দূর দেশের লোকগল্প— ২৬৯
পূর্ব আফ্রিকা
শুঁয়োপোকার পাকামি
চিন্ময় দাশ
একদিন এক শুঁয়োপোকা দারুণ এক কীর্তি করে বসেছে। গুটি গুটি চলতে চলতে, একটা খরগোশের গর্তে গিয়ে ঢুকে পড়েছে। খরগোশ তখন ঘরে ছিল না। খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে গিয়েছিল সে।
দুপুর নাগাদ খরগোশ ঘরে ফিরলো। তার চোখে পড়ে গেল, ধুলোতে যেন কার পায়ের দাগ। দাগটা তার ঘরের ভেতরে ঢুকেছে। একটু থমকে গেল খরগোশ । বাইরে থেকে চেঁচিয়ে বলল-- কে ঢুকেছিস আমার ঘরে?
শুঁয়োপোকার কানে গিয়েছে কথাটা। প্রথমে একটু ঘাবড়েই গেল সে। পরে ভাবল, ভয় পেলে চলবে না। বাঁচতে হলে, সাহস দেখাতে হবে। গলা চড়িয়ে বলল-- কে আবার? আমি। সেই আমি, যে গন্ডারকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে। হাতিকে ধুলোয় গড়াগড়ি খাওয়ায়।
শুনেই তো খরগোশের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। সে ভাবতে লাগল, আমার মতো ছোট্ট একটা প্রাণী। এমন জীবের সঙ্গে পারব কী করে? সরে পড়াই ভালো এখান থেকে।
বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে খরগোশ। যেতে যেতে একটা শেয়ালের সাথে দেখা। শেয়ালকে সব কথা খুলে বলে, কী করে মোকাবেলা করা যায়, সেটা জানতে চাইল।
বলল-- তুমি নিজে একবার চলো, ভাই। একটু সামলে দিয়ে আসবে চলো ব্যাপারটাকে। যাতে করে ভয়ানক জীবটা বেরিয়ে যায় আমার ঘর থেকে।
শেয়াল বলল—চলো। দেখি কিছু করতে পারি কি না।
দুজনে এসে খরগোশের গর্তের সামনে হাজির হয়েছে। শেয়াল বাইরে থেকে হাঁক দিয়ে বলল-- খরগোশ আমার বন্ধু। কে ঢুকেছিস তার ঘরে?
শুঁয়োপোকা একটুও ঘাবড়ালো না। গলা আরও চড়িয়ে বলল-- কে আবার? আমি। যে গন্ডারকে ধরে ছুঁড়ে ফেলতে পারে। ঘোল খাইয়ে ছাড়তে পারে হাতিকেও। তুই কে?
কথা কানে যেতেই শেয়াল বুঝে গেছে, এমন জীবের সঙ্গে লড়তে পারা, তার সাধ্যে নাই। আর একটিও কথা নয়। সাথে সাথেই সরে পড়েছে শেয়াল।
খরগোশ এবার গিয়ে হাজির হয়েছে চিতাবাঘের কাছে। সব কথা জানিয়ে বলল-- আমাকে একটু সাহায্য করো, চিতাদাদা।
চিতা এক কথায় রাজি। সে এসেছে খরগোশের সাথে। চেঁচিয়ে বলল—খরগোশ আমার বন্ধু। কে ঢুকেছিস তার ঘরে? কে তুই?
শুয়োপোকা ঘাবড়ে গেল না। একইভাবে গলা তুলে, একই কথাই বলল।
জবাব শুনে চিতা ভাবল, এ তো গন্ডারকে আছড়ে ফেলতে পারে। এমনকি হাতিকেও। এর সাথে পেরে ওঠা আমার কম্মো নয়। সরে পড়াই ভালো।
চিতাও চলে গেল সেখান থেকে।
খরগোশ এবার বেশ বুঝতে পেরেছে, ভেতরে যে ঢুকেছে, ছোটখাট শেয়াল বা চিতার পক্ষে তাকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। লড়াই হতে হয় সমানে সমানে।
এদিকে বেলা গড়িয়ে আসছে। রাত নেমে যাবে খানিক বাদে। ঘরে ঢুকতে না পারলে, সমস্যা হয়ে যাবে।
ভেবে চিন্তে সোজা গন্ডারের কাছে গিয়ে হাজির হল খরগোশ। সব শুনে, গন্ডার তো রেগে কাঁই-- কী বলেছে হতভাগাটা? আমাকে তুলে আছাড় মেরেছে? চল তো, দেখি কত বড় পালোয়ান সে।
গর্তটার সামনে পৌঁছে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে গন্ডার। মাটি আঁচড়াচ্ছে পা দিয়ে। চিৎকার করে উঠল—বেরিয়ে আয়, হতভাগা। কে ঢুকেছিস ভেতরে।
শুঁয়োপোকা এক্টুও ঘাবড়াল না। গম্ভীর গলায় বলল-- ওহ, গন্ডারের গলা মনে হচ্ছে। তুই আবার এসেছিস, হতভাগা? সেদিনের কথা মনে নেই তোর? মরবার সাধ হয়েছে, তাই না? একটু দাঁড়া। মজা দেখাচ্ছি আজ। এমন আছাড় মারব, উঠে ঘাস খেতে হবে না আর এ জন্মে।
