জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক সেলো দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক সেলো দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২৯শে ডিসেম্বর, আন্তর্জাতিক সেলো দিবস। সেলো কি? বাদ্যযন্ত্রের দুনিয়ায় এর ভূমিকা কি এবং এর ইতিহাসই বা কি? আসুন এই সব কিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

সংগীত মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। ভাষা, ধর্ম কিংবা জাতিগত বিভেদ অতিক্রম করে সংগীত মানুষের অনুভূতি প্রকাশের সর্বজনীন মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই সংগীতজগতের এক অনন্য ও আবেগঘন বাদ্যযন্ত্র হলো সেলো (Cello)। সেলোর সুর গভীর, কোমল এবং মানবকণ্ঠের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এটি শ্রোতার হৃদয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই অসাধারণ বাদ্যযন্ত্রের প্রতি সম্মান জানাতে প্রতি বছর ২৯শে ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সেলো দিবস পালন করা হয়।

সেলো একটি তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র, যা ভায়োলিন পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আকারে এটি ভায়োলিন ও ভায়োলার চেয়ে বড় এবং ডাবল বেসের চেয়ে ছোট। সাধারণত সেলো বসে বাজানো হয় এবং বাদ্যযন্ত্রটি মাটিতে ভর দিয়ে রাখা থাকে। সেলোর চারটি তার থাকে এবং ধনুক (bow) ব্যবহার করে কিংবা আঙুল দিয়ে তারে টোকা দিয়ে সুর তোলা হয়।
🍂

সেলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর স্বরগম্ভীরতা ও আবেগপ্রবণতা। এটি একদিকে যেমন গভীর বিষণ্নতা প্রকাশ করতে পারে, অন্যদিকে তেমনি আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও শান্তির অনুভূতিও সৃষ্টি করতে পারে।

সেলোর উৎপত্তি ইউরোপে, আনুমানিক ১৬শ শতাব্দীতে। প্রাথমিকভাবে এটি “বেস ভায়োলিন” নামে পরিচিত ছিল। ইতালির বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা পরিবার যেমন আমাতি, স্ট্রাডিভারি ও গুয়ারনারি সেলোর কাঠামো ও শব্দগুণ উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৭ ও ১৮ শতকে ধীরে ধীরে সেলো একক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বারোক যুগের সুরকাররা সেলোর সম্ভাবনা উপলব্ধি করে একে কেন্দ্র করে বহু সঙ্গীত রচনা করেন। পরবর্তীতে ক্লাসিক্যাল ও রোমান্টিক যুগে সেলো অর্কেস্ট্রা ও একক পরিবেশনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক সেলো দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো দিবস না হলেও, সেলোপ্রেমী ও সংগীতশিল্পীদের উদ্যোগে এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। সেলোবাদক ও সংগীত অনুরাগীরা ২৯শে ডিসেম্বর দিনটি বেছে নিয়েছেন, মূলত সেলোর ঐতিহ্য, ইতিহাস ও শিল্পীদের অবদান স্মরণ করার জন্য।

এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কনসার্ট, অনলাইন পরিবেশনা, সেলো ওয়ার্কশপ, আলোচনা সভা এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। সেলো কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি অনুভূতির ভাষা। মানবকণ্ঠের কাছাকাছি স্বর হওয়ায় সেলো সহজেই শ্রোতার আবেগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। অনেক সময় চলচ্চিত্রের বিষণ্ন বা আবেগঘন দৃশ্যে সেলোর সুর ব্যবহার করা হয়, কারণ এটি দৃশ্যের গভীরতা বাড়ায়।

সেলো একদিকে একক পরিবেশনার জন্য উপযুক্ত, অন্যদিকে অর্কেস্ট্রায় এটি ভারসাম্য রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে। ভায়োলিনের উচ্চ স্বর ও ডাবল বেসের গভীর স্বরের মাঝখানে সেলো একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিশ্বসংগীত ইতিহাসে বহু কিংবদন্তি সেলোবাদক রয়েছেন, যাঁরা এই বাদ্যযন্ত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন,
ইয়ো-ইয়ো মা (Yo-Yo Ma),
পাবলো ক্যাসালস (Pablo Casals) এবং মিস্তিস্লাভ রস্ত্রোপোভিচ (Mstislav Rostropovich)
তাঁদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার কারণে সেলো আজ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় একটি বাদ্যযন্ত্র।

বর্তমান যুগে সেলো কেবল ধ্রুপদি সংগীতেই সীমাবদ্ধ নেই। পপ, জ্যাজ, রক এমনকি চলচ্চিত্র ও ভিডিও গেমের সংগীতেও সেলোর ব্যবহার লক্ষণীয়। অনেক আধুনিক সেলোবাদক ইলেকট্রিক সেলো ব্যবহার করে নতুন ধাঁচের সংগীত সৃষ্টি করছেন, যা তরুণ প্রজন্মের কাছে সেলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক সেলো দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো,
১. সেলো বাদ্যযন্ত্রের ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণ
২. নতুন প্রজন্মকে সেলো শেখার প্রতি আগ্রহী করা
৩. সেলোবাদকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া
৪. সংগীতের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করা

সংগীত শিক্ষা মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেলো শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ধৈর্য, মনোযোগ ও সৃজনশীলতা অর্জন করে। অনেক দেশে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সেলো শিক্ষা পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সেলো মানুষের জীবনে শান্তি ও সৌন্দর্য যোগ করে। যুদ্ধ, সংকট বা দুঃসময়ে সেলোর সুর মানুষের মনে আশার আলো জ্বালাতে সক্ষম।

আন্তর্জাতিক সেলো দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানবতার সেতু। সেলো তার গভীর ও আবেগঘন সুরের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে যে প্রভাব ফেলে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ২৯শে ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সেলো দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা এই মহান বাদ্যযন্ত্র, এর শিল্পী ও এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে সম্মান জানাই।এই দিবস আমাদের অনুপ্রাণিত করে সংগীতের প্রতি ভালোবাসা বাড়াতে এবং সেলোর সুরের মাধ্যমে মানবিক অনুভূতিকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে।

Post a Comment

0 Comments