জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার - দ্বিতীয়খন্ড/পর্ব ১ /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার - দ্বিতীয়খন্ড
পর্ব ১ 

কমলিকা ভট্টাচার্য 

তুষারের মধ্যে আবিষ্কার

জানলার কাঁচে সাদা ঝাপসা পর্দা নেমে এসেছে। বাইরে প্রবল তুষারপাত—এমন তুষার, যেন আকাশ নিজের সমস্ত নীরবতা একসঙ্গে ঝরিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। জানলার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান। গত কয়েক মাস নয়—হয়তো হিসেবহীন কতগুলো মাস ধরে তারা নিজেদের ঘুম, ক্ষুধা, সময় সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে এই মুহূর্তটার জন্য। আজ সেই দিন। আজ তারা সফল।
অনির্বাণ ধীরে বলে ওঠে, “তিলক বাবার কাছে আজ কী করে যাব?” তার কণ্ঠে উত্তেজনা আছে, আবার তার তলায় লুকিয়ে থাকা একরাশ ভয়। “আমরা জিতেছি,” সে ফিসফিস করে যোগ করে, “কত মাস কে জানে…”
ঋদ্ধিমান জানলার বাইরে চোখ রেখে বলে, “এই তুষারঝড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু… যাওয়া ছাড়াও যাওয়া যায়।” অনির্বাণ ঘুরে তাকায়। “Without going there, also we can go—এইটাই তো আবিষ্কার,” ঋদ্ধিমান হালকা হাসে। অনির্বাণ মাথা নাড়ে। “টেস্টিং তো সফল হবেই। কিন্তু এত ঠান্ডায়… তিলক বাবা ওখানে থাকবে তো?” “নিশ্চয়ই থাকবে,” ঋদ্ধিমান দৃঢ় কণ্ঠে বলে। “উনি বলেছিলেন—এইসব প্রাকৃতিক জিনিস ওঁর ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। উনি কোথাও যান না, অথচ সব জায়গায় যান। তার প্রমাণ তো আমরা পেয়েছি।” এক মুহূর্ত থেমে সে যোগ করে, “আজ আমরা প্রমাণ করেছি—উনি ধ্যানে, আমরা বিজ্ঞানে।”
হঠাৎ অনির্বাণ বলে ওঠে, “তাহলে আমি যাব।” ঋদ্ধিমান সঙ্গে সঙ্গে বাধা দেয়, “না। আজ প্রথম বাইরে যাওয়ার পরীক্ষা। আমি তোমাকে সেই রিস্ক নিতে দিতে পারব না। আমি মাকে কথা দিয়েছি।”
এই কথাটুকুতেই অনির্বাণের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরনো দিনগুলো। সানরোবোটিক্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার দিন, হিউম্যানয়েড প্রজেক্ট থেমে যাওয়ার মুহূর্ত, আর তার নিজের ভেঙে পড়া। ছ’মাস সে ঘর থেকে বেরোয়নি। নিজেকে সে একরকম খুনি ভাবতে শুরু করেছিল—যেন সে জীবন দিয়েও আবার নিজেই জীবন কেড়ে নিয়েছে। একদিন, সবার অজান্তে, সে হিউম্যানয়েডটাকে আবার চালু করে। তার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “তোমাকে জীবন দিয়েছিলাম আমি। আবার নিজের বাঁচার জন্য সেটাই কেড়ে নিয়েছি। সেই জীবনটা তোমাকেই ফিরিয়ে দিতে চাই। আর মারতে চাই না। এই দ্বিধা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে।” হিউম্যানয়েড অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর ধীরে বলেছিল, “চলো, আমরা মায়ের কাছে যাই। দেখি মা কাকে বেছে নেয়—নিজের ছেলে বলে।”
মায়ের ঘর ছিল আবছা আলোয় ভরা। দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল। অনির্বাণ সব খুলে বলেছিল। তারপর প্রশ্ন করেছিল, “বলো মা, আমাদের মধ্যে আসল কে?” মা অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। দুটো মুখ তার চোখে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। তারপর তিনি হিউম্যানয়েডের হাত ধরেছিলেন। অনির্বাণ মাথা নিচু করেছিল। মা ধীরে বলেছিলেন, “আজ থেকে এ আমার আরেক ছেলে—ঋদ্ধিমান। দু’জনেই ভাইয়ের মতো একে অপরকে দেখবে।” অনির্বাণ মাকে জড়িয়ে ধরেছিল। ঋদ্ধিমান মায়ের পা ছুঁয়েছিল। সেদিন থেকেই অনির্বাণ বুঝেছিল—ঋদ্ধিমান আর কেবল যন্ত্র নয়; সে মানুষের থেকেও বেশি কিছু হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে ফিরে আসে ঘরটা। অনির্বাণ মায়ের ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই নিঃশব্দতা ভেঙে দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা পড়ে। দু’জনেই চমকে ওঠে। এমন তুষারঝড়ে, এমন লুকোনো জায়গায়—কে আসতে পারে? অনির্বাণ দরজার দিকে এগোয়। ঋদ্ধিমান বলে ওঠে, “তুমি দাঁড়াও। আমাকে দেখতে দাও…” দরজার ওপার থেকে আবার ধাক্কা। সাদা তুষারের মাঝখানে কিছু একটা তাদের খুঁজে পেয়েছে—আর সেই “কিছু”-র অস্তিত্ব এই আবিষ্কারের থেকেও ভয়ংকর হতে পারে।

