তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত 'রক্তকরবী' নাটক শতবর্ষে পদার্পণ করছে। মনে প্রশ্ন জাগে রক্তকরবীর কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দিনী--- কে এই নন্দিনী ? এ কি শুধুই রক্তকরবীর নন্দিনী ? না কি এ নন্দিনী আপনি আমি আমরা সে তাহারা তোমরা আপনারা অগণন জনগন? যাদের মনে সুন্দর করে স্তরে স্তরে সাজানো থাকে রক্তকরবীর লালিমা প্রেম ভালোবাসা আর সেই চিরন্তন মানবতা। আসলে এ বড় জটিল ধাঁধা। আমাদের মধ্যেই বাস করে সেই জালের আড়ালে থাকা অদৃশ্য লোভী রক্তকরবীর রাজা যে কেবল জড়পদার্থের সম্পদ চায়, চায় 'পৃথিবীর মরাধন তাল তাল সোনা' অর্থাৎ পার্থিব নিস্প্রাণ সম্পদ আর মানুষকে জবরদস্তি শাসন শোষণ করার ক্ষমতা। আবার আমাদের সমাজেই বাস করে সেই রঞ্জন যে প্রতিবাদ করে সেই ক্ষমতাধারীদের বিরুদ্ধে আর প্রাণ হারায়। আমাদের মধ্যেই বাস করে রঞ্জন আর নন্দিনীর প্রেম, রক্তকরবীর সৌরভ আর শক্তি। এই বিশ্বসংসারেই আছে বিশুপাগল আর তার নিজের গান --নন্দিনীর জন্য, আছে কিশোরের মতো সেই উদ্ভিন্নযৌবন চিরযুবা আর তার সাহস আর সারল্য,--- যে যক্ষপুরীর সর্দারের চোখ রাঙানী আর চাবুকের মার উপেক্ষা করেই নন্দিনীর জন্য লুকিয়ে এনে দেয় রক্তকরবী ফুল ,--'সে তার নিজের ফুল' নন্দিনীর জন্য ।
🍂
নাটকের অন্যতম চরিত্র অধ্যাপক বলছেন সকালের আলোর মধ্যে যে সৌন্দর্য্য তাতে আশ্চর্য নেই কিন্তু যক্ষপুরীর দেওয়ালের ফাটল দিয়ে এক চিলতে তীব্র যে আলো আসে তাতে থাকে রহস্য--- নন্দিনী হচ্ছে সেই এক চিলতে তীব্র আলো যা সবাইকে রহস্যজনক ভাবেই আলোকিত করে দেয় , মনটাকে খোলা হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয়, নাড়িয়ে দেয়, আঁধার কাটিয়ে দেয় এমনকি শেষ পর্যন্ত সেই বীভৎস ভয়ঙ্কর রাজাকেও নাড়িয়ে দেয়, সেও বেরিয়ে আসে যক্ষপুরীর আঁধার ছেড়ে খোলা আকাশের নীচে। তার ভুল ভাঙিয়েছে নন্দিনী, তার আত্মজ্ঞান চক্ষু খুলে দিয়েছে নন্দিনী, তার নিষ্ঠুর চাহনির জড়ত্বকে ঠেলে সরিয়ে এনে দিয়েছে মানুষের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি প্রেম ভালোবাসা ---সেই আলো আর প্রেমই কি নন্দিনী ? এক আত্মজিজ্ঞাসার নামই কি নন্দিনী?এক আত্মোপলব্ধির নামই কি নন্দিনী?