এক মূহুর্তও দেরি নয়। বন-বাদাড় ভেঙে দৌড়ে পালাল গন্ডার।
দেখে শুনে খরগোশ এবার হতাশ হয়ে পড়েছে। বনে আর কাকে বলা যায়, যে এসে এই বিপদ থেকে বাঁচাবে তাকে।
একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। মরিয়া হয়ে, হাতির কাছে গিয়ে হাজির হয়েছে খরগোশ। বলল—খুব বিপদে পড়ে এসেছি। আমাকে বাঁচাও, দাদা।
হাতিকে সব খুলে বলল খরগোশ। হুমকি শুনে চিতা, গ্ণডারও সরে পড়েছে! হাতির মন বলল—ঝামেলার মধ্যে জড়িয়ে কাজ নাই। কে বলতে না কে ঢুকে বসে আছে। বেশি বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে, শেষে না সবার সামনে নাকাল হতে হয়। খুব ভুল কাজ হয়ে যাবে সেটা।
কিন্তু মুখে তো আর মনের ভাবনা বলে ফেলা যাবে না। গম্ভীর গলায় বলল—আমার দ্বারা এসব হবে না। বাজে ঝামেলায় কোনও দিন জড়াই না আমি। ভাগ এখান থেকে।
খরগোশ হাল ছেড়ে দিয়েছে এবার। যার ভয়ে গন্ডার দৌড়ে পালায়, হাতি এক পাও এগোয় না, এই ছোট্ট শরীরে তাকে মোকাবিলা করা কি আমার কাজ?
বিষন্ন মনে ফিরে আসছে। পথে এক ব্যাঙের সাথে দেখা। ব্যাঙ বলল—কীরে, কী হয়েছে? এত চিন্তা কীসের?
যা হোক একজন সমব্যাথী পাওয়া গেছে। বুকে আশা নিয়ে, সব কথা খুলে বল খরগোশ। শুনে তো ব্যাঙের চোখ মুখ কুঁচকে গেছে—বলিস কী? এতো বড় পালোয়ান? হাঁকডাক শুনে, চিতা গন্ডার হাতি সবাই ভয় পেয়ে গেল।
খরগোশ বলল-- গেলোই তো। কেউ কিচ্ছুটি করতে সাহসই পেল না।
ব্যাঙ বলল—সবই তো বুঝলাম রে। কিন্তু এত বড় একটা বীর পালোয়ান, তোর ওই ছোট্ট একটুকুনি গর্তে ঢুকল কী করে? কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না আমার।
খরগোশ বলল—এদিকে সন্ধ্যেও হয়ে আসছে। কী যে করব আমি, কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।
--অত ভাবতে হবে না তোকে। চল, আমি যাচ্ছি। খরগোশের সাথে ব্যাঙ এসে হাজির গর্তের সামনে। গলা চড়িয়ে বলল—শেষমেষ আমাকেই আস্তে হোল। যে পালোয়ান গন্ডারকে ঘোল খাওয়ায়, তাকে ঘোল খাওয়াই আমি। যে হাতিকে ধুলোয় গড়ায়, তাকে আমি পিষে মারি পা দিয়ে। বেরিয়ে আয়। দেখি তোর কত হিম্মৎ।
এবার বেমালুক ঘাবড়ে গেছে শুঁয়োপোকাটা। তার মন বলল-- আর বাহাদুরি দেখানোটা বেয়াক্কেলে কাজ হয়ে যাবে। এই তো ছোট্ট আর দুর্বল চেহারা আমার। যে কেউ থেঁতলে দিতে পারে আমাকে। মানে মানে মাফ চেয়ে নেওয়াই বুদ্ধির কাজ হবে।
এই না ভেবে, গুটি গুটি পায়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল পোকাটা।
একটা শুঁয়োপোকাকে বেরোতে দেখে, ব্যাঙ আর খরগোশ কারুরই বিশ্বাস হতে চায় না। এই পুঁচকেটা হম্বিতম্বি করছিল এতক্ষণ! দুজনেই হাঁ হয়ে দেখছে পোকাটাকে।
ব্যাঙ বলল—আরে, হতভাগা, তুই!
ছোট্ট আর সরু লিকলিকে দুটো শুঁড় আছে পোকাটার মাথায়। শুঁড় দুটো নাড়িয়ে বলল—মাফ করে দাও, দাদারা। ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম এখানে। যা সব বড় বড় পালোয়ান এসে হাজির হয়ে গেল! ভয় পেয়ে, একটু হম্বিতম্বি করে ফেলেছি। রাগ কোর না গো। মাফ করে দাও আমাকে।
রাগ নয়, মাফও নয়। হো-হো করে হাসতে লাগল দু’জনে। একটা পুঁচকে পোকা, সব্বাইকে বোকা বানিয়ে দিয়েছে।
হাসতে হাস্তে পেট ফেটে যাওয়ার জোগাড় দুজনের। সেই সুযোগে শুঁয়োপোকা কখন সরে পড়েছে, খেয়ালই হোল না তাদের।
0 Comments