জ্বলদর্চি

রাঢ়ভূমির ধূলা মঞ্জরী /রূপক চট্টোপাধ্যায়

রাঢ়ভূমির ধূলা মঞ্জরী
রূপক চট্টোপাধ্যায় 


অন্ধ মেয়েটির অভিমান 

   পৃথিবীর এক কোনে বৃক্ষ হয়ে জন্ম নিল।
সারাদিন পাতায় পাতায় নেচে বেড়ায়

দৃষ্টি পরিচিতি! ঝলমলে ক্লোরোফিল সংকেতে

উপচে পড়ে রূপের দিন মহল। গায়ে লাগে হলুদ 
রোদের কোলাজ।

ঝাপসা সন্ধ্যায়
আউশের গন্ধ মাখা পথে ঝাঁকড়া চুলের 
ফিরতি পুরুষটি তার
প্রেমিক ছিলো এককালে। 
আজ তার হাতেই চকচকে কুঠার! 


হৃদয়ের কুয়ো তলায় 

তৃষ্ণা  হরিণ হয়ে আসে। হলুদ বরণ গাঁদা ফুল ফুটলে 
ভাদর মাসের বয়স্ক নারীরাও সেই ফুল
কানে গুঁজে মশক পাহাড়ের সাথে মশকরা করে!

জলের বৃত্ত থেকে বালতি বালতি জল ওঠে
হৃদয়ের অতলে কেউ এক ছটাক জল তুলতে
আসেনা। কোন দিন। বারান্দায় খুনসুটি পায়রা। 
এঁটো থালায় মুখ দেখছে বিড়ালি। 

মথুর গোয়ালা বসে বসে মশক পাহাড়ের বাপ বাপান্ত করে। রাত ভোর গালাগালির ওপর হিম জমে ওঠে! 

🍂

জলের অতলে মায়া মুখ পড়ে আছে

মুখোশটি নিয়ে গেছে 
তিনমূর্তী ছৌনাচের দল!

হিংচা শাক ভাজা আর গামলা ভর্তি পান্তা 
পর্যন্ত সুখ এলেই ভূষণ চৌকিদার হেঁসে ওঠে।

বড় অসুখের আগে
তার নাচের ভূমিতে কেঁপে উঠতো
 বরাভূম, কালপাথরা, পঞ্চকোট, গালুডি।

ধামসার তালে গুমরে ওঠা বুকের ভেতর
এখনো ভূষণ মাঝে মাঝে সেজে ওঠে 
দৃপ্ত দশানন। কঙ্কাল কাঁপতে থাকে সুরে,
পেশিতে জমে ওঠে বিগত প্রস্তাব! 



দশদিক আলো করে 

কত-শত কঙ্কাল জুড়ে মানুষ ফুটেছে। 
বড়দি পাহাড়ের কোলে
নব কুঞ্জে হরির হাট। শ্রী খোল বাজায়
কৃষ্ণকায় প্রেমিক।


অদূরেই 
রূপের নদী উপুড় করে বসে থাকে
বিনোদ বালা। রসকলির চিহ্নিত কপালে
অনেক কলঙ্ক আছে। লোকে পাঁচকান করে।
চাঁদনী রাতের আলোয় সে সব কলঙ্ক ধুয়ে 
উঠে আসে দামোদর থেকে।

প্রাক্তন পুরুষের চিতায় জন্মানো
বনতুলসীর মঞ্জুরী তুলে খোঁপায় গুঁজে রাখে।

আর শরীর জুড়ে খোল বাজায় কৃষ্ণকায় প্রেমিক!


হুহু হাওয়ায় আমার বর্ণমালা ভেসে যায়

বহুদূর,  দূর বহু শতাব্দীর  মৌন নগরী
গাঙ্গেয় পূণ্যতোয়া  ঢেউ এঁকে 
ভেসে যায় চর্যাগীতির মতো
তালপাতার পুঁতির আড়ালে
রৌদ্র লিপিতে ভেসে যায় 
আহা যায় সে শ্রাবণ স্মরণে 
আকুল বালিকার মতো!

সারসের দলে, মৃদু নদীর আলাপে একাকি
যেখানে চাঁদবেনের দেশ
ময়ূরপঙ্খী দুলে ওঠে দুপুর সাগরে 
ফুল্লরা হেঁটে হেঁটে তুলে আনে
হরিণ তৃষ্ণার জল, ময়ূরাক্ষী কূল!

আমার বর্ণমালা ভেসে যায় 
আবহমান বাংলার মুখে মুখে

 বিদ্যাপতি রামপ্রসাদের দেশে।

রাঙা হয়ে থাকা সিঁথি পূব দিক হয়ে যায় 
কাল কাটে বাংলা ভাষা, ভালোবেসে! 


জলের কোন লিঙ্গভেদ নেই। 

তবু ভীরু মীন জন্ম লুকিয়ে রাখে
অতলের তরঙ্গ আলাপে!

তোমারও অতলে পৌঁছে যাওয়া হলোনা আমার। 
যেখানে নির্জন যাপনে বসে
তুমি বেঁধে নাও মানুষের ভীড় থেকে
তুলে আনা সুর গুলি 

তোমার পুরাতন এসরাজে! 


পাখিরা কোনদিন বৃদ্ধ হয়না

জঙ্গল পাহাড় অথাব নদীর কঙ্কাল 
সব খানে খোঁজ নিয়ে দেখো,
কোথাও প্রমাণ পাবে না।
তবে, দোলাদি'র বর ছেড়ে যাওয়ার পর

দোলাদি 'কে ক্রমশ পাখি হতে দেখেছি!

Post a Comment

1 Comments

  1. কমলিকা ভট্টাচার্যDecember 29, 2025

    কবিতাগুলো ভালো লাগলো,বিশেষ করে জলের কোনো লিঙ্গ ভেদ নেই
    তাই আমিও চার লাইন লিখলাম

    আমি অতল লুকোইনি,
    শুধু শব্দকে নীরব হতে শিখিয়েছি।
    যে সুর ভিড় সইতে পারে না—
    সে একাই আমার এসরাজে নামে।

    ReplyDelete