কথাকলি সেনগুপ্ত
রোজকার অভ্যাসে আজ সকালেও যখন হাঁটতে আমাদের স্থানীয় পার্ক টিতে গিয়েছি, অনেক লোকের কথা বলবার আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসছিলো; এমনিতে সারা সপ্তাহ ধরে শুধু যারা হাঁটতে আসেন তাদের আর পাশে ছোট্ট দের একটা 'কিন্ডি স্কুল' আছে, তাদের কচি গলার একটু আধটু শব্দ শুনি; এতো কথা আসে তাহলে কি করে? তা ভেতরে ঢুকে দেখি - ফুটবল খেলা চলছে; নানাদিকের ছয় সেট গোলপোস্ট আছে, তার সব কটিতেই লোকে ঘিরে ভিড় করে রয়েছে।
আমাদের এখানে খেলার মাঠ গুলোতে এখন হৈ হৈ করে হয় ফুটবল নইলে রাগবি খেলা চলছে; ছোট বড়ো মাঝারি নানান বয়েসের, ছেলেদের মেয়েদের দলের মধ্যে চলছে, তা দেখতে পাই; বড়োরা মানে খেলুড়ে দের বাবা মা আর অনেক সময় দাদু দিদা, আশে পাশে দাঁড়িয়ে বা বসে থেকে সরবে বাচ্ছাদের উৎসাহ দিতে থাকেন, বেশ একটা সরগরম পরিবেশ চারিদিকে, দেখতে খুব ভালো লাগছিলো।
সাইড লাইন এর একদিকে একজন এই রকম দিদা বা ঠাকুমা বসে আছেন; একটা ফোল্ডিং গার্ডেন চেয়ার এতে; হাতে তাঁর একটা কাপ takeaway কোনো গরম পানীয়, পায়ের কাছে একটা ছোট চেহারার 'বিশন ফ্রিজে' পোষ্য লিশে বাঁধা; হাফ টাইম এর ব্রেক এতে ছোট একজন খেলুড়ে দৌড়ে এসে তাঁর সাথে একটু কথা বলে নিচ্ছে; এখানে গ্রান্ডমা কেনানা' বলে, ভারি মজা লাগে শুনে, কারণ আমাদের দেশে হিন্দি তেও তো নানা নানী শব্দ গুলো আছে, তাই না?
আমার এক কিউই বন্ধুর সাথে গতকাল ই পার্ক এতে প্রাতঃভ্রমণ করতে করতে ছোট বেলার নানা কথা আলোচনা হচ্ছিল। পার্ক এতে হাঁটতে গিয়ে বন্ধু ভিভিয়ান এর সাথে কথা প্রসংগে এই নিয়েই ভারি মজার একটি ঘটনার কথা জানতে পেরেছি। ওর দুই ছেলে তখন যথাক্রমে নার্সারি আর ক্লাস ওয়ানে পড়ত। ভিভিয়ান স্কুল বাস চালাতেন। ছোটদের প্রথম খেপে নামিয়ে বাকি বড়ো দের সেদিন নামিয়ে আসতে গেছেন। ঐ আধা ঘণ্টা তাঁর ই এক বন্ধুর ছেলের সাথে তাঁর ছেলেরা খেলা করতো। তা সেদিন কাজের শেষে ফিরে ওদের কে বন্ধুর বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে সবে এসেছেন। লক্ষ্য করে দেখেন যে তাদের গা - হাতে - পায়ে বেশ কাদা ময়লা শুকিয়ে আছে। তাই ওদের কে 'যাও স্নানের ঘরে আমি আসছি' বলেছেন যেই, তারা হুড়মুড় করে বলে উঠেছে 'না না মা, বাথরুম এতে ঢোকা যাবে না'!
উনি তো হাঁ! কেন? দুজনেই চুপ। তখন উনি নিজে গিয়ে উঁকি মারতে গোলমাল টা বুঝতে পারলেন। সেটি তখন কৃত্রিম জলাশয়ে পরিণত হয়েছে! মায়ের অনুপস্থিতির সময়ের সদ্ব্যবহার করেছে ছেলেরা; বাড়ির সামনের ডোবা থেকে মাটি পাথর এনে চারিদিক ঘিরে তার মধ্যে জলজ গাছ শ্যাওলা ছোট মাছ ব্যাঙাচি - সব এনে তাইতে ছেড়ে রাখা আছে!
