জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি/ ৩৯ পর্ব /চিত্রা ভট্টাচার্য্য

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি 
৩৯ পর্ব 
চিত্রা ভট্টাচার্য্য 

কবি নজরুলের প্রমীলা 

বাংলা সাহিত্যের আকাশে একদা বিপ্লবের ঝড় তুলেছিলেন যিনি  তেমনই  সাম্য ও মানবতার সাথে হৃদয় জুড়ানো প্রেমের বাণী প্রচারের মহানআত্মা তিনিই দ্রোহের কবি নজরুল। তাঁর ব্যক্তি জীবনের ওপর  ও বয়েগিয়েছে অশান্ত ঘূর্ণি ঝড়ের দাপট। কিন্তু অনন্য প্রতিভাশালী মানুষটির সৃষ্টির সম্মুখে সে ঝড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি । এ কথা ধ্রুব সত্য যে ' জগৎ সংসারের শিল্পী জীবনে শ্রেষ্টত্ব পাওয়া বা  বিখ্যাত হওয়ার নেপথ্যে  কোনো একজন বিশেষ মানুষের  প্রেম-ভালবাসা মায়ার বিচিত্র উপাদান প্রেরণার গভীর স্পর্শ অদৃশ্য থাকে। কেউ প্রেমাস্পদকে পেয়ে সৃষ্টি করেছেন ভালবাসার মহাকাব্য। কেউ বা বিরহের অনলে পুড়ে রচনা করেছেন করুণ রাগের অমর উপাখ্যান। তাঁদের সফলতার সাধনসঙ্গী ও প্রেরণাদায়িণীরূপে যে-সমস্ত নারীর উপস্থিতি দেখা গেছে, তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রেই বৃহত্তর অবদান রেখে গিয়েছেন। 

' নজরুলের কবিমানসে ও নারী বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই সত্য তিনিস্বয়ং বারবার স্বীকার করেছেন। নারীর বিরহে পুরুষ যেমন অসহায় বোধ করে, বিরহের আগুনে জ্বলে-পুড়ে তৈরি হয় উপলব্ধিমান নতুন মানুষ, ঠিক তেমনি নারীর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে সেই পুরুষই লাভ করে নবজন্ম। ''

সেই কারণেই বুঝি, ১৯৩৭ সালে  নজরুল তাঁর প্রথম প্রেয়সী নার্গিস কে চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত ; কী অসীম বেদনা। …'' তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি অগ্নিবীণা বাজাতে পারতাম না, আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।’   🍂

 কাজী নজরুল অতুলনীয় প্রতিভার উজ্জ্বলতায় সৃষ্টির সম্ভারে কাব্য সাহিত্যে সংগীতে সুরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন শিল্পের সুউচ্চ আসনে। অসাম্প্রদায়িক এই কবি মাত্র ২৩ বছরের লেখক জীবনে বাঙালির চিন্তা চেতনা, মনন ও অনুভূতিকে ভীষণ  ভাবে নাড়া দিয়েছিলেন।  সামাজিক আরাজকতা শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে গেয়েছিলেন সাম্যের গান। এপার ওপাড় দুই বাংলার অগুণিত হৃদয়ে এই কালজয়ী কবি যে স্বর্ণআসন টিতে আজও অপ্রতিরোধ্য স্রষ্টা রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন তাঁর নেপথ্যে দুই নারীর প্রভাব ছিল সর্বজন স্বীকৃত । একজন ছিলেন কবির প্রথম প্রেয়সী নার্গিস খান ও অপরজন অবশ্যই কবি জায়া নজরুলের প্রমীলার নীরব উপস্থিতি। বিদ্রোহী কবির  জীবনে তিনি  শুধু ভালোবাসার প্রতীকই নন, ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস। জন্মেছিলেন এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারায়, লালিত হয়েছিলেন সংগ্রাম ও সাহসিকতায়। তিনি আশালতা সেনগুপ্তা, ডাকনাম দোলনা, স্নেহাদরের নাম  ‘দুলী’।এবং নজরুলের  ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকা উপহারের নাম টি ছিল দোলনের প্রমীলা।   

  আমার ''ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি ' ধারাবাহিকের শেষপর্যায়ে কবির কর্মজীবনে নেপথ্যে প্রেরণা দায়িনী মহিয়সী সেই নারী প্রমীলা নজরুলের অব্যক্ত জীবন কাহিনি  নিয়ে আজকের আলোচনায় সচেষ্ট হয়েছি , যাঁর কথা না বললে কবির জীবন বৃত্তান্ত অসম্পূর্ণই থেকে যাবে ।  

