আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী
(নতুন লেখকের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে বইমেলা)
বড়ো হয়েছি আশির দশকে, মফস্বলের শহর মেদিনীপুরে। বাবা মাষ্টামশাই ছিলেন বলেই বাড়িতে বইয়ের সংগ্রহ ছিল অগাধ,পড়ার স্বাধীনতাও অবাধ। তখনকার মধ্যবিত্ত অধিকাংশ বাড়িতেই যেমনটি থাকতো।
তবে স্বীকার করতে লজ্জা নেই,বইমেলা বিষয়টির সঙ্গে তেমন পরিচিত ছিলাম না।
ঐ খবরের কাগজে পড়তাম, বিভিন্ন প্রকাশনীর বিজ্ঞাপন দেখতাম, অনেক ভীড়, অনেক বই, সেলিব্রিটি মানুষ জনেদের সমাগম…ব্যাস;ঐ পর্যন্তই।
মফস্বল থেকে কলকাতা অনেক দূর, যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা -এসব কারণ তো ছিলই, তারসঙ্গে মানসিক গোলযোগও কিছু ছিল।তবু কখনও কখনও স্বপ্ন দেখতাম,কোন একদিন নিশ্চয়ই যাবো,অনেক বড়ো মাঠ, চারিদিকে নানানিধি বইপত্র,সব দেখবো,ঘুরবো, আমার সামান্য লেখালেখি অন্যকে পড়াবো,অন্যের লেখা পড়বো,মঁমার্তের আশেপাশে আনমনে এঁকে যাওয়া শিল্পীর আমারই মুগ্ধ চোখের সামনে সৃষ্টি হওয়া চিত্রটির দিকে তাকিয়ে থাকবো,আলাপ হবে স্বপ্নের লেখকদের সঙ্গে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
সম্ভবতঃ তখন মেলা বসতো ময়দানে।বইয়ের দোকানের পাশেই এলোমেলো থাকতো খাওয়ার স্টল,খোলা উনুন, পলিথিন শীট দিয়ে তৈরি অস্থায়ী বিপনীর বিকিকিনি; যার ভয়ঙ্কর পরিনতিতে ১৯৯৭ সালে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় মেলা,যদিও তার কয়েকদিন পরেই আবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছিল সে তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আন্তরিক উদ্যোগে। রূপকথার মতো সেই গল্পের ঢেউ খবরের কাগজ ও দূরদর্শনের মাধ্যমে এতো জনপ্রিয় হয়েছিল,যে বইমেলায় আসার ইচ্ছেখানি আমাদের মতো আরও অনেকের মনেই নববর্ষা সিঞ্চনে অঙ্কুরিত লতার মতো পল্লবিত হয়ে ওঠে বহুগুণে।
এবং আন্তরিক ইচ্ছে হলে তার উপায় অবশ্যই হয়,আমাদেরও বইমেলায় যাওয়া শুরু হয়। সেদিনের স্বল্পপুঁজি কলেজছাত্রীর ব্যাগ ধীরে ধীরে ভরে ওঠে ভবিষ্যতের পরিনত শিক্ষিকার রুজির ভারে,বইয়ের সারস্বত সাহচর্যে।
🍂
ক্রমে দিন যায়,সময়কালও। পায়ে পায়ে ঘুরতে ঘুরতে পাঠিকা থেকে লেখিকা হয়ে উঠে সে, লিট্ল ম্যাগাজিনের পাতা থেকে একক সংকলনের দিকে এগোয় লেখনী।বইমেলাও ময়দান থেকে বিধাননগরের সেন্ট্রাল পার্কের সুসজ্জিত অবস্থানে এসে ডানা মেলে,পঞ্চাশের দোরগোড়ায় (উনপঞ্চাশতম) পৌঁছে, আপন যোগ্যতায় আজকের বিশ্বের অন্যতম ঋদ্ধ ও বৃহৎ বইমেলায় উন্নীত হয়েছে।
ভাবতে অবাক লাগে,স্বদেশী আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষা ও বইয়ের প্রসারের জন্য স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে শুরু হওয়া ১৯১৮ সালে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন (NCE) আয়োজিত,কলেজ স্ট্রিটের প্রথম বই প্রদর্শনী,
পরবর্তীতে ৫ থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৯৭৬ সালের সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালের বিপরীতে মহাকরণ উদ্যান(মহাকুঞ্জ উদ্যান)-পথ পেরিয়ে, আজকের পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সুচারু পরিচালনায় ১৯৮৪ সালের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্ররুপে বারো মাসে তেরো পার্বণী বাঙালীর 'চতুর্দশ পার্বণ' হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছে।