আমি তো রুদ্ধশ্বাস! 'কী করলে তুমি তখন?' ভিভিয়ান হাসিমুখেই বলে চলেছিলেন 'আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেছিল'। তাই উনি ওদের কে দিয়ে ই বড় বাথটাব এতে সেই কৃত্রিম পূকুর টি স্থানান্তরিত করালেন, সব `বাসিন্দা'দের ও তাইতে রাখালেন । তারপর বাথরুম পরিষ্কার করে দুই ছেলে কে ভালো করে স্নান করিয়ে তবে নিজে চানে গেলেন। আর বেশ কিছু দিন ওদের বাথটাব ঐ পুকুর - চেহারা তেই রয়ে গেছিল!
আসলে পার্ক এতে হাঁটবার পথের ধারেই একটি 'কিন্ডি তথা কিন্ডারগার্টেন' সকুল রয়েছে। মানুষ প্রমাণ উঁচু লোহার রেলিং দিয়ে সেটি ঘেরা; তা হলেও বাচচারা যখন ক্লাস রুমের বাইরে এসে স্লিপ / স্লাইড খাচ্ছে দোলনা দুলছে তিন চাকার সাইকেল চালিয়ে বেড়াচ্ছে কি মাঝের 'সযানড পিট' এতে নেমে তাদের খেলনা কোদাল দিয়ে 'বাগান' করছে এসব নজরে পড়ে, মনটা নিজেদের ছোটবেলার দিকে এমনি ই চলে আসে।
আমরা যখন তেইশ বছর আগে এদেশে চলে আসি, ছোটরা তো স্কুলে পড়তো; সবচেয়ে বড় আমার মেয়ে, সে হাই স্কুলের শুরুর ধাপে অর্থাৎ ক্লাস নাইন এতে ভর্তি হলো; তার পরের জন মিডল স্কুল এর সবচেয়ে শেষ ধাপে, মানে ক্লাস এইট এতে, আর সর্ব কণিষ্ঠটি ক্লাস ফোরেতে ঢুকেছিলো; তাই ওদের বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ও ধীরে ধীরে এখানকার চাল চলন শিখতে শুরু করেছিলাম; মানে শিখেছি কতটা বলতে পারি না, তবে সে বিষয়ে অবহিত হতে আমাদের খুব ই সাহায্য করেছে ওরা।
এখানে ক্লাস ফোর থেকেই বছর বার দুয়েক করে ক্যাম্প এতে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে; যেহেতু ওরা যথেষ্ট ই ছোট থাকে, সঙ্গে কিছু পেরেন্টস টিচার ওঁদের সাহায্য করতে সঙ্গে গিয়ে থাকেন; ছোট ছোট নদী কী ভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে পার হতে হয়, বনের পথ চলতে গিয়ে কিভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হয়, পোকামাকড় এর সম্ভাব্য কামড়ের থেকে নিজেকে রক্ষা করা, এসব ওদের শেখানো হতে থাকে।
এই দিকে স্কিন ক্যান্সার পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি হয়ে থাকে; তাই 'সান হ্যাট' মাথায় থাকা একেবারে জরুরি বলে শেখানো হয়; ঐটি দিতে বাড়ি থেকে ভুলে গেলে সেদিনকার মতন স্কুলের ঢাকা বারান্দায় ই তাকে বসে থাকতে হবে টিফিনের সময়ে অন্যদের মতো সে বাইরে খোলা জায়গাতে খেলাধুলো করতে পারবে না; তাই কিছুদিনের মধ্যেই মা বাবা'র ভুল যদি বা হয়ে গেলো টুপি দিতে, বাচ্চা নিজের গরজেই সেটি মনে করে হাতে নিয়ে তবে বাড়ি থেকে রওনা হতে শিখে যায়।
