পর্ব ৩
অরিজিৎ লাহিড়ী
জিলফির চলে যাওয়ার পর আমার শরীরে যেন রাষ্ট্রের মতোই ব্যথা—নষ্ট, অস্পষ্ট, এবং পুনর্গঠনের অযোগ্য। আমার হৃদস্পন্দন তখন ফায়ার অ্যালার্মের মত—হঠাৎ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে বলে: আরে গুরু! তুমি এখনো আছো?
তখনই সে এল।
হাসপাতালের জরুরি ওয়ার্ডে এক ভদ্রলোক ঢুকলেন, মাথায় সোনালি চুল, চশমার ফ্রেম হাওয়াই মার্কা, আর হাতে একটা প্লাস্টিক ব্যাগ, যার ভেতর থেকে চিকেন নাগেটসের গন্ধ বেরোচ্ছে।
সে বলল—ইয়ো, ইউ আর দ্যি অ্যানার্কো ওয়েরডো পোয়েট অর ওয়টএভা ফ্রম কলকাতা, রাইট?
আমি বললাম—আমি শারীরিকভাবে ভাজা, রাজনৈতিকভাবে ফ্যাটানো, আর ভাষাগতভাবে চিপস্। আপনি কে?
সে চেয়ারে বসে বলল—এজেন্ট স্যান্ডার্স হ্যামফিস্ট, ডোনাল্ডল্যান্ডের পোলিও-কালীন গোয়েন্দা সংস্থার অ্যাসাইনমেন্টে এসেছি। তোমার পেছনে গোলপান্ট্রি আর কদম্বাবাদ দু’পক্ষই লেগেছে। কাজেই আমরা ঠিক করেছি, তোমাকে বাঁচিয়ে আমাদের দেশে নিয়ে যাব। কারণ তুমি এখন একটা ভীষণ ভাইরাল অ্যাসেট।
আমি বললাম—তাহলে আমি কি এখন রাজনৈতিক মিম?
সে হেসে বলল— ব্যাং অন ! তোমার পচা কবিতাগুলো এখন আমাদের ইন্টেলিজেন্সের বোটানিক্যাল গার্ডেনে জায়গা পাবে।
আমি হ্যামফিস্টের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম না, সে আমার জীবন বাঁচাতে এসেছে, না এসেছে কোনও ডেটিং অ্যাপে আনম্যাচড করতে।
সে বলল—তোমাকে নিয়ে যেতে হবে এক গোপন পথ দিয়ে। একটা বোরখা, একটা উইগ, আর একটা শেক শ্যাক-এর ডেলিভারি ব্যাগ। ঢুকবে সেই ব্যাগে।
আমি বলি—শেক শ্যাক ব্যাগে? এটাই ডোনাল্ডল্যান্ডের পরমাণু কূটনীতি?
সে বলল—হ্যাঁ। কারণ এখানে কেউ বুদ্ধিজীবী চেক করে না, সবাই খাবার চেক করে।
রাতে, আমি একটা প্রায় ভেঙে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া মসজিদে দাঁড়িয়ে। হ্যামফিস্ট কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে নাচছেন—ডোনাল্ডল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের টিকটক অ্যাকাউন্টে ট্রেন্ডিং একটা গানে।
আমি তার দিকে তাকিয়ে বলি—আপনি দক্ষিণপন্থী হলেও হাসেন কেমন নরম।
🍂
সে হেসে বলল—সব রাইট উইঙ্গার অশুভ হয় না। কেউ কেউ শুধু প্ল্যানচেট করে ইতিহাস নিয়ে।
আমি বলি—আপনার ভাষায় মুক্তি মানে কি?
সে বলল—মুক্তি মানে—তুমি যদি বেঁচে যাও, আমরা সেটাকে বিজয় বলি। তুমি যদি মরে যাও, সেটা আমরা ফ্রিডম অফ ইনফরমেশন বলে চালিয়ে দিই।
আমি বুঝে গেলাম, একমাত্র যে রাষ্ট্র সত্যি, সে হল চটকদার অপারেশন।যেখানে একজন কবিকে বাঁচাতে শেক শ্যাক ব্যাগ লাগে,আর ভালোবাসা মানে ইমিগ্রেশন ফর্মে ভুল করে ‘স্টেটলেস’ লেখা পড়ে থাকা।
আমি মাথা নেড়ে বললাম—এত কিছু আপনি করছেন…মানবিকতার জন্য?
সে একটু থেমে বলল—আসলে… আমি ভারতের লোকও বটে। র-এর ইনফর্মাল এজেন্ট। তোমার মরণে যেমন কদম্বাবাদ হারে আর ডোনাল্ডল্যান্ড জেতে কিন্তু হারে, তেমন বাঁচাতেও একটু ভারত জেতে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি এখন হাইব্রিড মোডে চলে।
আমি হতবাক—তা হলে এখন?
সে বলল—এখানেই তো মজা! আমি তোমাকে হস্তান্তর করব আর একজনের হাতে।
একটি ভাঙা টয়োটা থেকে বেরিয়ে এল একজন চশমাধারী মানুষ, গায়ে হাফ হাতা শার্ট, গলায় ইফতার কমিটির ব্যাজ। হ্যামফিস্ট বলল—এ হচ্ছে কে সি দ্য গ্রেট, ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের ওয়েস্ট এশিয়া সেল থেকে। ও তোমাকে নিয়ে যাবে।
আমি একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে যাব এমন সময় এই কে সি লোকটা বলল—আসলে, আমি পাকিস্তানেরও ইনফর্মাল এজেন্ট। চাকরি একটাই—কিন্তু মনোভাবটা একটু ইনক্লুসিভ, বুঝলেন কিনা?
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে চুপ করে থাকি। সামনে দাঁড়িয়ে দু’জন গোয়েন্দা, দুজনেই ভারতের দাবিদার, দুজনেই নিজের পরের ঠিকানার ব্যাখ্যায় অন্য দেশের নাম বলছে।
হ্যামফিস্ট বলল—এটাই গ্লোবাল সিকিউরিটি। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না, শুধু কনট্র্যাক্ট করে। তুমি কোনও বুদ্ধিজীবি না, তুমি এখন একটা খুব খারাপ ধরণের প্রোটোকল।
আমি বললাম—তবে আমাকে কে নিয়ে যাবে?
দুটো জানোয়ার একসঙ্গে বলল—ওটা আমরা টস করে ঠিক করব।
0 Comments