জ্বলদর্চি

মধুবাবুর আউটিং/কমলিকা ভট্টাচার্য

মধুবাবুর আউটিং
কমলিকা ভট্টাচার্য

মধুবাবু সকালের নরম রোদে বসে এমনভাবে রোদ পোহাচ্ছিলেন, যেন রোদটা তাঁর পেনশনের অংশ। গামছা কাঁধে, চোখ আধবোজা, মুখে এক অদ্ভুত ধ্যানী ভাব। ঠিক তখনই কল্যাণী দেবীর গলা ভেসে এল—
—“কি গো, বাজারে যাবে না?”
মধুবাবু চোখ না খুলেই বললেন,
—“আজ নো বাজার।”
কল্যাণী দেবী একটু থতমত খেলেন।
—“মানে?”
—“আজ আমরা আউটিংয়ে যাব।”
এই কথা শুনে কল্যাণী দেবীর মুখ এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন হঠাৎ রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার আজীবনের জন্য উধাও হয়ে গেছে।
—“তার মানে আজ রান্না নেই?”
—“একদম না। আজ পয়লা জানুয়ারি। বাইরেই খাওয়া-দাওয়া।”
কল্যাণী দেবী আর দেরি করলেন না। সোজা ছেলের ঘরে ঢুকে ডাক দিলেন—
—“ওই বাবু! ওঠ! আজ আউটিং!”
এই বাবুই মধুবাবুর ছেলে। বিদেশে থাকে। ক’দিনের জন্য এসেছে। মনে মনে ঠিক করেছে—বাবা-মাকে ভালো ভালো বিদেশি খাবার খাওয়াবে।
অদ্ভুত ব্যাপার, মধুবাবুর কোনোদিনই সময়ের তাড়া থাকে না। ট্রেন ধরতে হলে বলেন, “পরেরটাও তো আসবে।” কিন্তু আজ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলছেন—
—“এই বাবু, আর কতক্ষণ? খিদে মরে গেলে মুশকিল।”
কারণ একটাই—
আউটিং মানেই খাওয়া।
গাড়ি বেরোনোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নির্দেশ এল—
—“এই একটু থাম। ডাবের জল না খেলে পেটটা খোলে না।”
ডাব শেষ। ফের নির্দেশ—
—“এবার একটু চা হলে মন্দ হয় না।”
একটি ফেমাস বেকারি শপে ঢুকে চা এল। সঙ্গে ব্লুবেরি মাফিন, চকোলেট কুকিজ, ওটমিল বিস্কুট।
বাবু চোখ বড় বড় করে বলল,
—“বাবা, তোমরা তো চা খাও চিনি ছাড়া। এগুলো কী?”
মধুবাবু গম্ভীর মুখে বললেন,
—“দেখ বাবা, আমি চিনি খাই না। কিন্তু খাবারের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।”
এরপর বড় ঘোষণা—
—“আজ আমি কন্টিনেন্টাল খাব। একদম লো অয়েল, লো স্পাইস।”
কল্যাণী দেবী মনে মনে বললেন— এই সংলাপটা আমি বিয়ের পর থেকে শুনছি, কিন্তু ফলাফল কোনোদিন দেখিনি।
ছেলে সোজা গাড়ি ঢোকাল এক নামী কন্টিনেন্টাল রেস্টুরেন্টে। মেনু কার্ড হাতে পেয়েই মধুবাবু বললেন,
—“আমি একটু ঘুরে দেখে আসছি।”
কল্যাণী দেবী আতঙ্কিত—
—“ঘুরে কী দেখতে যাবে? বসেই অর্ডার করো।”
—“মেনুতে লেখা আর প্লেটে দেখা এক জিনিস নয়,” এই বলে মধুবাবু উধাও।
বাবু ফিসফিস করে বলল,
—“মা, বাবাকে সামলাও। না হলে এবার কিচেনে ঢুকে শেফকে বাঙালি মাছের ঝোল শেখাবে।”
কিছুক্ষণ পর মধুবাবু ফিরলেন, সঙ্গে এক বাঙালি ওয়েট্রেস।
—“আমি ঠিক করে ফেলেছি,” গম্ভীর গলায় বললেন।
“ওই তিন নম্বর টেবিলের লোকটা যে গ্রিল্ড সালমন উইথ লেমন বাটার সস খাচ্ছে, সেটাই। আর সাত নম্বর টেবিলের চিকেন ব্রেস্ট উইথ ম্যাশড পটেটো অ্যান্ড হার্ব সস। আর ওই পাশের টেবিলের গার্লিক ব্রেড উইথ অলিভ সস প্রন।”