সাইকেল এতে চড়বার বিষয়েও এদের প্রাইমারি স্কুলের শেষ এর দিক থেকেই উৎসাহ দেয়া আর প্রতিটি ধাপ স্কুলে শেখানোর বিষয় ও আমাদের অবাক করতো; আগে একজন, মাঝে একজন আর সবচেয়ে পিছনে একজন টিচার থাকেন, প্রত্যেক এর গায়েই রিফ্লেক্টর জ্যাকেট পরিয়ে নিজেরা ও পরে তবেই তাঁরা বের হন; গলির মুখে বাঁ দিক করে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক দেখা, নিজের বাঁ বা ডান হাত তুলে সিগন্যাল দেয়া আর তার পর আস্তে আস্তে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া সুন্দর ভাবে এদেরকে শেখানো হতে থাকে; সাঁতার ও সেই ভাবেই শিখতে উৎসাহ দেয়া চলতে থাকে; দেশটিতে তো নদী বড় লেক এসবের কোনো ই অভাব নেই, তাই ওঁদের এই পদ্ধতি আমার খুব ভালো লাগতো; আমাদের দেশে ও এগুলো চালু হলে পর ছোটদের অনেক সুবিধে হবে এইসব আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতাম।
কিছুদিন আগের কথা; এক সকালে রোজকার অভ্যাস মতো হাঁটতে সবে বের হয়েছি, আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির কিউই প্রতিবেশী নেভিলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো; সে তখন পার্ক এর গায়ে ই যে সিমেটরি তথা কবরস্থান আছে, সেই দিকেই চলেছে। প্রথা মতো শিষ্টাচার বিনিময় সেরে উঠেছি, সে তখন নিজে থেকেই জানালো যে তার সদ্য প্রয়াত মা'র সেদিন জন্ম দিন; তাই সে মা'র কবরে মোমবাতি জ্বালিয়ে ফুল দিয়ে আসতে চলেছে!
আমার হাঁটবার পার্ক ও ঐ একই দিকে, তাই দুজনেই কথা বলতে বলতে একসাথে চলছিলাম। ভারি মা - অনুরক্ত এই নেভিল, দীর্ঘদিন নিজে আর বাড়িতে নার্স রেখে মা ক্যাথ এর দেখাশোনা করে এসেছে। Alzheimer's এর খুব বাড়াবাড়ি অবস্থায় গেলে পর তাঁকে ডাক্তার এর পরামর্শ মতো একটি 'বৃদ্ধাবাস' এতে রাখতে বাধ্য হয়েছিল। তা মাস ছয়েক এর মাথায় ই ক্যাথ মারা গেছেন। বেচারা অবিবাহিত, তাই একেবারেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। যাই হোক, ফুল দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে খানিকটা সময় প্রার্থনা করে কাছের মল থেকে কিছু খাবার কিনে তার বাড়ির দিকে ফিরে গেলো; আর আমি অন্যদিকে থেকে মানে পার্ক এতে হাঁটা শেষ করে আসতে গেলাম।
ওর বেড়াল ডেক্সটার কে প্রায় ই বাড়ির সামনে বসে বোধ হয় মালিকের অপেক্ষা করতে দেখি; সেই ই এখন তার একমাত্র সঙ্গী। এদিকে তার মা'কে 'সোশ্যাল সাপোর্ট' এ যে নার্স মেয়েটি গত ছয় মাস ধরে আসছিলো, ক্রমে নেভিলে এর সাথে তার একটা ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়ে যায়; সেই মেয়ে টিও তার মাকে নিয়ে থাকে, বিয়ে সে ও করে নি; যা হয়ে থাকে, নেভিলে দেখি গত নভেম্বর মাসে বলছে যে আমি ওকে বিয়ে করতে চাই, তাই ঠিক করেছি যে ওকে Rarotonga বেড়াতে নিয়ে যাবো জানুয়ারী মাসে; সেখানেই ওকে propose করবো'; ব্যাপার টা যেন একটু বেশিই তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে মনে করে আমরা খুব সতর্ক ভাবে ওকে প্রশ্ন করে ছিলাম যেতুমি খুব sure হয়ে বলছো তো নেভিল? ' উত্তরে সে খুব লাজুক ভাবে জানিয়েছিল যে ওর মনে হচ্ছে যে মেয়েটির ও তাই ইচ্ছে আছে!
