচা করে পাড়ার লোকের কাছে কলার তোলা গেল – কত বড় হাসপাতাল! কী ব্যবস্থা! 
– সবসময় ব্যাপারটা এমন নয় ঠাকুর পো। 
– তা ঠিক। তবে অধিকাংশটাই এরকম। 
– তুমি কি তোমার মেয়ে জামাই এর উপর এসব মনে করেই রাগ করে লুকিয়ে চলে এসেছ ঠাকুর পো? 
– রাগ ঠিক করিনি বৌদি। কিন্তু আমি অসুস্থ বলে কেউ আমার কথা শুনবে না – এ আমি মানতে পারি না। ওরা ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আমার উপর খবরদারি করছিল। আমি কতবার বলেছি, 'বুনি আমায় হাসপাতালে দিস না, আমার এ রোগের চিকিৎসা নেই।' বললে বলতো 'তাই বলে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখবো?' এখন চিকিৎসাটাই যে অতিরিক্ত, এটা কে বোঝাবে? বেশী বললে একটাই কথা, তোমার কষ্ট আমরা দেখতে পারবো না।
– তুমি কি মেয়ে জামাই এর সাথে থাকতে নাকি? 
– না, না। ওরা আলাদা ফ্লাটে থাকে, আমার বাড়ী থেকে আট কিলোমিটার দূরে। 
– যা হোক ঠাকুর পো, রাগ না করে ওদের একবার ডেকে পাঠাও। 
– এলেই আবার ধরে নিয়ে যাবে বউদি। দোহাই আমি আর ওই গারদে ফিরবো না। ডাক্তারের দেওয়া আলটিমেটাম আমার ফুরিয়ে গেছে বৌদি। আমি আর দু চার দিনই আছি। 
– তাই যদি সত্যি হয়ও, আমাদের তো বুনির সাথে যোগাযোগ করা দরকার। ওরাই বা কী। আজ পাঁচ দিন হল তুমি এসেছ, একবার দেখা করে যেতে পারতো না? 
– সবাই দৌড়াচ্ছে বউদি; কার আর সময় আছে। তোমাকে একটা গোপন কথা বলে যাই, আমার স্যুটকেসটার মধ্যে একটা ফোন ডায়েরি আছে, ওখানে বুনির নম্বর আছে, মরে গেলে একটা ফোন করে দিও। 
– তখন বলবে, তোমরা আগে ফোন করোনি কেন? 
– বলবে নম্বর জানতে না। মরে যেতে জিনিসপত্র হাতড়ে বের করেছ। 
– কি জানি বাবা, আমার এসব ভালো লাগছে না। এসব কথা বাদ দাও। 
– বাদ দিলে চলবে না বৌদি। যত অপ্রিয়ই হোক, শুনে নাও। 
– আর কী কথা বাকী আছে? 
– আছে। মরার পরে পোড়ানো হলে তবেই বুনিকে খবর দিও। 
– ওমা! তা কী করে হয়? এটা অনুচিৎ। আমি এই প্রস্তাব মানবো না ঠাকুর পো। 
– দ্যাখো ও মুখাগ্নি করলে আমার খারাপ লাগবে – বিষয়টা ঠিক এমন নয়। হাবু দিলেও যা, ও দিলেও তা। কিন্তু ও খবর পেয়ে আসতে আসতে আমার রাইগর মর্টিস হয়ে যাবে। পুরুৎ ঠাকুর আর জোড়াসনে বসাতে পারবে না বউদি। 
মুক্তেশ্বর হাসতে গেলেন, কিন্তু সেই হাসিটা বিকৃত হয়ে কেমন আর্তনাদের মতো শোনালো। মুক্তেশ্বর ঘামতে লাগলেন। একটু থেমে বললেন, এসে হয়তো জোরাজুরি করে আমার দেহ এখানে দাহই করাবে না বলে শহরে নিয়ে চলে যাবে। ওর বিচিত্র কিছু নেই। 
– তোমার এত মৃত্যু নিয়ে বিলাসিতা কেন ঠাকুর পো? বউদি প্রায় ককিয়ে উঠলেন। 
–মৃত্যুটাই তো এখন একমাত্র বেঁচে আছে বউঠান। আমার যদি ইচ্ছা-মৃত্যু নেওয়ার উপায় থাকতো, আমি তাই করতাম – নিজেই সাজিয়ে রাখতাম নিজেকে। সে তো হবার নয়। 
– ভীষ্ম ছাড়া আর কেই বা নিজের ইচ্ছা-মৃত্যু নিতে পেরেছিলেন? 
– রামচন্দ্র। 
– ওটাতো স্যুইসাইড ঠাকুরপো। যমুনা নদীতে ইচ্ছে করে ডুবে গেলেন তিনি, উঠলেন না। 
– কিন্তু ব্যাপারটা সাধারণ স্যুইসাইডের মতো দেখো না বউদি। উনি মৃত্যু নেবেন – এটা তাঁর প্রজা,অমাত্য সবাই জানতো। তারা সবাই তাঁর অনুগমন করেছিল যমুনার তীর পর্যন্ত। ভাবো তো কল্পনায় – মৃত্যুর কী অসামান্য এক চিত্রকল্প। 
বড় বৌ বললেন, ‘একটুখানি চুপ করে থাকো ঠাকুরপো, নাগাড়ে বকছো। আমি বরং চা করে আনি। 
– তুমিও চা খাবে তো বউঠান? 
