জ্বলদর্চি

আসছে গোপাল, যাচ্ছে গোপাল/কমলিকা ভট্টাচার্য


আসছে গোপাল, যাচ্ছে গোপাল

কমলিকা ভট্টাচার্য


গোপাল একরকম বেকার বললেই চলে। কাজকর্ম তেমন কিছু নেই, ফলে বিয়েটাও হচ্ছিল না। তখন তার এক পিসি বলল,
“চল, আমি যাব তোর সম্বন্ধ করতে। তুই চুপচাপ বসে থাকবি, বাকিটা আমি সামলাব।”
মেয়ের বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন এল,
— “পাত্র কী করে?”
পিসি গম্ভীর মুখে বলল,
— “ভাতাশ্রী আছে, ভাতের অভাব হবে না।”
সবাই চমকে উঠল, “মানে?”
পিসি নির্বিকার—
— “মানে কিছু না। আপনার মেয়ের তো কন্যাশ্রী আছে, কদিনেই আমাদের ঘর লক্ষ্মী ভাণ্ডার হয়ে যাবে!”
মেয়ের বাড়ির লোক আরও অবাক। পিসি তখন ব্যাখ্যা দিল,
— “ভাতাশ্রী মানে আমার ভাই এখনও বেঁচে আছেন। আর আপনার কন্যার কী শ্রী— সে তো ক’দিনেই আমাদের ঘরের লক্ষ্মী হয়ে ভাণ্ডার সামলাবে!”
সবাই হাঁফ ছেড়ে বলল, “ওই তাই বলুন!”
শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভালো, বিয়েটাও হয়ে গেল।
বউ সত্যিই লক্ষ্মীমন্ত। তার ভাণ্ডারের জোরেই সংসার চলে। ভাতাশ্রী এখন প্রায় অকেজো— বেঁচে আছেন কাগজে-কলমে। বড়লোক বাড়ির মেয়ে, তাই রোজ নতুন নতুন আবদার।
কদিন ধরে একটাই বায়না—
“কাতলা মাছের কালিয়া খেতে ইচ্ছে করছে।”
সকালবেলায় গোপাল বাজারে গেল। আজ মাছ না নিয়ে ফিরলে সর্বনাশ।
বাজারে গিয়ে গোপালের আক্কেল গুড়ুম! সারা বাজারে রুই-কাতলা কিছুই নেই। যাকেই জিজ্ঞেস করে, সেই এক কথা—
“ভোট না মেটা পর্যন্ত মাছ পাবেন না!”
গোপাল কিছুতেই কুলকিনারা করতে পারে না— মাছের সঙ্গে ভোটের আবার কী সম্পর্ক!
একজন দোকানদারকে ডেকে বলল,
— “কী ব্যাপার বল তো, মাছগুলো গেল কোথায়?”
দোকানদার হেসে বলল,
— “ভোটের প্রচারে।”
— “মানে?”
— “মানে-টানে কিছু নয়। লাখ টাকা দিলেও পাবেন না। তবে পেতে পারেন— ভোট দিলে।”
গোপালের চোখ কপালে— “ভোট দিলে মাছ!”
— “হ্যাঁ। যে কোনো পার্টি অফিসে গিয়ে নাম লিখিয়ে দিন। প্রচার শেষে মাছের নিলামে নাম উঠলে, বিনা পয়সায় একটা মাছ পাবেন। শর্ত একটাই— একটি মাছ, একটি ভোট!”
বউয়ের মুখঝামটা মনে পড়তেই গোপাল সোজা পার্টি অফিসে।
🍂
সেখানে গিয়ে দেখে লম্বা লাইন। মাছের জন্য ফর্ম ফিল-আপ চলছে। যেন মাছ নয়, চাকরির ইন্টারভিউ।
ফর্মে কী কী চাই! আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, দুই কপি ছবি, বিদ্যুৎ বিল, জন্ম সনদ, এমনকি বাবার নামের বানান মিলিয়ে দেখার জন্য আলাদা হলফনামা!
ক্লার্ক কাগজ উলটে-পালটে বলল,
— “বাবার নাম আধারে ‘দীননাথ’, আর ভোটার কার্ডে ‘দিননাথ’। দুটোর আলাদা মানে। কেস পেন্ডিং।”
গোপাল কাকুতি-মিনতি করে বলল,
— “মাছটা আগে দিন, নাম পরে ঠিক করি?”
ক্লার্ক কটমট করে তাকাল।
প্রতিদিন গোপাল যায়। নতুন নতুন কাগজ জমা দেয়। কখনও বলে সিগনেচার মিলছে না, কখনও বলে ছবি ঝাপসা, কখনও বলে ভেরিফিকেশন হবে।
বাজারের লোকেরা এখন তাকে দেখলেই বলে,
— “মাছের ফাইল এগোল?”
— “আজ বুঝি নোটিশ আসবে?”
বউ রোজ জিজ্ঞেস করে, “মাছ?”
গোপাল গম্ভীর মুখে বলে, “প্রচার শেষ হলেই আসছে…”
এভাবে দিন যায়। গোপাল শুধু পার্টি অফিস থেকে বাড়ি, আর বাড়ি থেকে পার্টি অফিস হাঁটা-হাঁটি করে। মাছ আর মেলে না।
একদিন খবর এল— আজ মাছ দেওয়া হবে।
গোপাল দৌড়ে গেল। একটা বড় টেবিলের ওপর কয়েকটা মাছ রাখা। কাছে যেতেই নাকে এল তীব্র গন্ধ।
ক্লার্ক বলল,
— “নিন, আপনার প্রাপ্য। একটি মাছ, একটি ভোট।”
গোপাল তাকিয়ে দেখে— মাছটা পচা!
সে কুঁকড়ে গিয়ে বলল, “এত পচা মাছ?”
ভিতর থেকে পার্টির এক দাদা বেরিয়ে বলল,
— “ওটা ভোটের মাছ… ফ্রিতে এর থেকে ভালো মেলে না! সকাল সকাল বউকে নিয়ে ভোটটা দিয়ে আসিস। ভোটে জিতলে একেবারে জ্যান্ত কাতলা নিয়ে যাস।”
গোপাল সেই পচা মাছ নিয়েই বাড়ি ফিরল।
ভোট হয়ে ফলাফল ঘোষণা হয়ে গেছে।
তারপর থেকে গোপাল শুধু পার্টি অফিস যায় আর আসে। টাটকা মাছ তখন গভীর জলে ডুব দিয়েছে।
আসছে গোপাল, যাচ্ছে গোপাল,
ভোটের বাজারে মাছের আকাল।
আসবে গোপাল, যাবে গোপাল—
জনগণের পচা মাছের কপাল!

Post a Comment

11 Comments

  1. 😂😂

    ReplyDelete
  2. 😂😂

    ReplyDelete
  3. খুব ভালো স্যটায়ার

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাApril 19, 2026

      থ্যাঙ্ক ইউ

      Delete
  4. কৌতুক সম্রাজ্ঞী উপাধিটা শীগগিরই লেখিকার প্রাপ‍্য হবে

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাApril 19, 2026

      হি হি

      Delete
  5. খুব ভালো খুব মজার.....দিদি

    ReplyDelete
  6. 😀😃😄😁😆😅🤣😂

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 18, 2026

      🫠☺️😊😍

      Delete