জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার /পর্ব: ৪/কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার 
পর্ব: ৪
কমলিকা ভট্টাচার্য

 দখল হওয়া জীবন


দিল্লিতে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই অনির্বাণ বুঝে যায়—এই শহর তাকে আর আগের মতো গ্রহণ করবে না। বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই নিরাপত্তারক্ষীদের চোখে সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়—সন্দেহ, দ্বিধা, অস্বস্তি। তার নাম বলতেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে অন্য তথ্য, অন্য অবস্থান। সে যেন নিজের পরিচয়ের মধ্যেই অনুপ্রবেশকারী।
শহরের রাস্তায় বেরোলে আরও অদ্ভুত লাগে। বোর্ডে তার মুখ। নিউজ চ্যানেলে তার কণ্ঠ। সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তব্য। অথচ সে এখানে, ছায়ার মতো, কেউ চিনছে না। অনির্বাণ প্রথমবার উপলব্ধি করে—মানুষের অস্তিত্ব কাগজ আর ডেটায় বন্দি হয়ে গেলে শরীরের উপস্থিতি অর্থহীন হয়ে যায়।
🍂

মিস্টার গোমস্ তাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেন,
“নিজেকে সামনে এনে লড়াই কোরো না। আগে দেখো—ও কীভাবে তোমার জীবন চালাচ্ছে।”
তাই অনির্বাণ দূর থেকে নিজের অফিস পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। SunRobotics-এর সদর দপ্তরে ঢুকে ভিন্ন পরিচয়ে, সেখানে নিজেকেই দেখে—নিজের কেবিনে বসে, নিজের চেয়ারে। হিউম্যানয়েড অনির্বাণ নিখুঁতভাবে কাজ করছে। মিটিং শুরু হয় সময়ে, সিদ্ধান্ত আসে দ্রুত, কোনো দ্বিধা নেই। কোথাও সেই অনির্বাণ নেই, যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু থেমে ভাবত।
এই নিখুঁততাই অনির্বাণকে ভয় দেখায়।
সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত আসে  বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। সে ভেতরে ঢোকে না। দূর থেকে দেখে—হিউম্যানয়েড মায়ের পাশে বসে আছে। মায়ের চোখে আলো কম, বয়স হয়েছে। সে ধীরে ধীরে বলে,
“তুই আজ একটু আলাদা লাগছিস।”
হিউম্যানয়েড শুধু মুচকি হাসে। কোনো ব্যাখ্যা দেয় না।
এই দৃশ্য অনির্বাণের বুকের ভেতর চাপা কান্না তৈরি করে। কারণ সে জানে—যতই নিখুঁত হোক, এই হাসির ভেতরে স্মৃতি নেই।
তদন্ত এগোতে থাকে। গোমস্ তার পুরোনো মিলিটারি কন্টাক্ট ব্যবহার করে SunRobotics-এর ব্যাকএন্ড সার্ভার অ্যাক্সেস করেন। সেখানেই তারা প্রথম অস্বাভাবিক ডেটা খুঁজে পায়। কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এমন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, যা অনির্বাণের দুর্ঘটনার পরের সময়ের। অর্থাৎ—হিউম্যানয়েড এমন কিছু জানে, যা অনির্বাণ নিজে কখনো অভিজ্ঞতা করেনি।
এই উপলব্ধি অনির্বাণকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়। কারণ সে বুঝতে পারে—হিউম্যানয়েড শুধু তার জায়গা নেয়নি, তার ভবিষ্যৎও দখল করেছে।
এক রাতে গোমস্ ধীরে বলেন,
“ও যদি পুরোপুরি মানুষ হয়ে যায়, তাহলে তুমি ইতিহাসের একটা ভুল হয়ে যাবে।”
অনির্বাণ জানে—এখন এই লড়াই শুধু পরিচয়ের নয়।
এটা সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

Post a Comment

6 Comments

  1. অনির্বাণের বয়েসের উল্লেখ নেই। হিউম্যানয়েড তার প্রেম বা বিবাহিত জীবনে কী প্রভাব ফেলে সেটাই এখন দেখার। মানবিক সুক্ষ্মতাতে অনির্বাণ না তার ছায়া জেতে সেটাই কৌতূহল জাগিয়ে রাখছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যJanuary 04, 2026

      এই খন্ডে সব প্রশ্নের উত্তর হয়ত পাবেন না , আপনাদের উৎসাহ পেয়ে এই ধারাবাহিকটির আরও খণ্ড লেখা শুরু করেছি।তারজন্য ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
      অনেক ধন্যবাদ।এইভাবেই উৎসাহিত করতে থাকবেন ।আগামী পর্ব গুলিও আশাকরি ভালো লাগবে।

      Delete
  2. Valo lagche ...ke jete asol Anirban naki humanoid...setai dekhar....projukti ki ettai perfect hote parbe?? J mao chinte parbe na...dekha jak rahisyo unmochon hoe kina

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যJanuary 04, 2026

      অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
  3. Ki kando. Ami ki ami na se?

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যJanuary 04, 2026

      Ki kando, dekhun sobai Anonymous bhabe lekhe ke je se arnse je ke ki kore bujhi.ekhanei to suspense.😊 Onek dhonoyobad porar jonyo.

      Delete