এখন তার দিন কয়েকের পরেই হলো একটা বিচ্ছিরি ঘটনা! নেভিলে খুব দেখি হতোদ্যম মুখে এসে সে এর সাথে কথা বার্তা খানি বলে গেলো; পরে জানতে পারলাম যে ওদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে; কারণ - ঐ মেয়েটি ওর সাথে ডিনার খেতে গিয়ে প্রথমে বলে যে তোমার মা'যে কাছে প্রতি দিন তোমার যাবার কোনো দরকার আছে কি? তাহলে তুমি আমার সঙ্গে কতটুকু সময় কাটাতে পারবে?' নেভিলে আশ্চর্য্য হয়ে যায়; বলেসে আমার মা, তোমার' মায়ের সাথে কতটুকু তুমি সময় কাটাবে বা কাটাচ্ছ, তা নিয়ে তো আমি কোনো কথা বলি না বা চিন্তা ও করি নি?' মেয়েটি জেদ করতে থাকে, নেভিলে 'র এতে রাগ হয়ে যায়; সে বলে যে এটা আমার নিজের ব্যাপার, তুমি interfere করতে পারো না; মেয়েটি রেগে উঠে তখন বলতে থাকে `এতো পয়সা দিয়ে এত্ত মডার্ন জায়গা তে উনাকে না রেখে আরো তো সস্তা'র জায়গা আছে' ইত্যাদি।
ইতিমধ্যে নেভিলে এর বেড়াল ডেক্সটার আস্তে আস্তে (বোধ হয় ওদের স্বভাবতঃ বুঝবার ক্ষমতা দিয়ে) মেয়েটির কাছে আসে ওর গায়ে আদর করে মাথা টা ঘষতে থাকে; মেয়েটি টিভি'র রিমোট ছুঁড়ে মারে তার গায়ে বলে আমি বেড়াল সহ্য করতে পারি না; তোমাকে একে ও বাইরে দিয়ে দিতে হবে আমি তোমার বাড়িতে একসাথে থাকতে আসার আগে!' এবারে নেভিল আর সহ্য না করতে পেরে উঠে দাঁড়িয়ে বলেএ আমার বেড়াল। আমার কাছে তিন বছরের ওপরে আছে; আমি একজন ক্যাট লাভার; তুমি ভালো করে জানো; গত ছয় মাস ধরে তুমি একে দেখেওছ; কেন ওর দিকে তুমি রিমোট ছুড়ে মেরেছো'? মেয়েটি কোনো remorse দেখায় নি বা স্যরি ও বলে নি; তখন নেভিল ওকে শান্ত ভাবে বুঝিয়ে বলে যে ওদের সম্পর্কের কোনো আর প্রয়োজন নেই; যখন একে অন্যকে বুঝতে পারবার কোনো চেষ্টাই নেই, আগে থেকে আর দেখা না হওয়া ই মঙ্গল। কী বিশ্রী কাণ্ড!
গতকালকের দেখা একটা ঘটনা বলি; যখন পার্ক এর কাছের সেই অভনহেড সেমেটারি বা কবরখানা'র পাশ দিয়ে যাচ্ছি, দেখি একজন মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা মাঝের ঘাসে ঢাকা একটা সুন্দর সাজানো জায়গাতে কেমন যেন ধপ করে বসে পড়লেন! আমি দূর থেকে দেখে প্রথমে ভেবেছি যে নিশ্চই গরমে আর রোদে'তে উনার শরীর খারাপ হয়েছে'! আমি কাছে গিয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করেছি কোনো সাহায্য লাগবে কিনা! তাইতে উনি খুব অবাক হয়ে আমার দিকে একটু তাকিয়ে তার পরে হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে দেখি হাতে রাখা একটা প্লাষ্টিক এর প্যাকেট থেকে খুরপি, এক ফ্লাস্ক জল, বেশ কিছু ফুল আদি বার করে রাখছেন; তখন আমার কৌতূহল হলো! কারণ যেখানে উনি বসেছেন, তার আসে পাশে (আমার হিসেবে মতে) কোনোকবর' তো নেই! কারণ কোথাও কোনো ক্রস পুঁতে রাখা নেই, না কোনো হেডস্টোন আছে!