এই সমাজে আমরা যারা নন্দিনীর মতোই মনে করি চারদিকে জমাট হয়ে থাকা অন্ধকারে যেন এত্ত এত্ত আলো ঢেলে দিই সেই আমরাই হয়তো অন্তরে অন্তরে এক একজন নন্দিনী! আমরা যারা প্রেমে বিশ্বাসী, ভালোবাসায় আস্থাশীল, সৌন্দর্যের পিয়াসী,'পৃথিবীর মরাধন তালতাল সোনা'র থেকে আমরা বেশী ভালোবাসি পৌষের ডাক শুনতে, হলুদ সরষের ক্ষেতের নয়নাভিরাম সহজ সৌন্দর্য দেখতে, নতুন ধানের সুগন্ধ পেতে আমরাই এক একজন নন্দিনী! আমরা এগুলোই চাই কিন্তু বলতে পারি না, খুঁজে পাই না সেই পথ ---- এই যন্ত্র সভ্যতার গোলক ধাঁধায়। এগুলোতেই আমাদের প্রাণের আরাম তবু আমরা কী যন্ত্রণায় নিস্ফল মাথা কুটে মরি চারদিকের যন্ত্র জীবনের কঠোর দেওয়ালে! নন্দিনী তাই আমাদের নিজেকে চেনার আয়না --মায়া মুকুর।
কিন্তু হায়! প্রকৃতির সরল সৌন্দর্য্য ভুলে অন্ধকার খনি থেকে পৃথিবীর ধন তুলে বড়লোক হওয়ার নেশায় পেয়েছে আমাদের। আমরা ভুলে যাই বৃক্ষের ঋজুতা, ঘাসের নম্রতা, বাতাসের বিনয়। তাই আমাদের এই বিপর্যয়। এ নাটক ,যখন রবীন্দ্রনাথ লেখেন তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে ---সাম্রাজ্যবাদের বিষময় কুফল ফলে গেছে। পৃথিবীর নিজস্ব ধনের ওপর অধিকার ফলানোর কাড়াকাড়ি এই যুদ্ধের কারণ। কোন্ দেশের অধিনায়ক কত সম্পদে বলীয়ান হয়ে কত দেশ দখল করতে পারবে, কত মানুষকে শোষণ করতে পারবে তারই নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা চলেছে এই যুদ্ধে। মানবতার এই পতন, সভ্যতার এই সংকট দেখে ব্যথিত রবীন্দ্রনাথ লিখলেন তাঁর প্রতিবাদ ---রক্তকরবী নাটক । সৃষ্টি করলেন লোভী সাম্রাজ্যবাদীর চরিত্র রাজার মাধ্যমে, প্রতিবাদের চরিত্র রঞ্জনের মাধ্যমে আর প্রেম বিশ্বাস ভরসা আস্থার চরিত্র নন্দিনীর মাধ্যমে।
যক্ষপুরীতে নন্দিনী এসে সব ওলটপালট করে দিল শুধু ভালোবাসার গান গেয়ে। দুখজাগানিয়া সে গানে দুঃখ ভোলে সেখানকার শ্রমিকের দল। এ যে ভালোবাসা দিয়ে বিপ্লব ঘটানো! রঞ্জনকে হারিয়েও শোসিতের মধ্যে রঞ্জনের আদর্শকে সঞ্চারিত করতে চায় নন্দিনী। কী করে পারে এই আঘাত সহ্য করেও রাজাকে তার আত্মোপলব্ধির জায়গায় নিয়ে যেতে ! কী করে পারে ফাগুলাল সর্দার অধ্যাপক বিশু পাগল কিশোর সবার মনে বেঁচে থাকার আনন্দ ছড়িয়ে দিতে!
হ্যাঁ, হয়তো পারা যায় ! হয়তো এটাই রঞ্জনের প্রেমের শক্তি! এটাই নন্দিনীর রক্তকরবীর শক্তি ! আমাদের মধ্যেও আছে বৈকি নন্দিনীর এই প্রেমসুষমা, প্রতিবাদের এই উত্তুঙ্গু বৈভব, মানুষের হাত ধরার সাগর- হৃদয়। আমাদের মধ্যেও আছে মানবিক গুণাবলী। তবুও ত সময়ে সময়ে আমরা বিদ্ধস্ত হই, বিপর্যয় ডেকে আনি।সে সংকটে পরিত্রাণ পেতে চাই। খুঁজে নিতে চাই পরিত্রাতাকে। আর ঠিক তখনই হাতে গলায় কানে মাথায় রক্তকরবী ফুলের মালা পরা সেই দুর্দান্ত জীবন প্রেমিকাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় ---কে তুমি নন্দিনী ?
0 Comments