কল্যাণী দেবী চমকে উঠলেন।
—“এত কিছু! দাম জানো?”
বাবু হেসে বলল,
—“মা, বাবার মতো দাম দেখে প্রেসার বাড়িও না।”
তোমার জন্য কি অডার করব বল,চিকেন পিকাতা নাকি ফিশ এন্ড চিপ"
কল্যাণীদেবী বললেন," না না ওসব পিকাতা টিকাতা দরকার নেই ফিশ এন্ড চিপ কর। তুই কি খাবি?"
বাবু বলল বলে দিচ্ছি। তার পর নিজের জন্য পেনে আলফ্রেডো আর বাকি খাবার অর্ডার করে দিল।"

🍂

অর্ডার হয়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ মধুবাবুর চোখ পড়ল মেনু কার্ডে।
দাম দেখে তাঁর চোখ এমন বড় হলো, যেন দুটো ফুল ডেজার্ট প্লেট।
—“ওফ… শরীরটা কেমন যেন… মাথা ঘুরছে…”
হাত বুকে দিয়ে অভিনয় শুরু।
ওয়েটার ছুটে এল।
—“এনি প্রবলেম স্যার?”
মধুবাবু বললেন," অর্ডার ক্যান্সেল করা যাবে কি,? শরীরটা খারাপ লাগছে এত খাওয়া যাবে না।"
বাবু তাড়াতাড়ি বলল,
—“নো নো। উনি খুব হাংরি। আপনি তাড়াতাড়ি খাবারটা সার্ভ করার জন্য দেখুন ”
তারপর হাসতে হাসতে নীচু গলায় মাকে বলল,
—“খালি পেটে বিদেশি খাবারের নাম আর দাম শুনেই বাবা এরকম করছে।”
কল্যাণী দেবী বললেন,"যা বলেছিস,এদিকে খাবার শখ  ষোলো আনা।
বাবু
—একটা ছবি তোল দেখি এত বড় হোটেল ,কত সাজানো।”

খাবার এল। সিজলিং প্লেট, ধোঁয়া উঠছে। ছবি তোলার আগেই পাঁচ মিনিটে প্লেট সাফ।
মধুবাবু হাত ধুতে গিয়ে ফিরে এসে দেখেন অন্য একটি ওয়েট্রেস মেয়ে ডেজার্ট হাতে দাঁড়িয়ে।
মধুবাবু অদ্ভুত চিৎকার করে বললেন,
—“এটা কে অর্ডার করেছে?”
—“আমাদের চাই না। সবাই ডায়াবেটিক!”
মেয়েটি ঘাবড়ে গেল। ঠিক তখনই বাঙালি ওয়েট্রেস মেয়েটি এসে বলল,
—“স্যার, টুডে নিউ ইয়ার। চকলেট লাভা কেক উইথ ভ্যানিলা আইসক্রিম—কমপ্লিমেন্টারি।”
মধুবাবু একবার ছেলের দিকে, তারপর কল্যাণী দেবীর দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বললেন,
—“বছরের প্রথম দিন… একটু মিষ্টি তো চলতেই পারে। রাখো, রেখে যাও ,চেখে দেখি।”
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে কল্যাণী দেবী আফসোস করে বললেন,
—“একটা ছবিও তোলা হলো না!”
বাবু হেসে বলল,
—“তোমরা খাবার আসার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাকিউম ক্লিনারের মতো টেনে নিলে—শট নেবার টাইম টুকুও তো দিলে না!”
মধুবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, 
—“খাবারের ছবি তোলা উচিত নয়। অন্য কেউ দেখে নজর দিতে পারে। আগে খাও, পরে না হলে ইতিহাস।”
বাবু হাসতে হাসতে বলল,
—“বাবা, এমনও তো হতে পারে—তোমার প্লেট দেখে তোমার মতো আরেকজন অর্ডার দেবে।”
কল্যাণী দেবী মজা করে বললেন,
—“সবার পেট ঠিক থাকলেই হলো।”
মধুবাবু গম্ভীর মুখে যোগ করলেন,
—“বাবু, বাড়ি ঢোকার আগে ওষুধের দোকানে দাঁড়াস। একটা ঝান্ডু পঞ্চারিস্ট কিনতে হবে।”
—“কেন? খাবারটা ভালো ছিল না?” বাবু অবাক হয়ে বলল।
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন,
—“গাঁদাল পাতার ঝোল খাওয়া দেশি পেটে কি বিদেশি খাবার হজম হয়?”

Post a Comment

4 Comments

  1. দারুণ লাগল

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যJanuary 12, 2026

      🙏

      Delete
  2. একেই বলে আউটিং খাউটিং

    ReplyDelete
  3. কমলিকা ভট্টাচার্যJanuary 12, 2026

    তারপর ব্লোটিং 😂

    ReplyDelete