আমি বিনয়ের সঙ্গে প্রথমে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিয়ে তার পরে জিজ্ঞেস করে ই বসলাম `কোনো তো কবর দেখছিনা এখানে'? তাইতে উনি হাসি মুখে (কারণ বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি ব্যাপার টার আগা - পাছা কিছু বুঝতে পারি নি) আমায় দেখালেন যে এক্কেবারে ঘাসের সঙ্গে লাগোয়া একটা লোহা বা ওই রকমের কিছু প্লাক / প্লেট এর মতন একটা জিনিস এর কাছে উনি বসে; জানালেন যে ওটা উনার বাবা আর মায়ের শেষ শয্যা'র জায়গা।
🍂
আমি তো খুব অবাক হয়েছি; আগে কখনো হেডস্টোন বা ক্রস ছাড়া যে কবর হতে পারে দেখি ই নি। আমার বিস্ময় দেখে উনি জানালেন যে - উনার বাবা মা এটা বলে গিয়েছিলেন যে যেন কোনো হেডস্টোন বা ক্রস আদি উনাদের কবরের সাথে না রাখা হয়; কারণ - প্রথম এক দুই বছর বাদে কোনো আত্মীয় সময় করে দেখতে বা পরিষ্কার করতে আসে না; পাথর ফেটে ঘাস গজিয়ে ক্রস ভেঙে গিয়ে জায়গাটা কুদর্শন হয়ে ওঠে।
এই ভদ্রমহিলা'ই শেষ দিন পর্যন্ত তাঁদের দেখা শোনা করেছেনা। তাঁর ভাই অস্ট্রেলিয়া'তে সেটলড, মাঝে মধ্যে বাবা মা'র সাথে দেখা করতে আসতেন; উভয় পক্ষের ছেলে মেয়ে'র সংখ্যা খুব কম নয়, কিন্তু বছরে সেই মৃত্যু দিনে বা খ্রীষ্টমাস ছাড়া তাদের কেউ ই এ দিকে এলেও কবরে এসে ফুল দেয়া বা প্রার্থনা করে যেতে সময় নাকি পায় না! উনি'ই মাসে এক বার করে এসে আশে পাশের আগাছা পরিষ্কার করে, ফুল দিয়ে ধুপ জ্বালিয়ে যান!
তার পরে উনি দেখালেন যে পাঁচ ছয় হাত দূরেই ওই রকম আরেকটা প্লেট মাটিতে লাগানো; জানতে পারলাম যে ওটা উনার শশুর-শাশুড়ি'র কবর; তাঁরা ও পুরানো ধরণের প্রথামত কবর এতে যেন তাঁদের কে না দেয়া হয় বলে গেছিলেন। অনেকেই নাকি আজকাল এরকম টা বলে রেখে যায়, যাতে কেবল সবুজ ঘাসেই ওদের শেষ বিশ্রামের জায়গা ঢাকা থাকে!
ভদ্রমহিলা আমায় জিজ্ঞেস করলেন যে আমাদের কি ভাবে শেষকৃত্য হয়? আমি উনাকে জানালাম যে হিন্দু প্রথাতে ক্রিমেশন চলে; উনি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন যে খুব বিজ্ঞানোচিত প্রথা এটা; না জায়গা ঘেরে, না কোনো ইনফেকশন আদি হবার ভয়, না উত্তর পুরুষের বা আত্মীয়দের সেখানে এসে কিছু পরিষ্কার করবার কোনো প্রয়োজন পড়ে। কথা বলতে বলতেই সেখানে তিনি পরিষ্কার করা সেরে ফুল এসব দিয়ে তা'র পরে আমায় আরেকবার ধন্যবাদ জানিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন লাঠি ঠুকে ঠুকে।
আমার এটা দেখে অনেক দিন আগে পড়া যাযাবর এর লিখিত দৃষ্টিপাত এতে পড়া মুঘল সম্রাট শাহজাহানের এর বড় মেয়ে বেগম জাহানারা'র কবর এর কথা মনে পড়ে গেলো; দিল্লি তে থাকা কালীন পীর নিজামুদ্দিন আউলিয়া'র সমাধির কাছে উনার কবর দেখেছি। কিন্তু সেখানে ঘাস ছাড়া আর কিছু নেই, কোনো দামি পাথর বা নকশা কিছু নয়; ওপরে পারসী তে শুধু উনার নিজের লেখা একটা ছোট্ট কবিতা - `বেগায়ের সবজা না পোষাদ কষে মাজারে মোরা / কে কবর পোষে হামিন গিহাহ বসত' (আমার কবরে যেন তৃণ ছাড়া আর কোনো আস্তরণ বা আচ্ছাদন না থাকে; আমার মতন দীনের সেই তো উপযুক্ত ভূষণ!)
0 Comments