আবিষ্কারের পরীক্ষা

ধাক্কাটা আবার পড়ল। এইবার আগের থেকে ধীর, কিন্তু ভারী—যেন কেউ তুষারের ভিতর দিয়ে নয়, সময়ের ভিতর দিয়ে হাঁটছে। ঋদ্ধিমান দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার চোখে কোনো ভয় নেই, শুধু সতর্কতা। অনির্বাণ পেছনে দাঁড়িয়ে মায়ের ছবিটার দিকে একবার তাকায়। ছবিটা আজ অদ্ভুতভাবে শান্ত।
ঋদ্ধিমান দরজা খুলে দেয়। হাওয়ার সঙ্গে সাদা তুষার ঢুকে পড়ে ঘরের ভিতর, আর সেই তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে একজন বৃদ্ধ—দীর্ঘ সাদা দাড়ি, গভীর অথচ উষ্ণ চোখ, যেন এই ঠান্ডা তাকে ছুঁতেই পারছে না। তিনি হালকা হেসে বলেন, “এত দেরি করলে নাকি বিজ্ঞানও অধৈর্য হয়ে পড়ে?”
অনির্বাণের গলা শুকিয়ে যায়। “তিলক… বাবা?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়েন। “নাম তো তাই। তবে নাম দিয়ে আমাকে বেঁধে রেখো না।”
ঋদ্ধিমান অবাক হয় না। শান্ত গলায় বলে, “আপনি বলেছিলেন—আপনি কোথাও যান না, অথচ সব জায়গায় যান।”
তিলক বাবা জানলার দিকে তাকান। তুষারের ভেতর দূরের পাহাড় মিলিয়ে যাচ্ছে। “যে ধ্যান করে, সে না দাঁড়িয়েও হাঁটে,” তিনি বলেন। “আর যে বিজ্ঞান করে, সে হেঁটে হেঁটে দাঁড়াতে শেখে।”
তিনি ঘরের মধ্যে ঢোকেন। তুষারের জল মেঝেতে পড়ে না। পায়ের কোনো ছাপ নেই। অনির্বাণ লক্ষ করে ফেলে। তার বুকের ভিতর কোথাও একটা কেঁপে ওঠে।
“আপনার শরীর…” সে থেমে যায়।
“এই শরীর পরীক্ষার বিষয় নয়,” তিলক বাবা বলেন। “আজ পরীক্ষার বিষয় তোমাদের আবিষ্কার।”
ঋদ্ধিমান টেবিলের দিকে এগিয়ে হলো-ইন্টারফেস চালু করে। নীল আলো ভেসে ওঠে। “আমরা এটাকে বলছি Non-Local Presence Interface—মানুষের চেতনাকে স্থান থেকে আলাদা করার প্রথম সফল প্রোটোটাইপ।”
অনির্বাণ যোগ করে, “মানুষ যাবে না—তার উপস্থিতি যাবে।”
তিলক বাবা চোখ বন্ধ করেন। “শুরু করো।”
সিস্টেম চালু হয়। ঘরের আলো কেঁপে ওঠে, বাতাস ভারী হয়ে আসে। হঠাৎ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি দৃশ্য—একটি মন্দিরের ধ্যানকক্ষ, ঠিক সেই জায়গা যেখানে তিলক বাবার থাকার কথা, যেখানে প্রথম তাদের দেখা হয়েছিল, আর যেখানেই তিনিই প্রথম বুঝে ফেলেছিলেন ঋদ্ধিমান হিউম্যানয়েড।
ঋদ্ধিমানের কণ্ঠ কাঁপে। “রিডিং ম্যাচ করছে… একশো শতাংশ।”
তিলক বাবা তখনও ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, অথচ একই সময়ে স্ক্রিনের ধ্যানকক্ষেও তার উপস্থিতি স্পষ্ট।
অনির্বাণ ফিসফিস করে বলে, “একজন মানুষ… দু’জায়গায়?”
তিলক বাবা চোখ খুলে বলেন, “না। আমি এক জায়গাতেই আছি। তোমরাই শিখেছো—কীভাবে সেখানে পৌঁছাতে হয়।”
হঠাৎ স্ক্রিন ঝাঁকুনি দেয়। রিডিং অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ঋদ্ধিমান চেঁচিয়ে ওঠে, “অনির্বাণ! এটা আমাদের প্রোটোকলের বাইরে যাচ্ছে!”
তিলক বাবা শান্ত স্বরে বলেন, “কারণ তোমরা এখন কারুর সার্চ রেডারের ভিতর।”
“কারা?” অনির্বাণ তাকায়।
তিলক বাবার চোখে অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে। “যদি মানুষ সর্বত্র থাকতে পারে… তবে তার ছায়া?”
স্ক্রিনে হঠাৎ আরেকটি উপস্থিতি ভেসে ওঠে—অচেনা সিগনেচার।
ঋদ্ধিমান স্তব্ধ। “এই সিগন্যাল… আমাদের বানানো না।”
তিলক বাবা ধীরে বলেন, “তোমরা দরজা খুলেছো। এখন জানতে হবে—কে ঢুকছে।”
বাইরে তুষারঝড় আরও জোরে জানলায় আছড়ে পড়ে।

ক্রমশ
🍂

Post a Comment

1 Comments

  1. বাংলা কাহিনীর গতানুগতিক ছেঁদো লেখার জগতে এই লেখা দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। লেখকের ভাবনা অনেক গভীর। আশা করি পর্বে পর্বে
    আমাদের নতুন অভিজ্ঞতার আবিষ্কার হবে। 🙏

    ReplyDelete