জ্বলদর্চি

উপকূলরক্ষী দিবস /দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

উপকূলরক্ষী দিবস 

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১লা ফেব্রুয়ারি, উপকূলরক্ষী দিবস। উপকূল রক্ষী কি, দেশের জন্য এর গুরুত্ব কতটা এবং তাৎপর্যই বা কি, আসুন এই সবকিছুই জেনে নিই বিস্তারিতভাবে।

উপকূলরক্ষী বা কোস্ট গার্ড হলো, একটি দেশের সামুদ্রিক আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা বাহিনী, যা মূলত উপকূলীয় অঞ্চল, আঞ্চলিক জলসীমা এবং একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে  টহল দেয়, চোরাচালান রোধ করে, সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি সাধারণত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে কাজ করে। 

ভারত একটি দীর্ঘ উপকূলরেখা-বিশিষ্ট দেশ। প্রায় ৭,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল, অসংখ্য বন্দর, দ্বীপপুঞ্জ ও সামুদ্রিক সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষা করা একটি বিশাল দায়িত্ব। এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যাঁরা নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে পালন করে চলেছেন, তাঁরা হলেন ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী (Indian Coast Guard)। এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ও অবদানের স্মরণে প্রতি বছর ১লা ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ভারতের উপকূলরক্ষী দিবস।
🍂

ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১লা ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ সালে। এর আগে ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা মূলত নৌবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, সামুদ্রিক সন্ত্রাসবাদ, জলদস্যুতা এবং পরিবেশগত বিপদের মতো সমস্যাগুলি বেড়ে যায়। এই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি পৃথক, দক্ষ ও আধুনিক বাহিনীর প্রয়োজন অনুভূত হয়। সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী।
এই ঐতিহাসিক দিনটির স্মরণে প্রতিবছর ১লা ফেব্রুয়ারি উপকূলরক্ষী দিবস হিসেবে পালন করা হয়, যাতে বাহিনীর সাহসিকতা, ত্যাগ ও সেবার প্রতি জাতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে।

ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী একটি বহুমুখী দায়িত্বপূর্ণ সংস্থা। এর প্রধান কাজগুলির মধ্যে রয়েছে,
সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা,
ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চল ও সমুদ্রসীমায় অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা উপকূলরক্ষীদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
চোরাচালান ও অবৈধ ব্যবসা দমন,মাদক, অস্ত্র, সোনা ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রীর চোরাচালান রোধে উপকূলরক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশ ও সন্ত্রাসবাদ রুখতে উপকূলরক্ষী বাহিনী সর্বদা সতর্ক থাকে। অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান (Search and Rescue) সমুদ্রে দুর্ঘটনাগ্রস্ত জাহাজ, নাবিক বা মৎস্যজীবীদের উদ্ধার করা এই বাহিনীর মানবিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তেল দূষণ, রাসায়নিক দূষণ ইত্যাদি প্রতিরোধ করে সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় উপকূলরক্ষীরা কাজ করে।
মৎস্যজীবীদের সুরক্ষা
উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী লক্ষ, লক্ষ মৎস্যজীবীর জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত রাখতে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভারতের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে উপকূলরক্ষী দিবস নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয়। এই দিন
প্যারেড ও সামরিক প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়,
উদ্ধার অভিযানের মহড়া প্রদর্শন করা হয়,
সাহসিকতা ও উৎকৃষ্ট সেবার জন্য উপকূলরক্ষী সদস্যদের পুরস্কৃত করা হয়। স্কুল, কলেজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হয়। এই সব কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণ উপকূলরক্ষী বাহিনীর কাজ ও ত্যাগ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও উপকূলরক্ষী বাহিনী
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী আধুনিক জাহাজ, হেলিকপ্টার, বিমান, রাডার ব্যবস্থা এবং উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর ফলে তারা দ্রুত ও কার্যকরভাবে যেকোনো বিপদের মোকাবিলা করতে সক্ষম হচ্ছে।

উপকূলরক্ষী বাহিনী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে তারা দেশের সামুদ্রিক সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখে। ২৬/১১ মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার পর উপকূলীয় নিরাপত্তা আরও জোরদার হয়েছে, যেখানে উপকূলরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঝড়, গভীর সমুদ্র, প্রতিকূল আবহাওয়া—সব কিছুর মধ্যেই উপকূলরক্ষীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে অন্যের জীবন বাঁচান। অনেক সময় তাঁরা পরিবার থেকে দূরে থেকে কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ সেবা ও আত্মত্যাগ সত্যিই প্রশংসনীয়। ভারতের উপকূলরক্ষী দিবস শুধুমাত্র একটি স্মরণীয় দিন নয়, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সব বীর মানুষদের কথা, যাঁরা নিরবে, নিঃশব্দে দেশের সামুদ্রিক সীমানা রক্ষা করে চলেছেন। তাঁদের সাহস, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। এই দিনে আমাদের উচিত তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় তাঁদের অবদানকে সম্মান করা।
ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী সত্যিই “We Protect” এই মূলমন্ত্রকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

Post a Comment

0 Comments