মোঃ আজহারুল ইসলাম সম্পাদিত ‘মানিকগঞ্জের শত মানিক’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত কুমিল্লার নায়েব বসন্তকুমার সেনগুপ্তের দ্বিতীয় স্ত্রী   গিরিবালা দেবীর একমাত্র কন্যা আশালতা। ১৩১৫ সালের ২৭ বৈশাখ (ইং ১০ মে ১৯০৮), মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে জন্মেছিলেন।  এবং আকস্মিকই বসন্তকুমারের  অকাল প্রয়াণে অভিভাবক হীন পরিবারটিতে দারিদ্র্যের করাল  ছায়া নামলে অসহায় মা গিরিবালা দেবী কুমিল্লায় কান্দির পাড়ে দেবর ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। 

ছোট থেকেই  চাঁপাকলির মতো গায়ের রঙ ,প্রগলভা , চঞ্চলা  এবং বর্ণময় এক চরিত্রের অধিকারী কন্যাটি  সেকালে লেখাপড়ার আগ্রহে ফয়জুন্নেসা গার্লস হাইস্কুলের  ছাত্রী  ছিলেন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি স্কুল পরিত্যাগ করেন। তিনি গান গাইতেন। কবিতা লিখতে ও পাঠ করতে বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। এবং কবিতার প্রতি অদম্য আগ্রহতেই এসেছিলেন তরুণ কবির সংস্পর্শে।  

  ১৯২১ সালে জুন মাসে দৌলতপুরে আলী আকবর খানের ভাগ্নী কবির প্রথম প্ৰেয়সী নার্গিস খানের সঙ্গে কবির বিবাহ স্থিরহলে এবং আসরে মনোমালিন্য হেতু বিবিধ কারণে  বিয়ে ভেঙেযায়। আত্মসম্মানে আঘাত লাগায় কবি সে  রাতেই তার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু বীরেন সেনগুপ্ত ও তাঁর মাতা বিরজাসুন্দরী দেবী যাঁকে কবি ও মা বলেই ডাকতেন,তাঁদের সাথে  কুমিল্লায় কান্দিরপাড়ের  বাড়িতে চলে  আসেন । কবির নিত্য সহচর মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের বর্ণনায় জানা যায় , সেদিন বিয়ে ভাঙার পর মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে কবি  অচেতন  এবং শারীরিক ও মানসিক ভীষণ ভাবে দূর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়লে , সেবা যত্ন দিয়ে সুস্থকরে তোলার ভার পরে সেনগুপ্ত পরিবারের ,বিরজাসুন্দরী দেবীর সাথে সবথেকে বড়ো কন্যা দোলনের ওপর।   

কর্তব্যপরায়ণা দোলন গভীর নিষ্ঠায় কবির সুশ্রষা যত্নের খেয়াল রাখে। কবি ও আরোগ্য লাভ করেন। সেখানেই এক সন্ধ্যায় নজরুলের চোখে ধরা দেন কিশোরী দোলন —তাদের সে সাক্ষাৎ বদলে দেয় দুজনেরই জীবন ধারা ,ভাগ্যের আকাশ।  অসুস্থ তরুণ কবি আশালতার সাহচর্য পেয়ে শরীরে ও মনে ক্রমে নিরাময় হতে লাগলেন এবং  প্রেমে ও পড়লেন সদ্য কিশোরীটির। পারিবারিক ভাবেই আশালতা  ছিলেনসংস্কৃতিমনা।  আর সংস্কৃতির প্রতি নজরুলও ছিলেন চিরনিবেদিতপ্রাণ।  নজরুল তৃতীয়বারের মতো কুমিল্লায় এসেছিলেন ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেবার‌ই কুমিল্লায় দীর্ঘতম সফর ছিল নজরুলের   'বিজয়িনী' নামের কবিতাটি সে সময়ে লিখে উপহার পাঠালেন প্রিয়তমা দোলন কে। '' আর সে স্মৃতিই হয়তো কবিকে উদ্বেলিত করেছিল তাঁর ‘দোলনচাঁপা’  কাব্যগ্রন্থটি মানস সুন্দরী প্রমীলা তথা দোলন কে উৎসর্গ করতে।     

আলী আকবর খানের নিমন্ত্রনে কুমিল্লায় নজরুল এসেছিলেন , কিন্তু ভাগ্যচক্রে সেটা হয়ে ওঠে নজরুল দোলনের এক গভীর প্রেমের সূচনা। এরপর সময়ের প্রবাহে প্রমীলা হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী কবির প্রেরণাদায়িনী সঙ্গিনী। 

সাহিত্যের পথে চলতে গিয়ে নজরুলের অনেক কবিতা, গান ও গদ্যে অনুপ্রেরণা হয়ে থেকেছেন প্রমীলাদেবী । তবে এই প্রেম ও দাম্পত্যজীবনের পরিণতি সুখের ছিল না। দুঃখ- আর নিঃস্বতা সবই স্বামীর সাথে ভাগ করে নিয়ে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নজরুলের পাশে থেকে এক অকৃত্রিম ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন ।   