ছোট্ট থেকে স্কুল ম্যাগাজিনের নিয়মিত লেখিকাটিও আজ মেদিনীপুরের দেশ বলে খ্যাত জ্বলদর্চির পাতায় লিখতে লিখতে কলকাতার আরও অনেক সংস্থায় লিখতে শুরু করেছে।দেশ-বিদেশের পাঠকের পছন্দসই হয়ে ওঠেছে তার লেখা, স্বপ্নমুকুলে জল সার পড়ছে নিয়মিত,মনে মনে আকাঙ্খা;একক কাব্যসঙ্কলনের।
ইতিমধ্যে লেখালেখির সুত্রেই যোগাযোগ হয়েছে কলকাতার অগ্রণী সংস্থা পালক পাবলিকেশন্স-এর সঙ্গে,গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে বারোটি গল্পের সমাহারে,হৃদয়ে দূরগামী।
গ্রন্থটি মূলতঃ প্রেমের গল্পের হলেও মানবমনের বিভিন্ন চোরাবালি, নুড়িপাথর ছুঁয়ে যেতে যেতে সে পাঠক তৃপ্তি পেয়েছে বলেই অনেকে জানিয়েছেন।এবারেও পালকের স্টলে বইটির সগর্ব উপস্থিতি লেখিকার আত্মসন্তষ্টির কারণ হয়েছে।
তবে তার চাইতেও বেশি পাওয়া, এটুকুই যে বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে কোন অচেনা তরুণ যখন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
-’ম্যাম, আপনিই আবীর ভট্টাচার্য্য? আপনার কবিতা পড়ি,ভালো লাগে।’
এই পঞ্চাশোর্ধ্ব মনেও নওলকিশোরীর লজ্জা এসে জমা হয়,সসঙ্কোচে জানতে চাই,
-’কবিতা ভালোবাসো?পড়েছ?’
সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাই আমার নতুন কাব্যগ্রন্থটির সঙ্গে পরিচয় করাতে ডট.অন্বেষার স্টলে।বইটি হাতে দিয়ে জানতে চাই,
-’আমার কবিতা কেন ভালো লাগে?’
-’শব্দচয়ন…’
সত্যি বলছি,মনে মনে হাজার রোশনাই,বাইরের উজ্জ্বল বাতিগুলোকেও যেন ম্লান করে দিচ্ছিল,হাজার করতালির উচ্ছলতা যেন সেই মৃদুল শব্দ বিভঙ্গে আমার কবিসত্তাকে অভ্যর্থনা করেছিল…
সে মুহুর্তে আমি বুঝেছিলাম, বইমেলা কি এবং কেন? বহুদূর থেকে এই গ্লোবাল মার্কেটিং-এর আরাম ছেড়ে আজও লক্ষাধিক মানুষ কেন হেঁটে বেড়ায় এই ধুলোর সাম্রাজ্যে,কেন খোঁজে তার প্রাণের আয়ুশ আগামী যুদ্ধের জন্য…
সত্যিই,বই তো আমাদের প্রাত্যহিক একঘেয়েমির মুক্তি নির্দেশ, শ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই স্বতঃস্ফূর্ত জীবনবোধ,প্রেমে, বিরহে,বিষাদে,ক্ষয়ে,প্রাপ্তিতে যা উত্তরণের তৃপ্তিতে আমাদের পূর্ণ করে, অমরত্বকে তুচ্ছ মনে করার সাহস দেয়।
বিশেষতঃ এই ফেসবুকীয় মিথ্যা মোহের বাইরে যে নিবিষ্ট পাঠক ফুল কেনার মতো আবেগ তীব্রতায় লিটল ম্যাগাজিনের স্টলে জড়ো হয়,কবিতার বই কেনে, আমার স্বপ্নসম্ভব পদ্যসন্তানটিকে তার হাতে দিতে বড়ো সাধ হয়,বলতে ইচ্ছে করে,
-’এই নাও।তুলে দিই জীবনায়ুধ, সমস্ত বৈরিতা জয়ে এই তোর অমৃত সনদ।’
“পাহাড়ের অনুবাদ ঢালে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার ওপারে
অলীক সুখের মতো মহানভ হাওয়া ডেকে আনে
দূরাগত আলো ছোঁয় পাইনের বন
কারুবাকী মোহন আঙ্গিকে।
সেও কি কবিতা নয় কোনো!
সৃষ্টি হাঁটে পায়ে পায়ে,ধানী রঙে রোদটি রাঙানো।
ক্ষুধার অধিক চাওয়া, কিছু নাকি আছে পৃথিবীতে!
হাতে হাত ছুঁয়ে থাকা সহজিয়া অভ্যাস আয়ুশ
শুশ্রূষার চেয়ে বড় কাব্য কোনদিন লেখেনি মানুষ।”
1 Comments
বইমেলার অভিজ্ঞতা খুব ভালো লাগলো।সাথে নতুন বইয়ের জন্য অনেক অভিনন্দন।
ReplyDelete