সাম্যের সার্ভার ডাউন
পর্ব ২.
অরিজিৎ লাহিড়ী
আমাকে যে হাসপাতালটায় রাখা হয়েছে, সেটার নাম ‘শহিদ মুজাহিদ বেমারিস্তানে রওশান’। বাইরে লেবু গাছ আর ভিতরে হিজাবের নিচে বাজে দুর্গন্ধ। আমার নার্সের নাম জিলফি (বা অন্তত আমি ওকে তাই ডাকি)।
জিলফি ইংরেজি বলতে স্বচ্ছন্দ নয়, আমিও ফার্সিপন্ডিত না। কিন্তু ওর চোখে একটা পারমাণবিক লোভ আছে—কোন দেশ জিতবে, সেটা নিয়ে নয়; কে হেরে যাবে, সেটার প্রতি এক অদ্ভুত কামনা।
প্রথম দিন থেকেই সে আমার বুকের শেভিং দেখে হেসেছিল। বলেছিল—শরীর তো পুরুষের, কিন্তু এই বুকে তো গোপন কিছু নেই, কেবল দুটো নিপল — একদম নিষ্পত্তিযোগ্য।
আমি বললাম—আমার কবিতা পড়লে তুমি কেঁপে উঠবে, অরগ্যাজমাল না হলেও এপিস্টেমিক।
সে হেসে বলল—আমার শরীর পড়লে হয়তো তুমিও সুধা খুঁজে পাবে—কিন্তু খেয়াল রেখ, ওটা প্লুটোনিয়াম মেশানো।
আমি কৌতুক করে বললাম—তাহলে তুমি কি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের মত? ঠান্ডা রাখলে নিরাপদ, আর গরম হলে খোরাফতাবাদ উড়ে যায়?
আমি বলি—আমি পরীক্ষামূলক কবি—প্রতিটি চুমু আগে হাইপথিসিস, পরে পিয়ার রিভ্যিউ।
ও ফিসফিস করে বলল—তোমার বুকে যদি তত্ত্ব থাকে, আমার ঠোঁটে তার ভুল প্রমাণ আছে।
আমরা দু’জনেই হেসে উঠি। বাইরে ড্রোন উড়ছে।
রাতে হাসপাতালের জেনারেটর চলে যায়। চারদিকে আঁধার। বাইরে গোলপান্ট্রির ড্রোন হুই হুই করে ঘোরে, আর ভেতরে আমি আর জিলফি সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে এক বিছানায় জড়িয়ে থাকি পরস্পরকে। একে অপরের জাতীয়তা ধরি না, শুধু স্পর্শ করি যেটা রাষ্ট্র জানে না—কোন ভাষায় দেহ আর রাষ্ট্র আলাদা হয়।
সে আমার নাভিতে হাত রেখে বলল—তোমাদের দেশে কি এত কোমল বিপ্লব হয়?
আমি বললাম—আমাদের দেশে প্রথমে চুমু আসে, তারপর আসে প্রতিবাদ।
সে আমার গালে কামড় দিয়ে বলল—আমাদের এখানে প্রথম আসে সন্দেহ, তারপর আসে স্ট্রিপ-সার্চ।
পরদিন আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দেখি আমার ফোন ফিরে এসেছে।
একটা মেসেজ ঝলমল করছে: ইউ হ্যাভ বিন গ্র্যান্টেড টেম্পোরারি ডিজিট্যাল এক্সিস্টেন্স।
মানে, আমি আবার অনলাইন। শুধু মৃত শরীরটাই অফলাইনে পড়ে আছে।
ইনতেশার আমায় ফোন করে । বলে—তুমি কী করেছো? মিডিয়াতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন তুমি গোলপান্ট্রির গুপ্তচর, নার্সকে দিয়ে তথ্য চুরি করাচ্ছো?
আমি বললাম—আমি শুধু শরীর দিয়েছি, তথ্য না।
সে বলল—শরীরই তো এখন ডেটা। প্লেটলেট আর পাসওয়ার্ড এক কথা।
🍂
জিলফিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আমার ঘরে আসে অন্য এক নার্স, মুখ শেয়ালের মুখোশে ঢাকা, চোখে রাষ্ট্রের ভাষা। আমি চুপচাপ তাকিয়ে থাকি।
আমার মাথার ভিতর তখন শুধুই ঘুরছে—কামনা মানে কি রাষ্ট্রদ্রোহ নয়?, ভালোবাসা কি জাতীয়তাবাদে নিষিদ্ধ?, আমি কি সত্যিই মৃত, নাকি পরমাণু-অন্তর্বাস পরে ঘুরে বেড়ানো একপিস্ মূর্তিমান কৌতুক?
আমার শরীর এখন নিষিদ্ধ অঞ্চল। কেউ বলে এটা হাসপাতাল, কেউ বলে হট-জোন।আমি শুধু জানি, আমার ভিতরে এখনো একটা দেশ লুকিয়ে আছে,যেটা নার্সের ঠোঁট ছুঁলে হঠাৎ জেগে ওঠে,আর ইনতেশারের কথায় আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
0 Comments