মুজফ্‌ফর আহমেদের মতে ,সম্পর্কের সূত্রপাত হয়েছিল , নজরুল তাঁর ৩৯দিন ব্যাপী  অনশন ভেঙে ছিলেন শ্রীযুক্তা বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে।  এবং ১৯২১ সালে নজরুল  যখন কুমিল্লায় প্রথম ঘোড়ারগাড়ি  ভাড়া করে রথযাত্রা দেখতে যান তখন বিরজা বালা দেবীর সাথে ১২ বছরের দোলন ও ছিলেন।  এবং সে সময় নজরুল নার্গিসের বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে দোলন ও গিয়েছিলেন।  

এরপরে 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতা লেখার 'অপরাধে' কবিকে কুমিল্লা থেকে ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিচারে কবির এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় ও  কবি জেল থেকে মুক্তি পেলেন। মুক্তি পাওয়ার পরদিন‌ই তিনি কুমিল্লায় চলে যান। এ নিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের হৃদয় ছিল ব্যথাতুর। 

কবি খান মুহাম্মদ ম‌ঈনুদ্দীন লিখেছেন: "একদিন কাগজে বের হলো: তিনি জেল থেকে মুক্ত হয়েছেন। আমরা —ছিলাম অধীর প্রতীক্ষায়। তাঁকে হৈ হৈ করে ষ্টেশন থেকে নিয়ে আসবো—এলবার্ট হলে সভা থেকে বহু পোষাকী বক্তৃতা করে স্তুতি-গান করবো, সত্য-মিথ্যা বিশেষণে তাঁকে বিশেষিত করে বাঙলাদেশকে তাক লাগিয়ে দেব। কত কল্পনা-জল্পনা মাথার ভেতরে গিস্‌গিস্ করছে। 'মুসলিম-জগতে'র তৎকালীন সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সাথে সে -আলোচনায় কতো বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি। কিন্তু কোথায় নজরুল? বহরমপুর জেলে নজরুল নেই—সারা কোলকাতায় নজরুল নেই—হুগলীতে নজরুল নেই। কোথায় তিনি ? তাঁর অগণিত ভক্তবৃন্দকে একেবারে পথে বসিয়ে তিনি সরে পড়েছেন কুমিল্লার এক নিভৃত পল্লীতে।" 

 নজরুল বিয়ে করবেন প্রমীলা কে। কিন্তু বিয়ের আগে কিশোরী প্রমীলাকে পার হতে হয়েছিল দুস্তর সমুদ্রের অসংখ্য বাধা বিপত্তির ঢেউ । প্রথমেই ছাড়তে হয়েছিল তাঁর পরিবারের আপনজনদের  যাঁদের আশ্রয়ে তিনি বড় হচ্ছিলেন।এবং তাকে ছাড়তে হয়েছিল তার আবাল্য পরিচিত হিন্দু সমাজ কে ।  নজরুল মুসলমান এবং প্রমীলা হিন্দু মেয়ে।আশ্চর্যের বিষয় হলো মুসলমান সমাজ থেকে তেমন কোনো বাধা আসেনি, বরং বাধা এসেছে হিন্দু সমাজ থেকে।এমন কি নজরুলের বেশির ভাগ বন্ধুই ছিলেন হিন্দু। তারা কেউ এই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন না  এবং সামাজিক বাধার কারণেই নজরুলকে নিজের ছেলের মত অপত্যস্নেহে ভালবাসলেও  বিরজাসুন্দরী দেবী রাজি ছিলেন না এই বিয়েতে কারণ, তার‌ও দুটি মেয়ে আছে এ বিয়েতে মত দিলে তাদের বিয়েতে সমস্যা হবেই ! 

 প্রবল বাধা এসেছিল সমাজের তরফ থেকে।  বিয়ে হতে আইনের বাধাও কম ছিল না। প্রথমত প্রমীলা যদি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতেন--প্রমীলা নিজে মুসলমান হতে চাননি, নাকি তাঁর মা গিরিবালা দেবী তা চাননি, কিম্বা  জাতপাতের ভেদাভেদে অবিশ্বাসী নজরুলই তা চাননি ; সে কথা  জানা যায়না।  দ্বিতীয়ত প্রমীলা সাবালিকা ছিলেন না। তার বয়স তখন ষোলো বছরের ও কম। নজরুল প্রমীলাকে স্বীয় ধর্ম ঠিক রেখেই বিয়ে করেন। কিন্তু সে সময়ের হিন্দু- মুসলমান সমাজের কেউই এই বিয়েকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে, আদর্শিক কারণে নানা অবিচার সহ্য করে তাঁকে বাস করতে হয়েছে। সে সময়ে টা ১৯২২-২৪সাল !তাঁদের বিবাহে সামাজিক বাধাবিপত্তি ভীষণ ভাবে ধেঁয়ে এসেছিল।  ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল—তখন ছিল রমজান মাস  রোজ শুক্রবার।শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিয়ে হয় ইসলামি রীতি অনুযায়ী।