কতদিন পরে এই ডাক শুনলেন কাদম্বরী। বিয়ের পর এই নাম নিয়েই মুক্তেশ্বর ওঁর সাথে খুনসুটি করতেন। বলতেন, ‘আমি তোমার ঠান্ডা হাতের ছোঁয়ায় আদর খেতে চাইলে বউঠান বলে ডাকবো, গল্প কবিতা লিখতে পারি না বলে তুমি আবার আমাকে অবহেলা করো না।’
কাদম্বরী মুক্তেশ্বরের কপালে হাত রাখলেন। এই ঠান্ডায় বড় বেশী ঘামছেন মুক্তেশ্বর। উত্তেজনায় বোধ হয়। 
– চল ঠাকুর পো, একটু খাটে গিয়ে শোও, আমি চা করে বরং তোমার পাশে এসে বসব।
– কি হে রাণা। জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে কী করছ? 
– আজ্ঞে বাবু আপনার গায়ে একটু জল মন্ত্র ছিটিয়ে দিতে এলাম। 
– এদ্দিনে সময় হল তোমার? তুমি তো বলেছিলে পরের দিন আসবে! 
– পরের দিন আসিনি বটে, তবে তার পরের দিন তো এসেছিলাম বাবু, আপনি ভুলে গেছেন। 
– এসেছিলে? বেশ তো। তা তুমি ওই জানালা দিয়েই জল ছেটাবে নাকি? ভেতরে এসো। 
– এজ্ঞে ভেতরে ঢোকা বারণ। বড় গিন্নিমা আছেন না। 
– ওঃ। তা তুমি এক কাজ কর রানা, তুমি তো বেশ তন্ত্র-মন্ত্র জানো, তুমি বরং বেশ ভালো একটা মৃত্যুর মন্ত্র পড়ে দাও। ভালো করার বাঁচার মন্ত্র পড়লে আমায় আবার অনেকক্ষণ লড়তে হবে। 
– কী যে বলেন বাবু! আমি না আপনার নুন খেয়েছি? 
– কী আদিখ্যেতা! তুমি তাকিয়ে দেখলে আমাদের ছোটবেলায় ঘা শুকোত না, মনে নেই? দ্যাখো দ্যাখো হাঁটুর তলাটা কেমন ঘা ঘা, দ্যাখো। কষে মন্ত্র পড় একটা। 
– কী বিড়বিড় করছো ঠাকুর পো। চা নাও। কাদম্বরী ঘরে এলেন। 
মুক্তেশ্বর উঠে বসে বললেন, ‘বিড়বিড় করছিলাম?’ 
– হ্যাঁ। কথা বলছিলে মনে মনে। নাও, চা টা খাও। 
– চা টা থাক বৌদি। যমদূত এসে গেছে। মন শক্ত কর।
– কি আবোল তাবোল বকছ? 
– আচ্ছা দাও, যাওয়ার আগে তোমার হাতের চা এক চুমুক অন্তত খাই। 
মুক্তেশ্বর এক চুমুক চা খেয়ে আস্তে আস্তে খাটে শুয়ে পড়লেন। 
কাদম্বরী বললেন, ‘তোমার কী কোনও কষ্ট হচ্ছে?’ 
মুক্তেশ্বর ক্ষীণ হেসে বললেন, ‘কষ্ট তো মনে বউঠান, আমার আর মন নেই, কষ্ট ও নেই।’ 
কাদম্বরী মুক্তেশ্বরের পাশে বসে একটু ঝুঁকে বুকের ওপর হাত বুলোতে লাগলেন। খুব ধীরে। হ্যারিকেনের আলোয় হাত বোলানোটা বড় অদ্ভুত হয়ে কাঁপছে উল্টো দিকের দেয়ালে। মুক্তেশ্বর বললেন, 'তোমার হাতটা এখনও কী ঠান্ডা?' 
– আসলে চা করছিলাম তো, হাত ভিজে ছিল। 
– আঃ কী আরাম বউঠান! দাও দাও আমার মনের ভেতর একটু এই শীতল ছোঁয়া দাও দেখি। আহ! 
কাদম্বরী দেখলেন পরম প্রশান্তিতে চোখটা একটু নেচে উঠল মুক্তেশ্বরের। প্রাণ বায়ু বেরিয়ে গেল এইমাত্র। জীবনে বহু মৃত্যু তিনি দেখেছেন কাছ থেকে। তাঁর এত দিনের সখা, এতদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া পরম বন্ধু এইমাত্র আবার বিদায় নিলেন তাঁকে ছেড়ে – তিনি শক্ত হয়ে উঠে বসলেন। দরজার মুখে গিয়ে তাঁর ক্ষীণ কণ্ঠে কয়েকবার কোন নিভৃত দূরের উদ্দেশ্যে ডাকলেন 'হাবু' – এই নিস্তব্ধ নিশুতিতে সেই ডাক কোথাও পৌঁছালো না। মড়া ছেড়ে বেরোতে নেই ঘর থেকে, তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন, বেশী রাত হলে কেউ না কেউ তাঁর খোঁজে নিশ্চই আসবে।

Post a Comment

1 Comments