জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ৩০শে ডিসেম্বর, আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস। এপি ডেমিয়লজি কি, এর ইতিহাস কি এবং মানব জীবনে এর গুরুত্বই বা কি আসুন, এই সবকিছুই আমরা জেনে নিই।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে রোগ ও মহামারির প্রভাব অত্যন্ত গভীর। প্লেগ, কলেরা, গুটিবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা সাম্প্রতিক কোভিড–১৯—এসব মহামারি কেবল লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও চরমভাবে প্রভাবিত করেছে। এই রোগগুলোর উৎস, বিস্তার, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে বিজ্ঞান কাজ করে, তাকে বলা হয় এপিডেমিওলজি (Epidemiology)। এই গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রের অবদান ও জনস্বাস্থ্যে এর ভূমিকা তুলে ধরতেই প্রতি বছর ৩০শে ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস পালন করা হয়।

এপিডেমিওলজি হলো, জনসংখ্যার মধ্যে রোগের বিতরণ (distribution) ও নির্ধারক কারণ (determinants) নিয়ে অধ্যয়ন এবং সেই জ্ঞানকে রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োগ করার বিজ্ঞান। সহজভাবে বলতে গেলে,কে অসুস্থ হচ্ছে,কেন হচ্ছে,কোথায় হচ্ছে,কীভাবে ছড়াচ্ছে,এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই এপিডেমিওলজির মূল কাজ।
এই শাস্ত্র শুধু সংক্রামক রোগ নয়, বরং ক্যান্সার,হৃদরোগ,
ডায়াবেটিস,মানসিক রোগ
দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত ঝুঁকি
এসব বিষয় নিয়েও গবেষণা করে।
🍂

আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস পালন করা হয় ৩০শে ডিসেম্বর, কারণ এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন আধুনিক এপিডেমিওলজির অন্যতম পথিকৃৎ জন স্নো (John Snow)। তিনি ১৮৫৪ সালে লন্ডনের কলেরা মহামারির সময় গবেষণা করে প্রমাণ করেন যে দূষিত জলের মাধ্যমেই রোগটি ছড়াচ্ছে। তাঁর গবেষণাই এপিডেমিওলজিকে একটি বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
জন স্নোর জন্মদিনকে স্মরণ করেই এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো, জনস্বাস্থ্যে এপিডেমিওলজির গুরুত্ব তুলে ধরা। রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো।
এপিডেমিওলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য কর্মীদের অবদান স্বীকৃতি দেওয়া,ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি,
গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণে উৎসাহ দেওয়া।

জনস্বাস্থ্যে এপিডেমিওলজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এপিডেমিওলজি ছাড়া আধুনিক জনস্বাস্থ্য কল্পনাই করা যায় না। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো,
১. রোগ শনাক্তকরণ
কোনো নতুন রোগ বা সংক্রমণ কোথায় এবং কীভাবে ছড়াচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করতে এপিডেমিওলজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. রোগের কারণ নির্ণয়
রোগের পেছনে থাকা জীবাণু, পরিবেশগত কারণ, জীবনযাপন পদ্ধতি বা সামাজিক কারণ নির্ণয় করা হয়।
৩. প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
টিকাদান কর্মসূচি, স্বাস্থ্যবিধি প্রচার, নিরাপদ জল সরবরাহ,এসব উদ্যোগের পেছনে এপিডেমিওলজির তথ্য কাজ করে।
৪. নীতিনির্ধারণে সহায়তা
সরকারি স্বাস্থ্যনীতি, লকডাউন, টিকাকরণ পরিকল্পনা ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এপিডেমিওলজিক্যাল ডেটার ভিত্তিতে।

কোভিড–১৯ মহামারি বিশ্বকে নতুন করে এপিডেমিওলজির গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়েছে।
সংক্রমণের হার,মৃত্যুহার
ভ্যারিয়েন্ট বিশ্লেষণ, টিকা 
এসব বিষয়ে এপিডেমিওলজিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এই মহামারির সময়ই সাধারণ মানুষ প্রথমবারের মতো “কার্ভ ফ্ল্যাট করা”, “R নম্বর”, “হার্ড ইমিউনিটি” ইত্যাদি এপিডেমিওলজির শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়।

ভারতে এপিডেমিওলজির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের মতো জনবহুল দেশে এপিডেমিওলজির গুরুত্ব আরও বেশি।
পোলিও নির্মূল,গুটিবসন্ত নির্মূল,যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ,
ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ
এসব সাফল্যের পেছনে এপিডেমিওলজির অবদান অপরিসীম।
ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন—
ICMR (Indian Council of Medical Research)
NCDC (National Centre for Disease Control)
এপিডেমিওলজিক্যাল গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এপিডেমিওলজিস্ট হলেন, সেই বিশেষজ্ঞরা যারা—
রোগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেন,ফিল্ড সার্ভে পরিচালনা করেন মহামারি নিয়ন্ত্রণে কৌশল তৈরি করেন,
স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে পরামর্শ দেন,তাঁরা প্রায়শই নীরবে কাজ করেন, কিন্তু তাঁদের কাজের ফলেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা পায়।

আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবসের গুরুত্ব হলো, এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ
তথ্য ও গবেষণা ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল।

এই দিনটি তরুণ প্রজন্মকে জনস্বাস্থ্য ও গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভবিষ্যতে এপিডেমিওলজির সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন,নতুন সংক্রামক রোগ,জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স
জীবনযাপনজনিত রোগের বৃদ্ধি,এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক এপিডেমিওলজি দিবস শুধু একটি প্রতীকী দিন নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানবজীবন রক্ষায় বিজ্ঞান, তথ্য ও সচেতনতার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এপিডেমিওলজি আমাদের শেখায়—রোগ হওয়ার আগে প্রতিরোধই সর্বোত্তম চিকিৎসা। একটি সুস্থ সমাজ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে এপিডেমিওলজি ও জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের প্রতি সম্মান ও বিনিয়োগ অপরিহার্য।

Post a Comment

0 Comments