"অগত্যা ১৮৭২ সালের ৩ নম্বর সিভিল ম্যারেজ এক্ট অনুযায়ী, কনেকে 'আহলে কিতাব' পরিচয়ে, ১০০০ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিবাহ সম্পন্ন হয়।  বিয়েতে ধুমধাম করার মতো টাকাপয়সা নজরুলের ছিল না। কবির মাতৃ স্থানীয়া মাসুদা রহমান নামের এক বিশিষ্ট নারীর সার্বিক আনুকূল্যে বিয়ের খরচ মেটানো হয়েছিল।"  এই বিয়েতে কোনো নহবত বসেনি।কোনো সানাই বাজেনি ,ছিলনা আলোর রোশনাই বা লোক নিমন্ত্রন । 

তবু এই ঐতিহাসিক বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল কলকাতার হাজী লেনের ৬ নং বাড়িতে। নজরুলের মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুসলিম বন্ধুর উপস্থিতিতে। আফসোসের বিষয় হচ্ছে, বিয়ের পরেও  সামাজিক আক্রমণবন্ধ হয়নি। হিন্দু মেয়েকে বিয়ের কারণে ব্রাহ্মরাও ক্ষেপে গিয়েছিলেন নজরুলের উপর। প্রতি 'শনিবারের চিঠি'র যে আক্রমণের কথা নজরুল লিখেছেন  তার পেছনেও রয়েছে এই বিয়ের কারণ ।  

   প্রমীলা দেবী -নজরুলের  অভাব ও আবেগের এক ছায়াসঙ্গী। নার্গিসের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নজরুলের জীবনে তিনি আসেন । তাঁদের বিয়ে ছিল সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সাহসী একটি পদক্ষেপ। আন্তঃধর্মীয় এই বিবাহ নজরুল ও প্রমীলা দুজনেই হয়ে ছিলেন  বিস্তর  লাঞ্ছনার স্বীকার।  তাঁদের বিবাহিত জীবন ছিল চরম অভাব ও  দারিদ্র্যের  জ্বলন্ত  উদাহরন ।  

''মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ লিখেছেন: "প্রমীলা সেনগুপ্তাকে বিয়ে করেছিল ব'লে ব্রাহ্মরা নজরুলের উপর বড় বেশী ক্ষেপে গিয়েছিলেন। 'শনিবারের চিঠি' ব্রাহ্ম মালিকানা-বিশিষ্ট 'প্রবাসী' পত্রিকার অফিসে জন্মগ্রহণ করেছিল। তার 'জনক' ছিলেন 'প্রবাসী'র তখনকার পরিচালক শ্রীঅশোক চট্টোপাধ্যায়। ১৯২৪ সালের ২৪শে (মূলত ২৫) এপ্রিল তারিখে নজরুলের বিয়ে হয়েছিল আর জুলাই মাসে বা'র হয়েছিল 'শনিবারের চিঠি'। দিনক্ষণ বিচার ক'রেই মোহিতলাল মজুমদার 'শনিবারের চিঠি'তে যোগ দিয়েছিলেন এবং 'প্রবাসী'তেও লেখা আরম্ভ করেছিলেন।" (আহ্‌মদ: ১৯৬৯, ২৮১-২) 

"সমালোচনা, কুৎসা রটানো চলছিলো দেদারসে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ব্যক্তি আক্রমণ‌ও করছিলো হরহামেশা। কিন্তু নজরুল ও প্রমীলা এসবের থোরাই কেয়ার করতেন। আর এজন্যই সামাজিক সমস্ত বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে প্রেম গড়িয়েছে প্রণয়ে, প্রণয় দীর্ঘায়িত হয়েছে আমৃত্যু।  '' 

 বেখেয়ালি সংসারে উদাসীন কবি  কাব্যরসে সংগীতের রাগরাগিণী ছন্দ সুর তাল লয় সৃষ্টির আনন্দে ঘুরে বেড়ান যত্রতত্র সঙ্গীত তাঁর নেশায়। নাবালিকা প্রমীলার  বিনিদ্র রাত কাটে দিনের পর দিন। বিবাহিত জীবনে শুরু হলো কঠিন সংগ্রাম। প্রেমের অনলে পুড়ে কল্পনার স্বর্গরাজ্যে এতদিন বিচরণ করে রূঢ় বাস্তব সংসারের যূপকাষ্ঠে নিত্যদিন আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে কবির দোলনচাঁপা  অকালে শুকিয়ে ঝরে যেতে থাকলো। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে  মশগুল কবি হয়তো দেখতেই পেলেন না।       

  ক্রমশঃ

Post a Comment

0 Comments