জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা/কমলিকা ভট্টাচার্য

গুচ্ছ কবিতা
কমলিকা ভট্টাচার্য


যেতে দিই

আজকাল কিছু আঁকড়ে থাকতে ভালো লাগে না,
মুঠো আলগা করে দিই—
যারা থাকার নয়
তাদের যেতে দিই।

অভিমানগুলো জানালার ধারে বসে থাকে,
আমি আর ডাকি না কাছে।
শুধু রাত নামলে
কিছু পুরোনো শব্দ এসে
চুপচাপ হাত ছুঁয়ে যায়।

একসময় খুব ভয় পেতাম হারাতে,
এখন বুঝেছি—
সব ভালোবাসা
ধরে রাখার জন্য জন্মায় না।
কিছু মানুষ আসে
মেঘের মতো,
একটু ছায়া দেয়,
তারপর ভেসে যায় দূরে।

তবু তাদের জন্য
মন খারাপ করি না আর,
কারণ ভালোবাসা মানে
কখনও কখনও
ভালোবেসেও মুক্তি দিয়ে দেওয়া।

🍂
নোটিফিকেশন

দু’জন মানুষ
দুটি বিপরীত তীরের মতো
একই নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
জল ছোঁয়া হয় না—
শুধু ঢেউয়ের শব্দ শুনে
ভালোবাসার অস্তিত্ব অনুমান করে।

কারণ কিছু সম্পর্ক
কথা বললেই নষ্ট হয়ে যায়।
তাই মানুষ
ভালোবাসাকেও কখনও কখনও
নোটিফিকেশনের মতো
চুপচাপ জ্বলতে দেয়।

না খোলা যায়,
না পুরো দেখা যায়,
না পড়া যায়,
না ডিলিট করা যায়।

শুধু বুকের ভিতর
একটা ছোট্ট আলো
অবিরাম জানিয়ে যায়—
কেউ একজন এখনও
অনলাইন আছে।
*******"*******
পুরোনো নম্বর

ফোন বদলে গেছে বহুবার,
শহর বদলেছে,
অভ্যাসও।

শুধু একটা নম্বর
এখনও মুখস্থ রয়ে গেছে।

কখনও ডায়াল করা হয় না,
তবু ভুলেও মুছে ফেলা যায় না।
মাঝে মাঝে
ভিড় বাসে জানালার পাশে বসে
হঠাৎ মনে হয়—
এই মুহূর্তে কল করলে
ওপাশের গলাটা কি এখনও
একইরকম ক্লান্ত শোনাবে?

তারপর আবার
ফোনটা পকেটে ঢুকে যায়।

কিছু ভালোবাসা
শেষ হয়ে যায় না আসলে,
শুধু
ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।
থাক!
নাই বা হলো অভ্যাস...


পাসওয়ার্ড

তুমি জানো না,
আমার সমস্ত শক্ত মানুষের অভিনয়ের ভিতর
একটা গোপন দরজা আছে।

সারাদিন
হিসেব, যুক্তি, ব্যস্ততা—
সব ঠিকঠাক চলে।

শুধু রাতের শেষে
তোমার নামটা মনে পড়লেই
ভেতরের সিস্টেম হঠাৎ
পাসওয়ার্ড ভুলে যায়।

তখন
আমি আর নিজেকে খুলতে পারি না,
বন্ধও করতে পারি না।

অদ্ভুত না?
একজন মানুষ
আরেকজন মানুষের কাছে
এতটা নিরাপত্তাহীন হয়ে যেতে পারে।


কষ্ট হয় 

যার জন্য
বারবার মেঘ সরিয়ে আকাশ দেখা,
তাকেই ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখি
গন্ধহীন ফুলের মতো।

সে আসে—
একটু আবদার হাতে,
যেন শীতের রোদ
দরজায় নরম কড়া নাড়ে।

তখন
চারপাশের মানুষের শব্দ বাড়িয়ে দিয়ে
দেখানো—
একাকীত্বের কোনো জায়গা নেই।

অধিকার
সব সময়ই ছাড়িয়ে যায় আবদার।

তারপর
অবহেলায় ফিরিয়ে দেওয়া তাকে,
মন ঘষে দাগটা মিটিয়ে ফেলা।

রাতে শুধু দেখি,
ভিড়ে ঢাকা মানুষটার ভিতর
একটা নিঃসঙ্গ পাখি
নিঃশব্দে ডানা ভেজায়।

Post a Comment

6 Comments

  1. মুকুল মুখার্জীJune 23, 2026

    কমলিকা দেবীর কবিতাগুলো পড়লাম। অনবদ্য লাগলো। অনুভূতিগুলো কয়েকটা শব্দের দ্বারা এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতাকে কুর্ণিশ জানাই। প্রেম ভালোবাসা কে অন্তর থেকে উপলব্ধি না করলে এই বহিঃপ্রকাশ সম্ভব নয়।ভীষণ ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJune 23, 2026

      কবিতা তার অর্থ পায় পাঠকের আবেগে।ভালো থাকবেন।প্রণাম নেবেন।🙏

      Delete
  2. AnonymousJune 23, 2026

    সেইতো! অরসিকেরও বুঝেছি বুঝেছি ভাব এসে যাচ্ছে। ব্যাপারটা ভাবার আছে।🤔

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJune 23, 2026

      ব্যাপারটা নিয়ে না ভেবে,ভাবটা লিখে ফেলুন কবিতা হয়ে যাবে।ভালো থাকবেন।প্রণাম নেবেন।🙏

      Delete
  3. AnonymousJune 23, 2026

    খুব সুন্দর হচ্ছে কবিতাগুলো। সংযত গভীর, শব্দ বসে থাকছে না, তারা ডানা মেলছে অনুভবের আকাশে। আরও লিখুন। নবারুণের মত কিছু প্রতিবেশী মানুষজনের অসহায় কষ্টও ফুটে উঠুক।

    ReplyDelete
  4. কমলিকাJune 23, 2026

    এই বারুদের মেঘে ভরা আকাশ
    আমার উড়বার জায়গা নয়।
    যেখানে স্বপ্নের ডানার চেয়ে
    মিসাইলের দাম বেশি,
    সেখানে আমার কোনো
    ঠিকানা থাকার কথা নয়।

    চেষ্টা করলাম। ভালো থাকবেন। প্রণাম নেবেন।🙏

    ReplyDelete